রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২০

করোনায় ঘরবন্দি জীবনে মানসিক সমস্যা ও প্রতিকার

সাকিনা কাইয়ূম

করোনার হাত ধরে পৃথিবী নামের এই গ্রহে মানুষের যে হারে মানসিক চাপ বাড়ছে তাতে রীতিমতো শঙ্কিত বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা। এ ভাইরাস আজ পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ঘরে বন্দি থাকার কারণে নভেল করোনা ভাইরাস মানুষের শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি মানসিক অসুস্থতার ওপরও মারাত্নকভাবে প্রভাব ফেলছে।

ধারণা করা হচ্ছে, করোনার প্রভাবে বর্তমানে শতকরা বিশ শতাংশ অর্থাৎ প্রতি পাঁচ জনে একজন মানুষ মনোরোগে আক্রান্ত হচ্ছে। 

২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে চীনে প্রথম যখন এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটে, আমরা বুঝতে পারছিলাম পুরো বিশ্বের ন্যায় আমরাও যেকোনো সময় এই ভাইরাসের কবলে পড়তে পারি। যেহেতু এই রোগের কোনো প্রতিষেধক নেই, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য আজ আমরা যখন লকডাউন হয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য গৃহবন্দি হয়ে আছি, অনেকেই তা মেনে নিতে পারছি না। ফলে আমাদের মাঝে অনেকেই মানসিক অসুস্থ হয়ে পড়ছি।

যারা হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, থাইরয়েড, ডায়াবেটিস, শ্বাসকষ্টের মতো রোগে আক্রান্ত তারাই বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন।

এদের মাঝে আপনিও মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়ে যাননি তো! তাহলে আসুন, মানসিক অসুস্থতার কিছু লক্ষণ জেনে নেওয়া যাক :

১. সূচিবায়ূ- অনেকেই মানসিক আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে একবার হাত ধুয়ে শুকিয়ে যাওয়ার আগেই আবার ধুতে যাচ্ছে। তারা অধিক সময় নিয়ে দিনে অনেকবার গোসল করে ফেলছে।  ভয়ে সারাক্ষণ সব জিনিসপত্র ধুচ্ছে ও পরিস্কার করছে। এরা করোনা আতঙ্কে অন্য স্বাভাবিক সব কাজ বাদ দিয়ে সারাদিন এক কাজ বারবার করায় সূচিবায়ূ মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। এই কারণে তারা পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছেও হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছেন।

২. উদ্বেগ– উদ্বেগ বা ভয় যা স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে তাকে উদ্বেগ ব্যাধি বলে। বর্তমান লকডাউন পরিস্থিতিতে অনেকেই এই মানসিক সমস্যায় ভুগছে। করোনায় মৃত্যু আতঙ্ক, অর্থনৈতিক সমস্যা, চাকুরী চলে যাওয়ার ভয় ইত্যাদি কারণে অনেকেই অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন। যার ফলে  তারা তাদের দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজ করতে পারছে না। তারা সব কিছুতেই বিরক্ত মনোভাব প্রকাশ করছে।

৩. ফোভিয়া- বিষণ্ণতা, বিষাদ অথবা হতাশা দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকলে অনেকেই এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এই অবস্থায় অনেকেরই সব কিছুতেই ভয় কাজ করতে পারে। এমনকি ছোট পোকা দেখেও ভয় পেতে পারে। 

৪. বাইপোলার (বিষণ্ণতা)- দীর্ঘ সময় ধরে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকায় একাকীত্ব ও চূড়ান্ত মানসিক ধাক্কার ফলে অস্বাভাবিক মেজাজ খারাপ হতে পারে, তারা হঠাৎ করেই ভীষণ রেগে যেতে পারে আবার খুব সামান্য কারণেই অস্বাভাবিক খুশি হয়ে যেতে পারে। 

৫. ঘুম সংক্রান্ত – অতিরিক্ত মানসিক চাপে অনেকেরই স্বাভাবিক ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে। তাদের স্বাভাবিক ঘুম আসা সত্ত্বেও ক্লান্তি অনুভূত হচ্ছে। তারা ঘুমাতে চেষ্টা করছে; কিন্তু তাদের মস্তিষ্ক ঘুমাতে চাচ্ছে না। ঘুমের সময় বিভিন্ন দুশ্চিন্তা গ্রাস করছে তাদের। আবার অনেকে হতাশাগ্রস্ত হয়ে অসময়ে অতিরিক্ত ঘুমাচ্ছে। 

৬. আবেগজনিত- যারা নিজেরাই কিছু নির্দিষ্ট আবেগকে অস্বাভাবিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম তাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণের ব্যাধিতে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। যেমন – অনেকেই করোনা আতঙ্কে প্যানিক হয়ে অতিরিক্ত ধর্মভীরু হয়ে পড়ছেন। অন্যান্য স্বাভাবিক কাজ সব বাদ দিয়ে সারাক্ষণ সৃষ্টিকর্তার আরাধনায় মগ্ন থাকছেন ও তার পরিবারের অন্য সদস্যদের উপরও মানসিক চাপ প্রয়োগ করছেন। হয়তো একজন মুসলিম সে তার ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ুয়া সন্তানকে এক দিনেই মাদ্রাসায় পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রী বানিয়ে ফেলতে চাইছেন আর একজন হিন্দু বানাতে চাইছেন পন্ডিত। হঠাৎ এই ধরণের পরিবর্তন তার ও তার পরিবারের অন্য সদস্যদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মানসিক চাপের কারণে হঠাৎ এই পরিবর্তনকে অস্বাভাবিক বাধ্যতামূলক ব্যাধি ও উদ্বেগজনিত ব্যাধি হিসেবেও শ্রেণীবদ্ধ করা হয়।

৭. খাদ্যভ্যাসজনিত- উদ্বেগ, ভয়, বিষন্নতার ফলে অনেকেরই খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আসছে। কারো খাওয়ার অরুচি হতে পারে যা তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটায়। আবার কারো অতিরিক্ত খাওয়ার ইচ্ছে জাগছে যা তাদের ওজন বাড়িয়ে অন্যান্য রোগের সৃষ্টি করতে পারে। 

৮. আত্মবিশ্বাস হারানো –  অনেকেই এই সময়ে নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে। নিজে কোন কাজটি করবে সে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের দেখে প্রভাবিত হচ্ছে। যেমন কেউ বললো, এই পরিস্থিতিতে নিজের ছবি বা খাবারের ছবি পোস্ট করা উচিত নয় । অথচ সে হয়তো সখ করে তার পরিবারের জন্য নিজের হাতে একটা রেসিপি রান্না করেছে, অবসরে তার এই রন্ধন সৃজনশীলতা বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে চাইছে। কিন্তু অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হাওয়ায় তার মাঝে দ্বিধা, সংকোচ, বিভ্রান্ত কাজ করা শুরু করলো। সে আর তার মনোভাব কাউকে প্রকাশ করতে পারলো না, যা দীর্ঘ সময় চলতে চলতে সে একসময় নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে। 

৯. মাদকদ্রব্যের ও অ্যালকোহলের ব্যবহার – এই সময় মানসিক ডিপ্রেসনের কারণে কেউ কেউ সিগারেট, অ্যালকোহল ও মাদক সেবনে আসক্ত হয়ে পড়ছে। যা তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। 

উপরোক্ত মানসিক সমস্যাগুলো প্রতিকারের উপায় – 

১. দৈনন্দিন কাজের রোজনামচা তৈরী করুন। 

আমাদের জীবনের একটা নতুন রুটিন বানিয়ে ফেলতে হবে। অফিসে বা অন্য কাজে যে সময়টা আপনি বাইরে থাকতেন, এখন ওই সময় আপনার পছন্দমতো অন্য কাজের একটা রোজনামচা তৈরী করুন। সময় মতো আহার, গোসল ও পরিষ্কার কাপড় পরিধান করুন। নিজেকে সুস্থ ও স্বাভাবিক মনে করুন।

২. দৈনন্দিন কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। 

নিজেকে সারাদিন ব্যস্ত রাখতে আপনার পছন্দের কাজ যেমন- বইপড়া, কোরআন তেলওয়াত করা বা শোনা, হাতের ছোটখাটো কাজ করা, ল্যাপটপে বা ডেস্কটপে অফিসের কোন কাজ থাকলে করে ফেলা, পছন্দের মুভি দেখা বা গান শোনার মতো আনন্দদায়ক কাজ করুন।এসব কাজ কখন কোনটি করবেন তা আপনার দৈনন্দিন রুটিনে অন্তর্ভুক্ত করে ফেলুন। 

৩. নিজের শরীরের প্রতি যত্নশীল হোন। 

এই সময় হালকা ব্যায়াম করা শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী।দৈনন্দিন ৩০ থেকে ৪০ মিনিট শরীর চর্চা করুন। মেডিটেশন করুন। নিজের ত্বকের যত্ন নিন। প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমান এবং পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার খান যা আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াবে। 

৪. যোগাযোগ রাখুন আপনজনদের সাথে। 

ফোন কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন এবং ইতিবাচক আলাপ করুন। এতে আপনার মন প্রফুল্ল থাকবে। 

৫. সঠিক তথ্য গ্রহণ করুন। 

দিনের নির্দিষ্ট সময় নির্ভরশীল উৎস থেকে তথ্য গ্রহণ করুন। মিথ্যা-বিভ্রান্তিকর তথ্য, গুজব, ভিত্তিহীন সংবাদ অস্থিরতা তৈরি করে মনোরোগের সৃষ্টি করে । তাই ভিত্তিহীন সংবাদ পরিহার করুন।

৬. বিরক্তি মনোভাব দূর করুন।

বিরক্তি মনোভাব দূর করতে যে কাজগুলো আপনি করতে পছন্দ করেন, তা অল্প সময়ের জন্য হলেও প্রতিদিন করুন। আপনার পছন্দের গান, নাটক, সিনেমা দেখুন বা ধর্মীয় গ্রন্থ পড়ুন। এতে বিরক্তিবোধ কমবে। ধর্মীয় অনুশাসন যেমন – নামাজ, ধর্মীয়গ্রন্থ পড়া, পূজা বা আরাধনা ইত্যাদি বাড়িতে পালন করুন।

৭. নৈরাশ্যজনক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করুন ।

কখনো যদি নৈরাশ্যজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়, ,স্বাস্থ্য সহায়ক কেন্দ্রে অথবা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে ফোন দিয়ে কাউন্সেলিং গ্রহণ করুন। অতিরিক্ত কাজ ও অধিক নেতিবাচক সংবাদ দেখা পরিহার করুন। মেডিটেশন করুন, এতে মনে প্রশান্তি আসবে। 

৮. ইতিবাচক দিক চিন্তা করুন।

সারাদিন মৃত্যু কয়জনের হলো না গুনে আক্রান্ত রোগীদের বেশিরভাগ সুস্থ হচ্ছেন এবং স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন তা ভাবুন। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের পর সুস্থ হয়েছেন, এমন কারো অভিজ্ঞতা জানার চেষ্টা করুন।

৯. সৃষ্টিশীল কাজ করতে চেষ্টা করুন। 

আপনার অবসর আনন্দময় করতে সৃষ্টিশীল কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। যেমন – গান গাওয়া, কবিতা লেখা বা আবৃত্তি করা, ছবি আঁকা, বাগান করা, পুরোনো জিনিস দিয়ে নতুন কিছু বানানো, নিজের ঘরকে নতুন করে সাজানো ইত্যাদি। এসব কাজ আপনাকে আনন্দ দেবে, মনে আনবে প্রশান্তি। 

১০. বাচ্চাদের প্রতি খেয়াল রাখুন।

লকডাউন বাচ্চাদেরও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে। যেসব বাচ্চারা দুরন্তপনায় বন্ধুদের সাথে মেতে থাকতো, আজ তারা গৃহবন্দী । তাই অভিভাবকদের তাদের বন্ধু হয়ে উঠতে হবে। তাদেরকেও পড়াশোনার পাশাপাশি সৃষ্টিশীল কাজের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে। বাড়িতে তাদের জন্য আনন্দময় পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

১১. ঘরে বসে খেলাধুলা করুন ।

এই সময়ে পরিবারের সদস্যদের সাথে আনন্দময় সময় কাটানোর জন্য লুডু, দাবা, কেরাম, বাগাডুলি, উনো, মনোপুলির মতো ঘরোয়া খেলা আমরা খেলতে পারি। যা আমাদের মোবাইল, কম্পিউটার ও ভিডিও গেমের প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত থাকলে দূর করবে। 

১২. ভবিষ্যত পরিকল্পনা করুন।

আমরা সময়টা কাজে লাগাতে ইতিবাচক ভবিষ্যত পরিকল্পনা করে ফেলতে পারি।  আমরা লিস্ট করতে পারি এই মাসে আমাদের কি কি খরচ কম হলো। বাইরে বের না হওয়ায়, অফিস খরচ কমলো, বিয়ের বা জন্মদিনের উপহারের টাকা বাচলো, বাইরে ঘুরতে যাওয়া বা খাওয়ার টাকা লাগলো না। আমাদের এই মাসে কত অর্থ আয় হলো বের করে সেই অর্থ পরবর্তীতে কিভাবে খরচ করবো তা আমরা পরিকল্পনা করে ফেলতে পারি। এতে আমাদের মানসিক উদ্বিগ্নতা কম হবে। 

১৩. টেলিমেডিসিন সুবিধা নিন।

যদি আমরা শারীরিক বা মানসিক যেকোনো অসুস্থতা অনুভব করি টেলিফোনে বা টেলি কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে চিকিৎসা নিতে পারি। এতে প্রাথমিক অবস্থায় খুব স্বল্প সময়ে আমরা সুস্থ হয়ে উঠতে পারি। আপনার সুস্থতাই পরিবার ও সমাজের নিরাপত্তা এবং জাতির সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।

একটা কথা মনে রাখতে হবে, আমরা যদি আমাদের সময়টাকে কাজে লাগাই তবেই এই সময়ের মূল্য থাকবে। দীর্ঘ সময় দুশ্চিন্তা, অবসাদ, বিষন্নতা, হতাশা, আতঙ্কগ্রস্হ থাকলে আমাদের মনের ওপর প্রভাব পড়বে যা হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, উচ্চ  রক্তচাপ এর মতো অসুস্থতা তৈরী করে আমাদের মৃত্যুও ডেকে আনতে পারে। 

তাই আমাদের মনকে স্বাভাবিক রাখতে হবে। সতর্ক থাকতে হবে নিজের ও পরিবারের প্রতি। তা না হলে পৃথিবী একসময় তার স্বাভাবিক গতিতে ঠিকই ফিরে আসবে, শুধু আপনি মনোরোগে আক্রান্ত হয়ে ভুগবেন চিরকাল। 


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত