বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯

আমার দেখা হুমায়ূন আহমেদ

নাসরীন জাহান

আমার লেখালেখি জীবনের শুরুতেই হুমায়ূন আহমেদের রচনার সঙ্গে পরিচয় হয়। সাহিত্যের আপামর সিরিয়াস ও সাধারণ পাঠকদের মতোই আমি তার ‘নন্দিত নরকে’ ও ‘শঙ্খনীল কারাগার’ পাঠ করে সত্যিকার অর্থে বিমুগ্ধ হয়েছিলাম। এই দুটি উপন্যাস আমার দিন-রাত একাকার করে দিয়েছিল। পড়ার পর বেশ কয়েকদিন আমি উপন্যাস দুটি নিয়ে ভেবেছি, মোহিত হয়েছি আর সবার মতোই।

হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্য প্রসঙ্গে সাহিত্যবোদ্ধারা বলে থাকেন, তার শক্তি ও কাজের জায়গা হলো বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজ ও তার মানুষ। এ কথা বলতে দ্বিধা নেই, ‘নন্দিত নরকে’ ও ‘শঙ্খনীল কারাগার’ পড়ার মাধ্যমে আমি মধ্যবিত্তের সত্যিকার রূপ আবিস্কার করেছিলাম। এই দুটি উপন্যাসে জীবনের বোধ আর বেদনার যে নান্দনিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন হুমায়ূন, সেটা সত্যিকার অর্থে হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতোই। পরবর্তীতে আমার মনে হয়েছে, এই দুটি উপন্যাস আসলে একটি-ই বই, দুটো মিলেমিশে একটি উপন্যাস। হুমায়ূন আহমেদে আমি এতই মুগ্ধ ছিলাম যে, তখনই ঠিক করে রেখেছিলাম, পরবর্তীতে তার যত বই প্রকাশিত হবে আমি সবই পড়ব।

আমার সাহিত্যের ভিত যখন থেকে গড়ে ওঠে, সেই ছেলেবেলা থেকেই আমি মূলত সিরিয়াস বইয়ের একজন নিবিষ্ট পাঠক। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রধান রচনাগুলো আমি ক্লাস এইট-নাইনে থাকতেই পড়ে ফেলেছিলাম। মানিকের চরিত্রগুলোর মনস্তত্ত্ব, ভাষার গভীরতা, কাহিনির বিন্যাস- এগুলো আমাকে ভীষণ টানত। মানিকের অতুলনীয় সৃষ্টির জগতে প্রবেশ করি ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’র মাধ্যমে। এই বইটি আমার লেখক জীবনের অনেক বড় বাঁক হয়ে আছে। ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ আমার মধ্যে ভীষণ তোলপাড় তৈরি করে। বলা চলে, একেবারে নাড়া খেয়ে গেলাম উপন্যাসটি পড়ে। মানুষের মনস্তত্ত্বের চিত্রায়ণ যেভাবে করেছেন মানিক, তার আসলেই তুলনা নেই। ব্যক্তিগতভাবে সেই কৈশোরকাল থেকেই সাহিত্যে সহজিয়া ভাষার ব্যবহার আমি অপছন্দ করতাম, সরল ভাষায় বর্ণনার বিষয়টি আমাকে টানত না। একটা লেখা পড়তে শুরু করলাম সেটা শুরু করার আগেই যদি শেষ হয়ে যায় কিংবা বলা যায় আমার চোখের আগে লেখা দৌড়াতে আরম্ভ করে, এমন ধরনের লেখা আমার পছন্দ না। আমার এই মতের বা পছন্দের সঙ্গে অনেকেই হয়তো এক মত হবেন না, কিন্তু এটা একান্তই আমরা ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের বিষয়। অনেক পাঠকই আছেন যারা সরল বর্ণনার বা সহজ ভাষার লেখা পছন্দ করেন, অল্প সময়ের মধ্যে কয়েকটি উপন্যাস বা গল্পের বই পড়ে ফেলতে ভালোবাসেন তারা। এটাতে যা হয়, ‘পড়লাম কিন্তু আবার ভুলেও গেলাম’ এমন একটা ব্যাপার ঘটে; যা আমার কখনোই পছন্দ ছিল না। আমার পছন্দ ভাষার মধ্যে নান্দনিকতার ব্যবহার, কাব্যের ছোঁয়া, আলো-ছায়ার খেলা।

একটা সময় যখন আমার আশপাশের সবাই শরৎচন্দ্র পড়ে বেশ মুগ্ধ, তখন আমি শরৎচন্দ্রের লেখা পড়ে খুব বিরক্ত হয়েছি। সবাই আমার সমালোচনা করে বলত, আমি আসলে আলোচনায় আসার জন্যই এমন মনোভাব প্রকাশ করছি। আদতে আমি শরৎচন্দ্রের ভক্ত কখনোই ছিলাম না, তাকে আমার সব সময়ই একজন হালকা চালের লেখক বলেই মনে হয়েছে। তার গল্প-উপন্যাসে বিষয়ের অগভীরতা আর ভাষার সহজ ব্যবহারের কারণে তার সাহিত্য কখনও টানেনি আমাকে। তবে শরৎচন্দ্রের একটা বিষয়ে আমি বেশ শ্রদ্ধা করি। সেটা হলো, নারীদের ব্যাপারে তার মনোভাব। তার বিভিন্ন গল্প-উপন্যাসে নারীদের তিনি যেভাবে উপস্থাপন করেছেন, যেভাবে নারীদের চরিত্র বিন্যাস করেছেন, তা আমার ভালো লেগেছে, এ কারণেই তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা।

‘নন্দিত নরকে’ ও ‘শঙ্খনীল কারাগার’ পরবর্তী হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যের প্রতিও আমার একই অভিযোগ। তার অধিকাংশ উপন্যাসে কাহিনির অগভীরতা আর ভাষার সহজ ব্যবহার ব্যক্তিগতভাবে আমার ভালো লাগেনি। তবে এ কথাও সত্য, ব্যক্তি হুমায়ূন আহমেদের কোনো তুলনা চলে না। আমাকে যদি প্রশ্ন করা হয়, এই জীবনে কার সঙ্গে আড্ডা দিয়ে সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেয়েছেন, আমি কোনো দ্বিতীয় চিন্তা না করে একটি নামই নেব, আর সেটা হলো হুমায়ূন আহমেদ। তার সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার স্মৃতিগুলো সত্যিই অসাধারণ এবং সবচেয়ে আনন্দদায়কও বটে। তিনি একজন বিস্ময়কর মানুষ ছিলেন। তার পড়াশোনার ব্যাপ্তি ছিল অচিন্তনীয়, যারা তার সঙ্গে কথা বলেননি বা আড্ডা দেননি তারা ছাড়া আর কারও পক্ষে এটা চিন্তা করা সত্যিই সম্ভব নয়। তিনি কথায়-আড্ডায় মজা করে সরলভাবে যেভাবে নিজের মতামত দিতেন এবং সেগুলোর কিছু কিছু সাহিত্যেও ব্যবহার করতেন, আমি সেগুলোর ভক্ত ছিলাম। তাকে নিয়ে আমার একান্তই ব্যক্তিগত এবং নিজস্ব ভাবনা, একই সঙ্গে আফসোসের বিষয় হলো তার যে অসাধারণ মেধা ছিল, তা তিনি তার সমস্ত সৃষ্টিতে ব্যবহার করতে পারেননি। এটার হয়তো নানান কারণ ছিল, সেই আলোচনায় এখন না যাওয়াই যথোপযুক্ত হবে বলে মনে করি।

হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যের পাশাপাশি তার নির্মিত কয়েকটি নাটকও আমাকে মুগ্ধ করেছে। ‘এইসব দিনরাত্রি’র মতো নান্দনিক নাটকটি আর সবার মতো আমারও ভালো লেগেছে। টুনি যখন মারা যায়, তখন কয়েক রাত আমি ঘুমাতে পারিনি। এই নাটকটি নিয়ে সবাই বলল, হুমায়ূন আহমেদ মধ্যবিত্তের জীবন নিয়ে নাটক বানিয়েছে। আমি নিজেও এক মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। আমার নিজের পরিবারের ও আশপাশের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর যে প্রধান সংকট, সেটা হলো তাদের আর্থিক টানাপোড়েন। গরিবের আর্থিক কষ্ট কম, কারণ তারা ইট ভাঙা, রিকশা চালানোসহ যে কোনো কাজই করতে পারে। উচ্চবিত্তের তো আর আর্থিক কষ্ট নেই। মধ্যবিত্ত না পারে ইট ভাঙতে, না পারে আকাশে উড়তে। চক্ষুলজ্জায় নিচের কোনো কাজ করতে পারে না আবার সুযোগের অভাবে বড় কোনো কাজও করতে পারে না। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোয় এমনও দেখা যায়, নিজের বাবা-মা বা নিকট আত্মীয়রা বাসায় এলে সাত দিনের পর আট দিনের মাথায় মনে মনে ভাবে, এবার তারা চলে গেলে ভালো হয়। সেখানে ‘এইসব দিনরাত্রি’ নাটকের প্রধান চরিত্র একজন সৎ সরকারি কর্মকর্তা। সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন এখন না হয় বেশি কিন্তু সেই সময় আর কতই বা ছিল, সেখানে তার ছোট ভাই রফিক, একজন বেকার। পরিবারটি একটা সুখী পরিবার। সেখানে একজন বুড়ো মানুষ চলে এলো, তাকে নিয়ে সবাই খুব খুশি। ওই পরিবারে অনেক লোক আসছে কিন্তু সবাই খুব খুশি। তখন আমার মাথায় প্রশ্ন এলো, এই যে একটি জমজমাট হাসিখুশি সুখী পরিবার। কিন্তু তাদের আর্থিক উৎসটা কোথায়। সমাজের মানুষের অন্যতম মূল চাহিদা অর্থ, সেখানে এই পরিবারটি কীভাবে চলছে। হুমায়ূন আহমেদ মধ্যবিত্ত নিয়ে লিখছেন কিন্তু তাদের আর্থিক বিষয়ের কোনো সুরাহা করবেন না তাহলে তো একটা বৈপরীত্য থেকে যাচ্ছে। হুমায়ূন আহমেদ মধ্যবিত্তকে স্বপ্ন দেখাতেন। তার গল্প-নাটকে দেখি একজন মধ্যবিত্ত বাবা তার সন্তানকে এতিমখানায় দিয়ে দিচ্ছেন, এটা বাংলাদেশের কোনো মধ্যবিত্ত পরিবার কখনও করতে পারে বলে আমার মনে হয় না। এভাবে আমি যুক্তি দিয়ে দেখার চেষ্টা করি। কিন্তু এই যুক্তিগুলো যখন আমি মেলাতে পারতাম না, তখন আমার ভালো লাগত না। এসব নানা কারণে তার লেখা থেকে ধীরে ধীরে আমি দূরে সরে আসি। আর তার ভাষার সরলীকরণ তো ছিলই যেটা আগেই বলেছি, এভাবেই হুমায়ূন আহমেদের প্রতি মুগ্ধতা কাটতে থাকে আমার।

তবে একটা কথা আমি স্বীকার করি, তিনি বাংলাদেশের পাঠক সমাজ তৈরিতে বিরাট ভূমিকা রেখেছেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে আমাদের এখানকার মানুষ তেমন বই পড়ত না। পড়লেও তাদের পছন্দের তালিকায় ছিল পশ্চিমবঙ্গের লেখকরা। হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের পাঠকদের নিজ দেশমুখী করে তুলেছেন। বলা যায়, একটা প্রজন্ম তাঁর বই পড়েই সাহিত্য পড়া শিখেছে।

মাঝে মাঝে ভাবি, ‘নন্দিত নরকে’ কিংবা ‘শঙ্খনীল কারাগার’ যে সাহিত্যিক লিখেছেন, সেই মানুষটি তার এই ধারাটি কেন ধরে রাখতে পারেননি। আমার মনে হয়, হুমায়ূন আহমেদ সব সময় এক ধরনের চাপের মধ্যে থাকতেন। সেটা প্রকাশকদের পক্ষ থেকে, পত্র-পত্রিকার পক্ষ থেকে। বই বা লেখা দেবার ভীষণ চাপে থাকতেন তিনি সবার কাছ থেকে। এই চাপগুলো এড়াতে পারলে হয়তো আরও দারুণ কিছু সৃষ্টি তিনি আমাদের উপহার দিতে পারতেন। কিন্তু এই চাপগুলো তিনি এড়াতে পারেননি। এমন না যে তিনি টাকার জন্যই লিখেছেন। একটা পর্যায়ে তার অর্থবিত্তের অভাব ছিল না। সুতরাং একেকটি মেলায় চারটি-পাঁচটি বই না লিখলেও পারতেন। একজন লেখকের এত এত বই কখনোই ভালো হয় না কিংবা এত বই লিখতে গেলে সব বই ভালো হবে এমন নিশ্চয়তা নেই। কেউ যদি একই সময়ে পাঁচটি বই লিখে নিশ্চয় তার সব কয়টি বই ভালো হবে না। কেননা, তিনি একই সময়ে তার মেধা, ভাবনা বা চিন্তার বীজ পাঁচটি পাত্রে ভাগ করে রাখছেন, সেখানে কয়েকটা পাত্রে কমবেশি নিশ্চয়ই হবে। হুমায়ূন আহমেদের ক্ষেত্রেও একই বিষয় ঘটেছে। আমি জানি হুমায়ূন আহমেদের অনেক পাঠকই আমার এই কথাগুলোর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করবেন, আমি তাদের সবার প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান রেখেই বলছি, এগুলো একান্তই আমার নিজের ভাবনা। আমি তাদের ভালোবাসি, শ্রদ্ধা করি, সম্মান জানাই; কারণ তাঁরা অন্তত বই তো পড়ে। সেটা হুমায়ূন আহমেদের হোক কিংবা অন্য যে কোনো লেখকেরই হোক না কেন।

হুমায়ূন আহমেদ আজ আমাদের মাঝে নেই। আছে তার সৃষ্টি আর তার অগণিত পাঠক। তাদের সবাইকে জানাই অকৃত্রিম ভালোবাসা।


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত