মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২০

অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু || সুরাইয়া আক্তার সৃষ্টি

রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমি অপেক্ষা করছি নীলার জন্য।

আজ নীলু আসলে অনেক কিছু বলার আছে তাকে।এরমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে বৃষ্টি। আর ঢাকার বৃষ্টি মানেই কাদা রাস্তায়,বাসের হর্ন, গাড়ির হেড লাইটের আলোতে চিকচিক করে বর্ণিল রং সৃষ্টি করা। আমরা যারা চশমা পড়ি তারা বৃষ্টিতে একটা অসাধারন দৃশ্য দেখতে পাই।

বৃষ্টির পানিতে চশমার ঘোলা গ্লাসের দৃশ্য। আমি একা দাঁড়িয়ে ভিজতেছি। হঠাৎ নীলা এসে আমার মাথার কাছে ছাতা ধরে বলল-

এই তোমায় বৃষ্টিতে ভিজতে কতবার বারণ করেছি? কোনো কথা শুনো না কেন বুঝি না!

ওর রাগ মাখা চোখে ভালোবাসার ছাপ স্পষ্টত। রাগ কমাতে একটু এগিয়ে গিয়ে ধরলাম হাতটা। প্রসঙ্গ বদলাতে বললাম-

চলো, কিছুক্ষন হাঁটি।

দুজন চুপচাপ একই ছাতার নিচে হাটছি।এর মধ্যেই হাত ছেড়ে দিয়ে নীলা আবার অভিমানী সুরে অভিযোগ করে বলতে শুরু করলো-

ধ্যাত, আজ আসছ খাতির দেখাইতে? দুদিন ধরে এত করে বললাম দেখা করতে। আমার জন্য সময়ই নাই তোমার। বাকি সবার জন্যই সময় থাকে শুধু আমি বললেই তোমার যত ব্যস্ততা!

চুপচাপ মাথা নিচু করে হাটতে থাকলাম আমি। কি বলব খুঁজে পাচ্ছি না। নীলু আবার বলে উঠল -কি হল? কথা বলতেছো না কেন?

একটু সময় নিয়ে বললাম-সরি, নীলু।আসলে জানোই তো নতুন চাকরী। ঘনঘন কি ছুটি নেওয়া যায় বলো? কিছুদিন যেতে দাও প্লিজ। দেখো সব ঠিক হয়ে যাবে।

-হু, হয়েছে। উফফ,কি ব্যাপার বলো তো? এই বৃষ্টিতে রাস্তায় এতো হাটার কি হল? আর কতক্ষন হাটাবা? বাসে উঠতে সমস্যা কোথায়?

-কেন? হাঁটতে সমস্যা কোথায়? আর তেমন তো বৃষ্টি নাই।

-ধুর, এই রাস্তায় হাটা যায় নাকি? গাড়ি আর গাড়ি। কখন এসে কে মেরে দেয় কে জানে! আর হাঁটতে পারব না বললাম।

-উফফ, এভাবে বলো কেন? তুমি জীবনে আগে কখনো রাস্তায় হাটোনি নাকি?

-আগে তো তুমি আমার লাইফে ছিলে না। আলহামদুলিল্লাহ, চার বছর যাবৎ তোমাকে নিয়ে আমি আমার লাইফে অনেক খুশি।এতো জলদি মরতে চাই না। আমি আরো অনেক বছর বাঁচতে চাই।বাসে উঠো তো তুমি।

-উফফ,তুমি না একটা বেরসিক রমণী।কি সুন্দর তুমি আর আমি হাতে হাত ধরে হাঁটছি না তুমি বুঝতেই চাও না!

-আচ্ছা আচ্ছা,ওকে চলেন স্যার হাটছি।

– এইতো আমার লক্ষ্মী বউটা!

-ঢং বাদ দেও তো।তোমার রেজাল্ট কখন দিবে?

-জানিনা। তোমার পড়া লেখার কি অবস্থা??

-ভালো না, পড়তে ভাল্লাগেনা একদম।

-আজীব তো!কি বলো এসব? আমার মত পোলাপানের পড়তে প্যারা লাগে, কিন্তু তুমি মেয়ে মানুষ, তোমার আবার সমস্যা কি?

-না।পড়তে মোটেও ভাল্লাগেনা।কিন্তু…ক্যারিয়ার নিয়ে খুব চিন্তা করি সব সময়!

-আরে, পাগলী বলে কি? পড়ালেখা বাদ দিয়ে ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তা করো মানে কি?

-না ,মানে আমি তো সবসময় তোমার কথাই চিন্তা করি। রাগ করে তাকালেও ওর চোখের দিকে তাকিয়ে দুজন একসাথে হেসে উঠলাম।এরপর নীলার দিকে তাকিয়ে বললাম-

নীলু, আমি তোমাকে…কথা শেষ হওয়ার আগেই নীলু আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো এক সাইডে। কিছু বুঝে উঠার আগেই দেখলাম একটা ট্রাক এক নিমিষে পিষে দিয়ে গেলো নিলুকে! সেদিনের কথাগুলো মনে করে কাঁদতে কাঁদতে হঠাৎ চোখ মুছে নীলুর কবরের পাশে থেকে উঠে দাঁড়ালো নাহিদ।

আজ নীলুর ১২তম মৃত্যুবার্ষিকী। হয়তো নীলু বেঁচে থাকলে ওদের বিয়ের ১২বছর পূর্ণ হতো। কারণ সেদিন নাহিদ নীলুকে বলতে চেয়েছিলো “আমি তোমাকে খুব জলদি বউ করে তোমার নিজের বাড়িতে আনতে চাই,নীলু।”

ভুলতে পারা অথবা নতুনভাবে জীবন শুরু করা দূরের কথা! নাহিদ সেদিনের পর থেকে এক মুহূর্তের জন্যও শান্তি পায়নি।কান্নায় কিছুটা শোক কমে, কিন্তু ফুরিয়ে যায় না।কারণ সেদিনের ঘটনার জন্য সে আজো নিজেকেই দায়ী ভাবে।তাই নাহিদ এখন শুধু মৃত্যুর দিকে তাকিয়ে আছে সুতীব্র অপেক্ষায়।কিন্তু মৃত্যু হয়তো অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবেই আসে সবসময়!


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত