শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২

একজন কেয়ারটেকার : নাদিয়া তাসনিম

এক

কী করেছি আমি? কিচ্ছু তো করি নাই!
কিচ্ছু করোস না কেন?
কী কিচ্ছু করি না?
কিছুই তো করোস না!
প্রচণ্ড রেগে আছেন বাড়ির কেয়ারটেকারের ওপর রকিব সাহেব। নেশাজাতীয় দ্রব্যটা আজ একটু বেশিই পান করেছেন।
আগেই ভেবে রেখেছিলেন, “বাড়ি গিয়ে সবার আগে ঐ কেয়ারটেকার বেটারে সাইজ করবো”।
ব্যাস! পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক সদর দরজায় দাঁড়িয়ে খুব চিৎকার, চেঁচামেচি আর যত অকথ্য গালিগালাজ তার জানা আছে, শরীরের সব শক্তি কণ্ঠনালীতে সঞ্চয় করে সেগুলোই সব দিয়ে যাচ্ছিলেন কেয়ারটেকারের নাম ধরে।
আমাদের বাড়ির এই কেয়ারটেকারের নাম মোখলেস। আমি তাকে মোখলেস ভাই বলে সম্মোধন করতাম। সবসময় সন্মান দিয়েই কথা বলতাম। বয়সে বড়, খুব সভ্য-শান্ত, পোশাক-আশাকে বেশ পরিপাটি। কথার অবাধ্য হতে বা কোন বেয়াদবিও করতে দেখিনি কখনও কারো সাথে। তাই আমাদের বাড়ির পনেরোটি পরিবারের সবার কাছেই তিনি ছিলেন খুব পছন্দের এবং খুব বিশ্বাসী একজন মানুষ ।
একই দালানে ভিন্ন পেশার আর বিভিন্ন মানসিকতার পরিবারগুলোর সদস্য আমরা একে অপরের সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করেই পরস্পরের সাথে মিলেমিশে সুন্দর ভাবে জীবনের পথে হেঁটে যাচ্ছিলাম। সময় তার নিজ গতিতে চলে যাচ্ছিল। সারাজীবনের স্বপ্ন ছিল, যদি কোনদিন নিজের একটা বাড়ি হয়, একটা বাড়ি কিনতে পারি, তবে সবার আগে দক্ষিণের জানালা আছে কি-না, তা দেখে নেবো। যখন এই বাড়িটি কেনার উদ্দেশ্যে দেখতে আসলাম, আমি যে কী খুশি হলাম সেদিন! ফ্ল্যাটটি আমার খুব পছন্দ হলো।
শুধু কি দক্ষিনের জানালা? ছোট্ট একটা ঝুল বারান্দাও আছে দক্ষিণমুখো। বারান্দায় দাঁড়ালে, অনেকটা দূর সবুজ গাছ আর খোলা মাঠ দেখা যায়। সামনেই একটা বড়সড় জাম গাছ, একদম বারান্দার গা- ঘেঁষা একটা সুপাড়ি গাছ। মন ভালো করা, একদম মনের মতোই শান্ত একটা পরিবেশ। আমার চারপাশটায় যেন শুধু প্রশান্তি আর আনন্দের ছুটোছুটি দেখতে পাচ্ছিলাম।
হঠাৎ করেই কোত্থেকে হুর হুর করে বেশ মিষ্টি একটা বাতাস আমার সমস্ত শরীর, মন স্পর্শ করে গেলো। ঠিক কতক্ষণ চোখ বন্ধ করেছিলাম, জানি না। আমার বর নিঃশ্বব্দে আমার খুব কাছে এসে আস্তে করে তার এক হাত আমার মাথায় বুলিয়ে দিতে দিতে বলে উঠলো, “বুঝেছি ম্যাডাম,বাড়ি আপনার খুব পছন্দ হয়েছে। তো চলেন, কেনার বন্দবস্ত করি আর যত দ্রুত সম্ভব চলে আসি, দক্ষিণের বারান্দায় বসে বসে দুজন মিষ্টি বাতাস দিয়ে সকাল, বিকাল চা খাবো।” বলেই সে হোহো হাহা করে খুব হাসলো। আমিও আনন্দে একটু শব্দ করেই হাসলাম।
