সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯

আজ আমার শূন্য ঘরে আসিল সুন্দর

মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন
নভেম্বর, ২০০৩। সামনে অনার্স পরীক্ষা। রাতজেগে পড়তে হয়। তাই বিকেলে ঘুমাতে যাওয়া অভ্যাস। আজ একটু একটু শীত অনুভূত হচ্ছে। লেপমুড়ি দেওয়ার মত নয়। পাতলা কাঁথা হলে ভাল হত। ইদানিং বাড়ি যাওয়া সম্ভব না। অগত্যা কাঁথা যোগাড়ের ভূত মাথায় আসছে। রাতের বেলায় কাঁথা জড়িয়ে পড়ার অভ্যাস। ম্যাকানিক্সের জটিল থিওরি আজ কাঁথা যোগাড়ের কাল্পনিক সমীকরণ সমাধানে ব্যস্ত।
পরের দিন শুক্রবার। বিকালে ঘুরতে ঘুরতে বন্ধু রাতুলের বাসায় গেলাম। রাতুলের রুমটা ওদের পারিবারিক বাউন্ডারির বাইরে। তাই আসা যাওয়া অনেকটা স্বাধীন। কলিংবেল টিপতেই রুমের দরজা খুলে বসতে দিল ওর ছোটবোন অরিন। অরিন আমাকে ভাল করে চিনে না। ক্লাস ফাইভে পড়ে।
: ভাইয়া দুধ চা নাকি রং চা দিব?
বললাম, রং চা।
দশ মিনিট পর অরিন চা বিস্কুট দিয়ে চলে গেল। টিভির রিমোট দিয়ে বলল, ভাইয়া অপেক্ষা করেন। ভাইয়া যেন কোথায় গিয়েছে। টিভি দেখতে দেখতে কখন যে ঘুমিয়ে গেলাম টের পাইনি। একটু শীত শীত ভাব। সন্ধা সাড়ে ৭ টা। রাতুল আসছে না। মেসে চলে যেতে হবে। রাতুলের বালিশের নিচেই একটি কাঁথা; মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। রুম থেকে একটা পলিথিন ব্যাগ বের করলাম। কাঁথাটি পেপার দিয়ে মুড়িয়ে মেসে চলে আসলাম।

মেসে ঢুকতেই ব্যাগে রাখা পণ্যের ওপর সবার সজাগ দৃষ্টি। কারণ নতুন কাপড়-চোপড় কিনলে মেসের সবাইকে আপ্যায়ন করতে হয় দামের অনুপাতে। যেহেতু চুরি করা কাঁথা তাই ঝালমুড়ি দিয়ে সেদিন পার পেয়ে গেছি। কাঁথা জড়িয়ে আজ রাত তিনটা পর্যন্ত পড়ছি। আমার রুমমিট শৈবাল আর নিহাদ। আমার কাছের বন্ধুও। কাঁথা খুলে দেখলাম। কাঁথার কর্ণারে লিখা “ভুলতে মানা, R”।

কাঁথাটি আনা ঠিক হলো বলে মনে হচ্চে না। অপরাধবোধ কাজ করছিলো। তাই অবস্থা অবলোকন করতে আজও রাতুলের বাসায় যাই। আজ ওদের বাসার সবাইকে একসাথে টিভি দেখা অবস্থায় পেলাম। রাতুলের ফেমিলি সদস্যদের সাথে আমার পুর্বপরিচয় ছিলো না। আমার সম্পর্কে এক আধটু জানত। কারন রাতুলের ফ্রেন্ডলিস্টে আমার বাড়িটাই দুরে।
কুমিল্লা থেকে সুনামগঞ্জ প্রায় ৩০০ কি,মি। কথাপ্রসঙ্গে কাঁথা গায়েবের কথা উঠলো। আমার ভেতরে ভেতরে অস্থিরতা। কারণ গতকাল আমিই এসেছি এই রুমে। সন্দেহ যদি আমার উপড়ে বর্তায়। একটু পর রাতুলের বোন রওনক এসে রাতুলের উপড়ে খুব নালিশ করছে। তাও আমার কাছে রাতুলের বিরুদ্ধে। বলছে ভাইয়া, আপনার বন্ধু এত বেখেয়ালি কেন? উনার রুম থেকে পারফিউম, ক্যাসেট, গল্পের বই চুরি হয়ে যায়।
আমি গত তিনমাস সময় নিয়ে কাঁথাটি তৈরি করেছি। আপনার বন্ধুর রুম থেকে কাঁথাটি গায়েব। বিশ্বাস করুন কাঁথাটি আমার খুব প্রিয়। আমি আশ্বাস দিয়ে ওর মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছি। বলেছি যদি বন্ধুমহলের কেউ নিয়ে থাকে তাহলে ফেরত তুমি পাবেই। ভিতরে ভিতরে আমার অপরাধবোধ আমাকে দহন করছে। কিন্তু না পারছি স্বীকার করতে, না পারব ফেরত দিতে। মেসে ফেরত গেলাম।

কাঁথাটি বাক্সে যত্ন করে রেখে দিয়েছি। কারণ রাতুল জানলেও সমস্যা নেই কিন্তু ওর পরিবারের সদস্য জানলে কি জবাব দিব। আমার সম্পর্কে ওদের ইতিবাচক ধারণা। বিশ্বাস ভঙ্গের আশংকা। তাছাড়া নিহাদের বাড়িও রাতুলের বাড়ির কাছে। রওনক নিহাদের বোনের ক্লাসমেট। ক্লাস এইটে পড়ে। নিহাদকে বললাম, দোস্ত এই কাঁথার ঘটনা অনেকদুর পর্যন্ত এগিয়ে গিয়েছে। ভুলেও তা স্বীকার করিস না।
অনার্স, মাস্টার্স কমপ্লিট করে ঢাকা চলে আসলাম চাকুরীর সুবাদে। কাঁথাটি ব্যবহারের সাথে স্মৃতি আর অপরাধবোধ কাজ করছে। ২০০৯ সালের নতুন চাকুরি। প্রথম পোস্টিং হাতিয়া। বাড়িতে বিয়ে নিয়ে কথা হচ্ছে। পছন্দ আছে কিনা জানতে চাইল ছোটবোন। বিশেষ কোন পছন্দ ছিলো না। যে যেভাবে পারছে পাত্রী দেখতেছে।

আগস্ট মাস। প্রচন্ড বৃষ্টি। কাঁথা গায়ে দিয়ে শুয়ে আছি। ফোন আসছে বাসা থেকে। ছোটবোন ফোন দিয়েছে।
বলতেছে, ভাইয়া রাতুল নামের কোন বন্ধু আছে তোমার?
বললাম হ্যাঁ, আছে। কেন?
: ওর কি কোন বোন আছে?
: হুম আছে। তিনবোন। কেন?
: ওদেরকে চিন?
: হুম চিনি। কেন?
: কতটুকু চিন?
: খুব বেশি না। কেন?
: ওরা তিনবোন।
: অরিন, রওনক, ফারিন।
: রওনক কে কেমন লাগে?
: কেন?
: আজ রওনককে দেখে আসছি।
যে কাঁথার নিচে শুয়ে এ খবর পেলাম সেই কাঁথার মালিক যে এই রওনক। দেখতে বেশ সুন্দর ছিল। ক্লাস এইটের পর আর দেখা হয়নি। প্রায় ৬ বছরের ব্যবধান। সাত-পাঁচ না ভেবেই পরিবারের ওপর দায়িত্ব দিয়ে দিলাম।

কথাবার্তা ফাইনাল। তবে তারিখে বিষয় টা আমার সিদ্ধান্তেই ছেড়ে দিলেন।কারন হাতিয়া থেকে সুনামগঞ্জ। রওনকদের বাড়ি কুমিল্লা। তাই সময়ের ব্যাপার। রওনকের বাবার ইচ্চে ছিলো মেয়েকে কাছাকাছি বিয়ে দেওয়া। তাই নেতিবাচক মন্তব্যের মাঝে একটা মন্তব্য ছিল যে হাতিয়া থাকা আর সৌদি থাকা একই। সৌদির প্রস্তাবে দিই নাই। হাতিয়া যদি চাকুরী করে তাহলে কিভাবে সম্ভব। যদিও পরবর্তীতে সবার সম্মতিতে বিয়ের এংগেজমেন্ট হয়ে যায়। রওনকের মোবাইল নাম্বারটা ও পেয়ে গেলাম। কথা খুব কম হতো। মেসেজে সব শেয়ার করাতাম। দৈনিক ২০০/২৫০ টি এসএমএস সেন্ড করতাম। ফিরত পেতামও ২০০/২৫০।

“আজ আমার শূন্য ঘরে আসিল সুন্দর, ওগো অনেক দিনের পর।
আমি সুখেরে করেছি সখা
দুখেরে দুসর, ওগো অনেকদিনের পর।”
এটা ছিল প্রথম এসএমএস।

যথারীতি কাঁথাচুরির তারিখটি ছিল ১২ই নভেম্বর। তাই বিয়ের তারিখটাও ১২ তারিখই বরাদ্ধ করেছি।
রওনকের সাথে কথা হলেই বলতো তুমিত মেসেজে চমকের কথা বল। কী চমক, জানা যাবে? আমি বলতাম যথাসময়ের চমক যথাসময়ের জন্যই বরাদ্ধ থাকুক।

আমাদের বিয়ে হলো। আজ ১২ ই নভেম্বর, ২০০৯। আজ আমাদের যুগুলবন্দীর প্রথম রাত। সঙ্গত কারনেই স্মরনীয় মূহুর্ত। রওনকের চোখে গ্লানির চিহ্ন। অনেকটা পথ জার্নি। তাছাড়া বিয়েবাড়ির কোলাহলে ঘুমকষ্ট ত আছে।
: রওনক, বলতো মানুষের হারানো জিনিষ ফিরে পেলে কেমন লাগে?
: ভাল লাগে, কিন্তু হারানো জিনিষ খুব কমই ফিরে পাওয়া যায়।
: আমি আজ তোমাকে হারানো জিনিষ ই ফিরত দিব।
: কী সেটা?
৬ বছরে কাঁথার কথা আসলে ভুলেই গিয়েছে রওনক।
: চোখ বন্ধ কর।
: হুম, করলাম।
প্যাকেট খুলে ওর সামনে কাঁথা খুললাম।
: চোখ খোল।
চোখ খুলে ত রওনক অবাক। ২মিনিটের বেশি কেবল তাকিয়েই ছিল আমার চোখে। এটাই ছিল আমাদের যুগুলবন্দীর সেরা মূহুর্ত।
আমাদের সংসার জীবনে আজো ওর কাঁথা চোর সম্বোধন আমাকে শিহরিত করে। আসছে ১২তারিখেও বিবাহবার্ষিকীতে ওর সম্বোধনের অপেক্ষায়। রওনক, নকশি কাঁথার উষ্ণতায় হাজার বছর আগলে রেখ। শুভ বিবাহ বার্ষিকী।


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

error: Content is protected !!