সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০২২

কমছে পাঠক বাড়ছে লেখক : হাসান হামিদ

আমার এই লেখাটি আপনি এখন পড়ছেন। আন্দাজ করতে পারি, এটি আপনি পড়ছেন সম্ভবত আপনার মুঠোফোন কিংবা ল্যাপটপ বা ডেস্কটপে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের লিংক থেকে! তাহলে কাগজে ছাপা পত্রিকা কিংবা বই কি তেমন কেউ পড়েন না? নিশ্চয়ই পড়েন, তবে এ সংখ্যা কিছুটা কমে যাচ্ছে। কমে যাচ্ছে তবে হারাচ্ছে না। আবার বিশ্বজুড়েই কাগজের বইয়ের বিক্রি কিন্তু বাড়ছে।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ যখন বিশ্বব্যাপী বাড়ছিল, তখন সবাই ভেবেছিল এই সময়ে ই-বুকের বিক্রি বাড়বে, কমে যাবে ছাপা বইয়ের বিক্রি। অথচ অবাক ব্যাপার হলো করোনাকালেও ছাপা বই-ই বিক্রি হয়েছে বেশি। বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালে বিশ্বের বইয়ের বাজার ছাপা বই থেকে আয় করেছে ১৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ই-বুক বিক্রি হয়েছে মাত্র ১০ শতাংশ। তবে সামনে এই ই-বুক বিক্রি কিছুটা বাড়বে, কেননা মানুষ বর্তমানে বেশি সময় কাটায় স্মার্ট ফোন বা কম্পিউটারে।

ঢাকায় সদ্য শেষ হওয়া অমর একুশে বইমেলায় প্রায় ৫২ কোটি টাকার বেশি বই বিক্রি হয়েছে বলে জানা গেছে। মনে প্রশ্ন জাগে, এর মধ্যে কত টাকার বই আসলে পঠিত হবে? যদিও এ হিসাব বের করা সম্ভব নয়। প্রমথ চৌধুরী তাঁর এক লেখায় বলেছেন, ‘বই কিনলেই যে পড়তে হবে, এটি হচ্ছে পাঠকের ভুল। বই লেখা জিনিসটা একটা শখমাত্র হওয়া উচিত নয়, কিন্তু বই কেনাটা শখ ছাড়া আর কিছু হওয়া উচিত নয়।’ আসলে আজকের দিনে নর্মান মেলরের মতো পাঠক পাওয়া সম্ভব কি না ভাবতে হবে। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি চাই যে, বই পাঠরত অবস্হায় যেন আমার মৃতু্য হয়!’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রকাশকদের হিসাব অনুযায়ী ২০২১ সালের করোনাকালীন বইমেলায় মোটামুটি ৩ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছিল। আর করোনাকালের আগের সর্বশেষ মেলায় অর্থাত্ ২০২০ সালে বিক্রি হয়েছিল প্রায় ৮২ কোটি টাকার বই। ২০১৯ সালে প্রায় ৮০ কোটি টাকার, ২০১৮ সালের মেলায় বই বিক্রি হয়েছিল ৭০ কোটি টাকার বই। ২০১৭ সালে বিক্রি হয়েছিল ৬৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা, ২০১৬ সালে ৪২ কোটি, ২০১৫ সালে বই বিক্রি হয়েছিল প্রায় ২২ কোটি টাকার বই। আর ২০১৪ সালের বইমেলায় বই বিক্রি হয়েছিল মাত্র সাড়ে ১৬ কোটি টাকার। এ বছর ২০২২ সালের মেলায় অনেকে ভেবেছিলেন অনেক বেশি বই বিক্রি হবে। কিন্তু তা হয়নি। এবার বিক্রি হয়েছে ৫২ কোটি টাকার বই। ২০২০ সালের বইমেলায় বাংলা একাডেমি বিক্রি করেছিল মোট ২ কোটি ৪৬ লাখ টাকার বই এবং ২০২১ সালে মাত্র ৪৬ লাখ টাকার বই। এবার বাংলা একাডেমি বিক্রি করেছে ১ কোটি ২৭ লাখ টাকার বই।

একাডেমির দেওয়া তথ্যমতে, ২০২২ সালের মেলায় মোট বই প্রকাশ হয়েছে ৩৪১৬টি। অবশ্য নতুন বই প্রকাশের ক্ষেত্রে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ২০২০ সালে নতুন বই এসেছিল ৪৯১৯টি। তবে এ হিসাব বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্রে জমা পড়া বইয়ের। এর বাইরেও মেলায় নতুন বই প্রকাশিত হয়ে থাকতে পারে।

প্রতিবছরই মেলার সময় মানসম্মত বই নিয়ে কথা ওঠে। এরপর এটি আর কারো মনে থাকে না। আবার যাঁরা এ নিয়ে কথা বলেন, তাঁদের অনেককে দেখি মানহীন লেখক বলে তাঁরা যাঁদের কথা বিভিন্ন সিকি সভায় আলাপে জিকির তুলেছেন, তাঁরা সেসব লেখকের পেছনে ডানে বামে কাচুমাচু দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন! অথচ তাঁরাই বলে বেড়ান, কোয়ানটিটি নয় বরং কোয়ালিটি চাই! অথচ প্রতিবছর মেলায় যে মানসম্মত কিছু বই প্রকাশ হয় তা কি অস্বীকার করার উপায় আছে? সেসব নিয়ে তাঁদের তো বলতে শুনি না!

আমার মনে হয়, একজন মানুষের দ্বিতীয়বার জন্ম হয়, যখন সে প্রথমবার পড়তে শেখে। কারণ সে তখন নতুন কিছু খুঁজে পায়, কিছু হয়তো গ্রহণ করে, কিছু বাদ দিতে শেখে। পড়তে পড়তে সে একসময় কিছু লিখতে চায়। বই প্রকাশ করতে চায়। তা লিখুক না! কে মানসম্মত, কে মানহীন তা সময়ই বলে দেবে! দুই দশক আগে দেদারসে বিক্রি হতো যাঁর বই, তাঁর একজন পাঠকও এখন নেই, তেমন লেখক এ দেশে কিন্তু আছেন। আর আমাদের দেশের পাঠকের পাঠাভ্যাস নিয়ে তেমন কোনো জরিপ বা গবেষণা হয় না, যা বলা হয় আন্দাজে যার যা মনে আসে। কেবল ২০১৯ সালে ওআরজি-কোয়েস্ট একটি জরিপ পরিচালনা করেছিল এ নিয়ে। সেখানে তরুণদের বই পড়ার হার আগের দুই বছরের চেয়ে সেই বছরে ৬ শতাংশ কমেছে বলে তথ্য উঠে এসেছিল।

এবারের মেলার সময়, এটা প্রতিবারই হয়, কিছু লেখক মরিয়া হয়ে ওঠেন নিজেকে বেস্টসেলার লেখক প্রমাণ করতে। কেউ যদি সত্যি বেস্টসেলার হন, সেটি তাঁকে কোনো অনলাইন বই বিক্রির দোকানের একদিনের স্ক্রিনশট দিয়ে প্রমাণ করতে হবে কেন? কেউ বেস্টসেলার হলে পরিস্হিতিই সেটি জানান দেবে, পাঠকের ঘরে ঘরে তাঁর বই থাকবে। যে দেশে বেশির ভাগ লেখকের বই-ই ছাপা হয় প্রথম মুদ্রণে ৩০০ কপি, সেখানে নিজেকে এসবে শামিল করার অর্থ কী! একদিনের সেই স্ক্রিনশট একজন লেখককে আসলেই কি বিপুল পাঠকের মনে জায়গা করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে? লেখক অনেক সম্মানিত মানুষ। প্রকৃত বেস্টসেলার লেখক কখনো বলে বেড়াবেন না, প্রমাণ করতে চাইবেন না যে, তিনি বেস্টসেলার। বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছেন, ‘একটি বই পড়ার দুটি উদ্দেশ্য থাকা উচিত; একটি হলো—বইটিকে উপভোগ করা আর অন্যটি হলো—বইটি নিয়ে গর্ব করতে পারা।’ ভেবে দেখুন যে বইটি আপনি লিখছেন বা পড়ছেন সেটি কতটা প্রাসঙ্গিক, প্রয়োজনীয়, উপভোগ্য কিংবা একে নিয়ে গর্ব করা যায় কি না!

শেষ কথা হলো, আমাদের পড়তে হবে। লেখক হতে গেলে আরো বেশি পড়তে হবে। মার্ক টোয়েন এক লেখায় বলেছেন, ‘যার বই পড়ার অভ্যাস নেই আর যে পড়তে জানে না মানে নিরক্ষর, এই দুইজনের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।’ আসুন নিজে বই পড়ি, পরিবারে ছোটদের বই পড়তে উত্সাহ দিই; তাতে তারা হয়ে উঠবে স্বপ্নবান মানুষ।


© 2022 - Deshbarta Magazine. All Rights Reserved.