অবশেষে পাঁচতলা বাড়ির দ্বিতীয় তলার এই ফ্ল্যাটটা আমরা কিনলাম।
নতুন বাড়িতে আসার ছয় মাস পর আমি আমার মাঝে আরো একজনের উপস্থিতি অনুভব করতে লাগলাম। বারান্দাটা বেশ সুন্দর করে গুছিয়ে নিয়েছি নিজের মতো করে।
চা, কফি প্রেমি আর বইপড়ুয়া এই আমি বারান্দার এক পাশে চেয়ার টেবিল রেখেছি। যখনই ইচ্ছে হয় পছন্দের বই আর চা/কফি হাতে নিয়ে বারান্দায় বসে যাই।
পছন্দের কিছু ফুল, পাতাবাহার গাছও লাগিয়েছি সমস্ত বারান্দাজুড়ে। সেগুলোর যত্ন নিজ হাতে করাটা আমার সবচাইতে পছন্দের কাজের একটি। শরীর খারাপ থাকলেও এই যে পৃথিবীর সবচাইতে প্রিয় একটা জায়গা বানিয়ে রেখেছি আমি আমার বারান্দাটাকে, এখানে এলেই আমি আমার আসল আমিকে খুঁজে পাই।
আমার প্রথম সন্তান হলো ছেলে। এর দুবছর পর আবার ছেলে। যাক, আর সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর দিকে গেলাম না। দুই ছেলেকে মানুষ করতে যত রকম শ্রম দেয়া দরকার মনে করলাম, তার সবটুকু দিতে গিয়ে ভীষণ রকমের ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।
সকাল থেকে রাত- ওদের স্কুলে নিয়ে দিয়ে আসা, স্কুল ছুটি হলে, বাসায় নিয়ে আসা, কোচিং-এ নিয়ে যাওয়া- সবই করতে হয় আমাকে।
বাচ্চাদের স্কুল ছুটি হয় সারে চারটায়।সপ্তাহের অন্য পাঁচদিন স্কুল ছুটির পর সরাসরি বাসায় আসলেও শুধু রবিবার আর বুধবার আমি স্কুল থেকে সরাসরি ওদের কোচিং সেন্টারে নিয়ে যাই। বাসায় ফিরতে কখনো নয়টা কিংবা দশটা; আবার জ্যামে পরলে আরো সময় লাগে।
এমন এক রবিবারের ঘটনা, কোচিং শেষে বাড়ি ফিরলাম। রাত তখন সারে নয়টা। পুরো বাসা অন্ধকার হয়ে আছে। কেমন ঘা ছমছম করা ভৌতিক পরিবেশ। লোডশেডিং চলছে । মোবাইলের টর্চটা জালালাম। লিফট ব্যবহার করা গেলো না। মোবাইলের টর্চের আলোতেই সিঁড়ি বেয়ে উপরে আমার ফ্ল্যাটের দরজায় এসে থামলাম।
আমার মোবাইলটা ছোট ছেলের হাতে দিয়ে, আমি ঘরের চাবিটা ব্যাগ থেকে বের করে ঘরের দরজার তালায় চাবি ঘুরাতেই অদ্ভুত এক ব্যাপার লক্ষ করলাম, আমার চাবিটা ঘুরছে না।
বারবার একই চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে বাড়ির কেয়ারটেকার আর দারোয়ানকে ডাকলাম। সাথে সাথে তারা চলে এলেন। মোখলেস ভাই আমার হাত থেকে চাবি নিয়ে কিছুক্ষন তালা-চাবি নাড়াচাড়া করে বললে, ম্যাডাম তালায় সমস্যা।
কিন্তু ঘর থেকে বের হবার সময় তো তালা লাগিয়েই বের হয়েছিলাম। তখনতো এমন মনে হয় নি?
তাড়াহুড়ো করে বের হয়ে গেছেন, অত কি আর খেয়াল করেছেন তখন!
তালাটা বদলে ফেলতে হবে। আমি আসছি আমার সব যন্ত্রপাতি নিয়ে।
এখানে একটা বিষয় জানাচ্ছি, আমাদের এই মোখলেস কেয়ারটেকার কিন্তু সব বিষয়ে দারুণ দক্ষ। কারো ঘরের এসি নষ্ট হলে, চুলায় সমস্যা হলে, টিভি, ফ্রিজ থেকে শুরু করে যেকোন সমস্যা সমাধানের একমাত্র ব্যক্তি তিনি। আমরা সব কাজে তাকে ডাকি।

খুব বেশি সময় নিলেন না। আমি ছেলেদের নিয়ে দূরে দাড়িয়ে ছিলাম। দাড়োয়ান টর্চ ধরলো আর কেয়ারটেকার আগের তালাটা খুলে, নতুন একটা তালা লাগালো। সবই হলো অন্ধকারে। দরজা খুলে গেল। বললেন,
এই তো খুলে গেছে। ম্যাডাম, নেন চাবি।
নতুন একটা চাবি দিলেন আমার হাতে। আগের চাবিটা তিনি নিয়ে গেলেন। ঘরে ঢুকলাম।
আইপিএসের ব্যাকআপ ছিল কিন্তু তাতে সব রুমের লাইট, ফ্যান, জ্বালানো যায় না। আমার বেডরুমের আর ছেলেদের বেডরুমের লাইট অন করলাম। বাকি সব কাজ টর্চ জ্বেলে চালানো যাবে।একটু যেন কেমন লাগছিলো তাই পুরো বাসাটা একবার দেখে নিলাম। সব তো ঠিকমতই আছে।
হাতের ব্যাগটা ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখলাম। সকালে সবাই গোসল করে বের হয়েছিলাম। এখন, নিজের কাপড় বদলে নেবো আর হাতে মুখে পানি দিয়ে ভালোভাবে পরিস্কার হতে বাথরুমে চলে গেলাম। ছেলেদেরকেও তাই বললাম। ওরা যে যার মত পরিস্কার করে নিলো নিজেদের। রাতের খাবার রান্না করা ছিলো, গরম করে টেবিলে দেবো।ওদের বাবার আবার আসার সময় হয়ে গেলো। রাস্তার যে অবস্থা! জ্যামের কারনে ওর অফিস শেষে বাড়ি ফিরতে কখনো নয়টা, দশটা আবার এগারোটাও বেজে যায়।
হাত-মুখ মুছে,আমার প্রিয় বারান্দার দরজাটা খুললাম একটু বাতাস গায়ে লাগাবো বলে।
চাঁদের আলোয় বারান্দা চকচক করছে।হঠাৎ নজরে পরলো,পায়ের ছাপ। কেউ যেন বারান্দা দিয়ে এসে আবার বের হয়ে গেছে। মাটি মাখানো পায়ের ছাপ। আরো ভালো করে দেখার জন্য ছেলেদের উদ্দেশ্যে বললাম, বাবারা, কেউ একজন একটা টর্চ আনো তো।বড়জন এলো হাতে একটা টর্চ জালিয়ে। ওরাও আমার সাথে পায়ের ছাপগুলো দেখছিলো।ভয়, অবাক, সন্দেহ, দুশ্চিন্তা সব এক হলো। কিন্তু ঘরে তো কারো পায়ের ছাপ নেই। অবাক হলাম।

দুই।

কিছুক্ষণ পর বিদ্যুৎ চলে এলো। আমি আরো একবার ঘরের সবকিছু খুব ভালোভাবে দেখলাম। বাড়িঘর যেমন রেখে গিয়েছিলাম, তেমনি তো আছে! কলিং বেলের শব্দে চমকে উঠলাম।
কে? কে?
আমি।
আমি কে?
আরে আমি কে মানে কি? আমি মিজান, তোমার ছেলেদের বাবা। তাড়াতাড়ি দরজা খোল।
দরজার পীপ হুইল/ফোটা দিয়ে বাইরে দেখলাম ভালোভাবে, তারপর দরজা খুললাম।
সারাদিন অফিস শেষে জ্যামে বসে থেকে,কতটা কষ্ট করে আজ বাড়ি ফিরতে পেরেছি তার ওপর তুমি জেরা শুরু করলা।
জেরা না।আসো বারান্দায় আসো।
ওকে দেখালাম।
ঘর চেক করেছো?
হুম।
সব ঠিক আছে?
আছে।
আলমারি?
আমি চমকে উঠলাম। বুকের ভেতরটায় চিনচিনে ব্যাথা শুরু হলো। সাহস পাচ্ছি না, আলমারি খোলার।
দাও, চাবি দাও বলে মিজান আমার দিকে হাত বাড়িয়ে চাবি চাইল।
আমার হাতের ব্যাগেই থাকে আলমারির চাবি। ওর হাতে দিলাম।
আলমারি খোলার সাথে সাথে কাপড়চোপড়, ব্যাগ, বিভিন্ন আকৃতির গয়নার বাক্স সব হুড়মুড়িয়ে একসাথে নিচে পড়ে গেলো। ভাজ খোলা উলোট পালোট করা জামা-কাপড়, শাড়ি।
এই আলমারিটাতে শুধু আমার কাপড়চোপড় ব্যাগ, গয়নাগাটি, টাকা-পয়সা থাকে।
গয়নার বাক্স সব খালি, টাকা যা ছিল কিচ্ছু নেই। আমার বিয়ের, বউভাতের শাড়িসহ অন্য দামী শাড়ি যা ছিল কিচ্ছু নেই। কিছু সালোয়ার কামিজ আর সস্তা পুরোনো কিছু কাপড় আছে। ব্যাগগুলো আছে আর আছে গয়নার খালি বাক্স গুলো।
মূহুর্তের মধ্যে মনে হচ্ছিল, আমি বুঝি জ্ঞান হারাবো। কতটা সময় আমি এমন স্তব্ধ হয়ে ছিলাম জানি না। আমার বর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই ঝরঝর করে চোখ দিয়ে পানি ঝরে পড়লো।
বিয়ের গয়নাগুলো সম্ভবত তোমার মা’র বাসায়, তাই না?
হুম।
আমার কষ্টটা হালকা করার উদ্দেশ্যে কথাটা বলে চোখের পানি মুছে দিতে দিতে বলতে লাগলো, এ কাজ বাইরের কেউ করেনি। কাজের লোক, দারোয়ান, কেয়ারটেকার -এদের কাজ।
কিন্তু বারান্দায় গ্রিল আছে। ওরা কিভাবে আসলো আর বেরই বা হলো কিভাবে? কথাগুলো বলতে বলতে আমরা বারান্দায় গেলাম। গ্রিলের একপাশে লক্ষ করলাম, বেশ অনেকগুলো গ্রিল কাটা।
গ্রিল কেটে যে বা যারা ঘরে ঢুকেছে তারা আবার এই পথ দিয়েই বের হয়ে গেছে। পায়ের ছাপগুলোতো সে কথাই বলছে।
পুলিশকে ফোন করলাম না। আমাদের এই বিল্ডিংয়ের সবাই মিলে একটা সোসাইটি গঠন করেছিলাম, সে সোসাইটির সেক্রেটারি জামাল সাহেব থাকেন, তিনতলায়। উনাকে ইন্টারকমে ডাকলাম।
তিনি সব শুনে দারোয়ান আর কেয়াটেকারকে ডাকলেন।
কাজের লোকের ব্যাপারে জানতে চাইলে বললাম, ও তো ওর গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে।
কবে গেছে জানতে চাইলেন; আমি বললাম, শুক্রবার।
হঠাৎ কেন গেলো?
বলছিলো, ঝড়ে ওর ঘরের চাল উড়ে চলে গেছে অন্য কোথাও, দেয়ালগুলোও ভেঙে পড়ে গেছে। আরো সব আসবাবপত্র বাতাসে কোথায় কোথায় চলে গেছে,তার কোন খোঁজ নাকি কেউ পাচ্ছে না।
আবার আসবে এমন কিছু বলেছে?
না। শুধু বলছিলো, আম্মাগো আমি একটা অন্যায় করেছি, খুব বড় পাপ, তার শাস্তি আল্লাহ আমাকে দিসেন গো আম্মা। খুব কাঁদছিল। আসবে কি না আসবে ঐ ব্যাপারে কিছু জানতে চাইনি। বেতনের সব টাকাসহ আরও বেশি টাকা হাতে দিয়েছিলাম।
জামাল সাহেব ঘুরে ঘুরে সব আলামত দেখলেেন, আলমারি, বারান্দা সব দেখার পর সন্দেহ পুরোটা কাজের লোকের ওপর পড়লো।
তাকে দিয়েছিল আমাদের দারোয়ান। সেও ধরা খেলো। যা হবার তাই হলো, দারোয়ানের চাকরি গেলো। কেয়ারটেকার বললো, ম্যাডাম, অনেকবার আপনাকে বলেছিলাম, বারান্দা এত খোলা রাইখেন না।
আসলেই আমাদের এই মোখলেস ভাই, আমাকে বেশ কয়েকবার সাবধান করেছিলেন।আমি গুরুত্ব দেইনি।
এই ঘটনার পর থেকে আমার সেই এত পছন্দের দক্ষিণের বারান্দা বেশিরভাগ সময় বন্ধ রাখতাম।
ঘটনার একমাসপর, রকিব সাহেব নামের এক ব্যবসায়ী ভদ্রলোক আমার ঠিক মুখোমুখি ফ্লাটটি কিনে নিলেন। উনি আসার আগে এক ভাড়াটিয়া ছিলেন। তারা চলে যাবার পর, রকিব সাহেব ফ্লাটটি কিনে নেন। ছোট ছিমছাম পরিবার- স্বামী, স্ত্রী আর তাদের একমাত্র সন্তান মেয়ে, অধরা।

প্রথম দিনেই তাদের মিষ্টি মুখ করানোর আয়োজন দেখে আমাদের চোখ কপালে উঠেছিল, প্রচুর ধনী লোক। কিসের ব্যবসা তা তো জানি না।
প্রায়ই ফ্ল্যাটের ভিতর থেকে চিৎকার, কান্না, হইচই, মারামারির শব্দ আসতো। ভদ্রলোকের কন্ঠই খুব বেশি জোরে শুনতে পেতাম। মেয়ে কন্ঠে কে যেন কাঁদে। গভীর রাতে, সন্ধ্যায়, সকালে বিভিন্ন সময় সেই একই রকম মারামারি আর কান্নার শব্দ পেতাম।
কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করিনি কখনো।
হঠাৎ এক গভীর রাতে, বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো।
হঠাৎ এক গভীর রাতে, বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো। সজোরে, কারো দরজায় আঘাতের শব্দ। ঘড়ি দেখলাম, রাত তিনটা দশ।
বিছানা ছেড়ে উঠে আসতেই শব্দটা আরো নিকটবর্তী হতে থাকলো, সাথে খুব অকথ্য ভাষায় গালাগালি।
ব্যাপারটা কি জানার জন্য আমরা দু’জন দরজার কাছে যেতেই দেখলাম, রকিব ভদ্রলোক আমাদের সবার প্রিয় কেয়ারটেকারকে খুব বকছেন। মারতে যাচ্ছেন বারবার আর উনার স্ত্রী ও কন্যা তাকে টেনে সরিয়ে নিচ্ছেন।
কী করেছি আমি? আমি তো কিচ্ছু করি নাই!

তিন।

পরিস্থিতি যা তাতে এটাই স্পষ্ট যে, বাড়ির দড়োয়ানের ওপর রকিব সাহেব প্রচন্ড রেগে আছেন এখন। একপর্যায়ে প্রচন্ড খেপে তাকে ধরে টানতে টানতে নিচে নিয়ে গেলেন। এরই মধ্যে অন্যান্য ফ্লাটের প্রায় সবাই নিচে চলে এসেছেন। আমরাও গেলাম।
সবাই রকিব সাহেবকে গালমন্দ করতে শুরু করলেন।তার হাত থেকে আমাদের নির্দোষ, ভালেমানুষ কেয়ারটেকারকে বাঁচানোর চেষ্টা সবার।
কিন্তু কে শোনে কার কথা!
আপনারা সবাই একটু সরে যান দয়াকরে বলে রাকিব সাহেব দু’হাত জড়ো করে মাটিতে মাথা ঠুকলেন। মাতাল মানুষ কি করে আর না করে, কেউ গুরুত্ব দিলেন না।
তখন তিনি আমাদের সবার মাঝের মুরুব্বিশ্রেনীর চারতলার এক ফ্ল্যাট-এর বাসিন্দা আজমল আঙ্কেলের কাছে গেলেন।
আমাকে একটু সুযোগ দেন দয়াকরে। আমি ওর মুখোশ খুলে দিবো।
আজমল আঙ্কেল আমাদের সবার উদ্দেশ্যে বললেন, ঠিক আছে সবাই যে যার জায়গায় চুপ করে দাঁড়ান। আপনি বলেন, কী ব্যাপার? কী করেছেন আমাদের কেয়ারটেকার মোখলেস?
নিচতালায় বিদ্যুতের মিটারের কাছে গিয়ে রকিব সাহেব বললেন, দেখেন এখানে দুটো লাইন। একটা আসল আরেকটা দুই নম্বর। আমার কারেন্টের বিল আসে ভৌতিক রকমের।প্রথমেই আমার সন্দেহ হয়েছিল। এমন বিল আপনাদের সবারই আসে।আপনারা কখনো আমার মত করে ভাবেন নি।বিদ্যুৎ অফিসের লোক এনে আমি বিষয়টা পরিস্কার করে বুঝতে চেয়েছিলাম। ব্যাস তাতেই কেচোঁ খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে এলো।
এই বাসায় বিদ্যুৎ এর লাইন দুইটা। একটা বৈধ আর আরেকটা অবৈধ। এই বেটা কেয়ারটেকার দুইনম্বরি লাইনে আমাদের সবার কাছ থেকে প্রচুর টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
এবার তিনি একটু থামলেন। একটা মোটা দড়ি আনলেন। মোখলেস ভাইয়ের দু’হাত পিছনে নিয়ে বাঁধলেন। টানতে টানতে এক পিলারের কাছে নিয়ে সেই পিলারের সাথে তাকে বাঁধলেন। মোটা এক লাঠি দিয়ে জোরে জোরে মারতে শুরু করলেন। বল এবার সব বল, এ পর্যন্ত যতগুলো জঘন্য অন্যায় করেছিস সব বল।
আমরা কেউ সেই অতি ভদ্রলোক, বিশ্বাসী, দীর্ঘদিনের চেনা মোখলেস ভাইর দিকে তাকাতে পারছিলাম না। উনি কাঁদছেন। মাফ করে দেন স্যার। এবারের মত মাফ করেন, পায়ে পরি স্যার। এইকথাগুলো বলে কাঁদছিলেন খুব।
আমার খুব মায়া হলো। বললাম, থাক না রকিব ভাই, বয়স্ক লোক, আমি দীর্ঘ বারো বছর যাবৎ উনাকে দেখছি। কখনো কোন অন্যায় করতে দেখিনি। উনি তো আর ফেরেশতা না যে কোন ভুল করবে না। মানুষ তো ভুল করবেই। মাফ করে দেন।
বলার সাথে সাথে রকিব সাহেব চিৎকার দিয়ে বলে উঠলেন, মাফ? মাআআআফ? বলেন কি ভাবি? বলছি, সে আপনার সাথে কি করেছে, দেখেন তো শোনার পর, আপনি তাকে মাফ করতে পারেন কি না?
কী করেছে?
আমি তো এই বাড়িতে এসেছি আজ দু’মাস হলো। আমি আসার ঠিক একমাস আগে, আপনার বাসায় চুরি হলো, অনেক গয়না, শাড়ি, টাকা নিয়ে চোর বারান্দার গ্রিল কেটে এসে আবার সেই পথ দিয়েই বের হয়ে গেছে। তাই না?
হ্যা, ঠিক তাই।
না, ঠিক তাই না। আপনি আপনারা সব ভুল জানেন। বারান্দার এতটুকু জায়গা দিয়ে কারো ঢোকা এবং বের হওয়া সম্ভব না। আর অন্য ঘরের সব ঠিকঠাক আছে, কোন ঘরে না গিয়ে শুধু আপনার ঘরে আপনার আলমারি খুললো! বাইরের চোরের পক্ষে তো জানা সম্ভব না যে ঠিক এই ঘরে এই আলমারিতে সব আছে, তাই না? চাবিটাই বা পেলো কোথায়?
আপনি এতকিছু জানেন কিভাবে?
সবকিছু জানি। আপনাদের সবার চাইতে অনেক বেশি বেশিই জানি।
কথাটা বলে, তিনি আবার মোখলেস ভাই এর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার চিবুকে সজোরে চাপ দিয়ে ধরে বললেন, সব এই ইবলিশের কাজ।
আপনার ঘরের তালা নিখুঁতভাবে খুলে এনে, নতুন তালা বসিয়ে দিয়েছে। পুরোবাড়ির মেইনসুইচ বন্ধ করে কাজটা করাতে কেউ কিচ্ছু দেখতে পায়নি। আর অত্যন্ত চতুর স্বভাবের মানুষ হওয়াতে এই লোক একেবারে নিঃশ্বব্দে কাজটা সম্পন্ন করতে পেরেছে।
কবে কখন কোথায় যান, কখন বাড়ি ফিরেন, সেসব, সবই তো তার জানা! রোববার বিকেল হতে রাত নয়টা বা কখনো দশটা-এতোটা সময় যাবৎ যে আপনারা বাসায় কেউ থাকেন না, তা তো আর তার অজানা নয়।সে সুযোগে সে আপনার বাসায় ঢুকে বারান্দার গ্রিল কেটেছে। কাঁদায় পা মাখিয়ে বারান্দায় গ্রিলের কাঁটা স্থান বরাবর, হেঁটে চোরের ঘরে ঢোকা আর বের হওয়ার প্রমান তৈরি করেছে। চোর ঘরে ঢুকেছে, আলমারি পর্যন্ত এসেছে, এই ছাপটা তৈরি করতে সে ভুলে গেছে বা ইচ্ছে করেই করেনি।
আলমারির চাবির ডুপ্লিকেট আছে তার কাছে। এতোসব করতে সহায়তা করেছে আপনার কাজের লোক। তাকে মোটা টাকার লোভ দেখানো হয়েছে। বাড়ির দারোয়ান সব জানলেও সে কোন টাকা নেয়নি বা সহায়তা করেনি। সে সব জেনে জানের ভয়ে চুপ করে ছিল।আমার যখন এই কেয়ারটেকারের অন্যান্য সব কাজে সন্দেহ হলো, তখনই আমি আগে পুরনো দারেয়ানের খোঁজ করি।আরো অনেক তথ্য পেলাম। যার একমাত্র নিরব সাক্ষী আপনাদের সেই পুরনো দরোয়ান, তাহের। কোন কাজে বাঁধা দিতে গেলে, চাকরি হারাবি, তোর পরিবারের বিরাট সর্বনাশ করবো, এইসব ভয় দেখাতো।
এবার আপা বলেন, আপনি উনাকে মাফ করতে পারবেন?
বলেন পারবেন?
এত অবাক হইনি জীবনে। এই মানুষটাকে দীর্ঘ বারো বৎসর যাবৎ দেখছি।কোনদিন কোন দোষ পাইনি। অথচ!
কি খুব অবাক তো??
আরো আছে…
এত অবাক হইনি জীবনে। এই মানুষটাকে দীর্ঘ বারো বৎসর যাবৎ দেখছি। কোনদিন কোন দোষ পাইনি।অথচ!
কিইই? খুব অবাক তো?
আরো আছে, আঙ্কেল-আন্টি গত বছর এমেরিকা গিয়েছিলেন মেয়ের কাছে। দেশে ফিরে আন্টির হাতের বলা জোড়া আর দুটো স্বর্নের চেইন, কোথাও খুঁজে পাচ্ছিলেন না। পরে ভেবেছেন, বয়স হয়েছে সেজন্য হয়তো মনে করতে পারছেন না-কোথায় রেখেছেন। এরপর একসময় সে কথা ভুলেও গেলেন।
আন্টি, আপনাদের জন্য ঐ বালা আর চেইনগুলো সামান্য হলেও ওর জন্য তো বিশাল পাওয়া ছিলো! আপনাদের ঘরের আর আলমারির ডুপ্লিকেট চাবি তার কাছে ছিলো। তাকে তো খুবই বিশ্বাস করতেন অন্য সবারই মতো। তাই আপনার ঘরের তালায় একবার যে একটা সমস্যা হয়েছিল, তা মোকাবেলায় তখন তাকেই মানে এই ইন্জিনিয়ারেরই ডাক পড়েছিল। ব্যাস যার যেমন চরিত্র। তখন সে সেই সুযোগট কাজে লাগায়। খুব সাবধানে চাবি ডুপ্লিকেট করে নিয়েছিল অসৎ উদ্দেশ্য মাথায় রেখে। এরপর সময় এবং সুযোগ বুঝে যা করার তা সে ঠিক ঠাক করে নিয়েছে-কেউ একটুও টের পায়নি।
ভদ্রলোক একটু থামলেন। পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন চারতলার রুনু ভাবি। তাকে উদ্দেশ্য করে আবার দম নিয়ে বলা শুরু করলেন,
রুনু ভাবির কাজের লোক তো ছাদে কাপড় শুকাতে গিয়ে আর ঘরেে ফিরে আসেনি। তাই না? তাকে কে সহায়তা করেছিল জানেন?এই চোর। ও আপনার ঘর থেকে টাকা চুরি করে ছাদের ফুলের টবের নিচে গিয়ে রেখে আসতো। সেগুলো খুব বড় অংকের টাকা ছিল না বলে ধরতে পারেন নি। তবে প্রায়ই রাখতো। মোখলেসের হাতখরচ চলে যেতো। যেদিন একলক্ষ টাকা নিয়ে বের হতে পেরেছে, সেদিনই তার মুক্তি হয়েছে। তার হাতে পচিশহাজার দিয়ে গ্রামের বাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করেদিয়েছিলো। আরো ছিল পচাত্তর হাজার টাকা – যার পুরোটার মালিকানার অধিকার ছিলো একমাত্র আপনাদের এই ভালো মানুষ, মোখলেসের হাতে।
এমন আরো অনেক অনেক ঘটনা আছে যার সাক্ষী ছিল আপনাদের পুরনো দারোয়ান, তাহের।
আজ সে বেকার। বউ বাচ্চা নিয়ে অনেক কষ্টে দিন পার করছে। তাই মনের দুঃখে, রাগে, জেদে মোখলেস চোরের সব অপকর্মের কথা নির্দিধায় বলে দিয়েছে।
দশদিন চোরের আর একদিন গৃহস্তের।
দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস টেনে বুকের গভীরে নিয়ে আবার তা ছারলেন। আমি নিজে খুব একটা ভালো মানুষ না।দুনিয়ার কাউরে বিশ্বাস করি না। মদ খেয়ে বাড়ি এসে বউকে মারি, মেয়েরে মারি, দুই নাম্বারি ব্যাবসা করি। অনেক টাকার মালিক আমি।আমি খারাপ বলেই ওরে আমি ঠিকই চিনতে পেরেছি। আপনারা যুগ পার করেও যা বুঝতে পারেন নাই, আমি দুইমাসে তা বুঝে ফেলেছি।
এখন ওর বাড়িঘর বিক্রি করে হোক বা ব্যাংকের জমানো টাকা থেকে হোক, যেভাবেই পারি,আপনাদের যার যা ক্ষতি হয়েছে, তা পূরণ করার চেষ্টা করবো।
আপনারা ভালো মানুষ, ভদ্রলোক – ওকে আমি আপনাদের হাতে ছাড়বো না। মাফ চেয়ে পার পেয়ে যাবে।আমার মত খারাপ লোকের সাথে চালাকি করতে গিয়ে ধরাটা পড়লো, ওকে সায়েস্তা করার একমাত্র যোগ্য ব্যক্তি আমি। যান সবাই যে যার ঘরে গিয়ে একটু বিশ্রাম করেন। ভোর হয়ে এলো বুঝি!


© 2022 - Deshbarta Magazine. All Rights Reserved.