শনিবার, ১৭ আগস্ট ২০১৯

কেমন ছিল বঙ্গবন্ধু’র শাসনকাল (১৯৭১-১৯৭৫)

সেই সময়কার পশ্চিম পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। ১১ জানুয়ারি অস্থায়ী সংবিধান আদেশ অনুযায়ী তিনি বাংলাদেশে সংসদীয় ব্যবস্থার সূত্রপাত এবং মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকার প্রবর্তন করেন।

দেশের মাটিতে ফিরেই বঙ্গবন্ধু শুরু করেন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের কাজ, আত্মনিয়োগ করেন বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড় করানোর কঠিন কর্মে। ১২ জানুয়ারি তিনি তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। দু’মাসের মধ্যে ভারত বাংলাদেশ থেকে তার সৈন্যবাহিনী প্রত্যাহার করে নেয়। দেশের প্রতিটি জেলায় বেসামরিক প্রশাসন সচল হয়। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং ধর্ম নিরপেক্ষতাকে মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করে ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে সংবিধান প্রণীত হয়। মাত্র ১০ মাসের মধ্যে জাতিকে সংবিধান উপহার দেন। পৃথিবীর কোনো দেশ এতো কম সময়ে সংবিধান প্রণয়ন করতে পারেনি এর আগে!

মাত্র সাড়ে তিন বছর ছিল তার শাসনকাল। এই অল্প সময়ে তিনি বাংলাদেশকে বিশ্বের স্বীকৃতি এনে দিয়েছিলেন। জাতিসংঘ, ওআইসি, কমনওয়েলথসহ পৃথিবীর ১২৬টি রাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। সদ্য স্বাধীন দেশকে শক্ত ভিক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করতে জাতি গঠনসহ সব ধরনের কার্যক্রম শুরু করেছিলেন জাতির পিতা।

১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯২টি লাভ করে। ন্যাপ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, জাতীয় লীগ ১টি করে, এবং নির্দলীয় প্রার্থীরা ৫টি আসনে জয়লাভ করে। এরপর স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়।

বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য ছিল, ব্রিটিশ আমল থেকে পাকিস্তান আমল পর্যন্ত যে সামরিক-বেসামরিক আমলা এলিট শ্রেণী দেশ শাসন করছিল তাদের উপর রাজনৈতিক এলিট শ্রেণীর নেতৃত্ব স্থাপন করা। অবশ্য সামরিক-বেসামরিক বাঙালি আমলাগণ বুঝতে পারেন, সংসদীয় গণতন্ত্রের দাবি বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে সর্বাত্মক সমর্থন পেয়েছে। এখন থেকে রাজনীতিবিদগণই নেতৃত্ব প্রদান করবেন। তাছাড়া ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত অনেক সিনিয়র বাঙালি আমলা ও সামরিক কর্মকর্তা পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে ফিরে না আসতে পারায় প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও তারা বেশ দুর্বল ছিলেন। সেই সময় রাজনৈতিক দলগুলোও দুর্বল এবং বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

বঙ্গবন্ধু আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তার ‘কারিশমা’ এবং ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করেন। যদিও সামগ্রিকভাবে দেশের অবস্থা ছিল দুর্বল, তা সত্ত্বেও এ সময় বেশ কিছু বড় আকারের সমস্যার সমাধান হয়; যেমন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধাদের নিরস্ত্রীকরণ, শরণার্থীদের পুনর্বাসন, অবকাঠামোগত পুনর্গঠন, অবাঙালিদের ফেলে যাওয়া শিল্প-কারখানা পরিচালনা, স্বীকৃতি এবং সাহায্যের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে আলোচনা ইত্যাদি। শিল্প-কারখানা, ব্যাংক এবং বীমা স্থাপনের উদ্যোগ গৃহীত হয়; যদিও রাষ্ট্রের স্বল্প সামর্থ্যের কারণে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা বেশ সমস্যার সম্মুখীন ছিল।

একটি সদ্য স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সামাজিক জীবন তখনও ছিল বেশ বিশৃংখল। একদিকে সমাজে ছিল পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দি এবং তাদের বাঙালি সহযোগীদের বিচারের প্রবল দাবি, অন্যদিকে পাকিস্তানের বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে তা বাতিল করার চাপ। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বিভিন্ন গ্রুপের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন নিয়ে আসে। তরুণ মুক্তিযোদ্ধারা সমাজে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন প্রত্যাশা করেন। স্বাধীনতার এক বছরের মধ্যেই আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠনের একটি অংশ নতুন একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ছিল যাদের ঘোষিত লক্ষ্য। দ্বিধাবিভক্ত কম্যুনিস্ট সংগঠনের অনেকগুলো গ্রুপ সারাদেশে শ্রেণী সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়। কিছু মুক্তিযোদ্ধা এনজিও (বেসরকারি সংগঠন) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দরিদ্র মানুষদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি ও সাহায্য-সহযোগিতা প্রদানে উদ্যোগী হন। স্বাধীন বাংলাদেশে এক বছরের মধ্যে এভাবেই এনজিও কর্মকান্ডের শুরু যা পরবর্তীকালে সমাজের একটি প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়।

দেশের এ ধরনের পরিস্থিতিতে শেখ মুজিব ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষামূলক ভূমিকা গ্রহণ করেন। পাকিস্তানি যুদ্ধ বন্দিদের মুক্তি দেওয়া হয়। এরপর শেখ মুজিব সমাজ কাঠামোর আমূল পরিবর্তনে বিশ্বাসী বিরোধী বামপন্থি শিবিরের দিকে দৃষ্টিপাত করেন। তিনি আওয়ামী লীগের একান্ত অনুগত ব্যক্তিদের নিয়ে উগ্রপন্থিদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আধা-সামরিক ‘রক্ষী বাহিনী’ গঠন করেন।

আওয়ামী লীগের উপর ছিল দেশের সামগ্রিক পুনর্গঠন ও পুনর্বাসন কাজের চাপ; কিন্তু অগ্রগতি ছিল খুবই ধীর। একই সময় আওয়ামী লীগের অনেক নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ক্রমশ প্রকাশ পায়। একদিকে উগ্রপন্থি যুব নেতৃবৃন্দ শেখ মুজিবের অধীনে বিপ্লবী সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। অন্যদিকে মধ্যপন্থি অবলম্বনকারী নেতৃবৃন্দ সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসন অব্যাহত রাখার পক্ষাবলম্বন করেন।

১৯৭৪ সালের বন্যা, খাদ্য ঘাটতি, বৈদেশিক মুদ্রা সংকট, বাংলাদেশকে ঋণ দানে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার অনিচ্ছা এবং ‘বাংলাদেশ সাহায্য সংস্থা’ গঠন করেও তাৎক্ষণিকভাবে সাহায্য না পাওয়ার পরিস্থিতিতে দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও বিরোধিতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি হয়। শেষপর্যন্ত শেখ মুজিব ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবাদপত্র ও বিচার ব্যবস্থার উপর বিধি নিষেধ আরোপ করে একদলীয় ও রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার পদ্ধতি চালু করেন।

১৯৭৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিব দেশে প্রচলিত সকল রাজনৈতিক দল বাতিল ও বেআইনি ঘোষণা করে ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ (বাকশাল) নামে একটি জাতীয় দল গঠন করেন। বাকশালের পাঁচটি ফ্রন্ট ছিল কৃষক, শ্রমিক, যুবক, ছাত্র এবং মহিলা। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের দীর্ঘ ঐতিহ্য ভেঙ্গে বেসামরিক আমলা এবং সেনা সদস্যগণও এ দলে যোগদানের অনুমতি পায়।

বঙ্গবন্ধুর ভাষায় এটি ছিল ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’। একদলীয় একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে বেশ কিছু অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের সূচনা হয়। মুদ্রামানের সংস্কার, আমদানি ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ হ্রাস, খাদ্য উৎপাদনে নতুন উদ্যোগ, রফতানি প্রসারে নতুন কৌশল, শিল্পখাতে নিয়ন্ত্রণ হ্রাস, মূল্যমান নির্ধারণে খোলা বাজারের ভূমিকা প্রসার এমনি ধরনের বিভিন্ন সংস্কার নতুন উদ্যোগে শুরু হয়। জেলা প্রশাসনকে ঢেলে সাজানো, সকল মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করে একজন রাজনৈতিক প্রশাসনিক গভর্নর নিয়োগ, ভোগ্যপণ্য সরবরাহের জন্য প্রতিটি গ্রামে সমবায় প্রতিষ্ঠান গঠনেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নতুন ধীকল্প এর সম্পূর্ণ প্রয়োগের পূর্বেই ১৫ আগস্ট প্রত্যুষে গুটি কয়েক উচ্চাভিলাষী বিপথগামী জুনিয়র সামরিক অফিসার বঙ্গবন্ধু, তার উপস্থিত পরিবার পরিজন এবং তার কিছু সহকর্মীকে হত্যা করে সাংবিধানিক ধারাকে ব্যাহত করে দেয়।


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

error: Content is protected !!