বুধবার, ২৫ নভেম্বর ২০২০

ইসলামে সাহিত্যচর্চা

কবিতা সম্বন্ধে রাসূল (সা.) তার স্পষ্ট মন্তব্য ও মতামত ব্যক্ত করেছেন। শুধু মতামতই ব্যক্ত করেননি; তার সাহাবিদের মাধ্যমে কবিতার মডেলও উপস্থাপন করেছেন মহানবী (সা.)। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যে কবিতা সত্যনিষ্ঠ, সে কবিতা সুন্দর; আর যে কবিতায় সত্যের অপলাপ হয়েছে সে কবিতায় কোনো মঙ্গল নেই।’ (ইবনে রাশিক, আল কায়রাওয়ানি, কিতাবুল উমাদা)

অর্থাৎ কবিতা যদি সত্যাশ্রয়ী হয় এবং তা যদি দেশ ও জাতির মঙ্গলের জন্য লিখিত হয়, তাহলে তাতে কোনো দোষ তো নেই-ই, বরং তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কোনো কোনো কবিতা হয় আল্লাহ ও রাসূল (সা.) বিরোধী, আবার কোনো কোনো কবিতা হয় অশ্লীল। ফলে সমাজে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। মানুষের নৈতিক স্খলন দেখা দেয়। সে কারণেই রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কারও পেটে কবিতা থাকার চেয়ে সে পেটে পুঁজ জমে তা পচে যাওয়া অনেক উত্তম।’ (বুখারি, মুসলিম ও আবু দাউদ শরীফ)।

হাদিসটি শুনে হজরত আয়েশা বলেছিলেন, রাসূল (সা.) কবিতা দ্বারা ওইসব কবিতা বুঝিয়েছেন, যাতে তার কুৎসা বর্ণিত হয়েছে। (জাবি যাদাহ, আলি ফাহমি, হুনুস-সাহাবা)।
কবি সাহাবি হজরত কাব বিন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) আমাদের নির্দেশ দিলেন- যাও, তোমরা মুশরিকদের প্রতিপক্ষে কবিতার লড়াইয়ে লেগে যাও। কারণ মুমিন জিহাদ করে জান ও মাল দিয়ে। মুহাম্মদের আত্মা যার হাতের মুঠোয় তার শপথ! তোমাদের কবিতা তীরের ফলা হয়ে তাদের কলজে ঝাঁঝরা করে দেবে।
পাপকে ঘৃণা করতে হবে; পাপীকে নয়। পাপীকে বুঝিয়ে সৎ পথে আনাই একজন মুমিনের দায়িত্ব। শুধু মন্দকেই তিরস্কার করতে হবে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে। যখন কুরায়শরা রাসূলের (সাঃ) কুৎসা রটাতে লাগল তখন কবি হাস্সান বিন সাবিতকে রাসূল (সা.) নির্দেশ দিলেন- ‘তুমি আবু বকরের কাছে যাও, তিনি তোমাকে কুরায়শদের দোষ-ত্রুটি জানিয়ে দেবেন।’ (তিরমীযী)। আর তুমি তাদেরকে কটাক্ষ করে কবিতা রচনা করবে। আবার তিনি হাসান বিন সাবিতকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি তো কুরায়শ। তুমি কীভাবে কুরায়শদের নিন্দা করবে?’ উত্তরে তিনি বললেন- ‘মথিত আটা থেকে চুল যেভাবে বের করা হয়, আমি তো সেভাবে আপনাকে বের করে আনব।’ (ড. শওকি দায়ক; তারিখুল আদাবিল আরবি)
পবিত্র কোরআন শরিফে ‘কবিগণ’ (আশশুয়ারা) নামে একটি সূরাই নাজিল করেছেন মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। এই সূরাটির ২২৪ থেকে ২২৭নং আয়াতে মহান আল্লাহ পাক কবিদের বৈশিষ্ট্য ও দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। সেই সঙ্গে নির্যাতন ও জুলুমের বিপরীতে সর্বাত্মক আন্দোলনের অংশ যে কবিতাও হতে পারে- সে কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, ‘(২২৪) এবং কবিদের অনুসরণ করে তারা, যারা বিভ্রান্ত। (২২৫) (হে রাসূল) আপনি কি দেখেন না, ওরা উদ্বাস্তু হয়ে উপত্যকায় উপত্যকায় ঘুরে বেড়ায়? (২২৬) এবং তারা যা করে না, তা বলে। (২২৭) কিন্তু তারা ছাড়া, যারা ইমান এনেছে, সৎকর্ম করে এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করে। আর তারা অত্যাচারিত হওয়ার পরে প্রতিশোধ গ্রহণ করে। অত্যাচারীরা শিগগিরই জানতে পারবে, তাদের গন্তব্যস্থল কী রূপ?’ (সূরা আশশুয়ারা, আয়াত ২২৪-২৭)।
এক শ্রেণির অল্পশিক্ষিত আলেম ও জনসাধারণ আয়াতের প্রথম অংশ পড়ে এতটাই বিহ্বল হয়ে পড়েন যে, তারা আয়াতের শেষ পর্যন্ত পড়ার ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন। তারা বলে ওঠেন, দেখলে, আল্লাহ কবিদের কেমন অপছন্দ করেন? তিনি তাদেরকে বিভ্রান্ত উপত্যকার অধিবাসী বলে তিরস্কার করেছেন এবং তাদের অনুসরণ করতে নিষেধ করেছেন। এসব ব্যক্তি যদি আরও একটু ধৈর্য ধরে আয়াতের শেষ পর্যন্ত পড়তেন তবে তারা দেখতে পেতেন, ‘তবে তারা ছাড়া’ বলে আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ আরেক দল কবির উল্লেখ করেছেন, যারা আল্লাহর অপছন্দনীয় তো নয়ই, বরং আল্লাহর বিশেষ কৃপাধন্য।
‘রাসূলের কবি’ নামে খ্যাত কবি হাস্সান বিন সাবিতের জন্য তিনি মসজিদের মিম্বরে কবিতা চর্চার ব্যবস্থা করেছেন। সেই সঙ্গে তার জন্য দোয়াও করেছেন- তার মুখ যেন বিনষ্ট না হয় এবং সত্যি-সত্যি ১৩০ বছর বয়সে তার মৃত্যু পর্যন্ত তার মুখের সম্মুখভাগের দাঁত অক্ষত ছিল। এর চেয়েও বড় কথা, মহানবী (সা.) কবি হাস্সান বিন সাবিতকে জিবরাইল ফেরেস্তা দিয়ে সাহায্য করার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন- ‘আল্লাহুম্মা আইদিহি বিরুহিল কুদুস।’ ইহকাল ও পরকালের সবচেয়ে বড় পুরস্কার ‘জান্নাত’-এর সুসংবাদও তিনি কবি হাস্সান বিন সাবিতকে দিয়েছিলেন- ‘হে হাসান, তোমার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কার হলো জান্নাত- জাযাউকা ইন্দাল্লাহিল জান্নাতা, ইয়া হাস্সান।’
সার্থক-সুন্দর কবিতা কোনো পাপ নয় বা ইসলাম পরিপন্থী হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। আমাদের কবি কাজী নজরুল ইসলামের ইসলামিক গান আর কবিতা পড়লে মন নড়ে ওঠে। আসলে মিথ্যার বিপরীতে সত্যের জয়গানই হবে কবিতার মূল লক্ষ্য। কবিতার ভাব, ভাষা ও ছন্দের যে নান্দনিকতা, তা হবে কেবলই সত্য, সুন্দর ও সভ্য জগৎ বিনির্মাণে। আগামীর পৃথিবী হোক স্বপ্নের, সুন্দরের আর কবিতার।


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত