বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২০

কবি হেলাল হাফিজের ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’

হাসান হাফিজ

দীর্ঘ প্রতীক্ষা ছিল। গুণগ্রাহী, অনুরক্ত পাঠকসমাজের মনে হয়েছিল, সেই অপেক্ষা বোধকরি অন্তহীন। কিন্তু না। নৈরাশার চিদাকাশে আলোর আভাস দেখা গেছে। শেষ অবধি দ্বিতীয় বই বের হলো। কবি হেলাল হাফিজের দ্বিতীয় মৌলিক কাব্যগ্রন্থ। নাম ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’। কিংবদন্তি এই কবিকে বলা হয় কবিতার বরপুত্র। অল্প লিখে গল্প হতে পেরেছেন। খুব সহজেই। সে এক বিরল ব্যতিক্রম। গোটা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসেই, সম্ভবত। মরণের আগেও কি মরে যাওয়া যায়? ব্যাকুল এই প্রশ্ন কবিমনকে উদ্বেলিত শিহরিত করেছে। ‘অবেলার খেলা’ কবিতায় ঝরে পড়ছে সেই স্নিগ্ধমেদুর অনুভূতিপুঞ্জ। ছোট্ট কবিতা। সাংকেতিক। শব্দের ভেতরে নিহিতার্থ পাঠককে ভাবায়। আলোড়িত করে। মনে এক ধরনের ব্যথাতুর আবেশ তৈরি হয়। টোকা পড়ে হৃদয়ের নিভৃত অলিন্দে। কবি বলছেন,
প্লিজ অবেলায়
তরঙ্গ তুলিয়া রঙ্গে ভঙ্গ দিও না
ওগো, বাঁচিবো না
মরিয়া যাইবো আমি মরণের আগে।
আগেকার কালে আমাদেরই এক কবি ভবিষ্যতের জন্য বর মেঙেছিলেন। কল্যাণের জন্য, সুস্থিতির জন্য। বলেছিলেন, আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে। বর্তমান বৈরী, অস্থির, অবিশ্বাস ও হানাহানি, স্বার্থপ্রলুব্ধ সমাজে এখনকার কবি হেলাল হাফিজ নতুনভাবে সেই ভাবনা, সেই কাঙ্ক্ষাকেই ধারণ করেন। লালন করেন। শিল্পবুননে তাঁর মনোলোককে, স্বপ্নবাসনাকে উন্মোচন করেন, সবিনয়ে উপস্থাপন করেন পাঠক সমীপে। তথা অনাগত দিনের উদ্দেশে। ‘বাসনা’ নামের ক্ষুদ্র কবিতায় তিনি বলেন,
আগামী, তোমার হাতে
আমার কবিতা যেন
থাকে দুধে ভাতে।
মৃত্যু-পরবর্তী সময়ে কী হবে, সেই চিন্তা কবিমানসকে ভাবিত করে। সঙ্গত সেই ভাবনারই অণু উৎসারণ এই কবিতা। আধুনিক সময়ে মানুষের ত্রস্ততা ব্যস্ততার সীমা শেষ নেই। মুদ্রিত ফর্মের বইয়ের সঙ্গে সম্পৃক্তি ও যোগাযোগের সূত্র ক্ষীণ হয়ে এসেছে। এখন মুঠোফোনের যুগ। মোবাইল সেটে দেশি-বিদেশি খবরাখবর, সাহিত্য, সবকিছুই। সারা বিশ্বের সঙ্গে মুহূর্তেই যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব। মুঠোফোনে চোখ বুলোনোর সময়ও বিশেষ নেই। সুতরাং সবকিছুই ছোট থেকে ছোটতর হয়ে আসছে। কবিতাই বা এ ধারা থেকে বাদ যাবে কেন? কবিতাও সংক্ষিপ্ত আকার ধারণ করেছে। এক পঙ্ক্তিতে একাধিক পঙ্ক্তির ব্যঞ্জনা-দ্যোতনা, লাবণ্য-সৌরভ সঞ্চারিত করার কাজটি রীতিমতো দুরূহ। কবি হেলাল হাফিজ সেই অসাধ্যকেই সাধন করেছেন। সাফল্যের সঙ্গে করেছেন। ফেসবুকে লিখিত অণুকবিতা দিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন এই দ্বিতীয় বইটির শরীর। বছরের পর বছর তিনি অনেক কবিতাই লিখেছেন তার ফেসবুকের ওয়ালে। সেখান থেকে নির্মম বাছাই-যাচাইয়ের পর এই কবিতাগুলো নির্বাচন করা হয়েছে। যা গ্রন্থাকারে পাঠকসমীপে পৌঁছে দিয়েছে প্রকাশনা সংস্থা ‘দিব্যপ্রকাশ’। কবি হেলাল হাফিজের প্রথম কবিতাগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ সর্বপ্রথম বের করেছিল অনিন্দ্য প্রকাশ। গত শতকের আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে। ওই প্রকাশনা সংস্থাটি আর নেই বর্তমানে। পরবর্তীকালে ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ প্রকাশিত হতে থাকে দিব্যপ্রকাশ থেকে।
মানুষকে ভালোবাসার দিকে, কল্যাণের দিকে, সুন্দরের দিকে আহ্বান করেছেন তিনি কবিতায়। মানুষ যদি একটু স্বচ্ছ হতে পারে, ভালোবাসার মায়ায় জড়িয়ে ‘মানুষ’ হতে পারে, সেটাই কবির চাওয়া। আঘাত ভালোবাসা যুগপৎ মানুষের কাছে থেকেই এসেছে। তারপরও মানুষই তাঁর আরাধ্য। মানুষই তাঁর গন্তব্য। চিরকালের। ‘কবিসূত্র’ কবিতাটি আমরা একটু দেখে নিই এই ফাঁকে-
আজন্ম মানুষ আমাকে পোড়াতে পোড়াতে কবি করে তুলেছে
মানুষের কাছে এও তো আমার এক ধরনের ঋণ।
এমনই কপাল আমার
অপরিশোধ্য এই ঋণ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।
নির্ঝরের মতো স্বচ্ছতোয়া, স্বতঃস্ফূর্ত নির্মিতি আমরা প্রত্যক্ষ করবো এই বইয়ের ক্ষুদ্র কবিতা কণাগুলোতে। এখানে তার দুটি উদাহরণ।
রোদ্দুরে ভেজাবো তোকে শুকাবো বৃষ্টিতে।
(লীলা)
দ্বিতীয় উদ্ধৃতি-
তুমি কি জুলেখা, শিরি, সাবিত্রী নাকি রজকিনী?
চিনি, খুব জানি
তুমি যার তার, যে কেউ তোমার
তোমাকে দিলাম না-ভালোবাসার অপূর্ব অধিকার।
(অধিকার)
পাঠকদের তরফে জোর দাবি ছিল কবির দ্বিতীয় মৌলিক কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের। আলস্য যেহেতু এই কবির অতিপ্রিয় একটি বিষয় দৈনন্দিন জীবনযাপনে, সেহেতু সঙ্গত কারণেই তাঁর কাব্য অভিযাত্রায় আলস্যের দৌরাত্ম্য বা অমোঘ প্রভাব আমরা দেখতে পাবো। কবি হেলাল হাফিজ নিজে কী বলছেন, তাঁর দ্বিতীয় জন্ম অর্থাৎ এই দ্বিতীয় গ্রন্থ প্রকাশের ব্যাপারে? আমরা শুনবো তাঁর কথা।
কবি হেলাল হাফিজ বলেছেন, গত অক্টোবরে পার হওয়া আমার জন্মদিনে অনুরাগীদের কথা দিয়েছিলাম, বেঁচে থাকলে আরো একটি বই তাদের উপহার দিয়ে যাব। এই বই হচ্ছে সেই প্রতিশ্রুতির উপহার।
এই বইকে বলা যেতে পারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও প্রযুক্তির ফসল। প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে মাঝে মাঝেই আমার মনের কোণে উঁকি দিয়েছে কবিতার নানা লাইন। সেগুলো অণু কবিতা হিসেবে লিখে ফেলেছি। এ যুগে বড় কবিতা পড়ার সময় মানুষের কম। একদমই নেই। শুরু থেকেই ফেসবুকে প্রকাশিত অণু কবিতাগুলো কাব্যানুরাগীদের দৃষ্টি কাড়ে। আমিও উজ্জীবিত প্রাণিত হই। বর্তমান বিশ্বের যে সেরা নেশা ফেসবুক, আইফোন- তার মধ্যে আমি কবিতাকে সঞ্চালিত করেছি। কেন করলাম এই কাজ? শুদ্ধ শিল্পের প্রতি অনুরাগ প্রীতিবন্ধন জোরালো করার স্বপ্নে ও প্রত্যাশায়। তারুণ্যকে ভালোবাসার পবিত্র ও কল্যাণমুখী দর্শনে সিক্ত ও যুক্ত করতে পারলে সমাজ থেকে অনেক ক্ষুদ্রতা, হানাহানি, ঈর্ষাবিষ দূর হতে পারে। সম্পূর্ণ বিলোপ না হলেও দৌরাত্ম্য অনেকটাই কমতে পারে। সেটাই বা কম কী?
কবি হেলাল হাফিজ আরো বললেন, এবারের বইটিতে মোট ৩৫টি কবিতা স্থান পেয়েছে। ‘পিতার পত্র’ নামের কবিতাটি মূলত আমার বাবার লেখা একটি চিঠির লাইন। কবিতাটিকে ইনভারটেড কমার মধ্যে এখানে তুলে দিয়েছি। আমার নিজস্ব কবিতা ৩৪টি। অন্তত দুইশ কবিতা থেকে বাছাই করে শেষাবধি ৩৪টি কবিতা দিয়ে এই বইয়ের পান্ডুলিপি তৈরি করি। বাকি কবিতাগুলো আলোর মুখ দেখবে কখনো, সেই সম্ভাবনা নেই আর। এ ব্যাপারে আমাকে নির্মমভাবেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। উপায় ছিল না।
পিতার কবিতা বইয়ে স্থান দেয়া প্রসঙ্গে কবি বলেন, আমার ভরজীবনের যে দুঃখ, কষ্ট আছে, তা পিতার কাছ থেকেই পাওয়া। তিনি বলেছিলেন- আমি যে দুঃখ কষ্ট দিয়ে গেলাম, তা লালন করো। স্বাধীনতার পর আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম, তখন এক চিঠিতে আমাকে তিনি লিখেছিলেন, ‘রেটিনার লোনাজলে তোমার সাঁতার/পিতৃদত্ত সে মহান উত্তরাধিকার’। এটিকে এই অণু কবিতার বইয়ের মধ্যে ‘পিতার পত্র’ নামকরণ করে এই গ্রন্থে স্থান দিয়েছি।

১৯৮৬ সালে বেরিয়েছিল কবি হেলাল হাফিজের প্রথম ও সাড়া জাগানো কবিতার বই ‘যে জলে আগুন জ্বলে’। সেই বইয়ের ৫৬টি কবিতা দিয়ে কবি বাংলা কবিতার জগতে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছতে সমর্থ হন। একটি মাত্র বইয়ের মাধ্যমে কাব্য সাম্রাজ্যে রাজত্ব করে আসা কবির কপালে বিরলপ্রজ তকমা জোটে।
মাহমুদ হাফিজের নেয়া সাক্ষাৎকারের আরো কিছু তথ্য : ২৫ বছর পর ২০১২ সালে বের হয় কবির ‘কবিতা একাত্তর’। এই বইয়ের ইংরেজি অনুবাদের নাম ‘দ্য টিয়ার্স দ্যাট বে্লজ’। কবিতা একাত্তরে প্রথম গ্রন্থের ৫৬টি কবিতার সঙ্গে ১৫টি নতুন কবিতা যুক্ত হয়। এ বছরের গোড়ায় এর সঙ্গে ১৭টি নতুন কবিতা যুক্ত হয়ে বের হয় দ্বিভাষিক বই ‘এক জীবনের জন্মজখম’। এর ইংরেজি অনুবাদ অংশের নাম রাখা হয়েছিল ‘বার্থ উন্ড অব ওয়ান লাইফ’। প্রথম বইয়ের পরের বইগুলো কিছু কবিতা যোগ ও অনুবাদের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তাই বর্তমান গ্রন্থকে কবি স্বয়ং তাঁর দ্বিতীয় মৌলিক কাব্যগ্রন্থ হিসেবে অভিহিত করছেন। ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’ কবিতাগ্রন্থের প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ করেছেন কৃতী শিল্পী ধ্রুব এষ।


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত