শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২০

একজন শিক্ষকের উপলব্ধি

মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন

অফিসিয়াল কাজে একদিন এক অফিসে গেলাম। অফিসে কর্মরত একজন ভদ্রমহিলা আমাকে আমার কাজটা করে দিলেন। আমার পেশাগত কারণে উনি আমার কাজটা আগ বাড়িয়ে করে দিলেন। ধন্যবাদ দিয়ে চলে আসার সময় উনি আমাকে বসালেন। চা আনালেন। কথায় কথায় উনি বেশ আত্মতৃপ্তির সাথেই আমার কাছ থেকে দোয়া চাইলেন যে, স্যার, দোয়া করবেন। আমার দুইটা ডিপিএস আছে।

আমি থতমত খেয়ে চমকে গেলাম। ডিপিএস এর জন্যও মানুষ দোয়া চায়? ভদ্রমহিলা বললো যে চাকুরি জীবনে এর চেয়ে বেশি কিছুই নাকি উনার চাহিদা নেই।

আমি ত অনেকটা থ বনে গেছি। সেদিন সারাদিনই মহিলার এই শব্দটা আমাকে ভাবাতে লাগলো। সহকর্মীদের সাথে এই বিষয়ে কথা বলেছি। এর আগাগোড়া আসলে আমি কিছুই বুঝিনি।

ঘটনাক্রমে তিনদিন পরে পুনরায় সেই অফিসে যেতে হয়েছে সহকর্মীর একটা কাজে। আবারও উনি চা খাওয়ালেন। যথারীতি উনি ডিপিএস এর কথা উঠালেন। উনি বললেন, স্যার, আমার ডিপিএস এর কী খবর?

আমি উত্তর দিলাম, ডিপিএস এর খবর ত ব্যাংকাররা রাখবেন। আমি রাখব কীভাবে?

আমি তখনও বুঝিনি। উনি বললেন, স্যার, মানুষের ডিপিএস ব্যাংকে আর আমার দুটি ডিপিএস আপনার স্কুলে। এমনকি আপনার ক্লাসে। আমি আশ্চর্য হয়ে গেছি। একজন মা থেকে আমি শিখেছি যে মানুষের জীবনে আসলে ডিপিএস কী?

উনার দুটি সন্তান আমার ক্লাসেই অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী। মেধা বলতে আমরা হয়তো বুঝি পড়ালেখায় ভালো। আসলে পড়াশোনা এবং আচার আচরণেও ছেলে দুটো অসাধারণ। আজ সেসকল মায়ের জন্যই আমার লিখতে বসা।

আমরা অনেক সময় ব্যাংক ব্যালেন্স রাখাকেই সন্তানের নিশ্চিত ভবিষ্যত মনে করি। মানুষের মতো মানুষ না করতে পারলে এই ব্যাংক ব্যালেন্স হীতে বিপরীত হচ্ছে। আজকের সামাজিক অবস্থাটা দেখলে অন্তত তাই মনে হচ্ছে।

বিশ্বটা আজ থেমে গেছে। রাখঢাক ছাড়াই থেমে গেছে।উন্নতির চুড়ান্ত সীমানায় পৌঁছে পৃথিবীর এতো অসহায়ত্ব আর কখনোই কোনো প্রজন্ম দেখেনি। বদলে যাওয়া পৃথিবীর সাথে ইতোমধ্যে মানুষের অভ্যাস, বদভ্যাস ও কেমন যেনো মানিয়ে নিতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক পরিবর্তন গুলোও থেমে নেই। এই পরিবর্তনের সাথে আমাদের আরো কিছু পরিবর্তন খুব দরকার।

প্রিয় শিক্ষার্থী,

আজকের কর্পোরেট জগতে তোমার মা বাবাকে এতো অবসর অবস্থা পাবে তা আদৌ ভাবোনি,তাই না? একটা জীবাণু এসে সে সুযোগটা করে দিয়েছে। পৃথিবীর একমাত্র নিঃস্বার্থ সম্পর্কের সাথে তোমার সময় কাটানোর চেয়ে কী এতো ভালো হতে পারে?

তুমি কি জানো কোনো যুদ্ধে মায়ের কোলে,বাবার কোলে নিরাপদ আশ্রয়ে কেউ ঘুমাতে পারে? নিশ্চয় না। উদ্বেগ আর উৎকন্ঠা নিয়ে রাত দিন কাটাতে হয়। সেদিক বিবেচনায় ভিন্ন যুদ্ধ পেয়েছো যে কিনা সবচেয়ে নিরাপদ কোলে ঘুমাতে পারছো। সুতরাং বেঁচে থাকার স্বার্থে, নিরাপদ থাকার স্বার্থে বাবা-মায়ের ভালবাসাকে উপভোগ করো।

প্রিয় মায়েরা,

কতদিন নিজের সন্তানদেরকে এতো কাছে রাখা, নিজ হাতে রান্না করে খাওয়াতে পারেন না।ভেবেছেন কি? পড়াশোনা কিংবা জীবিকার জন্য আপনার নাড়িছেঁড়া ধন আপনার চোখের আড়ালে ছিলো। না ছিলো সন্তানের প্রশান্তি,না ছিলো আপনার প্রশান্তি! করোনার এই সংকট আপনার এ আক্ষেপ ঘুছিয়ে দিয়েছে।

মা হিসেবে আপনি এখন পর্যাপ্ত সময় আপনার সন্তানকে দিন। নেপোলিয়ন বলেছিলেন, আমাকে একটা শিক্ষিত মা দাও, আমি একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দিব। একজন মায়ের শাসন, সুশিক্ষা, ভালবাসায় পারে একটি সন্তানের আদর্শ করে গড়ে তুলতে। কাজের মানুষের হাতে বেড়ে উঠা সন্তানের আচরণগুলো কাটিয়ে তুলুন নিজ হাতে। মনে রাখুন আপনার চেয়ে বড় শিক্ষক আপনার সন্তানের আর দ্বিতীয়টি নেই।

আপনি সত্য বলুন, আপনার সন্তান সত্য বলতে বাধ্য।আপনি পরিমিত ব্যায় করুন, সন্তানকে পরিমিতিবোধ শিখিয়ে তুলুন। সন্তানের সামনে ঝগড়াঝাটি করা বন্ধ করুন। আপনি ধর্মীয় মূল্যবোধের ভীত রচনা করুন।তাহলে বছরে একদিন মা দিবস নয়, আপনার সন্তান ৩৬৫ দিনই মা দিবস পালন করবে।

প্রিয় বাবারা,

রক্ত পানি করা পরিশ্রমের মাধ্যমে আপনি চান আপনার সন্তান যেনো থাকে দুধে-ভাতে। আসলেই কি দুধে-ভাতে রেখে যেতে পারি? নিশ্চয়ই না। তাহলে দুধে-ভাতে না রাখার চেষ্টা করাই উত্তম। ঝড়-ঝাপ্টা সয়ে বেড়ে উঠার যোগ্য করে তোলায় কি উচিত নয়? পিছলে গেলে ঘুরে দাঁড়ানো শিখিয়ে তুলুন। জীবন পুস্পশয্যা নয় তা বুঝিয়ে গড়ে তুলুন। প্রতিটি পিতা তার সন্তানের কাছেই আদর্শ। সুতরাং আপনার আদর্শকে সন্তানের মাঝে বুনন করুন। একদিন আপনার মতো এই চারাটিই বটবৃক্ষ হবে। ছায়া দিবে আপনাকে, আপনার স্বপ্নকে।

আসুন, আমরা আমাদের দায়িত্ব যথাযথ পালন করি।পরিবারকে নিরাপদ রাখি। নিজে সুস্থ থাকি। দেশকে সুস্থ রাখি। আল্লাহ আমাদের সহায় হউক। আমিন।

(লেখাটি সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক শ্রদ্ধেয় মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেনের ফেইসবুক থেকে নেওয়া)


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত