সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০২২

কাগজের বই কি বিলুপ্ত হতে চলেছে?

জাহাঙ্গীর সুর

কাগজের দিন সত্যি কি ফুরিয়ে আসছে? তাহলে, ছাপাছাপির দিনও ইতিহাস হয়ে যাচ্ছে? মানে, কাগজের বই কি বিলুপ্ত হতে চলেছে? কতদিন টিকবে মানব-যোগাযোগের এই মাধ্যম? এসব নিয়ে দীর্ঘ আলাপ করেছেন লেখক জেফ গোমেজ ‘প্রিন্ট ইজ ডেড: বুকস ইন আওয়ার ডিজিটাল এইজ’ গ্রন্থে। বইটি ২০০৮ সালে নিউ ইয়র্ক থেকে পালগ্রেভ ম্যাকমিলান প্রকাশ করেছিল। বইটির দশম অধ্যায়ের শিরোনাম ‘উইল বুকস ডিসঅ্যাপিয়ার’ (পৃ. ১৭৪-১৯৩)। গোমেজের সেই চিন্তাকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন জাহাঙ্গীর সুর

ডিজিটাল পঠন-ব্যবস্থার কারণে কয়েক দশকের মধ্যে মুদ্রিত মাধ্যমের (যেমন বই, সামিয়কীপত্র ও সংবাদপত্র) প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে যাবে, ক্রমেই কমবে এদের জনপ্রিয়তা। কিন্তু বই কখনই পুরোপুরি বিলুপ্ত হবে না। তখনও বই খুঁজবেন সংগ্রাহকরা, যারা বইয়ের পাতাগুলো, প্রচ্ছদ ও সুরক্ষা মোড়ক (ডাস্ট জ্যাকেট) ছুঁতে ও ধরে রাখতে ভালোবাসেন। বিশ্বজুড়ে লাখো কোটি বাড়িতে বই তখনও থাকবে। তবে ধীরে ধীরে বই বিরল হয়ে উঠবে, কারণ তখন মুদ্রকরা এ ব্যবসা ছেড়ে অন্য কোনো উদ্যোগ নেবে, বইয়ের মোড়ক মিলবে কেবল গুদামগুলোয়।

কিছু লোক তখনও কাগজের গায়ে কালিতে লেখা পাঠই বেশি পড়তে চাইবে, তবে তাদের সংখ্যা ক্রমশ হ্রাস পাবে। এখনকার ঠিক উল্টোটা তখন ঘটবে। এখন তো বেশিরভাগ সংবাদ ও কল্পকাহিনী কাগজে ছাপা হয়, এবং খুব সামান্য একটা অংশ ডিজিটাল মাধ্যমে পাওয়া যায়। কিন্তু ভবিষ্যতে, বেশিরভাগ সংবাদ ও যোগাযোগ ঘটবে ডিজিটাল মাধ্যমে, এবং খুব সামান্য পরিমাণে সংবাদ ও যোগাযোগ ঘটবে মুদ্রিত মাধ্যমে।

ডিজিটাল পঠনের আধিপত্যের যুগে বই কিন্তু শিল্পরূপে সমাদৃত হবে। ২০০৪ সালে প্রকাশিত দ্য ফল অব অ্যাডভার্টাইজিং অ্যান্ড দ্য রাইজ অব পিআর (বিজ্ঞাপনের পতন, জনসংযোগের উত্থান) গ্রন্থে আল রিজ ও লরা রিজ আলোচনা করেছেন, বিদ্যুতের উদ্ভাবন কীভাবে ঘরের আলোক-উৎস হিসেবে মোমবাতিকে অনাপরিহার্য করেছে, মোমবাতি এখন কেবলই একটা শিল্প। এডিসন আলোকবাতি উদ্ভাবন করার পরে যা ঘটেছে, তা বোঝাতে রিজ যুগল উপমারূপে বলেছেন, এ যেন ‘মোমবাতির পতন ও আলোকবাতির উত্থান’। তারা লিখেছেন, ‘প্রতি রাতে আমেরিকায় লাখো লাখো মোমবাতি পোড়ে। টেবিলে মোমবাতি ছাড়া কোনো রোমান্টিক ডিনার সম্পূর্ণ হয় না। একেকটা মোমবাতি বিক্রি হয় ২০ থেকে ৩০ ডলারে, আলোকবাতির চেয়ে দামে বেশি। বিদ্যুৎবাতি যত আলো ছড়ায়, সেই তুলনা টেনে কিন্তু মোমবাতির মূল্য বোঝা যাবে না। আখা আর পালতোলা নৌকার মতো, মোমবাতি আসলে এর কার্যকারিতা হারিয়েছে কিন্তু রূপ নিয়েছে শিল্পে।’

বইয়ের বেলাতেও একই ঘটনা ঘটবে। মানুষ ধীরে ধীরে ডিজিটাল মাধ্যমেই তাদের দরকারি তথ্য অনুসন্ধান ও গ্রহণ করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। এভাবে একটা সময় আসবে যখন ডিজিটাল রূপেই তথ্য পাওয়ার প্রত্যাশা এবং চাহিদা বেড়ে যাবে। তখন সাধারণ উপযোগ হারিয়ে ফেলবে বই। তবে অনেক মানুষের জীবনে বই তখন একটা শিল্প হয়ে উঠবে।

আরও কয়েক দশক এবং পরবর্তী শতাব্দীতেও মানুষ বই পড়তে চাইবে এবং পড়বেও। ঠিক যেমন এডিসন আলোকবাতি উদ্ভাবনের পরেও শতবর্ষ ধরে মোমবাতি পরিবারে একটি সাধারণ পণ্য হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছিল। তবে বই ক্রমেই সেকেলে বস্তু, প্রাচীন নির্দশন হয়ে উঠবে। সুতরাং, মুদ্রণের মৃত্যু বা বিলুপ্ত হওয়া নিয়ে যতই ভয়ানক ভবিষ্যদ্বাণী করা হোক না কেন, বই কিন্তু কখনই পুরোপুরি উধাও হয়ে যাবে না। ‘দি এন্ড অব দি অ্যাফেয়ার’ কিংবা ‘অব হিউম্যান বন্ডেজ’-এর মতো দুর্দান্ত উপন্যাসগুলো তখনও কাগজের বই হিসেবে পাওয়া যাবে। তবে এগুলো সাধারণ পাঠকদের জন্য নয়, বরং সংগ্রাহকদের সংস্করণ হিসেবে মুদ্রিত হবে।

চিরায়ত গ্রন্থ ছাড়াও, আরও কিছু বই কাগজে ছাপা হবে, কেননা কিছু বিশেষ পাঠক তখনও মুদ্রিত বই পড়তে চাইবেন। ছাপা বইয়ের বাজার আজ ঠিক যত বড়, ভবিষ্যতে ঠিক ততই ছোট হয়ে আসবে এই বাজার। অল্পসংখ্যক নির্দিষ্ট কিছু পাঠক হয়তো তখনও বিশেষ কিছু ছাপা বই খুঁজবে। এসব বইয়ের মধ্যে পড়বে বেশি বিক্রিত বা বিক্রিসেরা (বেস্টসেলার) ও কল্পকাহিনী এবং ড্যান ব্রাউন, ডেনিয়েল স্টিল ও জেমস প্যাটারসনের মতো সাহিত্যিকদের লেখা বই। তবে সব মিলিয়ে এ ধরনের বই সারা বছরজুড়ে প্রকাশিত মোট বইয়ের তুলনায় সংখ্যায় অনেক কম হবে। এ ধরনের বই পড়ায় অভ্যস্ত ভোক্তাদের জন্য বাজারে অবিশ্বাস্যরকম কম বই থাকবে।

কয়েক দশকের মধ্যেই মুদ্রিত বইয়ের অনুরাগীরা এমন একটা পরিস্থিতিতে পড়বেন যে তারা পছন্দসই বই কাগজে ছাপা অবস্থায় সেভাবে খুঁজে পাবে না। কারণ, ততদিনে উপন্যাস এবং কল্পকাহিনী নয় এমন (নন-ফিকশন) বইও ডিজিটাল মাধ্যমে অনেক বেশি হারে ছড়িয়ে পড়বে। অবশ্য, তারা যদি ড্যান ব্রাউন, ডেনিয়েল স্টিল কিংবা জেমস প্যাটারসনের ভক্ত হয়, তাহলে হয়তো সেসব ছাপা বই তখনও পাওয়া যাবে।

কিন্তু নতুন নতুন পাঠ বৈদ্যুতিন সংস্করণ সুলভ হওয়ার দরুণ ডিজিটাল মাধ্যমে পড়ার প্রবণতা বাড়বে দারুণভাবে। প্রতি বছর যত বেশি মানুষ এতে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে, ডিজিটাল মাধ্যমকেই পড়ার প্রাথমিক সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করবে, মুদ্রিত বইয়ের চাহিদা ততই কমে যাবে। ফলে ছাপ বই ততই দুর্লভ হয়ে উঠবে। পাঠক আধেয়র (কন্টেন্ট) প্রতি গুরুত্ব দেয়। ভবিষ্যতেও তারা আধেয়কেই বেশি গুরুত্ব দেবেন, তা যে মাধ্যমেই পাওয়া যাক না কেন। দ্য ভিঞ্চি কোড-এর বিরাট সাফল্য এই জন্য যে, গল্পটা পাঠকদের টানতে পেরেছে। এমনকি উপন্যাসটি যদি টিস্যু-কাগজেও ছাপা হতো তাতেও লোকে বইটি কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ত।

লোকে আজ বেশি বই কেনে ‘বার্নেস অ্যান্ড নোবল’ কিংবা ‘বর্ডার্স’-এর মতো বড় সারির বইবিপণী থেকে। কিন্তু যেহারে হু হু করে অনলাইন বিপণী বাড়ছে এবং অ্যামাজন ও অন্যরা যে হারে ছাড় দিচ্ছে ও যেভাবে পরিষেবা সরবরাহ করে, এতে ছোট সারির বইবিক্রির দোকানগুলো কয়েক বছর ধরেই ধুঁকছে।

২০০৭ সালে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসে জুলি বসম্যান লিখেছিলেন, ‘বড়সারির বইবিক্রেতা ও ওয়েবে খুচরা বিক্রেতাদের কারণে প্রায় দুই দশক ধরে স্বতন্ত্র বইবিপণীগুলো কোণঠাসা।’ না পেরে অনেকে এ ব্যবসা ছেড়ে দিচ্ছে। তবে এখনও টিকে থাকার লড়াই চলছে।

ছোটসারির বইবিপণীগুলো উঠে যাওয়ার কারণে বেশিরভাগ শহরে বিকল্প হয়ে উঠছে বার্নেস অ্যান্ড নোবলের মতো বড়বিপণীগুলো। ওয়াল-মার্ট, টার্গেট ও কস্টকোর মতো আরও বড়বিপণীগুলো আজকাল বই বিক্রির আলাদা বিভাগ চালু করেছে যারা সর্বশেষ বিক্রিসেরা বইগুলো বিক্রি করে। এমনকি বই বিক্রির কথা নয় এমন বিপণীগুলো যেমন ‘স্টারবাকস’ সীমিত সংখ্যায় হলেও বই বিক্রি শুরু করেছে।

ভবিষ্যতে ছাপা বইয়ের চেয়ে ডিজিটাল বইয়ের চাহিদা আরও বেশি থাকবে। এখন যারা কোনো মতে টিকে আছে, সেসব স্বতন্ত্র বইবিপণীর সুদিন সেদিন ফিরবে। কেন? কারণ, তখন ছোটসারির বইবিপণীগুলো এমন সব কাজ করতে পারবে বড় বড় প্রতিদ্বন্দ্বীরা যা করতে পারবে না।

২০০৭ সালে দ্য নিউ ইয়র্ক সানে মাইক পিড লিখেছেন, ‘যখন নাকি চটিবাটি গুছিয়ে নেওয়ার কথা, তখনও কিন্তু নতুন নতুন বইবিপণীর যাত্রা শুরু হচ্ছে। [নিউ ইয়র্ক] শহরে কয়েক মাসে পাঁচটি নতুন স্বতন্ত্র বইবিপণীর উদ্বোধন হয়েছে। এখন সম্প্রসারিত ও এক ক্লিকের ইন্টারনেট শপিংয়ের যুগ, যেখানে ব্যবহৃত বইগুলো ডাকমাসুলের চেয়ে কম দামে পাওয়া যায়। তারপরও স্বতন্ত্র ও বিষয়ভিত্তিক বইবিপণী এখনও সমান প্রাসঙ্গিক।’

এসব বইবিপণী সাধারণ দোকানের মতো হবে না। তারা হয়তো বিশেষত্ব নিয়ে আসবে (যেমন, হয়তো চিত্রকলার বই বিক্রি করবে)। স্থানীয়দের আড্ডাখানা হিসেবে কাজ করতে পারে, যেখানে আরামকক্ষে বই থাকবে, তার সঙ্গে ক্যাফেরও সুবিধা, মানে খাবার ও পানীয় মিলবে। আজকের বা অতীতের বইয়ের বড় বড় দোকানগুলোর মতো শুধু বই বিক্রি করবে তা নয়, এসব বিপণীবিতান অনেকটা উপহারসামগ্রীর দোকান হিসেবে কাজ করবে। এরই মধ্যে অনেক দোকানে বইয়ের তাক কমিয়ে ফেলা হচ্ছে, তাকগুলোয় বইয়ের বদলে উঠছে এমন কিছু যা লোকজনকে দোকানে টানতে পারে সহজে।’

ইন্টারনেট যুগে বইয়ের দোকানগুলোর রূপান্তর সম্পর্কে লিখতে গিয়ে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস নর্দার্ন ক্যালিফোর্নিয়ায় বুকবিট নামে বইবিপণীর পরিবর্তন নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছে। বুকবিটের মালিক গ্যারি ক্লিম্যান ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে কী পদক্ষেপ নিয়েছেন, সেটাও তুলে ধরা হয়েছে এই প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, ‘তিনি বইয়ের কিছু তাক খুলে ফেলে সে স্থানে টেবিল-চেয়ার এবং সরাসরি অভিপ্রদর্শনের (লাইভ পারফরম্যান্স) জন্য একটি ছোট্ট মঞ্চ বানিয়েছেন। বিনা পয়সায় সেখানে ইন্টারনেটে ঢুঁ মারার সুযোগ তৈরি করেন। আর তিনি যে বিয়ার ও ওয়াইন বিক্রির লাইসেন্স পেয়েছেন, সেই সুবিধার কথাও মানুষকে জানালেন।’

এতে কোনো সুফল এসেছিল?

‘আগে যেমন বই বিক্রি হতো, এখনও ঠিক সে হারেই বই বিক্রি হচ্ছে। তবে নতুন বই বেশি বিক্রি হচ্ছে। আর আগের চেয়ে দোকানে এখন বেশি গ্রাহক ভিড় করে। কারণ, ক্রেতারা এখানে খেতে পারে, পান করতে পারে এবং গানও শুনতে পারে।’

বিশেষত ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল সরবরাহ ও সেবার এই যুগে স্বতন্ত্র বইবিপণীগুলো টিকিয়ে রাখতে হলে স্থানীয় পর্যায়ে ভাবতে হবে। যেমনটা সাংবাদিকতা টিকিয়ে রাখার জন্য এই কৌশলই নেওয়া হচ্ছে। অ্যামাজন বা বার্নেস অ্যান্ড নোবেল, ব্লগ ও মাইস্পেস এদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা নয়। তারা যা করতে পারে না, সেদিকে নজর দিতে হবে। যদিও কিছু বিপণীবিতানের বেলায় এই কৌশলও হয়তো কার্যকরী হবে না।

ক্যানসাসের বইবিপণী প্রসপেরো’স বুকসের স্বত্বাধিকারী টম ওয়েন ও উইল লিথেম নিজেদের গ্রন্থপ্রেমী বলে দাবি করতেন। কিন্তু বই বিক্রি করতে না পেরে, এমনকি বিনে পয়সায় দিতে চাইলেও কেউ নেয়নি বলে, না পেরে শেষে তারা ২০০৭ সালে সিদ্ধান্ত নেন, ৫০ হাজার বই তারা পুড়িয়ে ফেলবে। [যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয়] স্মৃতি দিবসে নিজেদের বইয়ের দোকানের সামনে ফুটপাতে কয়েক বাক্স বই ফেলে, জ্বালানি তেল ঢেলে সেগুলো পুড়িয়ে ছাই করে দেন। শুনলে মনে হবে এ যেন ফারেনহাইট ৪৫১ উপন্যাসের কথা [১]।

তবে বই পোড়ানোর এ ঘটনা নাৎসীদের বই পোড়ানোর [২] মতো নয়। বরং, এর সঙ্গে মিল আছে উনিশশ ষাটের দশকের গোড়ার দিকে ভিয়েতনামি বৌদ্ধদের সঙ্গে যারা রাজনৈতিক প্রতিবাদ হিসেবে শরীরে আগুন জ্বেলে আত্মহত্যা করেছিলেন। ওয়েন বা লিথেম দুজনের কেউই আগে বই পোড়ানো কিংবা ধ্বংস করার কথা ভাবেননি। তারা তো দুজনেই অসম্ভব বইপ্রেমী ছিলেন। তবু তারা বই পুড়িয়েছিলেন সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে যে, বই এখন আর কারো আগ্রহের বস্তু নয় মোটেও।

ওই ঘটনার পরপরই ড্যান ব্যারি দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসে লিখেছিলেন, ‘এই দুই ব্যক্তি বলছেন, বিক্রি হয় না বলে এবং সংখ্যায় অত্যধিক হওয়ার কারণে বইগুলো তারা লোকজনকে বিনে পয়সায় দিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু এতেও কাজ হয়নি। তাদের এক বন্ধুকে কারাগারে যেতে হয়েছিল, তখন তারা কিছু বই কারা-সংশোধন বিভাগে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাদের বই নেওয়া হয়নি। তবে স্থানীয় পর্যায়ে তহবিল সংগ্রহের একটা সংস্থায় তারা যখন বই অনুদান দিয়েছিলেন, কিছু মানুষ বেশিরভাগ বই কিনে সেগুলো অবশ্য প্রসপেরো বিপণীবিতানের সামনে ফেলে এসেছিল।’

দুঃখজনক হলো, আমি যখনই ‘মুদ্রণের মৃত্যু ঘটছে’ বলে কথা তুলি, আমি সবসময়ই স্পষ্ট করেই বলি, ব্র্যাডবারির উপন্যাসের বেলায় যা ঘটেছে [১], তা দিয়েই সব কিছু বিচার করা ঠিক হবে না। আমি জোর দিয়েই বলি, ডিজিটাল পঠনের পক্ষে যারা, তারা মোটেও মুদ্রিত শব্দের উচ্ছেদকারী নয়। প্রযুক্তিবিদরা নয়, বরং কিছু বইবিক্রেতারা আছে যারা ‘দেশলাই কাঠি জ্বালায়’, আর আগুনে পুড়ে ছাই হচ্ছে উপন্যাস ও নন-ফিকশনগুলো।

এছাড়া, ফারেনহাইট ৪৫১ উপন্যাসে আমরা দেখি, সরকার বই নিষিদ্ধ করার মতো কঠোর ছিল না মোটেও। বরং লোকে যখন বইয়ের ওপর ভীষণ বিরক্ত হয়ে উঠেছিল, তখন সরকার বই পোড়ানোর আইন করে। লোকের চাওয়া বুঝতে সরকারের দেরি হয় না (বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, কোনো সরকারই বুঝতে দেরি করে না)। মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখে সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল বই পোড়ানোর ওই বিধি। বাস্তব জীবনে, ক্যানসাস সিটিতে আমরা এরকমটা ঘটতে দেখে থাকতে পারি।

যেভাবেই বলি না কেন, প্রকাশনা শিল্প এরই মধ্যে অস্তিত্বের হুমকি হজম করতে পেরেছে। হুমকিটা দেখা দিয়েছিল ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে। তখন কেবল ই-বুই চালু হয়েছে। অনেকে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল, ই-বই প্রকাশকদের বিদায়ঘণ্টা বাজিয়ে ছাড়বে। যুক্তি ছিল, লেখকরা এখন সরাসরি অডিয়েন্সের কাছে পৌঁছে যেতে পারবেন, প্রচলিত সাহিত্যধারাকে তারা উপেক্ষা করতে পারবেন। অনেকে ভেবেছিল, সাহিত্যের প্রচলতি ধারা একদিন ‘ডাইনোসর’ হয়ে যাবে। নতুন সর্বব্যাপী ওয়েব লেখকদের এমন শক্তিশালী করবে যে, প্রকাশকরা আর আগের মতো ক্ষমতাশালী থাকবেন না, ক্ষমতা বরং লেখকদের হাতেই বেশি থাকবে। যৌক্তিক মনে হয়? উদাহরণ হিসেবে ‘উইকি’র কথা ধরা যায়, তাহলে এই বিতর্কটার একটা মিল পাওয়া যাবে।

ডেভিড কার্কপ্যাট্রিক ২০০০ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমসে লিখেছিলেন, ‘লেখকরা কথায় কথায় প্রচলিত ধারার প্রকাশকদের সম্পর্কে নালিশ করেন। সম্পাদনার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, প্রচারের কমতি নিয়ে খুটো দেন, লেখক-সম্মানীর পরিমাণ নিয়ে তো আক্ষেপ থাকেই। আর এখন কিছু লেখক নিজেই তার সম্পাদক ও প্রচারকর্মী নিয়োগ দেন। বইয়ের নকশা থেকে বই ছেপে দেওয়া ও পরিবেশন প্রকাশকের সব কাজই করে দেওয়ার মতো বহু প্রতিষ্ঠান এখন গজিয়ে উঠেছে।’

ইন্টারনেটের সুযোগ অবারিত হওয়ার পর যেসব লেখক প্রকাশনা শিল্পকে সত্যিকার অর্থে চ্যালেঞ্জ করতে পেরেছিলেন, তাদের অন্যতম স্টিফেন কিং। এক্ষেত্রে তিনি অন্যতম সফল লেখকও বটে। হরর রাইটার স্টিফেন কিং। তার লেখা ছোটগল্প রাইডিং দ্য বুলেটই প্রথম (এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র) সফল ই-বই। ২০০০ সালে কিং নিরীক্ষামূলক বইটি লিখেন। নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে যে কেউ ডিজিটাল আধেয় পড়তে পারবে। কিংয়ের তো আবার লক্ষ লক্ষ ভক্ত ও পাঠক। এই ঘটনায় পুরো বইশিল্পের খুঁটি যেন নড়ে উঠেছিল। কিং নিজে রসিকতা করে বলেছিলেন, তিনি দ্য প্ল্যান্ট নামে একটা উপন্যাস লিখতে যাচ্ছেন, যা ধাপে ধাপে প্রকাশ করা হবে; এই উপন্যাসটিও সরাসরি ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেবেন, ফলে এটা হবে বড় প্রকাশকদের সত্যিকারের দুঃস্বপ্ন। কিছু দিনের জন্য হলেও, লোকে কিন্তু তাকে বিশ্বাস করেছিল।

কিন্তু ঘটেছিল কী? উল্টো স্টিফেন কিংয়ের জন্যই এটা দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল (প্রকাশকরা বরং প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন)। তিনি প্রথমে দ্য প্ল্যান্ট-এর প্রতি কিস্তি পড়ার জন্য পাঠকদের থেকে ১ ডলার করে ফি আদায় শুরু করেছিলেন। পাঠকরাও সাড়া দিয়েছিল। কিং কথা দিয়েছিলেন, একটা পর্ব ডাউনলোড করা পাঠকদের মধ্যে শতকরা যদি ৭৫ জন ডলারে ফি পরিশোধ করে, তাহলে তিনি ওয়েবসাইটে ধারাবাহিকভাবে বাকি পর্বগুলো প্রকাশ করবেন। কিন্তু সময়ের সাথে পাঠকসংখ্যা কমতে থাকল। ফলে কিং ফি বাড়িয়ে দিলেন। ডাউনলোডকারীর সংখ্যা আরও কমে আসলে ফিও বাড়াতে থাকলেন কিং। শেষপর্যন্ত কিং হাল ছেড়ে দিলেন। তিনি উপন্যাসের কাহিনী শেষ না করেই ওই প্রকল্প বন্ধ করলেন।

যত গর্জে তত বর্ষে না। হাঁকডাক, নামযশ থাকলেও, সে গাছ (দ্য প্ল্যান্ট) অবশেষে শুকিয়ে মরল। প্রযুক্তিবিষয়ক জনপ্রিয় ওয়েবসাইট স্ল্যাশডট ২০০০ সালে এ সম্পর্কে বলতে গিয়ে লিখেছিল, ‘কিংয়ের এমন নিরীক্ষা থেকে একটা প্রতীয়মান হয়েছে, বই বিলুপ্তি নয় বই বিক্রির শক্তিশালী এক নতুন সরঞ্জাম হলো ইন্টারনেট।

এমন নিরীক্ষার জন্য কিংকে সাধুবাদ। তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন, প্রকাশকদের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। কিন্তু প্রমাণ হলো উল্টোটা। আমরা দেখলাম, স্বয়ং কিংয়ের মতো প্রতিষ্ঠিত লেখকের জন্যও বিষয়টা অত সোজা নয়। এমনকি অবারিত ডিজিটাল সুবিধার এই যুগেও, আগের মতোই প্রকাশকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

উনিশশ নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে আরেকটি প্রযুক্তির আবির্ভাব ঘটেছিল: চাহিবা-মাত্র-মুদ্রণ বা চাহিদা-মাফিক-মুদ্রণ (প্রিন্ট-অন-ডিমান্ড, সংক্ষেপে পিওডি)। এই প্রযুক্তির সুবাদে লেখকরা একটা পরিবর্তনের প্রত্যাশা করেছিলেন। অন্যদিকে সেই প্রযুক্তির কারণে সাক্ষাৎ মৃত্যুর অশনিসংকেত পেয়েছিল বাঘা বাঘা প্রকাশনা সংস্থা। এই নতুন প্রযুক্তির মুদ্রণযন্ত্রে চাইলে মাত্র একটি বইও ছাপা সম্ভব। এ যন্ত্রে রঙিন চিত্র ও অলংকরণ, এমনকি জ্যাকেটও ছাপা সম্ভব। প্রচলিত ছাপাখানা থেকেও চাইলে খুব অল্প সংখ্যায় একটি বই মুদ্রণ করা যায়; কিন্তু যে খরচ পড়বে, তা ‘বাণিজ্যিক আত্মহত্যা’ ত্বরান্বিত হবে। অন্যদিকে পিওডি যন্ত্রে মাত্র কয়েক ডলারেই একটি বইয়ের হাতে গোনা কয়েকটি অনুলিপি মুদ্রণ করা সম্ভব।

পিওড প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পরপরই, অনেক সংস্থা উদীয়মান সম্ভাব্য লেখকদের আহ্বান জানাতে শুরু করল। তারা বলল, নতুন লেখকদের বই সম্পাদনা এবং প্রচারের কাজও করে দেওয়া হবে, অবশ্যই অর্থের বিনিময়ে। প্রচলিত ধারার বড়সারির প্রকাশনা সংস্থাগুলো যেসব কাজ করে, এই সংস্থাগুলোও সেসব কাজ লেখকের হয়ে করে দিতে চাইল। এমনকি ফ্ল্যাপ লিখে দেওয়া ও প্রচ্ছদ তৈরির দায়িত্বও তারা নিতে রাজি।
প্রচলিত ধারার প্রকাশকরা কী করে? একটা আইএসবিএন (আন্তর্জাতিক মান পুস্তকপরিচিতি সংখ্যা) দিয়ে লেখকের কথামালা পুরে দেয় মোড়কের ভেতর। অনেক সাংবাদিক ও পন্ডিত সাফাই গেয়ে বললেন, এই কাজটাই তো নতুন ধারায় করে দেওয়ার মতো অনেক সংস্থা আছে (এমনকি, বই বিক্রি হওয়ার সাপেক্ষে এসব সংস্থা কিছু ক্ষেত্রে লেখককে মূলধারার প্রকাশকদের তুলনায় বেশি লভ্যাংশ দিতে পারে)।

সে সময়, জেরক্স (পিওডির অন্যতম নির্মাতা) একটি বিজ্ঞাপন প্রচার করেছিল। সেখানে দেখানো হয়: এক বৃদ্ধ অধ্যাপক ক্লাস নিচ্ছেন। তার সামনে বসা শিক্ষার্থীরা যে কখনই লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে না, সেই আশঙ্কা কথা বলছিলেন তিনি। তার বক্তব্যের মাঝেই তরুণ এক শিক্ষার্থী উঠে দাঁড়ান এবং অধ্যাপককে তিরস্কার করেন। বেয়াড়া ওবি শিক্ষার্থী ঘোষণা করেন, দুর্দান্ত এই নতুন প্রযুক্তির (পিওডি) কল্যাণে একদিন সবার লেখাই প্রকাশিত হবে।

হয়তো এ কথা সত্য হবে। তবে, সম্ভবত, কেবল একটা দিক থেকে। জেরক্সের যন্ত্র দিয়ে ছাপা বইগুলো হয়তো সত্যিকারের পেশাদার বইয়ের মতো মনে হবে। তবে, লেখক ও বিপণন বিশেষজ্ঞ হিসেবে সেথ গডিন ২০০৬ সালে তার ব্লগে লিখেছিলেন: বই প্রকাশ করা আর বই ছাপা এক কথা নয়। প্রকাশনার সঙ্গে বিপণন ও বিক্রয় এবং পরিবশেন ও ঝুঁকির সম্পর্ক আছে। [এসব কারণে] যদি এই ব্যবসায় থাকতে মন না চায়, থাকার দরকার নেই। বই মুদ্রণ তুলনামূলক অনেক সহজ কাজ। কেউ যদি বলে, এ সহজ কাজ নয়, মানবেন না। কেননা, আপনি বহু মুদ্রক খুঁজে পাবেন যারা আপনার পছন্দসই ও বিক্রিসেরা বইয়ের আদলে হুবহু বই ছেপে দিতে পারবে, কপিপ্রতি মাত্র কয়েক ডলারের বিনিময়ে। এ কঠিন কিছু নয়।

বরং কষ্টসাধ্য হলো, প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনা থেকে (পিওডির যুগে শতসহস্র যেসব বই বেরুচ্ছে, সেগুলোর কথা না হয় বাদই দিলাম) ফি বছর প্রকাশিত হাজারো বইয়ের ভিড়ে একটি নির্দিষ্ট বই পড়ার বাসনা কারো মনে জাগিয়ে তোলা।

চাহিবা-মাত্র-মুদ্রণ আর কিছুই নয়, বরং এ যেন ‘নতুন মোড়কে পুরাতন পণ্য’। আগে থেকেই এমন ‘ওপরে ফিটফাট ভেতরে সদরঘাট’ ধাঁচের মুদ্রণালয় ছিল। এরা বই প্রস্তুত করে দেয়, সুন্দর একটা প্রচ্ছদ বানায়, এমনকি আইএসবিএন সংগ্রহ করে দেয়, এরপর বইখানা অ্যামাজনে প্রদর্শন করে। কিন্তু এসব বইয়ের লেখকরা কি সত্যিই নিজেদের প্রকাশিত বলে ভাবতে পারেন? পিওডি প্রকাশনা নিয়ে অনেক প্রশ্নই রয়েছে।

‘প্রিন্ট-অন-ডিমান্ড প্রকাশনা কি শুদ্ধ বা বৈধ উদ্যোগ?’ এই প্রশ্ন তুলে এলরা নাইলস ২০০৫ সালে প্রকাশিত সাম রাইটার্স ডিজার্ভ টু স্টার্ভ! থার্টি ওয়ান ব্রুটাল ট্রুথস অ্যাবাউট দ্য পাবলিশিং ইন্ডাস্ট্রি গ্রন্থে লিখেছেন, ‘এখন এমন এক যুগ চলছে যেখানে প্রকাশনার স্বরূপ নির্ধারণই সম্পন্ন হয়নি।’

জেরক্সের ওই প্রথম বিজ্ঞাপন প্রচারের পাঁচ বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে। তবে এখন আর কেউ মনে করে না যে, পিওডির কারণে প্রকাশকদের ‘মৃত্যু’ হচ্ছে। বরঞ্চ, পিওডি প্রযুক্তিকে এখন সহায়ক সরঞ্জাম হিসেবে দেখা হয়। এর সুবাদে প্রচলিত ধারার প্রকাশনা সংস্থাগুলো দ্রুত বই ছাপতে পারে। [যখন যতটা দরকার তখন ততটা বই ছাপার কারণে] এখন আর হাজার হাজার বই গুদামজাত করতে হয় না, ফলে ব্যয়ও কমে এসেছে। মূলধারার অনেক প্রকাশক এখন তাদের পুরনো বইগুলো (ব্ল্যাকলিস্ট) পিওডি যন্ত্রে ছাপছে, সেসব বই অনলাইন খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সহজলভ্য। যারা ইন্টারনেটে সেসব বই কেনে, তারা মূল বইয়ের সঙ্গে তফাৎটা আঁচও করতে পারে না। ফলে গুদামঘরে যত বই ধরে, এর চেয়ে বেশি বই প্রকাশকরা ছাপতে পারে। যদি লেখকের দিক থেকে ভাবা যায়, তাহলেও পোয়াবারো। কারণ, তাদের বাড়তি আয় হবে। এবং তাদের বই কখনই অমুদ্রিত (আউট অব প্রিন্ট) থাকবে না। এমনকি যদি বছরে মাত্র এক ডজন বা এরকম হাতে গোনা কয়েক কপির চাহিদা থাকে, তারপরও প্রকাশকরা একটা বই পিওডি মুদ্রণের জন্য রাখতে পারে।

কিছু বড়সারির প্রিন্ট-অন-ডিমান্ড সংস্থা যেমন র‌্যান্ডম হাউসের ‘এক্সলিব্রিস’ এখনও সক্রিয় আছে। আর নতুন ও প্রগতিশীল সংস্থাগুলো (বিশেষত লুলু ও ব্লার্ব) লেখকদের সস্তায় প্রিন্ট-অন-ডিমান্ড পরিষেবা দিচ্ছে। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানেই নতুন বই হাতে পেয়ে উচ্চাকাক্সক্ষী লেখকরা গর্ববোধ করতে পারেন। যেহেতু তড়িঘড়ি বই ছাপা যায় এবং জটিলতাও সেভাবে নেই, সে কারণেই লোকে সহজেই ভেবে বসে, এই প্রযুক্তির কারণে বুঝিবা সত্যি সত্যিই প্রকাশকদের দিন শেষ হয়ে এলো। তবে প্রকৃতপক্ষে, যে কোনো প্রযুক্তিই প্রকাশক, লেখক ও পাঠকদের জন্য নতুন সম্ভাবনা এবং সুযোগ সৃষ্টি করে থাকে।

ক্রিস অ্যান্ডারসন দ্য লং টেইল গ্রন্থে লিখেছেন, ‘ব্যয়বহুল তাক, স্ক্রিন, চ্যানেল ও মনোযোগ আকর্ষণের সর্বাধিক উপযুক্ত ব্যবহারের জন্য বিক্রিসেরা বই ছাড়া বাকি বইগুলো মজুদ রাখা হয় না। এক শতাব্দী ধরে এটাই চর্চা হয়ে আসছে। এখন তো গ্রাহকদের সঙ্গে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা যায় এবং সব কিছুই ডিজিটাল। ফলে বই পরিবেশনের অর্থনীতি আমূল বদলে যাচ্ছে। এ যুগে ইন্টারনেটেই সব হয় সব কিছু গুদামজাত করে রাখা যায়, এখানে নাটক মঞ্চায়ন করা যায়, সম্প্রচারও করা যায়, সেও মূলধারার চেয়ে অনেক কম খরচে।’

প্রভাবশালী এই বইতে অ্যান্ডারসন দেখিয়েছেন, এমনকি বছরে মাত্র কয়েক কপি বিক্রি হলেও একটি পিওডি বই সময়ের সাথে বেশ মুনাফা এনে দিতে পারে (অবশ্য যদি প্রকাশকের তালিকায় হাজারে হাজারে এরকম পুরনো বই থাকে)। অন্তত কোনো বই অমুদ্রিত থাকলে বা কিছুতেই কোথাও না পাওয়া গেলে, সে ক্ষেত্রে এ কথা বেশি সত্য। তখন ঠিকই মুনাফা মেলে।

কিন্তু এখন যে কোনো ভোক্তাই পিওডি যন্ত্রের সুবিধা নিতে পারে। এসবে মধ্যে অন্যতম আকর্ষণীয় ও প্রতিশ্রুতিশীল পিওডি যন্ত্র হলো ‘এসপ্রেসো’। এসপ্রেসোকে বলা হয়, ‘বইয়ের এটিএম’। এটা মূলত একটা ভেন্ডিং মেশিন, যা ডিজিটাল ফাইল থেকে বই তৈরি করতে পারে। পথের ধারে বিপণীবিতানের তো অভাব নেই, ফলে সেখানে এসপ্রেসো সহজেই জায়গা করে নিয়েছে। পাশাপাশি পিওডি প্রযুক্তিও এক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকরী, কারণ এ প্রযুক্তি থাকা মানেই যে কোনো জায়গাই যেন একেকটা বইবিপণী।

বিমানবন্দরের একটা বইবিপণীর কথা ভাবুন। সেখানে বাছাই করা অল্পসংখ্যক বাণিজ্যিক কিছু বই থাকে। কেন? কারণ, জায়গার অভাব। কিন্তু ওরকম একটা বইবিপণীতে যদি কয়েকটা এসপ্রেসো থাকতো, তাহলে মাত্র কয়েকশ নয়, তালিকায় থাকতো লাখো বইয়ের নাম, সেখান থেকে পছন্দসই বইটি বেছে নিতে পারতো ক্রেতারা। অথচ অতশত বই রাখার জন্য কোনো গুদামঘর লাগতো না, কারণ এসপ্রেসো বা এরকম যন্ত্রগুলো সামান্য একটু জায়গা দখল করে, ফলে যে কোনো জায়গাই হয়ে উঠতে পারে একেকটা বইবিপণী। এরকম মেশিন স্কুলে বা শপিংমলে পানীয় ও নাস্তা রাখার ভেন্ডিং মেশিনের পাশেই রাখা সম্ভব।

‘এমিলি মাল্টবি ২০১৬ সালে ফরচুন স্মল বিজনেস ম্যাগাজিনে লিখেছিলেন, ‘ভবিষ্যতে বই কেনা এক প্যাক আঠা কেনার মতো সহজ হয়ে উঠবে। কারণ, কয়েক বছর ধরে উন্নতিসাধনের পর এসপ্রেসে বাজারে যাওয়ার প্রস্তুত। ২০০৭ সালেই দশ থেকে পঁচিশটি গ্রন্থাগার ও বইবিপণীতে এ যন্ত্র যাত্রা শুরুর কথা। একটা যন্ত্রের দাম মাত্র ৫০ হাজার ডলার। একেকটা মেশিন যেন এক অন্তহীন গ্রন্থাগার।’

ই-বই কিংবা প্রিন্ট-অন-ডিমান্ড প্রযুক্তির কারণে এখনই যে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য হচ্ছে প্রকাশনা সংস্থাগুলো, এমন নয়। কিন্তু ডিজিটাল ভবিষ্যৎ যে প্রকাশনাজগতে বড়রকম প্রভাব ফেলবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ই-বইয়ের যুগে অনেক লেখকই যেমন টিকে থাকতে পারবেন না, তেমনি সাহিত্যের ডিজিটাল রূপধারায় খাপ খাইয়ে নিতে বেশ হিমশিম খাবে প্রকাশনার নানা খাত। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে মুদ্রিত পণ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ বা চালানের সঙ্গে সম্পৃক্ত খাতগুলো।

কিন্তু প্রকাশনাজগতে যারা কথা ও বাক্য নিয়ে কাজ করে, তারা আজকের মতোই ভবিষ্যতেও একই কাজ করবেন : তারা প্রতিভা সন্ধান করবেন ও তাদের যত্ন নেবেন, পান্ডুলিপি সংগ্রহ ও সম্পাদনা করবেন, তরুণ লেখকদের পরামর্শ দেবেন, তাদের পরিচর্যা করবেন। শুধু যেসব কথা-বার্তা আগে কাগজে মুদ্রিত হতো, সেসব শিগগিরই মিলবে মোডেম ও ডিজিটাল মাধ্যমে।

আগের মতো বইয়ের পৃষ্ঠাগুলোকে বাঁধাই করা বা একটা মোড়কে পোরার ব্যাপার থাকবে না ঠিকই। তবে জ্ঞানার্জনের জন্য আগামীতেও বই খোঁজা হবে, ফলে বই সম্পাদনা ও বিপণনের প্রয়োজন হবেই।

সুতরাং, বইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক এখন বইয়ের বিকল্প ধারার প্রশ্ন। বই পঠনের ভবিষ্যতের কথা ভাবলে আমরা দেখতে পাই, বইয়ের খোল বলে কিছু থাকবে না, থাকবে না ভাঁজ করা পৃষ্ঠা। তবে, আধেয় থাকবে ঠিকই। ফলে, মুদ্রণসংস্থাগুলো ডিজিটাল ভবিষতের ভয় যত পায়, প্রকাশকদের তত ভয় পাওয়ার কিছু নেই।

তারপরও কিছু মানুষের আশঙ্কা, প্রকাশকরা শিগগির অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে। তাদের যুক্তি হলো, মুদ্রিত বই যদি ডিজিটাল মাধ্যমে বিলি করার দরকারই পড়ে, তাহলে লেখকরা কী কারণে তাদের ও পাঠকদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করার জন্য কোনো সংস্থাকে পুছতে যাবে? প্রকাশনা সংস্থা টিকে থাকবে আর কী কারণে? উপন্যাসগুলো কি ব্লগেই লেখা সম্ভব না? কারণ, লেখকরা সেখানে অডিয়েন্সের সঙ্গে তাৎক্ষণিক সংযোগ গড়ে তুলতে পারবে ফ্রি সফটওয়্যার ব্যবহার করে।

প্রশ্নগুলো দারুণ। আমি উত্তর খুঁজতে গিয়ে পাঁচটি বিষয় পেয়েছি, যে পাঁচ কারণে ডিজিটাল যুগেও প্রকাশকরা টিকে থাকবেন।

প্রতিভার সন্ধান

অনলাইনে লক্ষ লক্ষ আধেয়র ভিড়ে পাঠোপযোগী কিছু খুঁজে পাওয়া আরও বেশি কঠিন হয়ে উঠছে। ২০০৬ সালের গ্রীষ্মেই মাইস্পেসের ব্যবহারকারী ১০ কোটি ছাড়িয়ে যায়। এদিকে, ইউটিউবে ক্ষণে ক্ষণে এত বেশি ভিডিওচিত্র আপলোড হচ্ছে, চাইলেও কেউ সবকটা ভিডিও দেখতে পারবে নান, এমনকি তিনি যদি চাকরিবাকরি ছেড়ে দিয়ে বাসায় থির হয়ে বসে সবগুলো দেখার চেষ্টা করেন, তবুও অসম্ভব।

জনপ্রিয় ব্লগ টেকনোরাটি তো দাবি করে, তাদের নীড়পাতায় আধেয়ভরা অফুরন্ত সংখ্যক (‘জিলিয়ন’ এটা প্রকৃত সংখ্যা নয়, অনির্দিষ্ট বড় সংখ্যা বোঝাতে ব্যবহৃত) ওয়েব-পাতা অনুসন্ধান করা যাবে। সেখানে এত বেশি আধেয় আছে [৩] যে, তা পড়ে বা দেখে শেষ করা শুধু অসম্ভবই নয়, কোথা থেকে শুরু করতে হবে, তা জানাও ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়েছে।

[তো, এরকম যুগে] প্রকাশকরা সেই কাজটাই করবেন, এতদিন তারা যা করে এসেছেন; তা হলো, তাৎপর্যপূর্ণ আধেয় খুঁজে বের করতে প্রতিভা হিসেবে কাজ করা। তারা ভালো আধেয়গুলোকে ছেঁকে সবার সামনে তুলে ধরবেন। নিজেদের ইনডেক্সে অনুসন্ধানযোগ্য ছবি, ভিডিও ও ব্লগ সম্পর্কে টেকনোরাটি যেমন বলেছে যে, ‘এগুলোর মধ্যে কিছু তো ভালো হওয়া চাই’। এর মানে, আধেয়র বেশিরভাগই মানহীন।

যেহেতু অনলাইনটা আধেয়ভরা, এবং প্রতিদিন আরও বেশি আধেয় যোগ হচ্ছে, সে কারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন পূরণে প্রকাশকরাই অনিবার্য। তারা লেখক ও পাঠকসমাজের জন্য ডিজিটাল নর্দমা থেকে মুক্তো বের করে আনার মূল্যবান কাজটি তারাই করবেন।

প্রতিভার সমর্থন

প্রাথমিক দর্শন তৈরির ক্ষেত্রে ইন্টারনেট দুর্দান্ত, তবে পেশায় পরিণত করার বেলায় নয়। অনলাইনে দুর্নাম কুড়ানো সহজ। কিন্তু ইন্টারনেটে এমনকি ইতিবাচক কোনো কিছু ওয়ারহোলের ‘ফিফটিন মিনিটস’ [৪] এপিসোডের খ্যাতির চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হওয়া বেশ কঠিনই। ২০০৭ সালের মাঝামাঝিতে ইউটিউবে একটি ‘গিটার ভিডিও’ দেখা হয়েছিল দুই কোটি ১০ লাখ বার। এ এক আশ্চর্য অর্জন। তবে এ ছিল কেবলই অনুশীলন। যে যুবক ভিডিওটি তৈরি করেছেন, বিক্রি করার মতো তার কোনো সিডি (কম্পিউটার ডিস্ক) ছিল না, তার কোনো ওয়েবসাইটও ছিল না যেখানে তিনি বিজ্ঞাপন প্রচার করতে পারে (এমনকি, প্রথম দিকে কেউ জানতই না যে, ওই যুবক আসলে কে ছিলেন)। ভিডিওটা মজার। কিন্তু কোনো ব্যবসায়িক মডেল নয় মোটেও।

অন্যদিকে, ‘ওকে গো’ ব্যান্ডটি ‘হেয়ার উই গো এগেইন’ ভিডিওর জন্য ইউটিউবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। তারা আসলে একটি রেকর্ডকে সমর্থন করেছিল যার অর্থায়ন ও প্রকাশের পেছনে বড় কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল। ব্যান্ডটি নিজেরাই হয়তো ওই ভিডিও বানানোর খরচ বহন করেছিল। কিন্তু পূর্বেই তা রেকর্ড করার জন্য নেপথ্যের প্রতিষ্ঠানটি তাদের অগ্রিম অর্থ দিয়ে রেখেছিল। অনলাইনে অডিয়েন্স পাওয়া কখনো কখনো খুব সহজ। কিন্তু তখনই কার্যকর প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব যখন ব্যবহারকারীদের মনোযোগ কাড়ার মতো কিছু উপস্থাপন করা হবে।

প্রতিভার সম্পাদনা

এমনকি প্রতিভাবানদেরও সম্পাদক প্রয়োজন। একজন দক্ষ সম্পাদক এমনকি সবচেয়ে প্রতিভাধর লেখককেও অমূল্য পরামর্শ দিয়ে থাকেন। যেমন, এফ স্কট ফিৎজগেরাল্ড তার চিরায়ত উপন্যাস দ্য গ্রেট গ্যাটসবি-র নাম রাখতে চেয়েছিলেন ‘ট্রিমালচিও ইন ওয়েস্ট এগ’। যে নামেই ছাপা হোক না কেন, উপন্যাসটা হয়তো সমান সুন্দর হতো। তবে ‘ট্রিমালচিও ইন ওয়েস্ট এগ’ নাম রাখলে উপন্যাসটির বাণিজ্যিক সম্ভাবনাগুলো বেশি সংকীর্ণ হয়ে যেত। এবং সম্ভবত এটি খ্যাতি অর্জনের মতো এত দীর্ঘসময় টিকে থাকত না, কেননা উপন্যাসটি লেখকের মৃত্যুর পরে অসম্ভবরকম সুখ্যাতি পেয়েছে।

ম্যাক্সওয়েল পারকিনস শুধু বইয়ের নামের ক্ষেত্রেই ফিৎজগেরাল্ডকে পরামর্শ দেননি, তিনি লেখকের কেরিয়ারকেও একটা রূপ দিয়েছিলেন (বলাই বাহুল্য যে, পারকিনস অন্তত আরও ছয়জন বড় মার্কিন লেখককে আবিষ্কার ও তাদের লেখা সম্পাদনা করেছিলেন; এসব লেখকের মধ্যে ছিলেন আর্নেস্ট হেমিংওয়ে ও টমাস ওলফ)।

সম্পাদক ছাড়াই ব্লগে লেখকরা দিনে বেশ কয়েকবার হালনাগাদ করেন বলে, পাঠের বাছবিছার ও পাঠোদ্ধারের দায়িত্ব পাঠকের ওপরই বর্তায়। শন উইলসি টাইমে লিখেছেন, ‘কিন্তু পাঠকরা তো সম্পাদক হতে চান না। তারা যা চায়, আমি যা চাই, তা হলো, আমি যা পড়ছি তা যেন সম্পাদনা হয়ে আমার হাতে এসে পড়ে। সম্পাদনা যেন এমন হয়, পাঠ হয়ে উঠবে নৈকট্য, পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নিমগ্ন ও গভীর আনন্দদায়ক।’

যে প্রজন্ম কম্পিউটারে লিখতে শিখেছে, যারা কৈশোরের বেশিরভাগ সময় একে অপরকে খুদে বার্তা ও তাৎক্ষণিক বার্তা আদানপ্রদানে ব্যয় করেছেন, তাদের আবেগভরা আইকন (ইমোটিকন) ও স্মাইলিগুলো বাস্তবের ভাষায় বর্ণনা করার জন্য সম্পাদকদের খুব প্রয়োজন। সম্পাদক ছাড়া, বই বলি আর ডিজিটাল-পাঠ বলি, সবই বড়জোর ব্লগরূপী বৈ ভালো কিছু হবে না।

প্রকাশ ও বিপণন

অনলাইনে যেমন অনেক লেখক পাওয়া যায়, তেমনি অনলাইনে অনেক লেখকের প্রচারও হয়। কম্পিউটার থাকলেই ওয়েবে ঢুকে যে বিশ্বের যে কোনো প্রান্ত যে কেউ যে কোনো তথ্য খুঁজে পেতে পারে। ফলে, গবেষণা ও কোনো তথ্য অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে ওয়েব দ্রুতই পছন্দের হাতিয়ার হয়ে উঠছে।

প্রকাশনার ক্ষেত্রে আমরা দেখছি, এখন গ্রাহকরা কেবল জানাশোনা পছন্দসই বই কেনার জন্যই নয়, বরং নতুন নতুন লেখক ও তাদের বই খুঁজে পেতে ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। এই কারণে, বই বিপণনের প্রচলিত পদ্ধতিগুলো যেমন কোনো সংবাদপত্র বা সাময়িকীপত্রে বিজ্ঞাপন প্রচার ধীরে ধীরে অচল হয়ে উঠছে।

ইন্টারনেটের সুবিধা ব্যবহার করে প্রকাশকরা অনলাইন ভোক্তাগোষ্ঠীর সামনে নানাভাবে লেখকদের প্রকাশ ও প্রচার করতে পারে। তারা ব্যানার বিজ্ঞাপন দিতে পারে, মিথষ্ক্রিয় ওয়েবসাইট ও ব্লগ চালু করতে পারে এবং ব্লগার ও অনলাইন পাঠকগোষ্ঠীর কাছে লেখকদের প্রচার করতে পারে।

প্রকাশকরা লেখকদের পরিচতিমূলক ভিডিও ট্রেলার তৈরি করতে পারে। আবার লেখকরা নিজেই আপন পরিচয়তিমূলক ভিডিও তৈরি করতে পারে। প্রকাশকরা এসব ভিডিও ইউটিউবে আপলোড করতে পারে এবং ওয়েবে ছড়িয়ে দিতে পারে। প্রকাশকরা ভক্তদের ইমেল ঠিকানাও সংরক্ষণ করবে, বিপণনের উদ্দেশে সেসব ঠিকানায় পেশাদার ই-কার্ড ও নিউজলেটার প্রেরণ করবে।

ওয়েবে অভ্যস্ত কিছু লেখক হয়তো নিজেই এসব দেখভাল করতে পারেন, কেউ কেউ নিশ্চয়ই তা-ই করেন। তবে বেশিরভাগ লেখকই বেশ খুশি হবেন (এবং সম্ভবত তারা প্রত্যাশাও করছেন) যদি প্রকাশকরা তাদের এসব কাজের দায়িত্ব নেয়।

ইন্টারনেট কতগুলো গোষ্ঠী গড়ে তোলে, কিন্তু তাদের মজুরি দেয় না। বোয়িং বোয়িং-এর মতো অতি জনপ্রিয় ওয়েবসাইটগুলোয় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে পর্যাপ্ত পরিমাণে উপার্জনের জন্য দরকারি যথেষ্ট ব্যবহারকারী (ট্র্যাফিক) হয়তো রয়েছে। তবে বেশিরভাগ ব্লগ ও ওয়েবসাইটই অর্থোপার্জনের উদ্যোগ নয়। যেমন, ‘গিটার ভিডিও’টি ইউটিউবে দুই কোটির বেশি দেখা হয়েছে, কিন্তু প্রচুর শ্রোতার কাছে পৌঁছানোর পরেও তরুণ নির্মাতা কিন্তু কোনো মজুরি পাননি।

তো, প্রকাশকরা বাজারে শিল্পীর সৃষ্টিকর্ম বিক্রি করবে এবং সেই বিক্রির বিপরীতে রয়্যালটি প্রদান করবে (তা সে বিক্রি ডিজিটাল বিশ্বে যেমনই হোক না কেন, সম্পূর্ণ পাঠও হতে পারে বা অংশবিশেষ, এতে কিছু এসে যায় না)।

পেপলের মতো কিছু ওয়েবসাইট রয়েছে, যা ব্যবহার করে লেখক ও সংগীতশিল্পীরা নিজেরাই নিজেদের সৃষ্টিকর্ম সরাসরি ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করতে পারেন। স্টিফেন কিংয়ের দ্য প্ল্যান্ট-এর বেলায় আমরা তা দেখেছি। কিন্তু বেশিরভাগ লেখকই আর্থিক দিকটি দেখভাল করতে চান না। তারা বরং লেখায় সময় দিতে চান। এই দিকটা এখনও প্রকাশকদের হাতের নাগালেই রয়েছে।

আশা করছি, পাঠক টের পেয়েছেন যে, উপরোক্ত উদাহরণগুলোর মধ্যে একটা মিল রয়েছে। তা হলো, এগুলো প্রতিভার কথা বলে। আমি এটাকে প্রতিভা না বলে লেখক বলতে পারতাম, কিন্তু বলিনি। কেনই বা নিজেদের একটা নির্দিষ্ট গন্ডির ভেতর বেধে রাখব? জন সাইলেস চলচ্চিত্র পরিচালনার জন্য পরিচিত, কিন্তু তিনি বইও লেখেন। পল অস্টারের বেলায় উল্টো (তিনি পরিচিত লেখক হিসেবে, কিন্তু চলচ্চিত্র পরিচালনাও করেন)। লিওনার্ড কোহেন উপন্যাস লেখার মধ্য দিয়ে [সৃজনশীল] যাত্রা শুরু করেছিলেন, তবে প্রত্যেকেই তাকে আজ একজন গায়ক-গীতিকার হিসাবে চেনে।

আমরা লেখকরা প্রতিভাবান গোষ্ঠীর মধ্যে পড়ি। আমরা কোনো নির্দিষ্ট দলে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখতে চাই না। কেমন হতো যদি, জন লেনন একজন সংগীতশিল্পী না হয়ে লেখক হিসাবে তার কেরিয়ার শুরু করতেন (‘বিটল’ হওয়ার পরেই কিন্তু তিনি বই লিখেছেন) এবং একদিন প্রকাশকের কার্যালয়ে গিয়ে একটি গিটার নিয়ে গাইতেন ‘আ ডে ইন দ্য লাইফ’? সেই প্রকাশক যদি তাকে দরজা দেখিয়ে দিত, আর বেরিয়ে যাওয়ার সময় লেননকে বলত, ‘দুঃখিত, বেটা, আমরা বইয়ের ব্যবসা করি।’ তাহলে ওই প্রকাশক নির্বুদ্ধিতার পরিচয়ই রাখত।

দ্য সেক্রেট প্রকাশ করে সাইমন অ্যান্ড শাস্টার ২০০৭ সালে মহাসাফল্য পেয়েছিল। এটা একটা আত্মনির্ভর প্রেরণামূলক প্রকল্প যা বই ও ডিভিডি দুইভাবেই প্রকাশিত হয়েছিল। তাহলে সৃষ্টিকর্ম হিসেবে দ্য সেক্রেট আসলে কী? এমন কিছু যা পড়া যায়? নাকি এমন কিছু দেখা যায়? নাকি প্রশ্নটা হওয়া উচিত এরকম : রচনাটা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ধারণাই মূল। যেভাবেই হোক, রচনার ধারণাটাই অডিয়েন্সের কাছে পৌঁছায়। সোডারবার্গ যেমন একই দিনে ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যমে বাবল প্রকাশ করেছিল, তেমনি প্রকাশনাজগতে নতুন নতুন আরও মডেল আসবে। তখন ভোক্তারা মনমতো আধেয় বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। আসলে, আধেয়ই সব।

১৯৯৯ সালে ই-বই প্রবর্তনের সময় এ কথাটাই বারবার বলা হয়েছিল। তবে কথাটা কেউ বিশ্বাস করেছিল বলে মনে হয় না। তখন প্রযুক্তিই যেন সব কিছু। আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইন্টারফেস, তখন ব্যবহারকারী তো দূরের কথা, গুরুত্ব পায়নি আধেয়ও। আধেয় নিয়ে ভাবনা ছিল পরে-দেখা-যাবে গোছের। অনেকটা হিচককের চলচ্চিত্রগুলোয় ‘ম্যাকগাফিন’ [৫] চরিত্র বা ঘটনার মতো, যার ওপর গল্পের পট ঝুলে থাকতে পারে, শেষে যার কারণে গল্পের মোড় যেকোনো দিকেই বাঁক নিতে পারে। তাতে কিছু এসে যায় না, তাতে কিছু যায় আসে না; দুঃসাহসিকতাই (অ্যাডভেঞ্চার) এখানে মূল।

তো, প্রকাশনাজগতেও সত্যিকার অর্থে ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আধেয়র ওপর। যদি মুদ্রিত পণ্য অচল-অপ্রচলও হয়ে যায়, তাহলেও একটা জিনিসই টিকে থাকবে, তা হলো আধেয়।

অনবদ্য বই লেখার জন্য ঔপন্যাসিকরা কী করেন এবং তাদের কী করণীয়, এ নিয়ে ২০০৭ সালে দ্য গার্ডিয়ানে ‘ফেইল বেটার’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন জাদি স্মিথ। একটি উপন্যাসের বিভিন্ন উপাদান নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করার পরে, তিনি দৃষ্টিপাত করেন মূল বিষয়ের গভীরে, মূলত উপন্যাসের যে বিষয়টা সত্যিকার অর্থে আমাদের ওপর প্রভাব ফেলে। তার ভাষায়, ‘একটা অনবদ্য উপন্যাস হলো এমন কোনো রূপক ঘটনার অভিব্যক্তি যা কারো পক্ষে কখনই জানা সম্ভব নয়, তা সে যত দিনই বাঁচুক না কেন, আর যত মানুষকে সে ভালোবাসুক না কেন। এটা হলো নিজস্ব চেতনার বাইরে অন্য এক চেতনার মধ্য দিয়ে বিশ্ব সম্পর্কে অভিজ্ঞতা নেওয়া। সেই অভিজ্ঞতা ড্রয়িং রুমে বসে হতে পারে, ইন্টারনেটেও হতে পারে, তা নিয়ে আমি ভাবি না। সেখানে [চিপসের বিজ্ঞাপনের] ডোরিটো নাকি বুর্জোয়া পরিবারের মনোহারিনী জ্যেষ্ঠ কন্যা [৬] বীরচরিত্র, সেটা মূল কথা না। পুরো উপন্যাসে ‘ই’ বর্ণের ব্যবহার ইচ্ছাকৃত এড়িয়ে যাওয়া [৭] হলেই বা কী, আর গল্পটা পাঁচ মহাদেশ পাড়ি৮ দেওয়ার হলে বা দুই হাজার পৃষ্ঠা ছাড়িয়ে গেলেই বা কী। কালজয়ী উপন্যাসগুলোয় অভিজ্ঞতার বর্ণনা থাকে স্বতন্ত্র বুননে যা আমাদের মনোযোগী হতে বাধ্য করে, জীবনের ঘুম কেড়ে নিয়ে যা আমাদের জাগিয়ে তোলে।’

স্মিথ যা খুঁজে পেয়েছিলেন (উপন্যাসগুলো আমাদের ওপর যে মহাপ্রভাব ফেলে) তা হলো, এসব উপন্যাস আমাদের মন ও ভাবনায় কী প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। তিনি কিন্তু পুরো লেখায় একবারও বলেননি যে, একটা উপন্যাস আমাদের আঙুলে কী প্রভাব ফেলে। কোন মাধ্যমে বা কী পদ্ধতিতে একটা উপন্যাস পড়ে স্বাদ মেটানো হলো, তা কিন্তু সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

আন্ডারস্ট্যান্ডিং মিডিয়া গ্রন্থে মার্শাল ম্যাকলুহান লিখেছিলেন, ‘প্রতিষ্ঠানগুলো ইদানিং তাদের কাজ ও ব্যবসার পরিধি সম্পর্কে সচেতন হওয়া শুরু করেছে। যখন আইবিএম বুঝতে পারল যে, সরঞ্জাম বা যন্ত্রপাতি তৈরি তাদের কাজ নয়, বরং তথ্য প্রক্রিয়াজাতকরণই তাদের কাজ, এরপর তারা স্পষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এগুতে শুরু করলো।’

প্রকাশনা খাতকেও একই ধরণের সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে। বুঝতে হবে, এটা শুধু বইয়ের ব্যবসা নয়, বরং এটা হলো ধারণা, তথ্য ও গল্পের বেসাতি। সিনেমাজগতে ভিডিও এবং ডিভিডির বেচাকেনা যেমন চলচ্চিত্রের ওপর সেভাবে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি, তেমনি ডিজিটাল পঠনও প্রকাশকদের জন্য কোনো হুমকি নয়। প্রকাশনাজগতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় কার্ডবোর্ড আর সজ্জা নিছকই ক্ষণস্থায়ী যোজনা মাত্র। আমরা যদি শব্দের বিশেষত্বের ধারণাকে বুঝতে পারি, উপলব্ধি করতে পারি যে, বই কেবলই কাগজ, তাহলে আমাদের দৃষ্টি প্রসারিত হবে, লক্ষ্যও সুস্পষ্ট হবে।

অনুবাদকের টীকা

১. মার্কিন লেখক রয় ব্র্যাডবারির ফারেনহাইট ৪৫১ একটি নৈরাশ্যবাদী উপন্যাস (ডিস্টোপিয়ান নভেল)। ১৯৫৩ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাসে ভবিষ্যতের এমন এক মার্কিন সমাজের কথা বলা হয়, যেখানে বই লেখা বা বিক্রি নিষিদ্ধ হয়ে যায়; কোথাও বই পাওয়া গেলেই দমকলবাহিনী সেগুলো পুড়িয়ে ফেলে। তবে সরকার নিজ থেকেই বই নিষিদ্ধ করতে চায়নি। তুলনামূলক নতুন মাধ্যমের (যেমন চলচ্চিত্র ও দূরদর্শন) প্রতি আসক্তি বাড়ার পাশাপাশি যখন বইয়ের প্রতি মানুষের অভক্তির একশেষ অবস্থা, তখন সরকারও তাদের মতের স্রোতে নাউ ভাসায়। দমকলবাহিনীকে বই খুঁজে বের করে পোড়ানোর দায়িত্ব দেয় কর্তৃপক্ষ। অবশ্য সব লোকে যে বইয়ের প্রতি বিরক্ত ছিল, বইবিরোধী ছিল, এমন নয়। দমকলকর্মীরা এক নারীর বাড়িতে বই পোড়াতে গেলে ওই নারী নিজেই আগুন জ্বেলে আত্মহত্যা করেন। আবার একজন দমকলকর্মী মনটাগ যখন বই পোড়াতে যেতেন, সুযোগ মিললেই চুরি করে একটা করে বই বাসায় নিয়ে যেতেন। যখন তার স্ত্রী বিষয়টা জেনে যান, তখন বইগুলো ফেলে দিতে চাইলে মনটাগ একটা ইচ্ছার কথা বলেন, বইগুলো তারা দুজনে মিলে পড়ে দেখবেন যে, বইয়ের কোনো মূল্য আদৌ আছে কি না; তাৎপর্যহীন মনে হলে তিনি বইগুলো পুড়িয়ে দিতে রাজি। কিন্তু বউ গোপনে বইয়ের খবর পৌঁছে দেন দমকলবাহিনীর প্রধানের কাছে। অভিযান চালিয়ে মনটাগের সব বই পুড়িয়ে ফেলা হয়। ক্ষোভে বসকে খুন করেন মনটাগ। পরে এক বইপ্রেমী ইংরেজি অধ্যাপকের সহায়তায় নদী পেরিয়ে পালিয়ে যান তিনি। যোগ দেন নির্বাসিত একদল বইপ্রেমীর সঙ্গে। এরা প্রত্যেকেই অন্তত একটা করে বই মুখস্থ করে রেখেছেন। মনটাগের মুখস্থ ছিল বুক অব ইকলিজিয়াস্টিজ (হিব্রু বাইবেল তানাখের ২৪ বইয়ের একটি)। যেমনটা আশঙ্কা করা হয়েছিল, একদিন যুদ্ধ শুরু হলো, ওপর থেকে ফেলা হলো পারমাণবিক বোমা। চোট পেলেও বেঁচে গিয়েছিল মনটাগরা। তারাই বিধ্বস্ত সমাজকে নতুন করে নির্মাণ করেছিলেন।

২. স্প্যানিশ ইনকুইজিশনের সময় মুসলিমদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরান পোড়ানোর কথা ইঙ্গিত করে ১৮২১ সালে আলমানসর নাটকে জার্মান কবি হেনরিক হেইন বলেছিলেন, ‘আজ যারা বই পুড়িয়ে ধ্বংস করছে, শেষে একদিন তারা মানুষ পুড়িয়ে মারবে।’ সেই হেইনের বইও একশ বছর পর পোড়ানো হয়েছিল, আর সেটা করেছিল স্বদেশি নাৎসীরা। উনিশ ত্রিশের দশকে জার্মানি ও অস্ট্রিয়ায় নাৎসীরা ভিন্নমতের বই পেলেই পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযান শুরু করেছিল। ইহুদী, ধার্মিক, উদারবাদী, সমাজবাদী, সাম্যবাদী লেখকদের বই তারা খুঁজে খুঁজে বের করত তৎকালীন জার্মান ছাত্র ইউনিয়ন।
লুসিয়ান জেভিয়ার পোলাস্ট্রনের বুকস অন ফায়ার : দ্য ডেস্ট্রাকশন অব লাইব্রেরিজ থ্রোআউট হিস্ট্রি গ্রন্থে (ইংরেজি অনুবাদ জন ই গ্রাহাম; রচেস্টার : ইনার ট্রেডিশনস) এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।

৩. এই ব্লগটি এখন আর নেই সক্রিয় নেই।

৪. মার্কিন চলচ্চিত্র নির্মাতা, পরিচালক ও শিল্পী অ্যান্ডি ওয়ারহোল ‘ফিফটিন মিনিটস’ নামে একটি টেলিভিশন টক-শো উপস্থাপনা করতেন। এটি যুক্তরাষ্ট্রের এমটিভিতে প্রচারিত হতো। ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৭ সালের মধ্যে এই শোর মাত্র পাঁচটি পর্ব প্রচারিত হয়।

৫. কল্পকাহিনীতে ম্যাকগাফিন হলো এমন কোনো বস্তু, যন্ত্র বা ঘটনা যা তুচ্ছ, গুরুত্বহীন ও অপ্রাসঙ্গিক, কিন্তু গল্পের মোড় ঘোরানোর জন্য এবং চরিত্রগুলো নির্মাণে প্রয়োজন পড়ে। ইংরেজ চিত্রনাট্যকার অঙ্গাস ম্যাকফেইল এই শব্দটা প্রবর্তন করেন, তবে তা জনপ্রিয় করেন আরেক ইংরেজ চিত্রনাট্যকার আলফ্রেড হিচকক। সূত্র : হারমন, ডব্লিউ (২০১২)। আ হ্যান্ডবুক টু লিটারেচার (দ্বাদশ সংস্করণ)। বোস্টন : লংম্যান।

৬. ইংরেজ ঔপন্যাসিক জেন অস্টিনের প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র জেন বেনেটের কথা ইঙ্গিত করেছেন গমেজ। উপন্যাসটি ১৮১৩ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়।

৭. গমেজ এখানে ইংরেজি ভাষায় লিখিত গ্যাডসবি উপন্যাসের কথা বলেছেন। ১৯৩৯ সালে এটি প্রথম প্রকাশিত হয়। লেখক আর্নেস্ট ভিনসেন্ট রাইট ইচ্ছা করেই এ উপন্যাসে তার নিজের নাম ও ভূমিকা (যা গল্পের মূল অংশ নয়) ছাড়া পুরো লেখায় এমন কোনো শব্দ ব্যবহার করেননি যা লিখতে ইংরেজি ‘ই’ স্বরবর্ণটি লাগে।

৮. কানাডীয় বংশোদ্ধূত মার্কিন লেখক এলিজাবেথ ইভস তার বিশ্বভ্রমণের গল্প লিখেছেন ওয়ান্ডারলাস্ট : আ লাভ উইথ ফাইভ কন্টিনেন্টস গ্রন্থে। গমেজ এই গ্রন্থের কথাই ইঙ্গিত করেছেন। (সূত্র- সারাবাংলা)


© 2022 - Deshbarta Magazine. All Rights Reserved.