সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০২২

অভিবাসনপ্রত্যাশীদের স্বপ্ন ও বাস্তবতা

তাসনিম সিদ্দিকী

সম্প্রতি ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোতে আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে আবেদনকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে বহু গুণে। সিরিয়া ও আফগানিস্তানের লক্ষাধিক নাগরিক আবেদন করেছে। গত বছর বাংলাদেশেরও ২০ হাজার নাগরিক এই আবেদন করেছে। এসব দেশে আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে আবেদন বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম বা ষষ্ঠ। সিরিয়া-আফগানিস্তান যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট। সুতরাং সেসব দেশের মানুষ নিরাপত্তা ও উন্নত জীবন প্রত্যাশায় নিজ দেশ ছাড়তে চাইতেই পারে। কিন্তু বাংলাদেশের নাগরিকরা কেন সেই দলে যুক্ত হচ্ছে- এ প্রশ্ন আসতেই পারে। একজন মানুষ কেন অভিবাসন করে- সেটি একটি জটিল প্রশ্ন।

অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, ডেমোগ্রাফিক, পরিবেশগত বিপর্যয়সহ নানা কারণে পারিপার্শ্বিক বাস্তবতা মিশে যায় একজন ব্যক্তির পারিবারিক ও ব্যক্তিগত মন-মানসিকতার সঙ্গে। একই সঙ্গে দালাল, রিক্রুটিং এজেন্সি অথবা ওই ব্যক্তির বিদেশে থাকা আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব সেই ব্যক্তির অভিবাসনের স্বপ্নকে জাগিয়ে দেয়।

অভিবাসন তাত্ত্বিকরা প্রমাণ করেছেন, দারিদ্র্যের সঙ্গে অভিবাসন কোনো কোনো ক্ষেত্রে যুক্ত; তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অর্থনীতির উন্নয়নের সঙ্গে বাড়ে। যে কারণে বলা হয়, দেশে যত বেশি উন্নয়ন হবে তত বেশি অভিবাসন বাড়বে। মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোতে কাজ করে যারা মাসে ১ লাখ টাকা রোজগার করতে পারে, তারা যদি ইউরোপের কোনো রাষ্ট্রে গিয়ে মাসে ৩ লাখ টাকা রোজগারের সুযোগ দেখে, তাহলে স্বাভাবিক কারণেই তারা সেসব দেশে পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করবে। এ কারণে সরকারের উচিত ইউরোপ-আমেরিকাসহ অন্যান্য রাষ্ট্রে বৈধভাবে কাজের সুযোগ করে দিতে কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো। না হলে সাগর-মহাসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইউরোপ-আমেরিকায় পাড়ি দিতে গিয়ে সলিলসমাধি ঠেকানো যাবে না।

ভারত-পাকিস্তান-ইরান-সুদান হয়ে লিবিয়া গিয়ে সমুদ্রপথে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমায় আমাদের দেশের অনেক নাগরিক। দালালদের মাধ্যমে এই দীর্ঘ যাত্রায় অনেকেরই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু হয়। মাঝেমধ্যেই গণকবরের সন্ধান মেলে। এত কিছুর পরও থেমে নেই বিদেশ যাওয়ার সেই জটিল প্রক্রিয়া। শরীয়তপুরের অনেক পরিবারের একজন সদস্য ইতালি যাওয়ার পর অন্যদেরও নিয়ে যায়। এর ফলে জেলার নড়িয়ার লোকজন ইতালিতে গিয়ে একটি লিটল নড়িয়া তৈরি করেছে। এটা যখন অন্য বাঙালিরা দেখে, তাদেরও সাধ জাগে একটু ভালো জীবনযাপনের। বাংলাদেশে অনেক উন্নয়ন হয়েছে- এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আরও উন্নত জীবনের আশায় মানুষ ইউরোপ-আমেরিকায় পাড়ি জমায়। আমি নাম বলতে চাই না; বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠিত সংগীতশিল্পী, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ বিদেশে চলে গেছেন। তাঁরা কেন গেছেন? সহজ উত্তর- আরেকটু ভালো থাকার আশায়।

মৃত্যু হতে পারে জেনেও অবৈধভাবে সমুদ্রপথে ইউরোপে পাড়ি জমায় অনেক অভিবাসনপ্রত্যাশী। কারণ তারা জানে, একবার যেতে পারলে জীবন পাল্টে যাবে। এসব অবৈধ যাত্রা বন্ধে বৈধ পথে জনশক্তি পাঠানোর উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে। ওইসব দেশকেও বৈধ পথ তৈরিতে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা দেখি, অবৈধভাবে যাওয়া বাংলাদেশিদের তারা ঠিকই কাজ দিচ্নে। আবার সর্বজনীন ক্ষমার মাধ্যমে বৈধও করে নিচ্ছে। তাহলে নেওয়ার বৈধ পথটি উন্মুক্ত করে দিতে সমস্যা কোথায়?

আমাদের দেশের চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষকদের লোভনীয় প্রস্তাব দিয়ে ইউরোপ-আমেরিকা তাদের দেশে নিয়ে যাচ্ছে। দক্ষ লোকদের তারা ঠিকই টানছে। কিন্তু শ্রমিক, কৃষক ও ব্যবসায়ীদের নেওয়ার ব্যাপারে বৈধ প্রক্রিয়া উন্মুক্ত করছে না। ফলে আমাদের দেশের বিশেষ করে মফস্বলে মধ্যবিত্ত পরিবারের বিএ, কখনও কখনও এমএ পাস করা যুবকরা যখন চাকরি খুঁজতে গিয়ে দেখে, এ দেশে সরকারি চাকরি পেতে ৫-১০ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়, তখন তারা চিন্তা করে, ১০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণির চাকরিতে যোগদানের চেয়ে দালালদের মাধ্যমে এই টাকা দিয়ে একবার ইউরোপ-আমেরিকা যেতে পারলে জীবন পাল্টে যাবে। তাই তারা অবৈধ পথে পাড়ি দে। এসব মানুষ প্রথমে এক রাষ্ট্রে যায়। পরে সুযোগ বুঝে অন্য রাষ্ট্রে চলে যায়। তারা আরও উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষায় স্থান পরিবর্তন করে।

অবৈধ পথে পাড়ি দিয়ে উন্নত দেশে যাওয়া নাগরিকদের সে দেশের সরকার প্রথম পর্যায়ে কাউকে কাউকে জেলে নিলেও পরে কিন্তু ঠিকই ক্ষমা করে দেয়। মাঝেমধ্যেই এ সাধারণ ক্ষমার ঘটনা দেখা যায়। ফলে সেই আশায় বা সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হবে- এমন আশ্বাসে অনেকেই অবৈধ পথে এসব রাষ্ট্রে পাড়ি দিচ্ছে। যদি চিকিৎসক, প্রকৌশলীদের নেওয়া হয়; তাহলে কৃষিকাজ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, এমনকি শ্রমিকদের বৈধ পথে নিতে ভিসা দিতে দেশগুলোর অনীহার যুক্তি থাকতে পারে না।

মধ্যবিত্তদের ইউরোপ-আমেরিকায় যাওয়ার সুযোগ নেই। এই বৈষম্যের কারণেই দালালরা সুযোগ নিয়ে অনেককে বিপদের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। উন্নত জীবনের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকে অনেকে অভিবাসনে আগ্রহী হচ্ছে। বলা যায়, উচ্চাশা থেকে অভিবাসন। অনেকে ভ্রমণ ভিসায় বিদেশে গিয়ে পরে স্থায়ী হয়ে যাচ্ছে। তাদের স্থায়ীকরণের ব্যাপারে আইনি সহায়তা দিচ্ছেন সেসব দেশের আইনজীবীরা। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সে দেশে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন। এসব আশ্রয়প্রার্থী নিজ দেশের বিরুদ্ধে নানা আপত্তিকর অভিযোগ তুলে আশ্রয় প্রার্থনা করে। অনেকে আছে, যারা দেশে জঙ্গি হামলার ঝুঁকি আছে- এই কথা বলে লন্ডন-নিউইয়র্ক, টরন্টোতে আশ্রয় চায়।

আমাদের শিক্ষাক্রমে পরিবর্তন আনতে হবে, যাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি হয়। কারণ দক্ষ জনশক্তির কদর বিশ্বের সব দেশে আছে। আমাদের শিক্ষাক্রম আরও ঢেলে সাজাতে হবে। এখানে কারিগরি বিষয়গুলোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। উন্নত রাষ্ট্রে গিয়ে অনেকে ভালো অর্থ রোজগার করছে। কারিগরি শিক্ষা ছাড়া সনাতন পদ্ধতির শিক্ষাব্যবস্থায় বেশি দূর এগোনো যায় না। দেশে পাবলিক-প্রাইভেট মিলিয়ে শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে। এর অর্ধেকের বেশির শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাই মানসম্মত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বিশ্বমানের শিক্ষাক্রম নিশ্চিত করতে হবে।

কানাডা দুয়ার খুলে দিয়েছে। ফলে অনেকেই বৈধ পথে সে দেশে যাচ্ছে। তারা আমাদের দেশের দক্ষ জনশক্তিকে কাজের সুযোগ করে দিচ্ছে। এটা দোষের কিছু নয়। যদি বিদেশে গিয়ে কাজ করে দেশে রেমিট্যান্স পাঠানো হয়, তাহলে ক্ষতির কিছু দেখছি না। বরং এসব উন্নত রাষ্ট্রে আমাদের প্রতিনিধিরা থাকলে দেশের স্বার্থসংশ্নিষ্ট বিষয়ে জনমত তৈরি করতে পারেন। এসব দেশে ব্যবসায়ী বা গবেষকরা ওখানে বসে যে লিঙ্ক তৈরি করতে পারবেন, এটা ঢাকায় বসে সম্ভব নয়। তাই দ্বৈত নাগরিকত্বকে উৎসাহিত করা উচিত।

আমাদের দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। কেউ কেউ বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুরের সঙ্গেও তুলনা করছেন। এ কথাও সত্য, এখানে আইনের শাসনের দুর্বলতা রয়েছে। গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব রয়েছে। এখানে ভিন্নমত সহ্য করা হয় না। ভিন্নমত প্রকাশের কারণে কারাগারে যেতে হয়। গুমের সংস্কৃতি থেকে আমরা বের হয়ে আসতে পারিনি। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ থেকে বের হয়ে আসতে পারিনি। এসব কারণে অনেকে নিরাপদ জীবনের প্রত্যাশায় দেশ ছেড়ে পশ্চিমা দেশে পাড়ি জমায়। অভিবাসনের স্বপ্ন মানুষ দেখবেই। এই অভিবাসন যাতে নিয়ম-নীতির ভেতরে হয়, সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব গ্রহণকারী এবং প্রেরণকারী উভয় দেশেরই।

অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকী: চেয়ারপারসন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


© 2022 - Deshbarta Magazine. All Rights Reserved.