মঙ্গলবার, ২৪ মে ২০২২

আমার ভগ্ন হৃদয় ও একটি অধরা স্বপ্ন

হাফেজ মাওলানা নিজাম বিন মুহিব

দুই হাজার উনিশ সাল। হজ্বের আর অল্প কয়েক দিন বাকি। হঠাৎ আল্লাহর পক্ষ থেকে যেন ইশারা আসলো, নিজাম তুমি তোমার রবের ঘরের(কা’বা) মেহমান হওয়ার জন্য প্রস্তুত হও! যে স্বপ্ন পূরণে প্রতিটি মুসলিম তার অন্তরে আকাঙ্খার প্রহর গুনে। 
বয়স আমার আর কতই? এত অল্প বয়সেই মাবূদের ইশারা! আনন্দে আত্মহারা হয়ে প্রস্তুতি নেয়া শুরু। হজ্ব নিবন্ধন, টাকা পয়সা গুছানো, ইউটিউবে হজ্বের বিভিন্ন ডকুমেন্টারি দেখা, কাগজপত্র গুছানো।

এদিকে আমি হজ্বে যাবো জানতে পেরে কয়েকজন ভিআইপি মুসুল্লি বললো, আপনি যদি এই অল্প সময়ের ভেতরে যাওয়ার প্রসেস করতে পারেন তবে আমরাও (৪ জন) আপনার সাথে যাবো। আবার আমার হজ্বে যাবার এ সংবাদ নিউমার্কেটের বিভিন্ন এজেন্সি ছাড়িয়ে পল্টনের কয়েকটি বড় বড় এজেন্সির কান পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছলো যে, নিউমার্কেটের ইমাম সাহেব হজ্বে যেতে চান।

প্রতিদিন লোক ভীড় জমাচ্ছে আমার রুমে। কারো বায়না, আপনার এহরামের কাপড় আমি দিবো! কারো বায়না, আমি আপনাকে ১টা ট্রলি দিবো! কারো বায়না, আমার গাড়ি দিয়ে এয়ারপোর্টে যাবেন! কানে এসেছে কেউ আবার টাকা পয়সাও আলাদা করছেন তাদের ইমাম সাহেবকে যাওয়ার সময় হাতে গুজে দিবেন বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্পটগুলো ঘুরে দেখে এসে আগামী বছর তাদেরকে নিয়ে যাওয়ার জন্য! কত আয়োজন!! কারণ একটাই, তারা (মুসুল্লিরা) আল্লাহর জন্য এ অল্প বয়সি ছেলেটাকে আশপাশের অন্যান্য ইমাম খতীবদের চেয়ে অনেক ভালোবাসে। (এটা রবের স্পেশাল অনুগ্রহ আলহামদুলিল্লাহ)

শুরু হলো চূড়ান্ত প্রস্তুতি। কেউ বলছেন এ বছর যেতে পারবেন না, কোটা ফিলাপ। কেউ আবার ৪ লাখে নিচ্ছেন, কেউ বলছেন ১১ লাখ দিবেন আপনাকে একদম কা’বা সংলগ্ন টাওয়ারে রাখবো, আরো কত কি! এমন করতে করতে নিউমার্কেটেরই এক মুসুল্লির আপন চাচাতো ভাইয়ের এজেন্সিতে কয়েকজনের পরামর্শে আমার স্বপ্নের (টাকা) এক অংশ জমা দিলাম।

এখন শুরু হলো তিক্ত অভিজ্ঞতা ও কান্নার দিন। ঐ ভদ্রলোক আমার চেয়ে বেশি টাকা পেয়ে আরেকজনকে নিয়ে নিয়েছে এবং আমার টাকা আটকে রেখেছে। সে এখন আর চাইলেও আমাকে নিতে পারবে না কারণ সব বুকড।

এবার অন্য যুদ্ধ! টাকা ফেরত পাবার দৌড়ঝাঁপ শুরু হলো। যিনি এই এজেন্সি দেখিয়ে দিয়েছেন সেই মুসুল্লিও লজ্জায় তার ব্যবসা বাণিজ্য রেখে নিউমার্কেট টু পল্টন দৌড়াদৌড়ি শুরু করলেন। আজ দিচ্ছি কাল দিচ্ছি করে অফিসেই আসা বন্ধ করে দিয়েছে সে। অতঃপর শুনলাম সে এত তারিখে অন্য হাজ্বিদের নিয়ে মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিবে। কি করি এখন? এয়ারপোর্টের কর্মকর্তা বন্ধু খন্দকার জাবেদ জিলানী-কে নক দিয়ে রাখলাম। বললো, ওকে আটকাবোই, তুমি এয়ারপোর্ট থানায় একটু নক দিয়ে রাখো, আমি আর এয়ারপোর্ট থানায় নক না দিয়ে সরাসরি তৎকালীন RAB-এর কর্মকর্তা (আমার দেখা সৎ মানুষ)সারোয়ার আলম স্যারের স্মরণাপন্ন হলে তিনি বলেন, আপনি আমার বরাবর একটা এপ্লিকেশন করেন, আর টেনশন করবেন না। পরে আর তার পর্যন্ত আর যেতে হয়নি। 

সবাই যখন হজ্বে যাচ্ছে তখন আমি সব বাদ দিয়ে টাকা উদ্ধারে পাগলের মত দৌড়াদৌড়ি করছি আর রাস্তাঘাটে নিজের অজান্তেই কাঁদছি। পল্টনের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী বন্ধু নুরুল, তুহিন ও ইমরান এর সহযোগিতায় টাকা ঠিকই উদ্ধার করলাম। কিন্তু আমার আর আল্লাহর ঘর দেখা হলো না!

তখন সবাই বলেছিলো, আগামী বছর তো যাচ্ছেনই, আর মন খারাপ কইরেন না। অথচ আজ ৩ বছর হতে চললো আমি গুনাহগার এখনো অপেক্ষায় আছি কালো গিলাফ ছুঁয়ে লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক বলার। এখনো অপেক্ষায় আছি হাজরে আসওয়াদে চুমু এঁকে ক্ষমা পাবার! এখনো পথ চেয়ে রই নবীজীর কাছাকাছি গিয়ে “সালাম” দেবার!

কল্পনায় কত মাড়াই ঐ মক্কা মদীনার পথের অলিগলি

খুব বেদনা বিধূর হই যখন আসে হজ্বের এই দিনগুলি।

প্রতি বছর হজ্বের খুতবা দেখে যাই আপন মুঠোফোনে,

ছলছল চোখে আবিস্কার করি, আমি ঐ আরাফার ময়দানে।
(চলবে)

লেখক – খতিব, বাইতুর রহিম জামে মসজিদ নিউমার্কেট, ঢাকা।


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত