রবিবার, ০৩ জুলাই ২০২২

একটা মেয়ে : ফারজানা ইয়াসমিন

মেয়ে হওয়ার আগে বুঝতে পারিনি জীবন বদলে যাবে। সত্যি বলতে ওর মধ্যে অন্য কিছু আছে। যা আমি ধীরে ধীরে বুঝতে পারছি। ছেলে আমার জন্য পাগল ঠিকই আছে। কিন্তু মেয়ে বাবার জন্য পাগল। বাসায় থেকে বাবার গুণ গায়। বাবার নামে কিছুই বলা যায় না।তার বাবা তার হিরো। তবে মেয়ে মায়ের নামে উল্টাপাল্টা কথাও শুনতে চায় না।

মেয়ে হওয়ার পর আমি কখনো একা থাকিনি। মানে আমার কখনো একা লাগেনি। মনে হয়েছে আমার একটা বন্ধু আছে। কারণ যে গালে হাত দিলেই বলে, মা কী চিন্তা করছো?তোমার মন খারাপ? যে এভাবে বলে তারচেয়ে আপনজন আর কে আছে?

মাঝে মাঝে আমার মা হঠাৎ কল করে বলে, তুমি ভালো আছো? তোমার কী মন খারাপ?
অবাক হয়ে যাই আমি। মা কী করে জানলো আমার মন খারাপ? খুব অবাক লাগে। আবার অনেক সময় কিছু হওয়ার আগেই বলে দেয়, কিছু হবে হয়তো। সাবধানে থেকো। আমি আজও বুঝতে পারি না। কীভাবে বলে এসব? মায়েরা হয়তো মনের চোখ দিয়ে সবকিছুই দেখে।

গতকাল আমাদের মেয়ে রাইসা খাওয়ার টেবিলে বসে খেলছে। আর আমরা খাচ্ছি। তো চা বানিয়ে তার বাবা আর আমাকে দিল। আমরা খেলাম। সে আমাকে বলে, এবার আমাকে দেও। খুব অবাক হলাম। এতটুকু মেয়ে কীভাবে এটা বুঝতে পারলো?তার অর্থ এটাই যে, আমি সবার জন্য করবো। কিন্তু আমার জন্য সবার করতে হবে। খুব ভালো লাগলো। কারণ আমরা মেয়েরা ভুলে যাই আমাদের ভালোলাগার কথা। নিজের অনুভূতি চাপা দিয়ে রাখি।

মেয়ে একটা মশা কামড় দিলেও তার বাবাকে দেখায়। তো তার বাবা বলে, তোমার মা তখন কোথায় ছিল? তোমাকে মশা কামড় দিল মা দেখেনি? কী করে সারাদিন তোমার মা?

মেয়ের উত্তর শুনে আমি অবাক হয়ে যাই। এতো ছোট মানুষ মাত্র তিন বছর বয়স।সে কীভাবে এমন উত্তর দেয়! মেয়ে তার বাবাকে বলে, আরে মা তো রান্না করে। আমাদের গোসল করায়, খাওয়ায়, ভাইয়াকে স্কুলে নিয়ে যায়। আমি তাকিয়ে থাকলাম মেয়ের মুখের দিকে। আমার কাজ কারো চোখে পড়ে না। অথচ এতো ছোট মানুষ তার চোখে আমার কাজ এভাবে কীভাবে পড়লো?

মেয়ের বাবার প্রতি টান থাকে জানতাম। কিন্তু মেয়ে বাবাকে এতো ভালো কী করে বুঝতে পারে? মেয়ে তার বাবা আসলে স্যান্ডেল এনে দেয়। গামছা দেয়। জিজ্ঞেস করে বাবা কেমন আছো? অসুস্থ হলে ঘরে ঢোকার সাথেই জিজ্ঞেস করে ঔষধ খেয়েছো? এগুলো ওকে কেউ বলে দেয় না।

তার বাবা যখন ভাত খায়। সে পাশে বসে থাকে। এটা ওটা নিতে বলে।ঠিক আমার শাশুড়ির মতো। খুব অবাক লাগে। আমার মেয়ের সাথে আমার শাশুড়ির অনেক মিল। একদম যেন শাশুড়ি মায়ের কার্বন কপি।

মেয়ের বাবার খুব শখ ছিল একটা ঢংগি মেয়ের।মেয়ে একদম তার বাবার চাওয়ার মতোই ঢং করে। এতোই ঢং করে যে মাঝে মাঝে তার বাবা বলে,রাইসা একটু কম ঢং করো।

তাই মাঝে মাঝে খোঁচা দিয়ে মেয়ের বাবাকে বলি, একদম তোমার মা। এতটুকু আমার কিছু পায়নি। মেয়ের কিন্তু তার দাদী আর নানীর সাথে খুব খাতির।কীভাবে যেন তার বাবাকে হাত করে ফেলেছে। যা আমি তেরো বছরে পারিনি। মেয়ের বাবা মেয়ের জন্য পাগল।

মেয়েও সবকিছুর ভাগ দিবে। বাবার ভাগ কাউকেই দিবে না। বাবা তার। আর রেহানের বাবা বলা যাবে না। রাইসার বাবা বলতে হবে।

আমার খুব মজা লেগে। আমি আমার মেয়ের সাথে আমার ছোট বেলায় ফিরে যাই।উপভোগ করি ওর বুড়ির মতো কথা গুলো। এখন আর কখনো নিজেকে একা লাগে না। ও যতই বড় হচ্ছে মনে হচ্ছে আমার বন্ধু হয়ে উঠছে। অনেক অনেক ভালোবাসা ও দোয়া রইল মা তোমার জন্য। এভাবেই হেসে খেলে বড় হও।


© 2022 - Deshbarta Magazine. All Rights Reserved.