মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২০

আসা যাওয়ার মাঝে || তনিমা তালুকদার

‘মা! তুমি চিন্তা করতে পারো! ভাইয়া চাকরি পেয়ে গেছে!’
রাহেলা বেগম নির্লিপ্ত স্বভাবের, আরো নির্লিপ্ত হয়ে জবাব দেন,
‘আর কতো জানবো? সকাল থেকেই তো জানাচ্ছিস! বেশী জানলে মানুষ জানোয়ার হয়ে যায়।’
বিন্দু জানে মুখে এ কথা বললেও মা কতো খুশী মনে মনে!
‘তুমি না মা পারোও! ভাইয়ার বেতন কতো জানো? মাসে তিরিশ হাজার টাকা। তিরিশ হাজার একসাথে দেখেছো কখনো? ষাটটা পাঁচশো টাকার নোট। আর পুরোনো জামা পড়ে কলেজে যেতে হবেনা! ভাইয়াকে বলবো প্রতি মাসে একটা জামা দিলেই হবে।’
সবার আনন্দ দেখে রাহেলার ভয় হয়। নির্মল আনন্দ নাকি বেশীদিন টেকেনা। তার বুক ধরফর করতে থাকে। তিনি শোবার ঘরে এসে শুয়ে থাকেন।
অন্তুর বাবা ঘরে এসে বলেন, অসময়ে শুয়ে আছো কেনো? শরীর খারাপ?
রাহেলা বেগম চুপচাপ শুয়ে থাকেন। কথা বলতে তার ভালো লাগেনা। অন্তুর বাবা বলেন,
‘ছেলেটার চাকরির দুমাস গেলে তোমার ভাইদের এই ফ্ল্যাট ছেড়ে নতুন বাসা নিতে বলবো। তোমার ছোট ভাইটা ইতর কিসিমের, সুযোগ পেলেই অপমান করে। সেদিন সবার সামনে আমাকে কেয়ারটেকার হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিলো।’
রাহেলা বেগম কাঁথার নীচ থেকে আস্তে করে বলেন,
‘তুমি সেটাই তো’
– তা তো বটে। বলতে গেলে তাদের দয়ায় বেঁচে আছি,তাই বলে…। যাই হোক আর কারো দয়া নিয়ে বেঁচে থাকতে হবেনা। কালকে ছেলেটা চাকরিতে জয়েন করলেই সব অবসান।
বলতে বলতে অন্তুর বাবার চোখে জল চলে আসে, তিনি ধরা গলায় বলেন,
‘বুঝলা অন্তুর মা! পাঞ্জাবীগুলো স্থানে স্থানে ছিড়ে গেছে, সেলাইকরা যায়গাগুলো দেখলে বড় অস্বস্তি লাগে। ছেলেটাকে বইলো মাসের প্রথম বেতন পেলেই যেনো আমাকে নতুন একটা পাঞ্জাবী কিনে দেয়।’
রাহেলার অস্বস্তি বাড়ে! মাথা ঝিম ঝিম করতে থাকে। যোহরের নামাজের পর তিনি কোরআন শরীফ নিয়ে বসেন। গোলাপ চাচার গ্রাম থেকে আনা রুই মাছ কাটতে কাটতে নতুন জামার গন্ধ পায় বিন্দু, সে নীরবে কাঁদে। কাঁদতে তার ভালো লাগে। কতোদিন পর আনন্দ করার মতো একটা উপলক্ষ এসেছে তাদের পরিবারে।

সন্ধ্যায় অন্তু বাসা থেকে বেরোয়, কালকে জয়েনিং। কামাল বলেছে তার দুইটা শার্ট আর প্যান্ট দিয়ে দিবে এক মাসের জন্য। যদিও ইন্টারভিউয়ের দিনগুলো সফিকের পোশাকগুলো দিয়ে চলে গেছে। সফিকেরা বড়লোক হলেও মনটা খুব ছোট, চান্স পেলে খোঁচা দিতে ছাড়েনা। কামালের এ সমস্যা নেই। অন্তুর খুব কাছের বন্ধু বলতে এই কামালই আছে।

কামালদের বাসায় পৌঁছাতেই কামালের বোন সিমলা দরোজা খুলে দেয়,
‘আরে অন্তু ভাই আপনি! আপনি নাকি চাকরি পেয়েছেন? ভাইয়া বললো।মিষ্টি কই? ‘
অন্তু হঠাৎ করে লজ্জা পেয়ে গেলো, এই মেয়েটার সামনে এলে কেনো জানিনা তার লজ্জা লাগে।
অন্তু মাটির দিকে তাকিয়ে বললো,
‘বেতন পেলেই মিষ্টি নিয়ে আসবো, কামাল কোথায়?’
– ‘ভাইয়া গোসলে, আপনি এসে বসেন। এক্ষুনি এসে যাবে। ভাইয়া আমাকে বলেছে, আপনার জন্য দুই সেট কাপড় আমি নিজে ইস্ত্রী করে রেখেছি’
অন্তু আবারো লজ্জা পেয়ে গেলো,
‘তুমি কেনো খামাখা কষ্ট করতে গেলে’
– ‘আপনার জন্য কষ্ট না করলে কার জন্য করবো অন্তু ভাই?’
অন্তু অবাক হয়ে সিমলার মুখের দিকে তাকালো। মেয়েটা লজ্জায় লাল হয়ে দৌঁড়ে পালিয়ে গেলো।
এক ছুটে শোবার ঘরের দরজা বন্ধ করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মনে মনে চিৎকার করে বললো,
‘তোমাকে আমি অনেক অনেক ভালোবাসি অন্তু ভাই! এতো ভালো কেনো বাসি আমি তা জানিনা!’

একটা সাদা আরেকটা নীল শার্ট, দুইটা প্যান্ট আর মন ভালো করা অদ্ভুত অনুভুতি নিয়ে অন্তু কামালদের বাসা থেকে বাইরে বের হয়ে এলো। সিমলা মেয়েটার জন্য ভেতরে ভেতরে সে প্রচন্ড টান অনুভব করছে। মেয়েটা কি তাকে ভালোবাসে?
এতো ভালো কিভাবে হয় মানুষ! অন্তুর ইচ্ছে করে আবার সে কামালদের বাসায় ছুটে যায়। সিমলা আবার দরজা খুলে বলে, আরে অন্তু ভাই আপনি! সিমলার মুখে তার নাম বারবার কানে বাজতে থাকে। অন্তু বুঝতে পারেনা কি হচ্ছে। হয়তো তার ভেতরেও জন্ম নিচ্ছে প্রবল ভালোবাসা।

ভালোবাসার ভাবনা মানুষকে জ্ঞানশূন্য করে দেয়, ভাবতে ভাবতে কখন রাস্তার মাঝখানে এসে পড়েছে বুঝতে পারেনা অন্তু। রাত সারে এগারোটায় উত্তরাগামী বালুবোঝাই ট্রাক তার উপর দিয়ে চলে যায়। মাথাটা সম্পূর্নরূপে থেঁতলে যাবার আগে একবার শুধু সে “মা” বলে ডাকতে পারে।

ওদিকে চারতলার ছোট্র ফ্ল্যাটে চারটা মানুষ অপেক্ষায় আছে একসাথে রাতের খাবার খাবে বলে। কাল থেকে তাদের দিন বদলে যাবে।


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত