সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০

Advertisement

ইতি মুজিব || মনদীপ ঘরাই

Advertisement

রেনু,
এই দিনটা শোক দিবস, তা জানো?
তোমার -আমার এপারে আসার দিন।
আমাদের সম্পর্কের শুরুর কথা তোমার মনে নেই।
বয়স তোমার যে তখন সবে তিন!
আমার জন্মদিন, তোমার জন্মদিন
এমন কি তোমার-আমার মৃত্যুদিন….
প্রাণের বাংলাদেশে কে না জানে?
শুধু…
জানে না আমাদের বিবাহের দিনক্ষণ।
তুমি- আমি থেকে আমরা হবার দিনক্ষণ…
বাদ থাক ওসব কথা।
তোমার দেয়া খাতা আর প্রেরণা;
আমাকে শিখিয়েছে কলম-কাগজের অদ্ভুত খেলা।
পুরো একটা লেখক হয়ে গেছিলাম জেলে বসে।
আমাদের সম্পর্কটা বড় অদ্ভুত, বলো?
আজীবন জেলের শিকগুলো শক্রু হয়ে এসেছে ;
দুজনার মাঝে।
জানি,তুমি বুঝতে…
এ সব কিছুই দেশের জন্য, মানুষের জন্য।
তাই বয়ে গেছ সব ভার, সয়ে গেছ -সুমধুর দৃঢ়তায়।
কতবার হারানোর ভয় নিয়ে পেয়েছ আমায়?
আমি নিজেই তো মৃত্যুকে কাছে থেকে দেখেছি
কতবার। তৈরি ছিলাম; সব বৈরিতায়।
আমি যখন জেলের একলা সেলে লড়ছি,
তোমার লড়াইটা তখন পরিবার নিয়ে।
জেলের সেই “দেখার” দিনগুলোর অপেক্ষা
তোমার হৃদয়ে কি দোলা দিত জানি না,
আমার কাছে তা ছিল তারুণ্যের মতো অধীর।
হঠাৎ আজ মনে হলো,অদ্ভুত এক টেলিপ্যাথি!
আমি যখন কুর্মিটোলায় আর্মি জিম্মায় বসে
তামাকের স্বল্পতায় পাইপ ছাড়তে হবে বলে ভাবছি…
তুমি কিভাবে বুঝলে বলো তো!

আর্মির সেই অফিসারের কাছে পাঠিয়েছিলে তামাকের কৌটো।
এমন করে কে কবে কার খেয়াল রেখেছে ভবে!
এভাবে জগত ছাড়তে হবে ভাবি নি হয়তো।
তার উপর আমায় নিয়ে গেল টুঙ্গিপাড়া;
তুমি রয়ে গেলে ঢাকায়।
জেলের গরাদের বাইরেও মৃত্যু এসে আরেকবার
আমাদের আলাদা করার ধৃষ্টতা দেখালো।
সত্যি বলতে কি, ওরা কতটা বোকা দেখো!
শরীর যখন দেশের মাটিতে আলাদা মাটি পেল,
মৃত্যুর এপারে তখন এক হয়ে গেছে আমাদের অন্তরাত্মা।
জেলখানায় আমার দেখা সেই দুটো হলুদ পাখির মতো।
আজও কেউ জানে না আমাদের বিবাহের দিন।
অথচ, তুমি-আমি এপারে এক হয়েছি আজকের দিনে।
এই ১৫ আগস্টে।
জেলখানায় ফলি মাছ রাঁধতে গিয়ে বুঝেছি,
ও আমার কম্ম নয়।
আজ একটু ফলি মাছ রাঁধবে রেনু?
তোমার রান্নাঘরের সবকিছু আছে আগের মতোই।
টেবিলে এখনও সাজানো রয়ে গেছে প্লেট।
নেই শুধু তুমি-আমি।
আমরা হলদে রঙ্গের রোদ মেখে দুটো পাখি হয়ে গেছি…
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট।
– ইতি, মুজিব।

Advertisement


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত