রবিবার, ১৮ আগস্ট ২০১৯

ইউরোপের মানুষ গোসল ছাড়া ১০০০ বছর কাটিয়েছিল কীভাবে?

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন,

‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা’

অগ্নিস্নান না হোক, আমরা প্রতিদিন যে জলস্নান বা গোসল করি, মনে প্রশ্ন জাগেনি আপনার কখনো; আচ্ছা এটার শুরু হলো কেমনে? কেই বা রোজকার কাজের একটির তালিকায় একে যুক্ত করলেন?

স্নানের প্রতিশব্দ হিসেবে আমাদের দেশের মুসলমানরা আরবি ‘গোসল’  শব্দটি ব্যবহার করেন। পরিষ্কার-পরিচ্ছনতা ইসলাম ধর্মে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বাধ্যবাধকতা। ইসলাম ধর্মে গোসলের উদ্দেশ্য পবিত্রতা অর্জন এবং এই গোসলের নিয়মকানুন সুনির্দিষ্ট। আবার, প্রাচীন ভারতীয় পুঁথিপত্রে দিনে তিনবার স্নানের বিধান আছে। এদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে গঙ্গার জল অতি পবিত্র এবং গঙ্গাজলে ফি বছর লাখ লাখ পূণ্যার্থী ‘পূণ্যস্নান’ করে পবিত্রতা অর্জন করে।

আপনি জানলে খুব অবাক হবেন, মধ্যযুগে প্রায় ১০০০ বছর ধরে পশ্চিম ইউরোপীয়রা স্নানের বিষয়টি প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। এমনকি তারা সাঁতারও ভুলে গিয়েছিল। তারা কেবল সাঁতার ভোলেনি, সাঁতারের ইচ্ছাও লোপ পেয়ে গিয়েছিল তাদের মধ্যে থেকে। ফরাসি ইতিহাসবিদ জুলেস মিসলেট ইউরোপের মধ্যযুগকে ‘স্নান ছাড়া ১ হাজার বছর’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইউরোপে কয়েক শতাব্দী ধরে স্নান ও সাঁতারের সংস্কৃতির এই অনুপস্থিতি বিশ্বের অন্যান্য অগ্রগতি থেকে তাদের ছিটকে ফেলেছিল।

সপ্তদশ শতকে উন্নত দেশগুলোয় স্নানের অনুপস্থিতি ও অপরিচ্ছন্ন অভ্যাস রীতিমতো অস্বাস্থ্যকর ও দুর্গন্ধময় অবস্থার সৃষ্টি করেছিল। ইউরোপীয়দের মনে ধারণা ছিলো, স্নান করলে রোমকূপের মধ্যে দিয়ে দেহে রোগ-জীবাণু প্রবেশ করে এবং সেই কারণে তারা স্নান করতেন না। স্পেনের রানী ইসাবেল জীবনে মাত্র দুইবার স্নান করেন। যেদিন তার জন্ম হয় এবং দ্বিতীয় ও শেষবার তার বিয়ের দিন। ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুইও সারা জীবনে মাত্র দুইবার স্নান করেছেন।

ফ্রান্সে রাজপ্রাসাদকে বলা হয় ‘শাঁতো’। ফ্রান্সের রাজা প্রথম ফ্রাঁসোয়া ফ্রান্সজুড়ে এমন অনেক প্রাসাদ বা শাঁতো গড়েছেন। একেকটা প্রাসাদে শত শত কক্ষ। কিন্তু মজার ব্যাপার, এতো বড় প্রাসাদে কোনো বাথরুম নেই! সৌন্দর্য-চর্চা, সুগন্ধি-সৌরভ আর সাজ-পোশাকের আড়ম্বরে ফরাসিদের খ্যাতি বিশ্বজুড়ে। সুগন্ধের রাজধানী ফ্রান্সের প্যারিস- যেখানে প্রতিনিয়ত হাজারো রসায়নের সমীকরণে তৈরি হচ্ছে বিচিত্র সব সুগন্ধি- ফরাসি সৌরভ। ফ্রান্সে এই সুগন্ধি বা পারফিউম কীভাবে তৈরি হয় সেটি ফুটে উঠেছে ‘পারফিউম: দ্য স্টোরি অব অ্যা মার্ডারার’ নামের একটি বিখ্যাত চলচ্চিত্রে। অথচ আশ্চর্যের ব্যাপার- এই ফরাসিরাই কিনা বছরের পর বছর স্নান করতো না! ফরাসিদের এই স্নানজনিত বিশ্বকুখ্যাত আলসেমির কারণেই জন্ম নেয় শত শত বিশ্ববিখ্যাত ফরাসি সুগন্ধি কোম্পানি। যাতে সুগন্ধি মেখে হলেও স্নান না করে গায়ের দুর্গন্ধ ঢাকা যায়! সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘ছবির দেশে কবিতার দেশে’ বইয়ে ফরাসিদের স্নান-বিমুখতার উল্লেখ আছে।

এবার স্নানের পেছনের দিকে তাকানো যাক। প্রাচীন গ্রীক সভ্যতায় পাবলিক বাথ হাউস বা সাধারণ স্নানাগারের উল্লেখ আছে। রোমান সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ খুঁজে দেখা গেছে, সে সময় স্নানাগারে প্রণালী দ্বারা পানি সরবরাহের ব্যবস্থা ছিল। এই দুই সভ্যতায় দ্বিতীয় খ্রিস্টাব্দে যে স্নানের অভ্যাস ছিল তার প্রমাণ মেলে। ‘ইউরেকা’  শব্দটি বললেই মনে পড়ে যায় বাথটাবে স্নান করতে করতে বিজ্ঞানী আর্কিমিডিসের সেই বিখ্যাত এবং যুগান্তকারী আবিষ্কারের কথা।

আরব্যরজনীতে তখনকার দিনের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের স্নান বিলাসের বিবরণ আছে। আর যারা নিম্নবিত্তের মানুষ তাদের জন্য নগরে থাকতো সামান্য দক্ষিণার বিনিময়ে সাধারণ স্নানাগার। বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব পড়ার আগে জাপানে খোলা জায়গায় স্নানের রীতি ছিল। পরবর্তীকালে বৌদ্ধধর্মের প্রভাবে ঘেরা স্থানে স্নানের রীতি চালু হয়।

প্রাচীনকালে রাজা ও রানীদের স্নান বিলাসের কাহিনি আজও আমাদের বিস্মিত করে। শোনা যায়, সৌন্দর্যের কিংবদন্তি রানী ক্লিওপেট্রা নাকি ত্বকের ঔজ্জ্বল্য রক্ষার জন্য গাধার দুধ দিয়ে স্নান করতেন। এছাড়া প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে রানী ও রাজকন্যাদের স্নানের জলে চন্দন, কেশর, গোলাপ জল ও নানা সুগন্ধিদ্রব্য ব্যবহার করার প্রচলন ছিল।

তবে স্নান-বিলাসে সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন ভারতের রাজস্থানের ভরতপুরের রাজা কিষণ সিংহ। কিষণ সিংহের রাজমহলে ৪০ জন রানী থাকতেন। রাজমহলের সামনে গোলাপি মার্বেলে সুইমিং পুল বানিয়েছিলেন কিষণ সিংহ। এমনকি, সেই সুইমিং পুলে যাওয়ার রাস্তা বাঁধানো হয়েছিল চন্দন কাঠে। সুইমিং পুলে নামার জন্য চন্দন কাঠের সিঁড়িও বানানো হয়েছিল। রাতে সুইমিং পুলে নগ্ন হয়ে স্ত্রীদের সঙ্গে স্নান করতে নামতেন রাজা কিষণ সিংহ। পুলের মধ্যে ২০টি চন্দনকাঠের পাটাতন এমনভাবে রাখা হয়েছিল যে, এক একটি পাটাতনে দুজন রানী অনায়াসে দাঁড়াতে পারতেন। কিষণ সিংহের নির্দেশে প্রত্যেক রানীকেই হাতে মোমবাতি নিয়ে পুলের সিঁড়ি থেকে একদম সিঁড়ির শেষ ধাপ পর্যন্ত দাঁড়াতে হতো। রানীদের উদ্দেশে কিষণ সিংহের কঠোর নির্দেশ ছিল, মোমবাতি যেন না নিভে যায়। স্নানের শেষমুহূর্ত পর্যন্ত যে রানীর হাতের মোমবাতি জ্বলতো, তাকে নিয়ে নিজের খাসমহলে যেতেন রাজা। এর মানে, ওই রানী সেই রাতে রাজার সঙ্গে রাত কাটানোর সুযোগ পেতেন।

ঠিক কবে থেকে গোসলের শুরু, সেটি ইতিহাস ঘেঁটে তেমন ভাবে পাইনি। যেসব তথ্য পাওয়া যায়, সেগুলোর বিশ্বাসযোগ্য সূত্র নেই। সে যাই হোক, স্নানের পর সকালে ও রাতে হলেও আমি এক কাপ চা খেতে ভালোবাসি। আপনি?

(হাসান হামিদ এর ফেইসবুক পোস্ট থেকে)


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

error: Content is protected !!