মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১

করোনায় এক অসহায় পৃথিবীর গল্প

প্রভাকর চৌধুরী

চারদিকে কেমন অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। যেন অদ্ভুত আঁধার নেমে এসেছে। এবং অস্বীকার করার উপায় নেই যে করোনা একধরনের আঁধার। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়টি হলো দু-তিন মাসের ভেতর প্রায় লাখ খানেক মানুষের মৃত্যুর কারণ একটি ছোট ভাইরাস। ধারণা করা হয় কয়েক লাখ ছাড়িয়ে যাবে করোনা–মৃত্যু।

বিশ্বায়নের আগে এ রকম মহামারির ইতিহাস ছিল। কিন্তু মানবসভ্যতার এমন অবগতির সময়ে এরূপ একটি মহামারি রাতারাতি পৃথিবীকে পুরোপুরি কাবু করে ফেলল ভাবতে অবাক লাগে। পৃথিবীতে অন্যান্য বহু কারণেও মানুষের মৃত্যু হয়। কিন্তু একটি ভাইরাস এভাবে রাজত্ব করবে এমনটি অনেকের ভাবনাতে ছিল না। একটি ছোট ভাইরাস অর্থনীতি, রাজনীতি, তাবৎ বিজ্ঞান, সমাজনীতিসহ প্রায় মানবসভ্যতাকে থামিয়ে দিল। শুধু আমেরিকায় করোনায় মৃত্যু ৮০ হাজারের বেশি। যুক্তরাজ্যে ৩০ হাজারের বেশি।

করোনা পৃথিবীর কাছে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। আমাদের ভাবনায় একসময় করোনার মতো ভাইরাস শুধু স্বাস্থ্যগত বিপর্যয় হিসেবে ছিল, অথচ মহামারি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বব্যাপী ক্ষুধা, দুর্ভিক্ষের লক্ষণ প্রকাশ্য। বলা হচ্ছে করোনার অর্থনৈতিক প্রভাব আগামী কয়েক প্রজন্মকে ভোগ করতে হবে। বলা হচ্ছে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও উন্নত করতে হবে। সবচেয়ে আশ্চর্য লাগে আমেরিকার মতো ধনী রাষ্ট্রে করোনায় মৃত্যু সর্বাধিক। চীন নিশ্চিতভাবে সত্য বলেনি। এটি চীনের চিরায়ত চরিত্র। বলা হয় চীন বহু আগেই করোনার মহামারি লুকিয়ে রেখেছিল। এসবই চরম অমানবিক। আবার হয়তো অনেক রাষ্ট্র প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা জানতে পারেনি, কারণ সামর্থ্য নেই। হয়তো অনেক রাষ্ট্রে শত শত করোনা রোগীর খবর কেউ জানেই না।

করোনায় বিশ্বের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ক্ষতির সম্মুখীন। বিজনেস ইনসাইডারের তথ্যমতে, বিশ্বের ১৮৮ রাষ্ট্রের সব শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ। এর ফলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী একধরনের বাধার সম্মুখীন। কিন্তু এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই, কারণ এসবের চেয়ে জীবনের মূল্য বেশি।

করোনার ছোবলে শিশু, তরুণ, বৃদ্ধ একে একে সবাই আক্রান্ত হলো। অথচ প্রথমে জানলাম শুধু জটিল রোগী এবং বৃদ্ধরাই বেশি বিপদগ্রস্ত। অথচ প্রকৃত সত্য হলো এমন সংক্রামক ভাইরাসে কেউ নিরাপদ নই। কারও পক্ষে নিশ্চিত নিরাপদ থাকার উপায় নেই।

মানুষ কত সমস্যায় জর্জরিত করোনাকালে তার একটি চিত্র দেখা যায়। বিশ্বব্যাপী মানুষকে বলা হলো স্টে হোম, স্টে সেইফ। কিছুদিন পর অধিকাংশ মানুষ বলে উঠল ভাতের জন্য তারা মরতে প্রস্তুত, তবু এভাবে ঘরে অভুক্ত থাকতে চায় না। এ থেকে বোঝা যায়, মানুষের সঞ্চয় কত কম। আমেরিকায় লকডাউনবিরোধী মিছিল করতে দেখা যায়। অস্ট্রেলিয়ার মানুষ সমুদ্রসৈকতে বেরিয়ে পড়েছে। একে বলা যায়, মানুষ জীবনের প্রয়োজনে লকডাউন ভেঙে জীবনকে ঠাট্টা করছে। আর বাস্তবতার আলোকে এসব কিছু খুব বেশি অস্বাভাবিক নয়।

করোনায় মৃত প্রিয়জনকে শেষবার দেখার সুযোগ পায়নি বহু মানুষ। কোথাও আবার ভয়ে প্রিয়জনকে দাহ বা কবর দিতে আসেনি কেউ, হয়তো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা কোনো স্বেচ্ছাসেবীর হাত ধরে নিতে হচ্ছে শেষ বিদায়।

করোনা প্রাদুর্ভাবের কালে বিভিন্ন শ্রেণির পেশাজীবী, শ্রমিক, কুলি এমনকি শিশু, শিক্ষার্থী সবাই যেন বিপর্যস্ত, বিব্রত। এ থেকে বোঝা যায় মানব সমাজের শিক্ষা কত কম। ক্ষণস্থায়ী মানব জীবনের এক বাস্তব চিত্র হয়ে উঠেছে করোনাভাইরাস। এ মহামারির সময়ে একটি হৃদয়বিদারক সত্য হলো আধুনিক সভ্যতার পুরোধা ইউরোপে করোনায় প্রতিদিন হাজারো মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।এসব দেখে দেখে মানুষের অসহায়ত্ব আবার প্রকাশ্য। মানুষের সীমার বাইরে কত শক্তিশালী ঘটনাবলি আর বস্তু আছে করোনাকালে ভাবতে ইচ্ছা করে।

করোনাকালে সবচেয়ে আলোচিত সত্যটি উপলব্ধি করা যায়। সেটি হলো মানুষ কত অসহায়! মানুষ কত বেশি দরিদ্র! মানুষের সঞ্চয় কত কম! প্রকৃতি মানুষের কত প্রতিকূলে! এ সময়ে দেখা যায় বিশ্বের সব লাভ–লোকসানের হিসাবের মূল্য কত কম!

আসলে করোনার মতো মহামারিতে মানুষের রাতারাতি করার কিছু নেই। বড় বড় স্বাস্থ্যবিদ ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীর চেষ্টা চলছে। সবাই আশাবাদী, হয়তো একদিন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বন্ধ হবে। হয়তো একদিন জীবন আবার ফিরে পাবে হারানো গতি। সৃষ্টিকর্তা মানুষকে হাসার অধিকার দিয়েছেন সুতরাং তিনিই মানুষের সহায় হবেন।

*লেখক: কলেজশিক্ষক, সিলেট।


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত