সোমবার, ২৯ নভেম্বর ২০২১

করোনা মোকাবেলায় যা করা জরুরি : ডা. জুনায়েদ আহমেদ

করোনা মোকাবেলা প্রস্তুতিতে বার বার হাত ধোয়া আর সামাজিক দূরত্ব মানা ছাড়াও এই মুহুর্তে আরো কিছু পরিকল্পনা নিতে হবে আমাদের। বাস্তবায়ন করতে হবে দ্রুত।

যে হারে আক্রান্ত এবং মৃতের সংখ্যা বাড়ছে তাতে করোনা মোকাবেলা অবশ্যই জটিল হয়ে পড়েছে।
কিন্তু প্রথম থেকেই আমরা সমন্বিত পদক্ষেপের অভাবে এটা আরো জটিলতর করে তুলেছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে এর মোকাবেলায় মোটা দাগে মাত্র কয়েকটি পদক্ষেপ প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজন মনে করি। সঠিক পদক্ষেপই পরিস্তিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসবে-

১। প্রতিটি এলাকা লকডাউন কঠোরভাবে করতে হবে। লক মানে গেইটলক। প্রতিটি এলাকা লকডাউন করা অন্তত আরো ১৫ দিনের জন্য।

২। কিন্ত এরকম লকডাউন মেইন্টেইন করতে হলে, দিনমজুর মানুষদের ঘর বন্দী রাখতে হবে। আর সেটি নিশ্চিত করতে হলে প্রতিটি ঘরে ঘরে কার্ড সিস্টেমের মাধ্যমে রেশন অথবা টাকা পৌছানোর ব্যবস্থা শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে। আর এতে সরকার এর পাশাপাশি বেসরকারি ফান্ড কালেক্ট করতে হবে। আর ত্রাণ ব্যবস্থাপনা সরাসরি সেনাবাহিনী’র মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
এরপরও যারা খুব ইমার্জেন্সি ছাড়া বের হবে তাদেরকে কঠোর হাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দমন করবে। প্রয়োজনে রাবার বুলেট ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখবে।

৩। প্রতিটি উপজেলায় ‘ফিবার পয়েন্ট’ চালু করতে হবে, সেখানে ফুল পিপিই পরিহিত চিকিৎসক স্ক্রিনিং করে যাদেরকে করোনা সাস্পেক্ট করা হবে তাদেরকে ওই উপজেলার আইসোলেশন সেন্টারে রাখা হবে। এরকম ২০-৩০ বেডের এক‌টি আইসোলেশন সেন্টার প্রতিটি উপজেলায় করা কোন ব্যাপার না।

৪। উপজেলা থেকেই সাসপেক্টেড রোগীদের স্যাম্পল কালেকশন করে নির্দিষ্ট পরীক্ষাকেন্দ্রে পাঠাতে হবে। যাদের পজিটিভ আসবে তাদেরকে উপযুক্ত প্রোটেকশনের মাধ্যমে জেলা সদরে পাঠাতে হবে। আর যারা নেগেটিভ আসবে তাদেরকে হোম কোয়ারেন্টাইন ১৪ দিন পালন করতে হবে। এদের মনিটরিং এর জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একদল সেচ্ছাসেবক থাকবে।

৫। প্রতিটি জেলা সদরে এক‌টি করে করোনা হাসপাতাল প্রস্তুত করতে হবে। এক্ষেত্রে জেলা সরকারি হাসপাতালকে করোনা হাসপাতালে ট্রান্সফর্ম করলে ভাল হয়।

৬। অন্যান্য রোগীর চিকিৎসার জন্য প্রতিটি জেলার সবচেয়ে বড় ক্লিনিকটা সাময়িক অধিগ্রহণ করতে হবে সরকারি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। প্রয়োজনে ওই ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের সাথে ভর্তুকি কিংবা সমোঝতার ভিত্তিতে।

৭। প্রতিটি জেলার করোনা হাসপাতালে অন্তত ৫০টি সাধারণ বেড এবং ৫টি আইসিউ বেড থাকতে হবে। তবে অক্সিজেন এর পর্যাপ্ততা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।

৮। জেলা হাসপাতালের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে যেসব রোগী, তাদের অতিস্বত্তর বিভাগীয় করোনা হাসপাতালে উপযুক্ত প্রোটেকশনের মাধ্যমে পাঠাতে হবে।

৯। প্রতিটি বিভাগীয় শহরে সরকারি হাসপাতালের একাংশে কিংবা কোন প্রাইভেট হসপিটাল যেখানে আইসিউ ফ্যাসিলিটি তুলনামূলক বেশী সেখানে কম পক্ষে ২৫০ বেড এর স্পেশালাইজড করোনা হাসপাতাল তৈরী করতে হবে, সরকারি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে।

এই হলো আমাদের চেইন অফ রেফারেল সিস্টেম।
তাহলে, আমাদের মোট ৪৯২টি উপজেলায়, ৪৯২x৩০= ১৪৭৬০টি আইসোলেশন বেড থাকবে। যেখানে অক্সিজেন সিলিন্ডার এর ব্যবস্থা থাকতে হবে।
মোট ৬৪টি জেলায় ৬৪x৫০=৩২০০ করোনা পজিটিভ রোগীর বেড থাকবে, এর মধ্যে ৬৪x৫=৩২০টি আইসিইউ বেড থাকবে।
মোট ৮টি বিভাগে ৮x২৫০ =২০০০ বেড করোনা রোগীর জন্য প্রস্তুত থাকবে, সাথে আইসিউ বেড অন্তত পক্ষে ৮x২৫= ২০০টি থাকতে হবে।

উপরোক্ত সিস্টেম কি খুব কঠিন কিছু হচ্ছে? মোঠেই না। এই রকম প্রস্তুতি বাস্তবায়নে কিন্তু কাঠামো প্রস্তুত আছে শুধু ট্রান্সফরমেশন প্রয়োজন। ডাক্তার, নার্স, সাপোর্টিভ স্টাফ সবই পর্যাপ্ত আছে। পিএসসি কর্তৃক বাছাই করা ৮০০০ এর উপরে নন-ক্যাডার ডাক্তার এর এক‌টি পুল রয়েছে, যাদেরকে সরকার চাইলেই নিয়োগ দিয়ে কাজে লাগাতে পারে।
প্রশাসন এর জনবলও পর্যাপ্ত রয়েছে। সরকার চাইলে স্থানীয়ভাবে দ্রুত প্রশিক্ষণ এর মাধ্যমে সেচ্চাসেবকও নিয়োগ নিতে পারে।

কিন্তু সবথেকে ইম্পোর্ট্যান্ট হল এই চেইন এর মধ্যে যারা ফ্রন্ট লাইনের যোদ্ধা হিসেবে কাজ করবে তাদেরকে অবশ্যই অবশ্যই পর্যাপ্ত পিপিই সাপ্লাই দিতে হবে। তাদের পরিবারের দায়িত্ব নিতে হবে। তাদেরকে সাস্থ্যবীমার অধীনে নিয়ে আসতে হবে। সবাই এখন সাধ্যমতো কাজ করছে এতে বিন্দু পরিমাণ সন্দেহ নেই।

আমি মনে করি চাইলে এরকম কিছু দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব। আর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে চিকিৎসক এবং প্রশাসনের দক্ষ লোকদের নিয়ে একটি জাতীয় কমিটি গঠন করতে হবে যারা এই পরিকল্পনা দ্রুতগতিতে বাস্তবায়ন করবে।

এদেশ যদি নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু বানাতে পারে, তাহলে করোনা মোকাবেলা করতে সারাদেশে এরকম প্রস্তুতি নেয়া অসম্ভব কিছু না।

লেখক- ডা. জুনায়েদ আহমেদ, Resident (Phase -A) Neurosurgery, Chittagong Medical College


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত