সোমবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২১

কেন্দ্রিকতা হাসান হামিদের কবিতার অন্যতম দিক : ড. সুজিত কুমার বিশ্বাস

যদি মরে টরে যাই, আজ এই রাতে;
নিশ্বাসের সবকটি দরোজার কপাট লেগে যায়; তুমিহীন ।
তবে এই কবিতাটি আমার শেষ কবিতা হবে ।
বুকের এখনকার ব্যথাটি শেষ ব্যথা;
প্রবলভাবে তোমাকে পাইনি এ আক্ষেপটি শেষ যাতনা;
এ মুহুর্তের অভিমানটি শেষ মায়া;
আজ মরে গেলে এই আঙুলগুলো আগামীতে বৃক্ষ হবে ।  (চিরন্তন)

কবিতাটি পড়ে আমি থমকে গেছি; এ কবিতা কার? বর্তমান সময়ে যারা লিখেন, তাদের অনেকের লেখাই আমি পড়েছি। অমন মানবিক অনুভূতি নিয়ে লেখা খুব একটা চোখে পড়েনি আর! কবির নাম হাসান হামিদ। বয়সে একেবারেই তরুণ। এ কবিতা পড়ার পর তাঁর বেশ কিছু কবিতা আমি পড়েলাম। কলকাতার বাংলা কবিতা নামের সাইটে তাঁর কবিতা পড়ে আমি একরকম ভক্তই হয়েছি। ভাষার মহিমা, সাথে সহজ শব্দের সবল বুনন; এমন প্রাণোচ্ছল ধারা এখনকার যারা কবি, দুয়েকজন ছাড়া আর কারও লেখায় আমার চোখে পড়েনি অতোটা ।

আমার কাছে তাঁর কবিতা পাঠে মনে হয়েছে, সরলতার সাথে আরও একটি বড় বৈশিষ্ট্য তার লেখা কবিতায় মনে বাজে; সেটি হল কেন্দ্রিকতা।  হাসান হামিদ তাঁর কবিতা যেখানটায় শুরু করেন, নানা পথ ঘুরে, জীবনের বিচিত্র চড়াই উতরাই শেষে ঠিক শুরুর জায়গায় এসে শেষ করেন। আপাত দৃষ্টিতে কবিতাগুলো সহজ মনে হলেও তার সমস্ত দেহজুড়ে যে মোহময় গাঁথুনি রয়েছে তা টের পান অগ্রগামী পাঠক।

কবিতা ঠিক তখনই কবিতা হয়, যখন তার শরীরে প্রাণের অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। সরলতার আবরণে, গভীর অনুভূতিকে পাঠকের সামনে আরও গভীর অথচ সহজভাবে উপস্থাপন সবচেয়ে কঠিন। একটি কবিতা উল্লেখ করছি,

সাঁতার না জানা শরীর তবু সমুদ্দুর পাড়ি দিতে চায়,
আলগোছে চুনোপুঁটি ধরে, একা একা সারা রাত বান ডাকে,
বালিশের ওড় ভিজে বালিকার প্রেমের স্রোতে,
স্যাঁতস্যাঁতে বিছানায় শুয়ে থাকে দুর্গন্ধ নির্যাস;
অনাঘ্রাতা হৃদয় পড়ে থাকে শিথানের কাছে।

মাঝরাতে একাকী বালিকার মনে পড়ে ঈশ্বর! (নিঃসঙ্গ বালিকার মধ্যরাত)

কবি বুঝেন কবিতার রস, কবিতার বিদ্রোহ-বিরহ –অমরত্ব। সেই সাথে বিমূর্ত মায়া, সৌন্দর্যবোধ, বেদনাবৃত নিসর্গ দিনপঞ্জি।  হাসান হামিদের পরিমিতিবোধ দারুণ; আর তাঁর পাঠকপ্রিয় হওয়ার কারণ এটাই।  তাঁর লেখালেখির বয়স কত আমি জানি না, তবে প্রকাশ হবার সময় অতো দীর্ঘ নয়। তিন চার বছর লিখে কেউ কবি হয় না, কিন্তু কবি হয়ে ওঠার বিষয়টি টের পাওয়া যায়। হাসান হামিদ এখানেই সার্থক, তাঁর কবিতার পাঠক তৈরি হয়েছে, হচ্ছে, সামনে আরও হবে। আরেকটি বিষয়, তাঁর প্রতিটা কবিতায় আমরা দেখতে পাই জীবনের উন্নত অবাদ বিকাশ। কবির দেশাত্ববোধ, দেশপ্রেম নানাভাবে ওঠে আসে রচিত বাক্যের হাত ধরে। যেমন-

এই বসন্তে শান্ত জলে হাত ধুয়ে চলে গেছে খুনী হৃদয়,
বড়ো বেশি বেহায়া বেয়ারা সময়, ভালো নেই স্বপ্ন-স্বদেশ,
শত নাবালিকার দীপ্তিমান দর্পনে সে এখন বিমর্ষ মলিন,  
অথচ একদিন তার সুন্দরের ভাষা ছিল না;
অথচ তার শ্যামল ঘাসের বিছানাতেই
রোদ বিছিয়ে রাখতো মাংসল সোনালী শরীর। (এই বসন্তে)

কবি বঙ্গবন্ধু নামের এক কবিতায় লিখলেন,

এ শব্দটি কানে এলে প্রতিবারই-

আন্দিজ পর্বত থেকে কেঁদে নামে আরও একটি নদী,

মাঝরাতে ঘুম ভাঙার মতো, স্বপ্ন-বাটি উল্টে পড়ার মতো,

মর্মর তুলে ঘেমে আমি নেয়ে যাই; এ শব্দ শুনলে

নিমেষে সুখী হই; স্বস্তির জায়নামাজে জীবন নামাই।

কতো গভীর বোধ জমা হলে বুকে, এমন করে সাজানো যায় শব্দ। কতো যাতনার সমাহারে এমন প্রতিচ্ছবি আঁকা যায়, তা দেখিয়েছেন কবি। এখানেই তিনি সার্থক;  সহজ অথচ কতো মোহময়, সরল অথচ কী বিন্ময় লুকানো তাঁর সৃষ্টিতে। হাসান হামিদের কবিতার আরেকটি দিক হলো নাটকীয়তা । এখানেও সহজ অথচ সুন্দর এবং গভীর ভাবে তিনি লিখেছেন, পাঠক তা পড়ে অন্য কোথাও যেন চলে যায়, কিছু সময়ের জন্য আর ফিরে না, মন্ত্রমুগ্ধ হয় –

যেমন আছি তেমন রবো; বদলাবো না, দ্যাখো-
তোমার হাত ছাড়বো না যে- খাতায় লিখে রাখো। (প্রতিশ্রুতি)

তাঁর কবিতা পাঠে যাতনা সেরে যায়, মনে আরাম অনুভুত হয়। কটমটে কঠিন এখন যারা নিজেকে জাহির করেন, হাসান হামিদ তাদের উল্টো। সহজ পথে যদি পৌঁছুনো যায় পাঠকের ঘরে, তবে কঠিন কাঁটার পথ কেন মাড়ানো? হাসান হামিদের কবিতা তাই একবার পড়লে আবারো পড়তে ইচ্ছে করে। গভীর থেকে একটা টান টের পাওয়া যায়।

লেখক- ড. সুজিত কুমার বিশ্বাস, গবেষক ও লেখক


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত