রবিবার, ০৩ জুলাই ২০২২

করোনায় আক্রান্ত রোগীদের বাড়তি যত্ন কীভাবে নিবেন?

ডা. আব্দুল্লাহ শাহরিয়ার

অধ্যাপক, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল

কভিডে আক্রান্ত হলে প্রাথমিক পর্যায়ে জ্বর, সর্দি, হাঁচি-কাশি, গলাব্যথা, শ্বাসকষ্ট, স্বাদ-গন্ধের অনুভূতি লোপ পাওয়া, অবসাদ ও দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। সুস্থ হওয়ার পরও করোনা রোগীদের মধ্যে নানা ধরনের জটিলতা থেকে যেতে পারে। আর যারা উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসের মতো দুরারোগ্য অসংক্রামক রোগে ভুগছেন, তাদের কভিড-পরবর্তী জটিলতায় ভোগার ঝুঁকি দুই থেকে তিন গুণ বেশি

ওমিক্রনের প্রভাবে করোনার সংক্রমণ সম্প্রতি বেড়ে গেলেও মৃত্যুহার এখনও আশঙ্কাজনক পর্যায়ে যায়নি। আবার আক্রান্ত হলেও যারা ভ্যাকসিন নিয়েছেন, তাদের অধিকাংশ দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছেন। আর যারা নেননি তাদের মধ্যে করোনাজনিত জটিলতা বা সমস্যা গত বছরের মতো মারাত্মক পর্যায়ে দেখা দিচ্ছে না। করোনাজনিত হাসপাতালে ভর্তির হারও অপেক্ষাকৃত কম। এ জন্য সরকারের নির্দেশনা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের ঢিলেঢালা ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ অবস্থা মোটেই কাম্য নয়। বিশেষ করে যারা উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা হাঁপানির মতো দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগে ভুগছেন, তাদের কিন্তু করোনা রোগকে হালকাভাবে নেওয়ার অবকাশ নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল-সিডিসির সহযোগিতায় আইইডিসিআরের ফিল্ড এপিডেমিওলজি ট্রেনিং প্রোগ্রাম (এফইটিপি-বি) কভিড-১৯ রোগীদের প্রাথমিক উপসর্গ এবং পরবর্তী জটিলতাগুলো নিয়ে যে গবেষণা পত্র প্রকাশ করেছে, সেখানে করোনায় আক্রান্ত ডায়াবেটিস ও হার্টের রোগীদের পরবর্তীতে অপেক্ষাকৃত বেশি ভোগান্তির চিত্র ফুটে উঠেছে। জাতিসংঘের স্বাস্থ্যবিষয়ক সংস্থা ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, গত সপ্তাহে বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৭১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, আর কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই বৃষ্টি পেয়েছে ১০০ শতাংশ। সংস্থাটি বলেছে, বিশ্বব্যাপী যারা করোনাভাইরাসে গুরুতরভাবে আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের ৯০ শতাংশ কোনো টিকা নেননি।

কভিডে আক্রান্ত হলে প্রাথমিক পর্যায়ে জ্বর, সর্দি, হাঁচি-কাশি, গলাব্যথা, শ্বাসকষ্ট, স্বাদ-গন্ধের অনুভূতি লোপ পাওয়া, অবসাদ ও দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। সুস্থ হওয়ার পরও করোনা রোগীদের মধ্যে নানা ধরনের জটিলতা থেকে যেতে পারে। আর যারা উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসের মতো দুরারোগ্য অসংক্রামক রোগে ভুগছেন, তাদের কভিড-পরবর্তী জটিলতায় ভোগার ঝুঁকি দুই থেকে তিন গুণ বেশি। তাদের শরীরে দেখা দিতে পারে উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে বেড়ে যেতে পারে সুগারের মাত্রা, নিদ্রাহীনতা, বুকে ব্যথা, মানসিক সমস্যা, স্মৃতিশক্তি হ্রাস পাওয়া, মেজাজ খিটখিটে হওয়া এবং হূৎস্পন্দন অনিয়মিত হওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

এসব সমস্যাকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কভিড-১৯ পরবর্তী জটিলতা বা ‘পোস্ট কভিড কন্ডিশনস’ বলে চিহ্নিত করেছেন। গবেষণার উপাত্ত থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি, করোনা থেকে সুস্থ হওয়ার তিন মাস পর ৭৮ শতাংশের শরীরে এ ধরনের কভিড-পরবর্তী জটিলতা দেখা যাচ্ছে। ছয় মাস পর ৭০ শতাংশ, ৯ মাস পর ৬৮ শতাংশ এবং এমনকি এক বছর পরও ৪৫ শতাংশ মানুষের শরীরে এ ধরনের সমস্যা থেকে যাচ্ছে। এ জন্য উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের কভিড-পরবর্তী উপসর্গে আক্রান্ত হওয়া কমাতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ বা চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া জরুরি।

আইইডিসিআরের গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের মধ্যে যারা নিয়মিত ওষুধ সেবন করছেন, তাদের কভিড-পরবর্তী জটিলতার ঝুঁকি যারা ওষুধ সেবন করেন না তাদের তুলনায় ৯ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।

একইভাবে ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে নিয়মিত ওষুধ সেবনকারীদের কভিড-পরবর্তী জটিলতার ঝুঁকি যারা ওষুধ সেবন করেন না তাদের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ কমে যায়।
সুতরাং ডায়াবেটিস আর হার্টের রোগীদের এ সময়টিতে যতটা সম্ভব সাবধানে চলাফেরা করতে হবে। তাদের অবশ্যই ভ্যাকসিন নিতে হবে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে মাস্ক পরে চলাফেরা করতে হবে।

আর করোনা যদি ধরেই বসে তবে পরিপূর্ণ বিশ্রামে থাকুন, সর্দি-জ্বর থাকলে প্যারাসিটামল আর অ্যান্টি হিস্টামিন সেবন করুন। চিকিৎসকের পরামর্শক্রমে নির্ধারিত হার্ট বা ডায়াবেটিসের ওষুধ নিয়মিত সেবন করুন। কোনো ধরনের বাড়তি সমস্যা যেমন শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে, বুকে ব্যথা হলে, পালস অক্সিমিটারে অক্সিজেনের মাত্রা কমে এলে বা ৯২ শতাংশের কম হলে তৎক্ষণাৎ হাসপাতালে ভর্তির প্রস্তুতি নিন।


© 2022 - Deshbarta Magazine. All Rights Reserved.