সোমবার, ২৩ মে ২০২২

আনন্দধাম : প্রিয়তু শ্যামা

ময়না, ময়না…ওহ্ ময়না মা তুমি এখানে! আমি কতক্ষণ ধরে ডেকে যাচ্ছি। আমার একটা দরকার ছিল তোমার সাথে। তাছাড়া এত নিবিষ্ট হয়ে, নিবিড়ভাবেই-বা কী পড়ছ তুমি?
কয়েকটা মেইল চেক করলাম। আর দ্যাখো কত চিঠি এসে রয়েছে, সেসবও কিছু কিছু পড়ছি, উত্তর করছি। এই চিঠিটা পড়ে সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছি। এটা লিখেছে আমাদের আনন্দধামেরই একজন প্রবীণা। পড়ে দেখবে নাকি?

পড়ব? আচ্ছা দাও পড়ি…

প্রিয় চারুলতা,
আমার ভালোবাসা গ্রহণ কোরো। তোমাকে, তোমাদেরকে ভীষণ মিস করছি।ভণিতা না-রেখেই বলছি আমার এখানে থাকতে একদমই ভালো লাগছে না। মাঝে মাঝে দম আটকে আসতে চায়। জানি না কবে দেশে ফিরতে পারব, তোমাদেরকে কাছে পাব! আমি আনন্দধামে কতটা ভালো ছিলাম এই দেশে না এলে বুঝতেই পারতাম না। তুমি তো জানো আমার দুটো নাতি আছে, বউমা মেয়ে হিসেবে ভালোই বলতে হবে। পরের মেয়েকে অহেতুক দোষারোপ করার মতো অমন মেয়ে সে মোটেই নয়। তবে ওরা প্রচন্ড ব্যস্ত, সারাক্ষণ কেবল ছুটছে, ওদের জীবন ঘড়ির কাঁটার সাথে যুক্ত করা। ওরা খায়, ঘুমায়, বাচ্চাকে সময় দেয়, বুঝি-বা স্বামী-স্ত্রীকেও ঘড়ি ধরেই। ওদের সংসারটা দেশটার মতোই শীতল। শীতঘুমে ওদের জীবন বাঁচে।বন্ধনের দৃঢ়তার বড়ো অভাব দৃশ্যমান এখানে। অথচ সম্পর্ক বাঁচেই বন্ধনের দৃঢ়তাকে ভর করে। আমার এমন যান্ত্রিক জীবন মোটেই ভালো লাগছে না। তোমরা কেন যে আমাকে এই ভীনদেশে ছাড়লে! এই মর্ত্যধামেই যে এমন জীবনও হতে পারে তা এখানে আসার আগে বুঝতেই পারিনি। এখন মনে হচ্ছে আমার আসাটা বোধহয় দরকার ছিল, নইলে ছেলেটার প্রতি কোথাও কিছুটা অভিমান হয়তো থেকে যেত। যাকগে, আমি রুহানকে বলার সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারছি না, তুমি ওকে মেইল করে জানাও আমার চিঠির কথা। ওকে বলো খুব তাড়াতাড়ি আমাকে দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করে দিতে।
আরেকটা কথা, তোমরা বেশি বেশি করে প্রবীণনিবাস, বৃদ্ধাশ্রমের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে যাবে।কারণ আমরা আমাদের বয়সী সঙ্গীদের সাথেই সবচেয়ে বেশি ভালো থাকি। জানো, একটা বয়সের পর-না খুব কথা বলতে ইচ্ছে করে! কত কত কথা জমা পড়ে থাকে এই এক জীবনে! সবই বলে যেতে মন ব্যাকুল হয়। মনে হয় মরে গেলেই তো আর কিছু বলা হয়ে উঠবে না।তাছাড়া কথা বলতে পারলেই এখন ভালো লাগে। কিন্তু আমাদের কথা শোনার মতো, আমাদেরকে সময় দেবার মতো অত সময়, ব্যবস্থা ওদের নেই। ওরা বড়ো বেশি ব্যস্ততায় নিমগ্ন। এই ব্যস্ততাকে এভয়েড করে বাঁচবে ওরা তেমনও নয়।তবে কেন আমাদের ওদেরকে অহেতুক বিরক্ত করা। ওরা ভালো থাকুক। আমরাও ভালো থাকতে চাই।আর সেটা আনন্দধামেই সম্ভব। তোমরা খুব ভালো থেকো, আর সবাই কেই বোলো আমি ওদের ভীষণ মিস করছি।
সবটা পড়লে?
হুম, পড়লাম।
কী বুঝলে?
বুঝলাম আনন্দধাম নিয়ে নেতিবাচক ধারণা এইবার আমজনতাকে বদলাতেই হবে। সময়টা এখনকার, আর এই সময়ে এসে প্রবীণনিবাস ভীষণভাবে আবশ্যক হয়ে পড়েছে ।
এই দ্যাখো আরেকটা চিঠি, আচ্ছা দাঁড়াও এটা আমি পড়ে শোনাচ্ছি।
এই চিঠিটা লিখেছেন একজন ছেলে।সে তার একান্ত দুঃখের কথাগুলোকে খুবই যৌক্তিক করে উত্থাপন করেছেন। তাহলে পড়ছি শোনো…
আনন্দধামের পরিচালকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি…
আমি একজন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সামান্য কর্মচারী। বেতন সাকুল্যে ৪২,০০০ টাকা হাতে পাই। ঢাকায় দুই কামরার ছোট্ট ভাড়ার ফ্ল্যাটে বসত। আমার দুটো সন্তান রয়েছে। তারা যথাক্রমে স্কুলে যাচ্ছে… বউকে আগুনের চিমনি বললে উপযুক্ত উপমাই দেয়া হতো,তবে আমার তা বলতে ইচ্ছে করে না। কারণ এর থেকে আমার যেহেতু নিস্তার নেই। তাই যা থেকে নিস্তার নেই, যা ছাড়া আমার চলবে না, তাকে মেনে নেয়াই ভদ্রতা বলে জ্ঞান করি।
এখন আসল কথায় আসি, আমার একজন অসহায় বাবা রয়েছেন, ভীষণই অসহায়। মা মারা যাবার পর থেকেই আমার বাবার সুখপুকুরটা দুঃখ পুকুরে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। সুখ সরে গিয়ে সেখানে অসুখ পাকাপোক্ত আসন গেড়ে বসেছে। সেটা হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অস্বাভাবিক যেটা সেটা হলো আমার গৃহশান্তি বলে আর কিছুই থাকছে না। এখন আমি নিজ বাড়িতে যেতেই ইচ্ছে হারিয়ে ফেলছি। ঘরে ফেরা মানে বউয়ের ভাঙা রেকর্ডে একটানা ঘ্যানঘ্যানানি, আর বাবার হাজারটা অভিযোগ। আমি আর পেরে উঠছি না।বাবা বর্তমানে সমস্ত বাস্তব জ্ঞান হারিয়ে একজন জড় বস্তুতে পরিণত হয়েছেন। উনি যেন বাস্তবিকই এখন একটা শিশু। এই শিশুটার জন্য আমার অনেক মায়া হয়,ভালোবাসা, কর্তব্য কাজ করে। কারণ এই শিশুটার হাত ধরেই আমি জগৎ চিনেছিলাম। আমরা অস্বচ্ছল ছিলাম না, মা’র ক্যান্সারের সাথে দীর্ঘদিন লড়াই করে করে আজ আমরা দারিদ্র্যর সামনে পড়ে গেছি।
আমার বউ তার দুই সন্তানের তদারকি ঠিকভাবেই করছে, কিন্তু আমার বাবার অবুঝ আবদারগুলোকেই তার অযথা মনে হয়। বোঝা হয়ে গেছে আমার বাবা তার আপন ছেলের সংসারেই। আমি আমার বাবার এই দৈন্যদশা কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না।আমার বাবার এতটুকু অমর্যাদা আমাকে প্রচন্ড আঘাত দেয়। এক অসহ্য poignant impact পড়ে আমার উপর। হয়তো অনেকে বলতে পারেন, ভাবতে পারেন যে,আমি কেন তবে বউকে টলারেট করছি। এমন বউ ছেড়ে দিচ্ছি না কেন। উত্তর হলো, আমি নিরুপায়, আমি এই জায়গায় একদমই অসহায়। আমার বউ ছাড়া চলবে না। বিবাহিত পুরুষ বউ ছাড়া আসলে থাকতে পারে না।বউ খারাপ বলে, তাকে ছেড়ে দিয়ে আরেকটা বিয়ে করার সক্ষমতাও আমার নেই, সাথে রুচিটাও। আর কেউ হয়তো-বা বউ ছেড়ে অন্যত্র নিজেকে মেলে ধরতে পারেন। কিন্তু আমার সেই সুযোগ, সেই অবস্থা এবং অবশ্যই মানসিকতা নেই। তাছাড়া বউ আমার বাবার জন্য যতটা মন্দ, ঠিক তার সন্তানদের বেলায় এর উল্টোটা। এখানটায় তার জুড়ি মেলা ভার।সুতরাং আমি পারছি না ওকে ঘাটাতে। বাকি থাকল, গৃহশান্তি ফেরানোর চেষ্টা করা। সেটা সম্ভব, একমাত্র আমার শিশু বাবাটাকে আমার সংসার থেকে সরিয়ে দিয়েই। আমি জানতে চাই, আপনারা আমার বাবাটাকে রাখবেন কি না? আপনাদের একটামাত্র সিট হবে আমার অসহায় অবোধ শিশু বাবাটার জন্য? আগেই বলে নিচ্ছি আমি মাসে ৫০০০ টাকার বেশি দিতে পারব না। আপনারা মানবিক হয়ে স্কুলের দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য যেমন ফুল-ফ্রি, হাফ-ফ্রি’র ব্যবস্থা থাকত তা আমাদের মতো পরিবারগুলোর জন্য রেখেছেন তো? আমি একজন অভাগা সন্তান, আমার বাবাকে আপনাদের এখানে একটু জায়গা করে দিলে আমার ভীষণ উপকার হয়। এই বিনীত প্রার্থনাটুকু মঞ্জুর করে আমাকে বিশাল যন্ত্রণার হাত থেকে দয়াকরে রক্ষা করবেন, এই আশা নিয়েই অধীর হয়ে অপেক্ষায় থাকলাম…
বলো আমি এসব চিঠির কী জবাব দেবো? প্রতিনিয়তই এমন এমন চিঠি পেয়ে থাকি। কিন্তু আমার সক্ষমতা তো লিমিটেড। তা দিয়ে কতটাই-বা আমি করতে পারি! অথচ শুরুর দিকটাই আমাকে কেউ সেভাবে সাপোর্টই করেনি। কিন্তু ধীরে ধীরে সামাজিক ট্যাবুটা কীভাবে খসে পড়ছে দেখছ? ভুক্তভোগীদের চামড়ার মুখ এখন অন্য কথা বলছে। সময় কত দ্রুত পোশাক বদলায়! প্রবীণরা নিজেরাই এখন বুঝতে পারছে এর প্রয়োজনীয়তা আসলে কতটা ।পশ্চিমা বিশ্বকে একসময় যারা গাল দিত তারাই এখন এর কাছে নতজানু। কিন্তু সকলের এগিয়ে আসতে হবে এই ক্ষেত্রে। প্রবীণদের বসবাসের যোগ্য করে অনেকবেশি সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে বৃদ্ধানিবাস গড়ে তুলতে হবে।
সময় এসেছে বৃদ্ধদের জন্য স্কুলের মতোই বৃদ্ধাশ্রম নির্মাণ করবার। কোথাও পড়েছিলাম জাপানে নাকি বৃদ্ধরা ইচ্ছে করে অপরাধ করে, যেন ওদের জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। কারণ সেখানে গেলে তারা মানুষ পাবে। একটা কমিউনিটি পাবে নিশ্বাস নেবার জন্য,কথা বলবার জন্য। ভাবতে পারো একাকিত্ব কতটা মারাত্মক হতে পারে একজন মানুষের পক্ষে ?
পারছি ময়না মা। কিন্তু তুমি আর কতটা করতে পারবে? তোমার টাকা, বাবার রেখে যাওয়া সম্পদ সবই তো এই আনন্দধামেই ঢেলে দিয়েছ।
তা দিয়েছি। তবে দিনশেষে আমি কতটা ভালো আছি তা-ও তো দেখবে! আমার মধ্যে সারাজীবন আনন্দধাম করার ইচ্ছেটা একটা Existing proposition হয়ে ছিল. Subconsciously consciously আমি তো শুধু এর স্বপ্নটাই মনের কোণে এঁকে গেছি। আর আজ অত বছর পরে আমি আমার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারছি, এ-যে আমার কী আনন্দ তোমাকে বলে বুঝানো যাবে না!
তুমি আমাকে ডাকছিলে,কী বলবে?আর তুমি কবে চলে যাচ্ছ? তুমি চলে গেলেই আমি আনন্দধামে ফিরে যাব। আমি ছাড়া ওখানের সবাই অন্ধকার দেখে। ওরা আমাকে খুব ভালোবাসে, মিস করে।
ময়না মা আমিও তোমাকে খুব ভালোবাসি, খুব মিস করি।
আমাকে এখন এটা তোমার মনে করিয়ে দিতে হবে?
আচ্ছা যাও দিলাম না। এখন একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলব,মন দিয়ে শুনবে।তবে অবশ্যই কোনো রিয়েক্ট করতে পারবে না, এবং এটা আমি আগেই বলে নিলাম। কথাটা তোমাকে বলতে চাইনি,আসলে বলতে পারছিলাম না। ভেবেছিলাম আবার ফিরেই যাব। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে…
চারুলতা আপন আত্মজার মুখ দেখে একটা রহস্যমেদুরতার আভাস পাচ্ছিল।
কী হয়েছে বেবি?
মা আমি আর ওদেশে ফিরে যাচ্ছি না।
কিন্তু কেন?
মা আমি তোমার মেয়ে। তাই আমার পক্ষে অন্যায়ের সাথে কম্প্রোমাইজ করে চলা পোষালো না।ভালোবাসার বর্ণমালা দিয়ে যেই সংসার আমি এতদিন তিলতিল করে সাজিয়েছিলাম তা এক লহমায় ভূমিকম্পের মতো ধসে পড়েছে।
বুঝলাম, কিন্তু রেহান কী অন্যায় করেছে?
মা রেহান এই সময়ে এসে, তোমার বিদেশী ডিগ্রীধারী ডাক্তার মেয়ের কাছ থেকে ভদ্রতার মুখোশ পরে যৌতুক দাবি করে আসছিল এতদিন ধরে।
তোমার এই বাড়িটার দিকে ওর দৃষ্টি। রেহান চায় তুমি আনন্দধাম তুলে দাও।সে ওখানে একটা ইন্ডাস্ট্রি করবে বলে অনেকদিন ধরেই আমাকে চাপ প্রয়োগ করে আসছিল।ইনফ্যাক্ট রেহান এই জন্য আমাকে নানাভাবে অত্যাচারও করেছে।
তুমি বলছ কী!
হ্যাঁ ময়না মা। এই দ্যাখো, আমি জুরিখ থেকেই অ্যাপ্লিকেশন করেছিলাম চাকরিটার জন্য। পেয়েও গেলাম কোনো ঝামেলা ছাড়াই। এখন থেকে শুক্র-শনিবার তোমার আনন্দধামে রোগী দেখব।ভেবো না,তোমার রোগীদের দেখে বেতন চাইব না।
পাগলি একটা!
চারুলতা হাসল কী!বোধহয় না।নিজেকেই বুঝি ব্যঙ্গ করল।আহারে নারী জীবন! এতকালের একটা স্বপ্ন কেবল বাস্তবতার মুখ দেখেছে।আর এরমধ্যেই…
জীবন সবসময়ই কেন এমন হয়, জীবনকে কেন এমনই হতে হয়! চারুলতা জানে না নারীর মুক্তি তবে কোথায়! কবে নারী তার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা পাবে! একজন শিক্ষিত নারীও আত্মমর্যাদা নিয়ে তার আপন সংসারে থাকতে পারে না। তবে অশিক্ষিত নারীদের অবস্থা আরও কতটা করুণ তা অনুমেয়।
আজ থেকে চারুলতাও আনন্দধামের সকলের মতোই অনেক ভালোর মধ্যে, আলোর মধ্যে থেকেও কী নাই’য়ের মধ্যে পড়ে গেল। আর এরমধ্যে থেকেই পূর্ণতার স্বাদ খুঁজে নিতে হবে, বাঁচতে হবে। আনন্দধামের সকলেই এখানে এভাবেই আনন্দ খুঁজে বাঁচে,আনন্দধামের প্রচ্ছদে বেদনার নীল রঙটা নেই, তার বদলে আছে কিছুটা ধূসর গোধূলির বর্ণচ্ছটা…
(সমাপ্ত)


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত