শুক্রবার, ৩০ জুলাই ২০২১

আমার মা এবং স্বপ্নের গল্প

ডা. সানজিদা সরকার

আমার মেডিকেলে আসাটা অনেকটা পূর্বনির্ধারিত করে রেখেছিল আমার মা। ছোটবেলা থেকে বলতো তোকে ডাক্তার হতে হবে। আমার এত এত অসুখ। আমার মেয়ে হয়ে তুই না দেখলে তবে কে দেখবে আমাকে?

আমার মা কলেজে পড়াতেন। এ কারণে ছোটবেলা থেকে টিচিং প্রফেশনের প্রতি আলাদা একটা ফ্যাসিনেশন ছিল। টিচারদের আমি খুব ফলো করতাম। তাদের পড়ানোর স্টাইল খেয়াল করতাম। তখন ঠিক করলাম এমন কোথাও আসতে হবে যেখানে ডাক্তার আর টিচার দুটোই পসিবল হবে। এভাবে একসময় আমার মাথায় ঢুকে গেল আমার বোধহয় ডাক্তার হওয়া ছাড়া অন্য অপশন নেই।

মায়ের কলেজ আর ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পাশাপাশিই ছিল। প্রায় ডাক্তাররা মাকে চিনতো। খুব ছোটবেলায় প্রায় মায়ের সাথে কলেজে চলে যেতাম। মা ছাত্রছাত্রীদের নানারকম উপদেশ দিতো। উনি চলে যাওয়ার পর আমি এগুলা রিপিট করতাম। সবাই আমাকে এত আদর করতো। অল্প কয়েকদিনের ভিতরে দেখা গেল আমাকে সবাই চিনে এখানে।

মায়ের কলিগরা যাদেরকে ছোটবেলা থেকে আঙ্কেল আন্টি ডাকতাম এখন মেডিকেলে এসে সবাই স্যার ম্যাডাম হয়ে গেল। এই যে সম্পর্কের একটা অদলবদল এই জিনিস টা আমি খুব এনজয় করি। মেডিকেলটাকে আমার খুব আপন লাগে। একদম ছোট থাকতে আর করিডোরগুলোতে আমি হেঁটে বেড়িয়েছি। কত মানুষের সংস্পর্শে এসেছি। এখন যখন এপ্রন নিয়ে এর করিডোর গুলোত হেঁটে বেড়াই দ্যাট ফিলস লাইক হেভেন।

মেডিকেলে পরীক্ষা দিয়ে আমি দিনাজপুর মেডিকেলে চান্স পাই। বাবার ইচ্ছে ছিল সেখানেই পড়ি। কিন্তু ভাইয়ার একরকম জোরাজুরিতে আমি ময়মনসিংহ চলে আসি। মেডিকেল লাইফটা বেশ চ্যালেঞ্জিং। ফার্স্ট ইয়ারটা খুব স্ট্রেসফুল থাকতাম। থার্ড ইয়ারে এসে যখন ওয়ার্ড করা শুরু করলাম তখন দেখলাম, না এই প্রফেশনটা মজার। রিলাক্স থাকতে পারলে নিজেকে গুছানো কোন ব্যাপার না। পড়াশোনা নিজের মত করে করার চেষ্টা করি নিজের মেথডে। ফার্স্ট প্রফে আমি এনাটমি আর বায়োকেমিস্ট্রিতে অনার্স পাই এবং ঢাকা বোর্ডে অষ্টম স্থান অর্জন করি। সেকেন্ড প্রফে আমি দশম স্থান অর্জন করি। থার্ড প্রফে প্যাথলজি আর মাইক্রোবায়োলজিতে অনার্স পাই৷

এখন ওয়ার্ডে লেকচারে যাদের ক্লাস করি কমবেশী সবাই অনেকেই মায়ের স্টুডেন্ট৷ সবার কাছে মায়ের এত এত গল্প শুনি। মা কলেজের লোকদের সাথে বেশ রসিয়ে গল্পগুজব করতেন হিস্টোরি নিতেন৷ এই জন্য সবাই মাকে খুব পছন্দও করে। আর মায়ের আরেকটা গুন উনার সবসময় মুখে হাসি লেগে থাকতেন। কখনো মন খারাপ হলে বুঝতে দেয় না। মাকে আমি খুব কম সময়ের জন্য কাছে পেতাম। কিন্তু যত অল্পসময় বাসায় থাকতো মায়ের সময়টুকু আমার জন্য বরাদ্দ। থার্ড ইয়ারে আমি ইসিজির হাতে কলমে শেখা শুরু করি ।

আমাকে আজকে যে অবস্থানে আমি দেখি, তার জন্যে বাবাকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। একদিনে এত সফলতা আসেনি। ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি বাবা পরিবারের জন্য, আমার আর ভাইয়ার জন্য কত কষ্ট করেছেন। কোনদিন মেডিকেলে ক্লাস না থাকলে সালেহা ম্যাম প্রায় আমাকে হাসপাতালে সাথে করে নিয়ে যেতেন। আমাকে যেমন সামলাতেন, রোগীকেও সামলাতেন। উনি কার্ডিওলজিস্ট বলে বেশিরভাগ সময়ই জরুরি রোগীতে ভরা থাকতো ওয়ার্ড।বেশীরভাগ রোগীর খুব খারাপ অবস্থা। একদিন ম্যাম রাউন্ড দিচ্ছিলেন, তার সাথে আমিও ঘুরছি। ওইসময় একটা ইমার্জেন্সী পেশেন্ট আসলো। ম্যাম আমাকে বললো মা তুমি একটু দাঁড়িয়ে থাকো এখানে, আমি আসছি। আমাকে সামান্য দূরে দাঁড় করিয়ে তিনি সিপিআর দেয়া শুরু করেন। হঠাৎ এত জোরে রোগীর বুকে ঘুসি মারলেন আমি চমকে গেলাম। কিছুক্ষণ পরেই রোগী ভাল হয়ে যায়। ম্যাম একটু পরই আবার আমার হাত ধরে রাউন্ড দেয়া শুরু করেন। একদম নরমাল। ম্যামকে আমার সুপার হিউম্যান মনে হতো তখন। খুব গর্বও হতো অবশ্য। তিনি এখনও একটুও বদলায়নি৷ সরকারী চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন।তবুও সারাদিনজুড়ে উনার ব্যস্ততা। মাঝেমাঝে আমাদের দেখা ও হয়না পুরো দিনে। তবে আমি উনাকে শ্রদ্ধা করি মন থেকে।

পড়াশোনার পাশাপাশি আমি কবিতা লিখতে আর ছবি আঁকতে বেশ পছন্দ করি। আমার অন্যতম হবি এটা। ছোটবেলা থেকেই ময়মনসিংহ শিল্পকলা একাডেমিতে আমার ছবি আঁকা শেখা। আমার সবচেয়ে আবেগের জায়গা। এখনও সময় পেলে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন প্রোগ্রামে পারফর্ম করি অথবা বিভিন্ন কম্পিটিশনে অংশগ্রহন করি। মেডিকেলে পড়াশোনার হিউজ প্রেশারে আগের মত সময় দেয়া হয় না৷ এই নিয়ে আমার আক্ষেপও হয় খুব। মেডিকেলে না পড়লে অবশ্যই ছবি আঁকা বা কবিতা নিয়ে ক্যারিয়ার করতাম। অন্য কোথাও সেকেন্ড থট দিতাম না।

এখন প্রফেশন হিসাবে সার্জারি স্পেশালাইজড কোন বিভাগে অথবা মায়ের ইচ্ছামত ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিতে ক্যারিয়ার করার ইচ্ছা আছে৷

সাধারণ মানুষকে সেবা দিয়েই তাদের পাশে থাকতে চাই আজীবন।


© দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত