বৃহস্পতিবার, ০৬ অক্টোবর ২০২২

কুমড়ো ফুলের বড়া : নিতু ইসলাম

বেশ কিছুদিন হলো ফ্রাইপ্যানটার বেহাল দশা।

মেয়েদের প্রায়ই বলি– মাগো, একটা ফ্রাই প্যান কিনে আনো প্লিজ। বড় মেয়ে চশমার ফাঁক দিয়ে তার আশ্চর্য সুন্দর চোখ মেলে বলে– এটা তোমার ডিপার্টমেন্ট মা।

আমিও নাকের জল টিস্যু দিয়ে মুছতে মুছতে বলি– হ্যাঁ, আর তোমাদের ডিপার্টমেন্ট হচ্ছে ফাস্ট ফুড আর অনলাইনে গভীর মনোযোগ দিয়ে ক্লাস করা। এর চেয়ে স্কুল কলেজে যেতে সেও ভালো ছিল।

মেয়েরা হাসে আর গভীর মনোযোগ সহকারে আমার ঘরে বানানো চিকেন ফ্রাইতে কামড় দিয়ে রান্নার প্রশংসা করে।

কার কাছে বলি এসব দুঃখের কথা– বড় জা নামাজ আর নাতিপুতি নিয়ে ব্যস্ত। মেজ জা তার পুরাতন স্বভাবেই আছেন। পৃথিবীর সব কিছুকেই উনি উলটো বোঝেন। উনার বাসায় কেউ দুইবার কলিংবেল টিপলেও উনি মনে করেন– বেশি টিপে টিপে উনার কলিংবেলের বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে লোকে।

মনের কষ্ট মনে চেপে রেখে কাল হঠাৎ একা একাই বাজারে গেলাম ফ্রাইপ্যান কিনতে। রান্নাঘরের জিনিসপত্র আমি যা দেখি তাই পছন্দ হয়। দোকানে গিয়ে দেখি – নতুন গ্লাস সেট, আমি তো ফিদা হয়ে গেলাম। (বাসায় এমন গ্লাস সেট ও আছে, যা জীবনে ব্যবহার করিনি) আজকাল নতুন খুন্তি, তেলে মাখানোর ব্রাশ বের হয়েছে প্লাস্টিকের, সেটা দেখে মনে হচ্ছে না কিনলে জীবন বৃথা।

তিনটা বাটির সেট, চামচ, খুন্তি, গ্লাস ওভেন প্রুফ বক্স কেনার পরে দেখি ব্যাগের স্বাস্থ বেশ খারাপের দিকে। তখন একটা ফ্রাইপ্যান আর একটা উঁচু প্লাস্টিকের টুল (জানি না কি কাজে লাগবে) কিনে বাসায় রওনা হলাম।

বাসার গেট খুলে দেখি, আমার বারান্দায় নীল জামা পরনে মোটু এক মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে তার বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে বলছে ‘সারপ্রাইজ’ !!

আমি বহুদিন এতো সারপ্রাইজড হইনি। আমি হাতের সব টোপলা টুপলি ফেলে দৌঁড়ে মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে- চিৎকার চিৎকার করতে লাগলাম – আমার বোন এসেছে। আমার বোন এসেছে।

আমাদের চিৎকারের শব্দ শুনে বড় জা তার জানালা দিয়ে মুখ বাড়ালেন। পাশের বাড়ির ভাবি উঁকি দিলো। কাজের মেয়েটি কাজ ফেলে দৌঁড়ে এলো– কী হইছে গো। আপনেরার কী হইছে?

আমি চোখে জল নিয়ে হাসতে হাসতে বললাম– কিচ্ছু হয়নি। আমার দস্যি বোনটা আমার কাছে বেড়াতে এসেছে।

মজার ব্যাপার হলো, এবারে ও এসেছে একা বাচ্চাদের ছাড়া। হাসতে হাসতে ও বলছে ‘লিপন আমাকে নামিয়ে দিয়ে গেছে। তোমার জন্য পুরো একঘণ্টা অপেক্ষা করেছে। তুমি বাসায় নেই কী আর করা।’
(ভুলে ফোন বাসায় রেখে গিয়েছিলাম।)
বাচ্চারা চারদিন পরে আসবে। আসো আমরা এই চারদিন শুধু দুজনে ঘুরি আর গল্প করি।
আমার মেয়েদের ডেকে বললো।

– বাচ্চো কাচ্চো তোমরা বাদ। এবারের ফাগুন আমাদের।

সন্ধ্যায় আমরা দুইবোন হাত ধরে রাস্তায় নামলাম। ও নানান ধরণের পিঠা, চপ, ডিম সেদ্ধ সমানে শুধু খেয়েই যাচ্ছে। আমি অবাক হয়ে বললাম– এই এতো আইটেম কেউ একসাথে খায়?

সে মুখ ভর্তি ভাপা পিঠা নিয়ে বলে– খায় না। তবে আমি খাই। বাচ্চাদের যন্ত্রণায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে খাওয়ার আনন্দ তো ভুলে গেছি। এখন তো সব অনলাইনে ঘরে চলে আসে।

বলে সে দোকানির কাছে আর একটা পোয়া পিঠা চাইলো। যেন সেই ছোট্ট রিমি। এরপরে সে খেলো টং দোকানের মালাই ‘চা’। তারপর মশলা পান। পান খেয়ে ঠোঁট লাল করে দুই বোন রিক্সায় বাসায় ফিরলাম। ঠিক যেন একটুকরো শৈশব এসে ধরা দিল আমাদের হাতে।
থ্যাংকস ‘রিমি’ আমাকে এত্তো সুন্দর সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য। আপনারা গল্প পড়ুন আমি এই সুযোগে বোনের জন্য বউয়া আর আট পদের ভর্তা বানিয়ে আনি। ও হ্যাঁ, বোন বলে দিয়েছে এর সাথে কুমড়ো ফুলের বড়া অবশ্যই লাগবে।

আমার মেয়েরা বলে, ‘কী সব যে তোমাদের বায়না আন্টি। কুমড়োর বড়া একটা খাবার হলো?’

আমার বোন আমার মেয়ের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলো– কুমড়োর বড়া হচ্ছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ খাবারের একটি। কারণ এতে লেগে আছে আমাদের শৈশব।


© 2022 - Deshbarta Magazine. All Rights Reserved.