বুধবার, ১২ মে ২০২১

ইসলামে অন্যের সমালোচনা করার পরিণতি

মুফতি আতিকুল্লাহ বিন আসাদ

আমাদের সমাজে কিছু লোক আছে, যারা সব সময় অন্যদের অনুপস্থিতে তাদের দোষ-ত্রুটি নিয়ে আলোচনা করে। এরা নিজেদের নির্ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে সর্বদা অন্যদের নিন্দা করে বেড়ায়। অথচ তারা কখনো বুঝতেই পারে না যে, তারাই আসলে নিকৃষ্ট। ইসলামে এই কাজকে বলে গিবত। গিবত শব্দের অর্থ পরনিন্দা, পরচর্চা বা পেছনে সমালোচনা করা। কোনো মানুষের অনুপস্থিতিতে তার সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা শুনলে সে মনে কষ্ট পায় তাকে গিবত বলে। ইসলামের দৃষ্টিতে এই কাজ হারাম ও কবিরা গোনাহ।

গিবতের ফলে সমাজে দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পায় এবং ভারসাম্যতা নষ্ট হয়। গিবত করতে আল্লাহ তায়ালা কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। পবিত্র কোরআনুল কারিমে কারও অগোচরে তার সমালোচনা করাকে মৃত ব্যক্তির গোশত খাওয়ার সঙ্গে সাদৃশ্য দেওয়া হয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা পরনিন্দা করো না। তোমাদের কেউ কি আপন মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া পছন্দ করে? বস্তুত তোমরা তো একে ঘৃণাই কর।’ (সুরা হুজরাত : ১২)।

যারা অন্যের দোষ বলে বেড়ায় তাদের জন্য ইসলামে ধ্বংসের দুঃসংবাদ রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘ধ্বংস তাদের জন্য, যারা অগ্র-পশ্চাতে অন্যদের দোষ বলে বেড়ায়।’ (সুরা হুমাজাহ : ১)।

গিবতের পরিচয় প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের লক্ষ্য করে বলেছেন, ‘তোমরা কি জান গিবত কী?’ তারা বললেন, ‘আল্লাহ ও তার রাসুলই অধিক জ্ঞাত।’ তিনি বললেন, ‘তোমার ভাই যে কথা অপছন্দ করে তার সম্পর্কে সে কথা বলার নাম গিবত।’ জিজ্ঞেস করা হলো, ‘আমি যা বলছি তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে?’ রাসুলুল্লাহ্ (সা.) বললেন, ‘তুমি যা বলছ তা যদি তার মধ্যে বিদ্যমান থাকে তবে তুমি তার গিবত করলে। আর যদি না থাকে তাহলে তুমি তাকে অপবাদ দিলে।’ (মুসলিম : ৬৭৫৮)। মোটকথা, মানুষের মধ্যে যে দোষ আছে এবং যার চর্চা সে অপছন্দ করে তা আলোচনা করাই গিবত।

গিবতের গোনাহ যেমনি বড়, তেমনি এর পরিণতিও খুবই ভয়াবহ। গিবতকারীদের শাস্তি সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘মিরাজের রাতে আমি এমন এক কওমের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলাম, যাদের নখগুলো তামার তৈরি এবং তা দিয়ে তারা অনবরত তাদের মুখম-লে ও বুকে আঁচড় মারছে। আমি বললাম, হে জিবরাইল! এরা কারা? তিনি বললেন, এরা সেসব লোক যারা মানুষের গোশত খেত। অর্থাৎ মানুষের গিবত করত।’ (আবু দাউদ : ৪৮৭৮)।

অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, ‘তোমরা পরনিন্দা করা থেকে বেঁচে থাকবে। কারণ তাতে তিনটি ক্ষতি রয়েছে। প্রথমত, গিবতকারীর দোয়া কবুল হয় না। দ্বিতীয়ত, গিবতকারীর কোনো নেক আমল কবুল হয় না এবং তৃতীয়ত, আমলনামায় তার পাপ বৃদ্ধি হয়ে থাকে।’ (বোখারি : ২৮৩৭)।

গিবত যে রকম পাপ, শ্রবণ করাও তেমনি পাপ। গিবত থেকে বেঁচে থাকা অত্যন্ত জরুরি। এ থেকে বাঁচার কয়েকটি উপায় আছে। প্রথম উপায় হচ্ছে অপরের কল্যাণ কামনা করা। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘দ্বীন হচ্ছে নিছক কল্যাণ কামনা করা।’ (বোখারি : ৫৭)। গিবত থেকে বেঁচে থাকার আরেকটি অন্যতম উপায় হলো গিবতের ভয়াবহ শাস্তির কথা স্মরণ করা এবং নিজের জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘সে যে কথাই উচ্চারণ করে, তা গ্রহণ করার জন্য তার কাছে সদা প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে।’ (সুরা কাফ : ১৮)।

গিবত সামাজিক বন্ধন ছিন্নভিন্ন করে দেয়। মানুষের মাঝ থেকে ভালোবাসা, বন্ধুত্ব ও সুসম্পর্ক নষ্ট হয়। শুরু হয় মানুষে মানুষে অবিশ্বাস, আস্থাহীনতা এবং সব ক্ষেত্রে চরম বিশৃঙ্খলা। এটি একটি সামাজিক ক্যান্সারের মতো। সমাজদেহে কোনো এক স্থানে এর সূচনা হলে আস্তে আস্তে তা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে আমাদের সমাজে এমন বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরজমান হওয়ার জন্য এই অপরাধটি অন্যতম কারণ। তাই গিবতের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা জরুরি।

অতএব, আমাদের উচিত অন্যের দোষ-ত্রুটি অপরের কাছে আলোচনা না করে নিজের দোষ-ত্রুটি খুঁজে বের করে তা সংশোধন করতে সচেষ্ট থাকা। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে গিবত থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : খতিব, রোশাদিয়া শাহি জামে মসজিদ, উত্তরা, ঢাকা


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত