শুক্রবার, ৩০ জুলাই ২০২১

কোরবানির পশুর হাট যেন করোনা সংক্রমণের বাজার না হয়

হাসান হামিদ

ঈদ অতি নিকটে। দেশে এখন চলছে উৎসবের আমেজ। লকডাউন শিথিল হওয়ার পর লাখ লাখ মানুষ শহর ছেড়ে ছুটে যাচ্ছে আপনজনের কাছে। স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই। কে কাকে বোঝাবে! এর মাঝে দেশজুড়ে বসেছে কোরবানির পশুর হাট। সেখানে কোনো কিছুর তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। অথচ যখন লকডাউন শিথিল করে পশুর হাট বসানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, তখন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, কোরবানির পশুর হাটগুলোতে কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে বাধ্য করা হবে। কিন্তু পত্রিকার পাতায় সারাদেশের যে খবর প্রকাশিত হয়েছে; তা বলছে, কেউ স্বাস্থ্যবিধি মানছে না!

মুসলমানদের জন্য সামর্থ অনুযায়ী পশু কোরবানি করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এর বাইরে কোরবানির পশু কেনাবেচা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য কিন্তু কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, এই ঈদে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ১৯ লাখ গবাদি পশু জবাইয়ের জন্য রয়েছে। তাদের প্রতিবেদন বলছে, গৃহস্থালিতে গরু-ছাগল পালন ছাড়াও প্রায় সাত হাজার খামার রয়েছে যেগুলো কোরবানির জন্য পশু পালন করে। প্রতি বছর গড়ে ৫০ থেকে ৫৫ হাজার কোটি টাকার কোরবানির পশু কেনাবেচা হয় আমাদের দেশে। তাই ঈদে যদি বিক্রি কম হয়, তাহলে তা অর্থনীতির ওপর এটি বিরূপ প্রভাব ফেলবে সেটাই স্বাভাবিক। এসব কারণেও কোরবানির হাট বসা জরুরি। কিন্তু তাতে যদি স্বাস্থিবিধি না মানা হয়, তাহলে এর পরবর্তী অবস্থা সামলানো কঠিন হবে। অনলাইনে এবার যখন পশু কেনাবেচা হচ্ছিল, আমরা খুব আশাবাদী ছিলাম বাজারটা আরও বিস্তার লাভ করবে।

গতকাল পত্রিকায় পড়লাম, গরুর হাট থেকে ফিরে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। ওই ছাত্রের নাম সুমন হোসেন। তিনি নৃবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। থাকতেন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এ এফ রহমান হলে। জানা গেছে, ১০-১২ দিন আগে সুমন তার বাবার সঙ্গে গরু কিনতে বাজারে যায়। বাড়িতে ফিরে সেদিন রাতেই সুমনের জ্বর হয়। পরে কালীগঞ্জ সদর হাসপাতালে তার চিকিৎসা শুরু হয়। এরপর শ্বাসকষ্ট বাড়লে সুমনকে যশোর হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং করোনা শনাক্ত হয়। এখানে চিকিৎসা চলার মধ্যে সে মারা যায়। এই একটি ঘটনাই বলে দিচ্ছে, কোরবানির হাটে স্বাস্থ্যবিধি মানা কতটা দরকার। এই জরুরি বিষয়ে সবাই উদাসীনতা দেখাচ্ছে। এর পরিণাম কী হতে পারে? যারা বলতো, এ দেশে করোনা আসবে না, তারা হয়তো জানে না, দৈনিক করোনা শনাক্তের হারে বাংলাদেশ এখন এশিয়ার শীর্ষে এবং বিশ্বে চতুর্থ। এখনও সাবধান না হলে, তা দেশের ভয়ানক ক্ষতির কারণ হবে, ভুগবে মানুষ।

জানতে পেরেছি, সারাদেশে ১৭ জুলাই থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অস্থায়ী কোরবানির পশুর হাট কার্যক্রম শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধির ৪৬টি শর্ত মেনে নেয়া সাপেক্ষে এটি অনুমোদন করা হয়েছে। কিন্তু প্রকাশিত সংবাদ বলছে, কোরবানির পশুর হাটে স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে ক্রেতা বিক্রেতাদের মধ্যে তেমন কোনো তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। অল্প কয়েক জায়গা বাদে বেশিরভাগ স্থানে মাস্ক পরিধানের ব্যাপারটিও শতভাগ নিশ্চিত নয়। ঢাকায় আমরা জানি, সীমান্তবর্তী জেলাগুলো থেকে বিক্রেতারা আসেন। তারা এবার মাক্স পরিধান করা ছাড়াই কোরবানির পশু বিক্রি করতে এসেছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জরিপ বলছে, দেশে করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ ভারতীয় ভেরিয়েন্ট মারাত্মকভাবে প্রভাব পড়েছে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে। স্থানীয় ক্রেতাদের মধ্যেও স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য কোনো তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়নি।

কোরবানির পশুর হাটে স্বাস্থ্যবিধি তো মানা হচ্ছেই না, উল্টো মারামারি হচ্ছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া অবৈধভাবে বসানো গরুবাজারে হামলায় শাহআলম নামের একজন গরুর ক্রেতা মারা গেছেন। পত্রিকার খবরে পড়েছি, ১৭ জুলাই দুপুরে ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে উপজেলার বাদৈর ইউনিয়নের আলীনগরে অবৈধভাবে গরু-ছাগলের হাট বসে। ওই হাটে গরু কিনতে যায় শ্যামবাড়ী গ্রামের ইউনুছ মিয়ার ছেলে শাহআলম ও তার ভাই গরু কিনতে যায়। তারা দুই ভাই একটি গরুর দরদাম করছিলেন। এ সময় গরুর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন গ্রেপ্তারকৃত ইসহাক মিয়াসহ তার দুই ভাই মাহবুব ও বায়েজিদ মিয়া। গরুর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় গরুটি তাকে লাথি দেয় অভিযুক্ত মাহবুব মিয়াকে। তার পেছনে দাড়ানো ছিলো নিহত শাহআলমের বড় ভাই আনোয়ার হোসেন। অভিযুক্ত মাহবুব মনে করে তাকে আনোয়ারই লাথি দিয়েছে। কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই মাহবুব মিয়া আনোয়ার মিয়ার নাকে মুখে ঘুষি মারে। সাথে শাহআলম তার ভাইকে ঘুষি মারলো কেন জানতে চাইলে উত্তেজিত হয়ে হামলা শাহআলম ও তার ভাই আনোয়ারের ওপর। এক পর্যায়ে বায়েজিদের হাতে থাকা বাশ দিয়ে শাহআলমের মাথায় আঘাত করলে গুরুতর রক্তাক্ত জখমপ্রাপ্ত হন শাহআলম। তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ কমপ্লেক্সে নিয়ে এলে শাহআলমকে কুমিল্লা হাসপাতালে রেফার করে। সেখান থেকে তাকে ঢাকা রেফার করলে ঢাকা নিয়ে গেলে মারা যায় সে। এই হলো অবস্থা। এদের স্বাস্থ্যবিধি কে মানাবে!

প্রতিটি শহরে পশুর হাটের জন্য প্রশাসন থেকে কয়েকটি মনিটরিং টিম গঠন করা যেত। মাঠ পর্যায়ের ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে এসব টিম পরিচালনা হত। সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিটি হাটেই কিছু প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক এবং পর্যাপ্ত মাস্ক দেওয়া দরকার ছিল। এর পাশাপাশি ইজারাদারদের পক্ষ থেকে হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় অন্যান্য সামগ্রী সরবরাহ করা যেত। এর কিছু কিছু কোথাও করা হয়েছে বলে জেনেছি। কিন্তু কঠোর ভাবে দেশজুড়ে তা না হলে, লাভ নেই। বেলুনের বাতাস বের হতে একটি ফুটোই যথেষ্ট। ব্যবস্থা হওয়া উচিত ছিল নিশ্ছিদ্র। তা আর হল কই!

আমাদের মনে রাখা দরকার, ঈদ সামনে রেখে বর্তমান ভয়াবহ করোনা পরিস্থিতিতেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে পশুর হাট বসার অনুমতি দিয়েছে সরকার। এখন বিধি যদি আমরা না মানি, যদি মুর্খের মত নানা কথা বলি, তাহলে শেষ রক্ষা কিন্তু হবে না। সাবধানের মাইর নাই এই পুরোনো কথাকে আমরা দলামোচা করতেই অভ্যস্ত যেন। আমরা কেবল আমাদের কথা ভাববো না, দেশের কথাও ভাবতে হবে। কুরবানির পশুর হাটে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের কোনো বিকল্প নেই, এটাই শেষ কথা। সবার জীবনে আনন্দময় ঈদ আসুক এই প্রত্যাশা।

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক।


© দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত