রবিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২০

আড়াল

আমি মারা গেছি আজ ভোর রাতে। তার কিছুক্ষণ পর থেকেই আমার লাশটা মেঝেতে পড়ে আছে। জিভের অনেকটা কাত হয়ে ঝুলছে।  বাকিটা শুকিয়ে সাদা হয়ে গেছে বকের পালকের মতো। দাঁত বসে গেছে তাতে, রক্তাভ লালা চুইয়ে পড়েছিল খানিক আগেই, এমন আন্দাজ সহজেই করা যায়। আমার বাম হাতের শক্ত মুঠো খামছে ধরে আছে পাজামার ফিতে। ডান হাত নিস্তর হয়েও মাঝে মাঝে দোলে ওঠছে পেন্ডুলামের মতো।

সকাল সাতটা নাগাদ পুরো গ্রাম জুড়ে রাষ্ট হয়ে গেল সব। সবাই জেনে গেলো যে, আলিমুদ্দিনের ক্লাস নাইনে পড়া মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে। পুরো এলাকায় ছি ছি পড়ে গেলো। আমি তখনও মেঝেতেই। নাহ, ফ্যান থেকে ওড়নাটা খোলার পর কেউ আমার গায়ের তিলটা পর্যন্ত স্পর্শ করেনি। আর করবেই কেনো; আমি তো আপাদমস্তক অপয়া; কুলটা। আমাকে ছোঁয়া সমাজ-স্বীকৃত কর্ম নয়। আমাকে ছোঁয়ার সাহস করে ওঠা লোক এখন আর জন্মায়? ইতিহাসের সেইসব মানুষেরা মরে অনেকের বাঁচার রাস্তা সহজ করেছে। আর এদের নিরেট নিঃশ্বাসে ভারী হয় আজকের সভ্যতার সমস্ত বাতাস।

আমি গত রাতে বাড়ি ফিরেছিলাম। নিরুদ্দেশ হবার দুই মাস পর। কাল যখন ফিরেছি, পুরো গ্রামসুদ্ধ লোক জড়ো হয়েছিল আমাদের উঠোনে। আমি যখন হেঁটে আসছিলাম, চেনা পথ-ঘাট, আমাদের বাড়ির সামনের পুকুর, নীলুফাপাদের দেউড়ি সব কেমন অচেনা মনে হচ্ছিল। আর কতজনে কত কী যে বলছিল। আমার মায়ের বসে যাওয়া ডিবির গর্তের মাঝে ফোলা ফোলা চোখ, সংসারের কালিঝুলি মাখা হাত আর ডান হাতের কাটা আঙুলের মরা দাগ দেখেই বুঝেছি, গত দুই মাস মায়ের ওপর দিয়ে কী যে গেছে।

আর বাবা? কম বয়েসী মুসলমান মেয়ে অন্য ধর্মের বখাটে ছেলের সাথে পালালে যেমন হবার কথা, তেমনই। কেউ কেউ বললো, ছি ছি! এই মেয়ে না ফেরাই তো ভালো ছিল। অথচ আমি জানি, ঠিক এরাই না ফেরার সময়; আমি যখন নিখোঁজ হয়ে ছিলাম, তখন বলেছে, যেমনই হোক; মেয়েটা যদি ফিরে আসতো, আহা, বাদবাকি দিন মা বাবার সামনে অন্তত থাকতো। চুন থেকে পান খসিয়ে কেউ আবার বললো, এবেলা নিশ্চয়ই পেটে বাচ্চা নিয়ে এসেছে। দেখলে না, কীরম ফ্যাকাশে হয়ে আছে গতর।

আমার বুঝতে বাকি ছিল না, মায়ের যত্ন-আত্তিতে গড়া বাবার মূর্তিটি হারিয়ে গেছে আমার অপমানে তৈরি আজকের সামাজিক আবহের কাছে। আমার আসলে আর কিছুই করার নেই। আমি নিজের ভেতর শুধু নিজের জন্য কবর খুঁড়ে চলেছি তখন। আমি শামুকের মতো নিজের সবকিছু নিজের ভেতরে নিয়ে নিচ্ছিলাম তাড়াতাড়ি। কেনো আমি দীমানের সাথে পালিয়ে গিয়েছিলাম, সেই গল্পটি বরং বলা যাক।

দীমান আমাদের পাশের পাড়ার ছেলে। বখাটে ছেলেরা যেমন কদর পায় অকদর্যদের কাছে, দীমান তারচেয়ে আরেকটু উপরের স্তরের একজন। বলার মতো তেমন কিছুই সে করে না। কাজ তার নেই, তবে অকাজের তালিকাটা বেশ বড়। সে এসব অকাজ নিয়ে খুব ব্যস্ত সব সময়। ওর স্বভাব ভালো-মন্দ মিলিয়ে হলেও, মন্দের দিকটা বেশি হওয়াতে তার মূল্যায়ণ সেরকমই সে সাধারণের কাছে পায়।  আর বড়বাজারে  ওদের একটা ছোটখাট মিষ্টান্ন ভাণ্ডার আছে। তিন পুরুষ ধরে এই ব্যবসায় খারাপ চলছে বলা যাবে না। তবে আমাদের পরিবারের অবস্থানের তুলনায় দীমানদের অবস্থা অনেক খানি খাটো।

দীমান বছর দেড়েকের বেশি সময় ধরে আমার স্কুলে যাবার পথে বসে থাকতো। তবে আমরা জানতাম, আমরা মানে আমি আর আমার সমবয়েসী বন্ধুরা; দীমান অনেক মেয়েকেই বিরক্ত করে। কিন্তু সে এটা বোঝাতো আমায় যে, সে আমার জন্য আসলে বসে থাকে পথে, অপেক্ষা করে। প্রথম প্রথম দৃষ্টি অতোটা না পড়লেও তার ক্রমাগত চেষ্টায় তার দিকে নজর একটু পড়তো, সেটা সুনজর অবশ্যই নয়। তবে আমার কাছের বন্ধুদের কাছে নিত্য খোঁজ-খবর করতে করতে সে একসময় মনে নেয়ার মতো সামান্য জায়গা নিয়ে নেয়। দীমান সম্পর্কে আমার ধারণা যেমনই হোক, একজন কেউ আমার জন্য এমন করছে ভাবলে একটা অচেনা অনুভূতি মনের মধ্যে জেগে ওঠতো তখন।

ঐ সময়ে আমার একবার জ্বর হল। সেই খবর গেল দীমানের কাছে। বাড়িতে দুপুর বেলাটা আমি একাই থাকি। এই সুযোগটাই নিল সে। সপ্তাহ খানেক প্রায় রোজ আমাদের বাড়িতে এল। আর বিভিন্নভাবে আমাকে এটা বোঝাতে সক্ষম হল যে, সে আমাকে ভালোবাসে। কত আর বয়স আমার তখন। তাছাড়া ভুল করার সেই বয়সে কেবল কেউ বুঝে কাছে টানলেই তার কাছে মানসিক সমর্পনের ইচ্ছে জাগে মেয়েদের।  মা-বাবা যখন সব জেনে ভয়ানক ভাবে মানা করে দিল এই ব্যাপারে, আমার মন তখন মনে মনে আরও ক্ষেপে গেল। একপর্যায়ে আমার মধ্যে মোটামোটি একটা জিদ চেপে বসলো যে, দীমানের সাথেই আমি থাকবো। এভাবে একদিন কীসব ভেবে, অনেকখানি না বুঝে, মনের পুরোটা সায় না নিয়েও দীমানের সাথে পালিয়ে যাই আমি।

দীমান অপেক্ষা করছিল আমাদের বাড়ির কাছের এক রেলস্টেশনে। আগের রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে আমি তৈরি হতে থাকি। স্কুল ব্যাগে কয়েকটা কাপড়, মায়ের দুটো একটি গয়না আর নগদ কুড়ি হাজার টাকা নিয়ে ভোরে ঘর থেকে বের হয়ে যাই আমি। বাড়ি থেকে বের হয়ে যাবার সময় আমি ভুলে যাই পেছনের সব মমতার গেরস্থালি, মা-বাবার আগলে রাখা শরীর অজানা সমুদ্রে সাঁতার দেবার জন্য প্রস্তুত হয়।

আমার ছোট মন, কম বয়েসী শরীর দুটোই খারাপ হতে লাগলো দু দিন বাদেই। দুই রাত একটা নোংরা আর সস্তা হোটেলে কাটাই আমরা। তারপর দীমান আমাকে বস্তি মতোন একটা জায়গায় নিয়ে যায়। আমার কাছে থাকা গহনা ও টাকা সে নিয়ে নেয়। সে আমায় নিয়ে যেখানে যায়, ছোট হলেও আমি বুঝি, জায়গাটা ভদ্রলোকের বাস করার নয়। অবশ্যি দীমান সে ভদ্র কেউ নয়, তা আমি ভালোই জানি। কিন্তু কোন এক অদৃশ্য টানে আমি সব মেনে নিই।

একটা ঘর, যেখানে কেউ নেই, দেখিয়ে আমায় বলে, এই ঘরেই থাকতে হবে আমাদের। আমি খুব খুশি হয়ে যাই। আমি এটা ভাবি যে, হয়তো কম পয়সায় এই শহরে এর চেয়ে ভালো ঘর পায়নি সে। আমি আমাদের পরবর্তী সময়, আমোদে উপভোগ ও স্বপ্নের বাস্তবায়নের কথা চিন্তা করে সুখী বোধ করতে থাকি। হয়তো দীমান কাল থেকে কিছু একটা করবে। ওর রোজগার সামান্য হলেও আমাদের তারপর ভালোই চলবে কোনোমতে। দুটো মাত্র প্রাণি, এমন কী আর খরচপাতি।  কিন্তু মা-বাবা আর সবার কথা মনে করে আমার খুব কান্না পাচ্ছিলো তখন। এভাবে কতক্ষণ ভেবেছি খেয়াল ছিল না। তারপর একসময়, এই আসছি বলে দীমান বাইরে বেরিয়ে যায়। আমি খুব ক্ষুধার্ত ছিলাম। পথের দীর্ঘ যাত্রার রেশ তখনো কাটিয়ে উঠিনি। ক্লান্ত ও অনেকটা অসুস্থ আমি নেতিয়ে পড়ি সেই নোংরা ঘরে পাতানো একটা ছাটাইয়ের ওপর। আধোঘুমে আমি দেখি ঘরটিতে একটা আধ ছেঁড়া ছাটাই, দুটো ময়লা বালিশ, ভাঙ্গা একটা চেয়ার আর শক্ত কাঠের একটা মুগুর ছাড়া কিছু নেই।

আমার শরীরে কারো স্পর্শ পেয়ে চকিত হই আমি। নাহ, এ দীমান নয়। কে ইনি? ঠিক দীমানের বয়সী ছেলেটি হাসতে হাসতে বলে যে, ওর নাম কিরণ। হ্যাঁ, এবার চিনতে পারি আমি। দীমান ওর কথা বলেছে আমায়। ওর খুব কাছের বন্ধু।  কিন্তু সে আমায় একটা হাতে এভাবে জড়িয়ে আছে কেনো বুঝতে পারি না। হ্যাচকা টানে তাকে সরিয়ে উঠে দাঁড়াই আমি। কিরণ আমার দুরবস্থা দেখে হেসে লুঠোপুটি খায়। আমি গলা বুজে আসা কণ্ঠে দীমানের কথা জিজ্ঞেস করি। জানতে পারি, সে বাড়ি চলে গেছে। একটা সিগারেট টানতে টানতে কিরণ চোখ মুখ লাল করে যা বলে তার অর্থ হলো, ওর সাথে আপাতত কিছুদিন থাকতে হবে আমাকে। আমি এবার আরও কান্নায় ভেঙ্গে পড়ি। আমার বর্তমান ও সামনের কুৎসিত দিন-রাত্রির কথা ভেবে বারবার শিউরে ওঠি। আমি বুঝতে পারি মা-বাবার কথা না মেনে কী সর্বনাশ করেছি সময়ের, কতোটা অপচয় করে ফেলেছি জীবনের। যা ঘটছে তা মেনে নিতে পারিনা। চিৎকার করে প্রতিবাদ করতে চাই কয়েকবার। কিরণ রেগে যায় আমার ওপর। আমাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় মেঝেতে। এরপর আরও দুজন ঘরটিতে ঢুকে। মদের গন্ধ আমি চিনি না। তবে একটা ভোদকা আঁশটে গন্ধ আমার উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়, কেমন একটা আবহে মাথা গুলিয়ে যেতে থাকে। ওরা জোর করে আমাকে কিছু একটা খাওয়ায়। তারপর সম্ভবত আমি মূর্ছা যাই।

আমি যখন চোখ মেলেছি তখন মধ্যরাত। না, আমার পাশে কেউ নেই। আমি এই ঘরে একা। উঠতে চেষ্টা করি। পারি না। সীমাহীন নরক যন্ত্রণার মাঝেও অপেক্ষা করতে থাকি দীমানের। পরদিন দুপুরে দীমান আসে। তাকে কিছুই বলি না আমি। কিছুই হয়নি এমন ভাবে কথা বলার চেষ্টা করি। ও হাসতে হাসতে আমার পাশে বসে। আমি বাইরে বের হতে চাইলে দীমান আমাকে বাধা দেয়। এরপর দস্তাদস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে আমি পাশে রাখা মুগুর দিয়ে সজোরে আঘাত করি ওর মাথায়। দীমান লুটিয়ে পড়ে। ওর রক্তে আধ ভেজা আমি দ্রুত কাপড় চেঞ্জ করি, তারপর বের হয়ে যাই ঘর থেকে। বাড়ি পৌছুতে সেদিন সন্ধ্যা রাত হয় আমার। আমাদের উঠোনজুড়ে গ্রামের সমস্ত মানুষ। এতোগুলো সামাজিক মানুষের মাঝে নিজেকে দাঁড় করাতে পারছিলাম না কিছুতেই।

 


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত