বৃহস্পতিবার, ০৬ অক্টোবর ২০২২

কিশোর রম্যগল্প: জিদ্দি

জামসেদুর রহমান সজীব

পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য মাসুদের আরেক পরিচয় হলো, সে ভীষণরকম জিদ্দি। বাকিরা শান্তশিষ্ট স্বভাবের হলেও তার বেলায় হয়েছে উল্টো। তার মতো একরোখা ছেলে দ্বিতীয়টা নেই। এই মুহূর্তে সে রাগে অগ্নিমূর্তি ধারণ করেছে। রাগ দমাতে না পেরে স্কুলব্যাগ থেকে সকল বইখাতা বের করল। তারপর কাপড়চোপড় ছড়াল বিছানায়। উদ্দেশ্য, বাসা থেকে আজ বেরিয়ে যাবে। আর কোনোদিন ফিরে আসবে না।

কিন্তু মুশকিল হয়েছে অন্য জায়গায়। চোখের সামনে এত এত কাপড়চোপড় দেখে মাসুদের রীতিমতো মাথা ঘুরতে শুরু করেছে। বেচারা বুঝতে পারছে না কোনটা নেবে আর কোনটা নেবে না। তাছাড়া কাপড় বাদেও অন্যান্য জরুরি জিনিসপত্র রয়েছে। এই যেমন- মিনি টুথব্রাশ, বেবি টুথপেস্ট, স্ট্রবেরি স্যাম্পু, নারকেল তেল, পিচ্চি চিরুনি, মোটুপাতলু স্যান্ডেল… নাম বলে তালিকা শেষ করা যাবে না।

অথচ মাসুদের স্কুলব্যাগের যা স্বাস্থ্য, তাতে মনে হয় না তিন-চারটা কাপড় গেলার পর এটার পেটে আর জায়গা থাকবে। বাদবাকি জিনিসের কথা আর নাইবা বললাম।
মাসুদ গাল ফুলিয়ে বসে রইল। মনে মনে ভাবছে, এটা কোনো কথা! স্কুলে যাবার সময় তো রাজ্যের বইখাতা ব্যাগে জায়গা করে নেয় অনায়াসে। অথচ সে এখন সামান্য কয়েকটা জিনিস নেবার জায়গা খুঁজে পাচ্ছে না। এ নিয়ে রাগে দুঃখে যখন চুল ছেঁড়ার উপক্রম হলো, ঠিক তখন তার মা মীনা খন্দকার এসে দাঁড়ালেন। বিছানায় কাপড়চোপড়ের স্তূপ দেখে মুচকি হাসলেন তিনি।
‘এ দেখছি কাপড়ের পাহাড়! নাম কী দিয়েছিস, গরিবের মাউন্ট এভারেস্ট?’
‘খবরদার! আমার সাথে দুষ্টামি করবা না।’ ধমকে উঠে জবাব দিল মাসুদ।
‘আচ্ছা ঠিক আছে। আমি দুষ্টামি করব না। তুই একাই করিস। কিন্তু বিষয়টা কী বল তো, দেখে মনে হচ্ছে বাসা ছেড়ে চলে যাচ্ছিস।’
‘হ্যা। চলে যাব। যে বাসায় আমার আবদারের কোনো দাম নাই, সে বাসায় আর থাকব না।’
‘সিদ্ধান্ত কি ফাইনাল? পরিবর্তন করা যাবে না?’
‘না। এটাই ফাইনাল সিদ্ধান্ত।’
‘আফসোস! চলেই যেহেতু যাবি, তোকে আর আটকাই কীভাবে। আগামীকাল বাসায় চিতই পিঠা, ভাপা পিঠা তৈরি করব। নারকেল আর দুধের সর দিয়ে মালাই পিঠা বানাব। থাকলে খেতে পারতি। কিন্তু তুই তো চলে যাবি আজ।’

মীনার মুখে পিঠা ও খাবারের বর্ণনা শুনে মাসুদের জিভে জল এসে যায়। পেটের ভেতর থেকে অদ্ভুত এক শব্দ বেরিয়ে আসে। যেন তার পেট বলছে- পিঠা না খেয়ে যদি বাসার বাইরে এক পা ফেলিস, কপালে কিন্তু কষ্ট আছে! অবশ্য এখন থেকেই কষ্ট লাগছে মাসুদের। বাসা ছেড়ে চলে যাওয়া যতটা জরুরি, পিঠা খাওয়া ঠিক ততটাই জরুরি। তার দুই চোখ ছলছল করতে থাকে। ফুঁপিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করে। ব্যাপারটা মীনার নজর এড়ায় না।
‘আর একটা দিন থেকে গেলে হয় না? পিঠা খেয়ে তারপর চলে যাস।’
‘ঠিক আছে। এত করে যখন বলছ, আজকের দিনটা থেকে যাই।’

হাঁফ ছেড়ে বাঁচল মাসুদ। আরেকটু হলে দমবন্ধ হয়ে যেত। অপরদিকে মীনা একগাল হাসি দিয়ে চলে গেলেন। বিছানায় এবার ধপাস করে বসে পড়ল মাসুদ। তার রাগ এখনো কমেনি। আজব এক পরিবার পেয়েছে সে। কী এমন বড় আবদার করেছিল, বৃষ্টিতে সামান্য একটু ভিজতে চেয়েছিল কেবল। অথচ কেউ রাজিই হলো না।

বেশ কিছুদিন হলো শীত পড়েছে। বাইরে এত ঠান্ডা যে একসেট কাপড়ে পোষায় না। কয়েকটা একত্রে পরতে হয়। তার উপর হঠাৎ নিম্নচাপ হওয়ায় বিগত দুদিন যাবৎ মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। আর এই বৃষ্টি ঘিরেই যত জ্বালা যন্ত্রণা। মাসুদ জিদ ধরেছে সে বৃষ্টিতে ভিজবে। কিন্তু বাবা-মা কড়া নিষেধ করে দিয়েছেন। শীতের সময়ে বৃষ্টিতে ভেজা যাবে না।

ছেলেটা শত অনুনয় বিনয় করেও যখন দেখল কাজ হচ্ছে না, তখন বিভিন্ন ফন্দির আশ্রয় নিল। শুরু করল কাঁদাকাটি আর মাটিতে গড়াগড়ি খাওয়া কার্যক্রম। কাজ হলো না। খাওয়া দাওয়া বন্ধ রাখল আড়াই ঘণ্টা। কাজ হলো না। মায়ের কাছে পাত্তা পাবে না জেনে বাবার কাছে গিয়ে মন্ত্র আওড়াল, বলল- বাবা তুমি ভালো, বাবা তুমি লক্ষ্মী, বাবা তুমি পক্ষী! তাতেও কাজ হলো না।

পরিবার থেকে সাড়া না পেয়ে পাড়াপ্রতিবেশি, স্কুলের শিক্ষকদের পর্যন্ত ধরল। সেখানেও কায়দা করতে পারেনি মাসুদ। উল্টো বেকায়দায় পড়ল। তারা বুঝালেন, বাবা-মায়ের কথা শুনতে হয়। অবাধ্য হতে হয় না। কিন্তু তাদের কথা সে এক কান দিয়ে শুনে আরেক কান দিয়ে বের করে দিল। বাকি রইল ছোটমামা। তার সবচাইতে প্রিয় মানুষদের একজন, বন্ধুও বলা যায়। সে গিয়ে এবার তাকে ধরল।
‘মামা, তুমি তো হাত দেখে ভবিষ্যত বলতে পারো। আমার হাতটা দেখে বলো তো, আমি কি বৃষ্টিতে ভিজতে পারব?’ আহ্লাদের সুরে বলল মাসুদ।
‘তোর হাত দেখে এটা বলা মুশকিল। দেখতে হবে তোর মায়ের হাত। যদি খালি থাকে, তাহলে ভিজতে পারবি। আর যদি ঝাড়ু থাকে, বৃষ্টিতে ভেজার কথা ভুলে যাবি। প্রাণ নিয়ে দৌঁড়ে পালাবি সেখান থেকে!’
‘মায়ের হাতে তো সবসময়ই ঝাড়ু থাকে। তাদের কথা ছাড়ো, তুমি আমাকে বৃষ্টিতে ভেজার পথ দেখিয়ে দাও।’

এত করে অনুরোধ করার পরও মাসুদকে হতাশ হতে হলো। ছোটমামা তাকে ঘরের দরজা দেখিয়ে বললেন, গিয়ে পড়তে বস। ধরে নে বৃষ্টিতে ভেজার বিষয়ে আমাদের মাঝে কোনোরকম আলাপ হয়নি। এরপরই মাসুদ সিদ্ধান্ত নেয়, এ বাসায় আর এক মুহূর্তও নয়। কেউ তাকে ভালোবাসে না। তার আবদারের কোনো মূল্য নেই।

একবুক কষ্ট নিয়ে রীতিমতো নাক ডেকে ঘুমিয়ে রাতটা পার করল মাসুদ। সকালে ঘুম ভাঙল পিঠাপুলির সুঘ্রাণে। লাফিয়ে উঠে রান্নাঘরে গিয়ে দেখে মা পিঠা বানাচ্ছেন। একটা টুল টেনে সেখানেই আয়েশ করে বসল। মীনা হাসিমুখে তার দিকে ভাপা পিঠার প্লেট এগিয়ে দিলেন। মাসুদের খুশি তখন দেখে কে! হাসি একেবারে কান পর্যন্ত গিয়ে ঠেকল। তারপর গপাগপ গিলতে থাকল গরম পিঠা। বাসার বাইরে তখনো বৃষ্টি পড়ছে। শীতল পরিবেশ।

খাওয়া শেষে নিজের রুমে ফিরে আসলো মাসুদ। স্কুলব্যাগে জামাকাপড় ভরতে লাগল। এতকিছুর পরেও সে কোনোকিছু ভুলেনি। রাগ কমেনি বিন্দুমাত্র। বাসা তাকে ছাড়তেই হবে। গভীর মনোযোগ সহকারে সে যখন ব্যাগ গোছাতে ব্যস্ত, তখন তার বাবা সাজিদ সাহেব গলা খাকারি দিলেন। শব্দ শুনে ঘুরে দাঁড়াল মাসুদ। দেখল তার বাবা ছাতি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি জানালেন, একসেট কাপড় ছোট্ট একটি ব্যাগে নিয়ে তার সাথে যেতে হবে।

বাবার সাথে বাসা থেকে বেরিয়ে আসলো মাসুদ। কোথায় যাচ্ছে বলতে পারে না। তবে পথ দেখে মনে হচ্ছে বাজারের দিকে যাচ্ছে। মাসুদের মনটা ভীষণ ভারী হয়ে আসলো। কেমন যেন কষ্ট লাগছে। বাসা ছেড়ে দেবার সিদ্ধান্ত যখন নিয়েছিল, তখনো এত কষ্ট লাগেনি। এখন মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি তাকে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে। খারাপ লাগছে খুব। কান্না করবে কিনা বুঝতে পারছে না।

হঠাৎ মাঝপথে থমকে দাঁড়ালেন সাজিদ সাহেব। তাল মিলিয়ে মাসুদও দাঁড়িয়ে পড়ল। তার মাথার ভেতর হাজার দুশ্চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। চিন্তা করল, সে কি খুব বেশি জ্বালিয়েছে সবাইকে? এখন কি বাবা পিটিয়ে তাকে আলুভর্তা বানাবে? এসব সাতপাঁচ ভাবতে গিয়ে সে শীতের মাঝেও দরদর করে ঘামতে শুরু করে।
‘মাসুদ।’
‘জি বাবা।’
‘এখন চাইলে বৃষ্টিতে ভিজতে পারো।’
‘সত্যি?’

নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না মাসুদ। বাবা কি সত্যি বলছে? আরও কয়েকবার জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হলো, বাবা মিথ্যে বলছে না। এরপর আর কীসের অপেক্ষা! ছাতির নিচ থেকে ছুটে বেরিয়ে যায় সে। মুষলধারে পড়তে থাকা বৃষ্টিতে নিজেকে সপে দেয়।
প্রথম কয়েক মিনিট ভীষণ ভালো লাগল। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টির পানি, কী যে মজা! কিন্তু মিনিট পাঁচেক না যেতেই মজা উধাও! পানি এত ঠান্ডা, শরীরে কাঁপুনি ধরে গেল। দাঁতে দাঁত লেগে সে এক এলাহি কাণ্ড। উপায়ান্তর না দেখে এক দৌঁড়ে বাবার কাছে ফিরে গেল মাসুদ। বারবার বলতে লাগল, শীতে জমে গেলাম রে!

সাজিদ সাহেব শব্দ করে হাসলেন। এরপর ব্যাগে করে আনা শুকনো কাপড় মাসুদকে পরিয়ে দিলেন। কিন্তু সহসাই বাসার পথ ধরলেন না। সেখান থেকে বাজারে গেলেন, ডাক্তারের চেম্বারে। মাসুদ তখনো শীতে কাঁপছে। সাজিদ সাহেব ডাক্তারকে সমস্ত ঘটনা খুলে বললেন। ঠান্ডা-সর্দি, জ্বরের ওষুধপত্র নিয়ে তারপর বাসায় ফিরে আসলেন।

আগাম রোগ-শোকের প্রস্তুতি নিয়ে রাখায় সুবিধা হলো খুব। রাতে মাসুদের জ্বর আসলো। সঙ্গে ঠান্ডা-সর্দি। তবে তাদের সংগ্রহে ওষুধ রয়েছে। সেগুলো খেয়ে নিল মাসুদ। অসুখে পড়ে বেচারা একদম চুপসে গেছে। মীনা সঙ্গেই রয়েছেন। একচুল নড়ছেন না। ছেলের বুকে-মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন পরম আদরে। তিনি অনেক কথা বললেন। কেন তাকে বৃষ্টিতে ভিজতে নিষেধ করেছিলেন, সেটাও সুন্দরভাবে বুঝালেন।

মাসুদ মায়ের বুকে মুখ লুকাল। কষ্ট লাগছে তার। নিজের ব্যবহার আর কর্মকাণ্ডে ভীষণ লজ্জিত সে। তবে একটা বিষয় খুব ভালোভাবে অনুধাবন করতে পেরেছে। বাবা-মা কখনো সন্তানের খারাপ চায় না। সবসময় ভালোটাই চায়। তাদের যত বিধি নিষেধ, সবটুকু সন্তানের মঙ্গলের জন্য।
মাসুদ পণ করল, সে আর কখনো অন্যায় আবদার করবে না। বাবা-মায়ের কথা মেনে চলবে। আর হ্যাঁ, বাসা ছেড়ে চলে যাবার কথা ভুলেও মাথায় আনা যাবে না!
.
প্রথম প্রকাশ: মিষ্টিকুটুম, ফেব্রুয়ারি ২০২২


© 2022 - Deshbarta Magazine. All Rights Reserved.