রবিবার, ০৩ জুলাই ২০২২

করোনা-পরবর্তী শিক্ষাব্যবস্থার মান নিশ্চিতে উদ্যোগ প্রয়োজন

ড. জান্নাতুল ফেরদৌস

বৈশ্বিকভাবে পড়াশোনায় ব্যাঘাতের অর্থ হলো লাখ লাখ শিশু শ্রেণিকক্ষে থাকলে যে একাডেমিক শিক্ষা অর্জন করতে পারত, তা থেকে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বঞ্চিত হওয়া। সেসব শিশুদের জন্য এই একাডেমিক শিক্ষা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ যারা চরাঞ্চল, পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস করে এবং উপজাতি।

এসব শিশুদের বেড়ে ওঠা পারিপার্শ্বিক পরিবেশের তুলনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ অনেক বেশি অনুকূল হয় শিক্ষা গ্রহণের জন্য। কিন্তু দীর্ঘদিন করোনা মহামারির ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে সব শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাতের পাশাপাশি নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় হয়েছে। একইভাবে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছে আশঙ্কাজনকভাবে।

করোনা সংক্রমণের কারণে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। করোনা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে দীর্ঘ ১৮ মাস পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হয়। যদিও শ্রেণি কার্যক্রম চলছিল স্বল্প পরিসরে। সব শ্রেণির ক্লাস সব দিন হচ্ছিল না।

পরবর্তীতে নতুন করে করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় আবারও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা করে সরকার। গত ২১ জানুয়ারি থেকে এই ছুটি শুরু হয়ে ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলে। সেই বন্ধ থাকার সময়সীমা পরবর্তীতে আরও দুই সপ্তাহ বাড়ানো হয়। ফলে দীর্ঘদিন শিক্ষার্থীরা পাঠ পরিক্রমা থেকে দূরে থেকে যায়। দেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য এটি গভীর সংকট হিসেবে বিবেচিত হয়।

২০২১ সালের ১৯ অক্টোবরে ইউনিসেফ ও ইউনেস্কো প্রকাশিত এশিয়ায় শিক্ষা খাতের ওপর ‘কোভিড-১৯ এর প্রভাব ও মোকাবিলা কার্যক্রমবিষয়ক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ’ (সিটএন রিপোর্ট) শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের প্রথম দিকে কোভিড-১৯ মহামারি শুরুর পর থেকে স্কুল বন্ধ থাকায় বাংলাদেশে তিন কোটি ৭০ লাখ শিশুর এবং দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পূর্ব এশিয়াসহ এশিয়ার প্রায় ৮০ কোটি শিশুর পড়াশোনা ব্যাহত হয়েছে।

এছাড়া ২০২১ সালের আগস্টে ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে বলা হয় করোনাকালে লম্বা সময় ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষার স্তর পর্যন্ত বাংলাদেশে চার কোটিরও বেশি শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

প্রতিবেদনটি শিশুদের পড়াশোনার ওপর মহামারির অব্যাহত প্রভাব এবং তা মোকাবিলায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সরকারের গৃহীত কর্মসূচি ও উদ্যোগের কথা তুলে ধরে। প্রতিবেদনে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে স্কুলগুলোকে খুলে দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

মহামারি ভাইরাসের প্রভাবে স্কুল বন্ধের বিরূপ অবস্থা মোকাবিলায় শিক্ষার্থীদের সহায়তার জন্য বাংলাদেশ সরকার টেলিভিশন, মোবাইল ফোন, রেডিও এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে দূরবর্তী শিক্ষার সূচনা করেছিল। তবে সকল শিক্ষার্থীদের এ প্ল্যাটফরমগুলোতে অ্যাক্সেস না থাকায় শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য অর্জন ব্যর্থ হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, এ বিকল্প শিক্ষা পদ্ধতি এবং প্ল্যাটফরমে তাদের অ্যাক্সেস কম ছিল।

জরিপ করা স্কুলশিশুদের মধ্যে পাঁচ থেকে ১৫ বছর বয়সি যথাক্রমে ৫০ শতাংশেরও কম রেডিও, কম্পিউটার এবং টেলিভিশনে অ্যাক্সেস পেয়েছে। তাদের প্রায় সবারই মোবাইল ফোনে অ্যাক্সেস রয়েছে, তবে অনেকেরই ইন্টারনেটে অ্যাক্সেস নেই। এ সমীক্ষায় ধনী ও দরিদ্র পরিবারের মধ্যে একটি ডিজিটাল বিভাজনও পাওয়া গেছে।

ধনী পরিবারের সঙ্গে তুলনা করা হলে সবচেয়ে দরিদ্রতমদের মধ্যে ৯.২ শতাংশ টেলিভিশনে অ্যাক্সেস পেয়েছে। পক্ষান্তরে সবচেয়ে ধনীদের মধ্যে পেয়েছে ৯১ শতাংশ। অন্যান্য বিকল্প শেখার মাধ্যমে একই ধরনের প্রবণতা বিদ্যমান।

অন্য জরিপে দেখা গেছে, অনলাইন লার্নিং প্রোগ্রামগুলোতে অ্যাক্সেস থাকা ২১ শতাংশ পরিবারের মধ্যে মাত্র দুই শতাংশ পরিবার এর সঠিক ব্যবহার করতে পেরেছে।

বিশ্বব্যাংকের আরেকটি জরিপে দেখা গেছে, প্রাক-করোনা মহামারি সময়ে প৭াচ বছর বয়সি বাংলাদেশি শিশুদের মধ্যে প্রায় ৫৮ শতাংশ ন্যূনতম পড়ার দক্ষতা অর্জন করতে পারে না বলে অনুমান করা হয়েছে; অথচ মহামারিকালে স্কুল বন্ধের সময় এ সংখ্যাটি ৭৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনডেক্স-২০২০ এর একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, বাংলাদেশে একটি শিশু প্রাক-মহামারিকালে চার বছর বয়সে স্কুল পড়া শুরু করে সর্বোচ্চ ১৮ বছরের মধ্যে স্কুলজীবন শেষ করে থাকে। কিন্তু এ মহামারিকালে শিশুদের স্কুল শুরু করতে হচ্ছে প্রায় ৫-৬ বছর বয়স থেকে। ফলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন থেকে শুরুতেই দু-এক বছরে চলে যাচ্ছে।

ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এডুকেশন গ্লোবাল প্র্যাকটিস দ্বারা আবিষ্কৃত একটি সিমুলেশন যন্ত্রের মাধ্যমে একটি তথ্য জরিপে পাওয়া যায়, করোনার প্রভাবে স্কুল বন্ধের ফলে একজন গড় শিক্ষার্থীর জন্য লার্নিং-অ্যাডজাস্টেড স্কুলিংয়ের পাঁচ থেকে ৯ বছরের মধ্যেই ক্ষতি বেশি হয় বলে অনুমান করা হয়।

ফলে যদি নতুন কোনো কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের মতো ঘটনা ঘটে তাহলে এ ক্ষতির পরিমাণও বেড়ে যাবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারিতে এসএসসি এবং এপ্রিলে এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হতো।

তবে বাংলাদেশে করোনা মহামারির সংক্রমণ শুরু হওয়ায় ২০২০ বছরের ফেব্রুয়ারিতে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা হলেও আটকে যায় এইচএসসি। পরে অক্টোবরে শিক্ষামন্ত্রী ঘোষণা দেন তারা এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ছাড়াই সনদ দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

ফল ঘোষণার এই সিদ্ধান্তে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তিনটি আইন। সেগুলো সংশোধন করে ২০২১ সালের ৩০ জানুয়ারি ঘোষণা করা হয় ফল। আগের দুই বছরে ৭৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ এবং ৬৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ পাস করলেও অটোপাসে শতভাগ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়।

এতে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বাড়ে তিনগুণের বেশি। তাই শিক্ষাক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া ক্ষতিগুলোর মধ্যে তালিকায় একেবারে ওপরের দিকে অটোপাসকে রাখা যেতে পারে। কারণ এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের মানদণ্ড নিশ্চিতে কোনো আদর্শিক কাঠামো মানা হয়েছে বলা যায় না।

তবে বর্তমানে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পুরোদমে প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তাই ইতোপূর্বে মহামারি চলাকালীন শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া, অসম শিখন সমস্যা, বাল্যবিয়ে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথাও জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

করোনার এ ক্ষতি পোষাতে সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থাও এগিয়ে আসছে। এরই অংশ হিসেবে বিশ্ব ব্যাংকের মাধ্যমে ‘গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফর এডুকেশন’ (জিপিই) ‘বাংলাদেশ কোভিড-১৯ স্কুল সেক্টর রেসপন্স (সিএসএসআর)’ প্রকল্পের আওতায় ১৪ দশমিক আট মিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় ১২০ কোটি টাকা অনুদান দিচ্ছে।

প্রকল্পের আওতায় মোট ২৫ লাখ শিক্ষার্থীকে দূরশিক্ষণের মাধ্যমে প্রথম থেকে দশম শ্রেণির পুরো শিক্ষাবর্ষের জন্য ৩৫টি বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ও যথাযথ ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করা হবে।

এসব কনটেন্ট স্থবির হয়ে পড়া শিক্ষাব্যবস্থাকে বেগবান করবে এবং শিক্ষার্থীদের যথাযথ শিক্ষার মান নিশ্চিত করবে। দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার মানের নিম্নমুখিনতা অনেক দিন থেকেই দৃশ্যমান। এই ধারায় করোনাকালের দীর্ঘ সময়ে শিক্ষার্থীদের শিখন উদ্দেশ্য সেই নিম্নমুখিনতাকে তলানিতে নিয়ে গেছে। অপরদিকে ব্যবহারিক ক্লাস পরীক্ষাভিত্তিক বিভাগগুলো স্বাভাবিকভাবেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

অন্য বিভাগগুলোর অবস্থা সে তুলনায় খুব ভালো সেটি বলার সুযোগ নেই। করোনাউত্তর এই সময়ে অবস্থা যে খুব ঘুরে দাঁড়াবে বর্তমান বাস্তবতায়ও সে স্বপ্ন দেখা কষ্টকর। আবার রাজনীতির বেড়াজালে ক্ষমতার শক্তিকেন্দ্র হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসকে ব্যবহার করতে গিয়ে ‘একাডেমিক এক্সেলেন্সি’ শব্দটিকে অচেনা হয়ে পড়েছে।

এমন বাস্তবতায় করোনাউত্তরকালে উচ্চশিক্ষার অঙ্গন শিক্ষা গবেষণায় উজ্জীবিত হবে সে ভরসা কমে এসেছে। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আমাদের সার্বিক শিক্ষাকাঠামোকে যদি স্বস্তির জায়গায় নিয়ে আসতে হয় তাহলে শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন।

মূলত, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বারবার হোঁচট খায় সুস্পষ্ট পরিকল্পনা এবং যুগোপযোগী ধারণার প্রয়োগের অভাবে। এ ধারায় মুক্তচিন্তার বিশেষজ্ঞ কম পাওয়া যায়। এসব ক্ষেত্রে আপসহীন প্রয়োগের জন্য বিশ্বমানের পরিকল্পনা প্রস্তুত থাকলে শিক্ষা ব্যবস্থাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব।

সর্বোপরি, প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের পর তা খুলে দেয়াতেই শিক্ষার গতি বৃদ্ধি কিংবা মানোন্নয়ন নিশ্চিত হয়ে যায় না বরং শিক্ষায় বিশাল আকারের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আনা দরকার। এটা সত্য যে, করোনার কারণে শিক্ষার ছত্রছায়া থেকে অনেক শিক্ষার্থী দূরে সরে গেছে।

তাদের আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনতে সরকারকে দীর্ঘ প্রচেষ্টা চালাতে হবে। করোনার কারণে শিক্ষায় ক্ষতি পুষিয়ে নিতে হলে শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি আরও বেশি মনোযোগী হতে হবে। শিক্ষাই পারে একটি দেশ ও জাতিকে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে নিয়ে যেতে। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমন দুর্বল অবস্থায় ফেলে রাখলে চলবে না বরং পদক্ষেপ গ্রহণে এখনই আরও বেশি দৃঢ়চেতা হওয়া জরুরি।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, লোক প্রশাসন বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়


© 2022 - Deshbarta Magazine. All Rights Reserved.