মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১

কবি, এক জোড়া জুতা এবং মওলানা ভাসানীর গল্প

এক।

১৯৭৪ সালে ভারতের ওড়িষ্যা রাজ্যের ওড়িয়া ভাষার জ্ঞানপীঠ পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি শচী রাউত রায় বাংলা একাডেমির আমন্ত্রণে ঢাকায় এসেছিলেন। তিনি মওলানা ভাসানীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার ইচ্ছা প্রকাশ করায় একাডেমির কর্মকর্তা ও লেখক শামসুজ্জামান খান (পরে বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক) তাকে নিয়ে সন্তোষ যান।তারা গিয়ে দেখেন মওলানা মশারির ভেতরে শুয়ে রয়েছেন। তার শরীর বিশেষ ভালো ছিল না সেদিন। কারা গেছেন সে-কথা জানানোর সঙ্গে সঙ্গে তিনি মশারির ভেতর থেকে দ্রুত বেরিয়ে নিজেই মশারির দড়ি খুলে ফেলেন। তারপর অতিথিদেরকে বসতে দিয়ে তাদের আপ্যায়নের জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন।

ভাসানীর অকল্পনীয় সাধারণ ঘরদোর ও জীবনযাপনের অবস্থা দেখে শচী রায় থ হয়ে যান। এক অসাধারণ জনপ্রিয় নেতার একি সাধারণ বড়িঘর আর বিছানাপত্র!সেদিন মওলানা দ্রুত একটি আলমারি খুলে তার ভেতর থেকে একটি বড় পেঁপে বের করেন এবং নিজেই তা কেটে তাদের খেতে দেন।তখন তিনি ভারত সরকারের কঠোর সমালোচনা করছিলেন। সেজন্য ভারতের বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের খবরের কাগজগুলো তাকে ‘সাম্প্রদায়িক মওলানা’ ‘বেইমান মওলানা’ এসব বলে গালাগাল দিচ্ছিল। সেই সময় ভারত সরকারে মুখপাত্ররাও মাঝে মাঝে তাকে সমালোচনা করে বক্তব্য দিতেন। তাতে তিনি ব্যথিত হতেন, কিন্তু তার যা বলার বলে যেতেন।ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘ কথাবার্তা হয় ভারতীয় লেখকদের সঙ্গে।

একপর্যায়ে ব্যথিত কণ্ঠে ভাসানী বলেন, ‘ইন্দিরাকে বলবেন মওলানা সাম্প্রদায়িক না’। রাউত রায় জানতে চান, মওলানার জীবন দর্শন সম্পর্কে তার নিজের মুখে। ভাসানী তার জীবনের দীর্ঘ সংগ্রামের কাহিনী বলে যান, উপমহাদেশের কুড়ি শতকের রাজনৈতিক ইতিহাস এবং শোষিত-বঞ্চিত মানুষের নিরন্তর সংগ্রামের ইতিবৃত্ত। তা থেকেই ফুটে উঠছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদী চেতনার কথা, শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে তার ক্রোধের কথা শোষকের বিরুদ্ধে তার আপসহীন মনোভাবের কথা। সেদিন অতি খোলামেলা আলোচনায় ওড়িয্যার কবি বুঝতে পারেন মওলানা ভাসানী সম্পর্কে ভারতীয় নেতাদের বিবেচনা সঠিক নয়। তার রাজনীতিকে ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ নেই, তা খুবই স্পট, যখন যাদের বিরুদ্ধে যায় তখন তারা তাকে নিন্দা করে, তার মতামতের মূল কারণ খোঁজার চেষ্টা না করেই।

দুই।

মওলানা ভাসানী জীবনে যতো জুতা-স্যান্ডেল হারিয়েছেন, ততো জুতা-স্যান্ডেল অনেকে সারাজীবনে কেনেও না। চটি স্যান্ডেল হারাতেন তিনি দুইভাবে। গরমের দিন হলে কেথাও তুলে ফেলে রেখে ‘খালি পায়েই’ চলে যেতেন, পরে আর খুঁজে পাওয়া যেত না। অথবা কোনো জনসমাবেশে গিয়ে খুলে রেখে ভাষণ দিচ্ছেন বা কোথাও গিয়ে বসেছেন, তো কোনো জুতাচোর তা নিয়ে সটকে পড়েছে। সেটি যে মওলানার জুতা তা জানলে কোনো চোর তা নিতে সাহস করত না। কোনো সামাজিক বা ধর্মীয় সমাবেশ, যেমন- মিলাদ মাহফিল প্রভৃতি থেকে জুতাচুরি এদেশে খুব সাধারণ ঘটনা। ভক্তরা কিনে দিলেও একটির বেশি জুতা-স্যান্ডেল খুব কমই থাকত ভাসানীর। সুতরাং হারিয়ে গেলে সমস্যা হতো।১৯৭২ সালের ডিসেম্বরের ১ অথবা ২ তারিখে একবার তার জুতা হারিয়ে যায়। ৩ ডিসেম্বর তিনি তার জ্যেষ্ঠ পুত্র আবু নাসের খানকে এক চিরকুট লেখেন,

বাবু,

১টা জিপ অথবা বেবি ট্যাক্সি সংগ্রহ করিয়া পাঠাইবে। বেলা সাড়ে তিনটায় আমি জয়পুরহাট পৌছিব। তোমার মা সঙ্গে যাইবে। এখানে কলেজের কিছু কাজ আছে। আমার জুতা হারাইয়াছি, ১ জোড়া স্যান্ডেল অথবা চটিজুতা ৬নং পাঠাইবে।

মো. আবদুল হামিদ খান ভাসানী

০৩ ডিসেম্বর ১৯৭২

এ প্রসঙ্গে নাসের ভাসানী জানান, মওলানা সাহেবের বলিষ্ঠ শরীরের তুলনায় তার পা দুটি বড় ছিল না। অনেক ভক্ত তাকে ৭-৮ নম্বর জুতা-স্যান্ডেল কিনে পাঠালে তিনি তা ব্যবহার করতে পারতেন না, অন্য কাউকে দিয়ে দিতেন। সেজনা কাউকে জুতা কিনতে বললে মনে করিয়ে দিতেন ছয় নম্বর জুতার কথা।

তিন।

পঞ্চাশ ও ঘাটের দশকে ভাসানীর সঙ্গে কবি সুফিয়া কামালের খুব যোগাযোগ ছিল। কোনো কোনো সামাজিক আন্দোলন-সংগ্রাম তারা একসঙ্গে করেছেন। সুফিয়া কামাল জানান, “অনেক দিন দেখাশোনা না হলে মওলানা সাহেব কারো কাছে আমাকে খবর দিতেন। অনেকবার খুব কষ্ট করে হলেও গিয়েছি তার সাথে দেখা করতে। রাস্তা ছিল ব্যাপক খারাপ। অনেক সময় লাগত যেতে। আমাকে তিনি ছোট বোনের মতো স্নেহ করতেন। বয়সে আমি তার মেয়ের মতো, কিন্তু খুব সম্মান করতেন।”

সুফিয়া কামাল আরো জানান, “আমি টাঙ্গাইল গেলে কত রকম মাছ কিনতেন। এ-বাজার সে-বাজারে লোক পাঠাতেন বড় মাছ আনতে। বলতাম, এত মাছ খাবে কে? বলতেন, কেন আপনারা খাবেন। সত্যি সত্যি অল্প সময়ের মধ্যেই বড় বড় মাছ- রুই, আইড়, চিতল কোথা থেকে এসে যেত । সেকালে তো আর ফ্রিজ ছিল না। সব মাছ রান্না হতো। মওলানা সাহেবের স্ত্রী কষ্ট করে সে-রান্না করতেন। একবার মনে আছে, আসার সময় একটা হাঁড়িতে গামছা দিয়ে বেধে অনেকটা মাছের ছালুন দিয়ে দিয়েছিলেন। তার ক্ষেতের কাঁচা তরিতরকারিও গাড়িতে বস্তা ভরে উঠিয়ে দিতেন। ঢাকায় এনে আমি সেগুলো অনেকের বাসায় পাঠাতাম। দুয়েকবার শেখ সাহেবের বাড়িতে পাঠিয়েছি। মনে পড়ে শেখ সাহেব ছিলেন না। তার স্ত্রী মওলানা সাহেবের বাড়ির তরিতরকারি পেয়ে খুব খুশি।”

(বইসূত্র- ভাসানী কাহিনী, সৈয়দ আবুল মকসুদ)


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত