মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১

ইউরোপের স্বপ্নালু জীবনের টানে মৃত্যুফাঁদে পা নয়

হাসান হামিদ

ইতিহাস বলে, প্রাচীন গ্রিসের নগর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ধ্রুপদী সভ্যতার শুরুটা হয়েছিল। এরপর ধীরে ধীরে পুরো ভূমধ্যসাগর কেন্দ্রীক অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করে রোমান সাম্রাজ্য। রোমান সাম্রাজ্যের পতন হয় ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে। আর এই পতনের মধ্য দিয়ে মধ্যযুগের সূচনা হয়। চৌদ্দ শতকের শুরুর দিকে জ্ঞানের পুনর্জাগরণ ঘটে। আঠারো ও উনিশ শতকের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা তৎকালীন রেনেসাঁসের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব দেখি। উনিশ শতকে ইউরোপে শিল্পবিপ্লব শুরু হওয়ার পর বিশেষ করে ইংল্যান্ড এবং পশ্চিম ইউরোপ সমৃদ্ধ হতে থাকে। তখন থেকেই ইউরোপে ভীড় জমাতে শুরু করে পিছিয়ে পড়া অন্য অনেক দেশের মানুষ। একসময় বৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশের অনেক পথ রুদ্ধ কিংবা কিছুটা কঠিন হওয়ার কারণে নানা অবৈধ উপায়ে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা আরম্ভ হয়। উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও ভয়াবহ ঝুঁকির পথে পা বাড়ায় অনেকে। এতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা প্রতারণা ও হয়রানির শিকার হয়। এসব খবরও সংবাদমাধ্যমে আসে। অবৈধ পথে ইউরোপ যাত্রা করতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে মৃত্যুর ঘটনা এখন নিয়মিত ঘটছে। আর সেই তালিকায় মোটা দাগে শনাক্ত হচ্ছে বাংলাদেশিদের নাম। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের দেওয়া তথ্য মতে, ভূমধ্যসাগর ব্যবহার করে ইউরোপে প্রবেশকারীর সংখ্যায় বাংলাদেশিদের অবস্থান চতুর্থ। অতএব, এ বিষয় নিয়ে আমাদের এখনই ভাবতে হবে।

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাবার পথে সাগরে ডুবে মৃত্যু কী পরিমাণ হচ্ছে, তা বুঝতে আমরা কিছু পরিসংখ্যানে নজর দেব। আইওএম-এর হিসেবে ২০২১ সালের এই করোনাকালীন মহামারিতেও ভূমধ্যসাগর রুটে এই ক’মাসে প্রায় ৯৭০ অভিবাসন প্রত্যাশী পুরুষ, নারী ও শিশু প্রাণ হারিয়েছে। ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ইউরোপে প্রবেশ করা আঠারো হাজারেরও বেশি শিশু-কিশোর শরণার্থীর হ‌দিস পাওয়া যায়নি। তাদের সাথে কী ঘটেছে সেটা কেউ জানে না। এভাবে ঠিক কতজন মারা যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে; আর তাতে আমাদের বাংলাদেশের কতজন তার সঠিক সংখ্যা কেউ জানে না। তা জানা আসলে খুব সহজও নয়।

ইউরোপে অবৈধভাবে প্রবেশের সংখ্যাতে সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশিরা। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালের প্রথম ৬ মাসেই অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশ করেছেন ৪৭ হাজার ৪২৫ অভিবাসনপ্রত্যাশী। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশিরা৷ ইউরোপে অবৈধ পথে প্রবেশকারীদের মধ্যে ৪৪ হাজার ৯৩ জন এসেছেন ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে৷ জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচএসিআরের তথ্য অনুযায়ী, মোট অভিবাসনপ্রত্যাশীর ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ, অর্থাৎ তিন হাজার ৩৩২ জন বাংলাদেশি। আইওএম-এর ডিসপ্লেসমেন্ট ট্র্যাকিং ম্যাট্রিক্স বা ডিটিএম-এর জরিপ বলছে, ২০২০ সালে চার হাজার ৫১০ বাংলাদেশি জল ও স্থলপথে অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশ করেন। চলতি বছরের প্রথমার্ধ্বেই এই সংখ্যার কাছাকাছি চলে এসেছে ইউরোপে অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীদের সংখ্যা।

মনে প্রশ্ন জাগে, জীবনের ঝুঁকি জেনেও মানুষ এ অবৈধ পথে পা বাড়ায় কেন? তারা আসলে কতটা সচেতন? তারা কি এ কাজের পরিণাম সম্পর্কে মোটামুটি জানে? অবৈধভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এই ইউরোপ যাত্রায় মানুষকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে এক শ্রেণির দালাল ও প্রতারক। যারা যাচ্ছেন তাদের সবাই একেবারে এ দেশে হত দরিদ্র নন। তবুও যাচ্ছেন। উন্নত জীবনের স্বপ্নে বিভোর হয়ে এ পথে পা দিচ্ছেন তারা। একটু খেয়াল করে দেখলে বোঝা যায়, ইউরোপে অবৈধভাবে যাওয়া মানুষের তালিকায় যে দেশগুলোর নাম আছে, বাংলাদেশ ছাড়া বাকি দেশগুলোতে হয় দুর্ভিক্ষ, নয়তো যুদ্ধ কিংবা চরম দারিদ্র্যের মতো সমস্যা রয়েছে। আমাদের দেশে এ রকম কোনো সংকট কিন্তু নেই। আর বেশিরভাগ বাংলাদেশি এভাবে ইউরোপে যেতে দালালদের লাখ লাখ টাকা দিচ্ছেন, অথচ সেই টাকা দিয়ে দেশেই কোনো একটা ব্যবসা করা সম্ভব। কিন্তু তা না করে তারা ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপে যেতে চাইছেন। এর মানে হলো, ইউরোপের প্রতি এই টান, এটার অন্য এক ব্যাপারও আছে। অর্থনৈতিক চাপের সাথে এখানে মানসিক কিংবা সামাজিক চাপ কাজ করে ভয়াবহ ভাবে।  বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যে স্বপ্নকে বুকে নিয়ে দেশ ছাড়েন বাংলাদেশিরা, সেই স্বপ্ন তৈরি করতে একটা বড় ভূমিকা পালন করে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের পরিবারের সদস্য আর স্বজনরা। এই অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ওপর এক ধরনের সামাজিক চাপও থাকে। যে আত্মীয়-স্বজনরা সফলভাবে ইউরোপের অন্য কোনো দেশে থেকে জীবনযাপন করেন, তারা অনেক সময় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বলেন যে, কোনো মতে ইউরোপে চলে আসতে। ফলে, অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মনে একটা ধারণা সৃষ্টি হয় যে, যেকোনো উপায়ে ইউরোপে একবার ঢুকতে পারলেই আর কোনো সমস্যা থাকবে না জীবনে। ইউরোপের স্বপ্নালু জীবনের এমন টান আর পারিপার্শ্বিক সমাজের চাপের কারণেই বাংলাদেশিরা অবৈধ পথে পা দেয়।

অবৈধ পথে ইউরোপে প্রবেশের খবরে ভূমধ্যসাগরের নাম সবচেয়ে বেশি শোনা যায়। এই সাগর হচ্ছে তিনটি মহাদেশকে ঘিরে বিভিন্ন মানুষের মধ্যে পরিবহন, বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের কেন্দ্রীয় মহাসড়ক। তিনটি মহাদেশ হলো- পশ্চিম এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা এবং দক্ষিণ ইউরোপ। আর অবৈধভাবে ইউরোপে পাড়ি জমাতে প্রধানত চারটি রুট বিবেচনা করা হয়। রুটগুলো হচ্ছে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, কেন্দ্রীয় ভূ-মধ্যসাগরীয় অঞ্চল, পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল এবং চতুর্থ রুট হচ্ছে স্থলপথে পশ্চিম বলকান অঞ্চল। এর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ রুট হিসেবে পরিচিত কেন্দ্রীয় ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল। বলতে গেলে প্রতি মাসেই এই রুটে নৌকাডুবির খবর পাওয়া যায় এবং অনেকে এভাবে মারা যান। আর বাংলাদেশিদের বেশিরভাগ অভিবাসী এই রুটে পাড়ি জমান। অবশ্য  জানতে পেরেছি, বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে যাবার মোট আঠারোটি রুট রয়েছে ও সবচেয়ে বেশি ইউরোপের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিচ্ছেন যেসব বাংলাদেশি তাদের বেশিরভাগের বয়স ৩১ থেকে ৩৫ বছর।

আমাদের দেশে ইউরোপ নিয়ে এমন সব গল্প প্রচলিত, সেসবের প্রভাবে যারা ঝুঁকি নিয়ে সেখানে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন তারা ভাবেন কোনোভাবে ইউরোপে পাড়ি জমাতে পারলেই হল, তারপর আর চিন্তা নেই। অথচ মৃত্যুকে পাশ কাটিয়ে ইউরোপে কেউ পৌঁছাতে পারলেও তাদের জীবনের চাকা ঘুরতে অনেক সময় নেয়। কারণ ইউরোপে থাকতে হলে অবশ্যই তাকে বৈধভাবে বসবাস করতে হয়। তবে এই বৈধতার জন্য অনেকেই কিছুদিন থাকার সুযোগ হিসেবে আশ্রয়ের আবেদন করেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বলতে গেলে আবেদনের বড়জোর ৫% গ্রহণযোগ্য হয়। পরবর্তীতে এই অভিবাসীরা অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে হয়তো জীবন সায়াহ্নে এসে বৈধ কাগজপত্র লাভ করেন। তবে ততদিনে জীবন ফুরিয়ে গেছে। উন্নত জীবন ধরা দিলেও সেই জীবনকে উপভোগ্য করে তোলা তাদের পক্ষে আর সম্ভব হয় না। এটা তো গেল যারা ইউরোপে প্রবেশ করতে পারে, তাদের কথা। কিন্তু বড় একটি অংশ দালাল আর প্রতারকদের নির্যাতনের শিকার হয়। তাদের আটকে রেখে পরিবারের কাছ থেকে আদায় করা হয় লাখ লাখ টাকা। এক হিসাব থেকে জানা যায়, ২০০৯ সাল থেকে ইউরোপে অবৈধভাবে প্রবেশের নয়টি পথ দিয়ে মোট ৬২ হাজার ৫৮৩ জন বাংলাদেশি সেখানে ঢুকেছেন। এই সংখ্যার একটা অংশ ইউরোপে প্রবেশ করতে পারলেও সাগরপথের বিপজ্জনক পরিস্থিতিসহ অন্যান্য প্রতিকূলতার কারণে প্রাণ হারাতে হয়েছে বহু বাংলাদেশিকে। সেই সংখ্যাটা কত? মারা যাওয়া বা হারিয়ে যাওয়া মানুষের সেই সংখ্যা নির্দিষ্ট করে বলা যায় না৷ কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাগরে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের শনাক্ত করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু ২০১৪ সাল থেকে যে তথ্য দেখা যাচ্ছে, তার ভিত্তিতে গড়ে প্রতি বছর শ’পাঁচেক বাংলাদেশি এই পথে প্রবেশ করতে গিয়ে মারা যান বলে ধারনা করেন বিশেষজ্ঞরা। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালে ১৭  লাখ ৬৬ হাজার ১৮৬ জন ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেন। এভাবে সাগরপথে ইউরোপ যেতে অন্তত ১৫ হাজার মানুষ প্রাণ হারান বলে মনে করা হয়।

বাংলাদেশি তরুণদের বড় একটি অংশ জানেন না, চাইলে বৈধ পথেও ইউরোপ যাওয়া সম্ভব। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোরও নানা খাতে দক্ষ কর্মী প্রয়োজন হয়। তাই প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষকে বৈধভাবেই ইউরোপে প্রবেশ করার সুযোগ দিচ্ছে এসব দেশ। তবে সেই সুযোগ নিতে হলে একটু পরিকল্পনা এবং পরিশ্রম দরকার। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইউরোপে প্রবেশের একটি সহজ উপায় হচ্ছে উচ্চশিক্ষার জন্য আসা। যে আঠারো বা বিশ লাখ টাকা এবং সময় একজন মানুষ অবৈধ পথে ইউরোপে আসতে ব্যয় করেছেন, সেই সময় ও অর্থ তিনি ইউরোপে শিক্ষার্থী হিসেবে প্রবেশ করতে ব্যয় করলে ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। কেননা এই অঞ্চলের বেশিরভাগ দেশেই বিদেশি শিক্ষার্থীরা চাকুরির সুযোগ পায়। আবার, ইউরোপে বৈধভাবে প্রবেশের অন্য একটি বড় উপায় হতে পারে বিভিন্ন সেবা খাত। বিশেষ করে কৃষি এবং স্বাস্থ্য সেবা খাতে দক্ষ শ্রমিকের অভাব ইউরোপের দেশগুলোতে প্রকট। কোনো কোনো দেশে রয়েছে নার্সের অভাব৷ প্রশিক্ষিতরা সহজেই এই খাতে চাকরি নিয়ে সেখানে প্রবেশ করতে পারেন। তবে এজন্য রাষ্ট্রকে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে। ইউরোপের শ্রম বাজার যে ধরনের প্রশিক্ষিত জনশক্তি চায়, সে রকম প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা বাংলাদেশে করা হলে বৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশের হার বাড়ানো যাবে।

আমাদের দেশের বেকার যুবকদের উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে বিপজ্জনক পথে ঠেলে দিচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। সর্বস্ব বাজি রেখে অবৈধ পথে ইউরোপে পৌঁছানো কোনো সফলতা হতে পারে না। এটা সাধারণ মানুষকে বোঝাতে হবে। আমাদের অনেকের অসচেতনতা ও দায়িত্বশীলদের অবহেলার সুযোগে মানব পাচারকারী চক্র সারাদেশে তাদের জাল বিস্তার করেছে। আর অবৈধপথে মানব পাচারের এসব ঘটনায় নষ্ট হচ্ছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি। তাই অবৈধভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পথে বিদেশযাত্রা রোধে ও দালাল প্রতারকদের দৌরাত্ম্য কমানোর ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। সরকারের জোর তৎপরতা তথা আইনের কঠোর প্রয়োগই পারবে মানব পাচার বন্ধ করতে।

*লেখক- কবি ও প্রাবন্ধিক।


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত