বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২০

ক্রমেই বাড়ছে সংক্রমণ : মৃত্যু বেড়ে ১৬৩১২

বিশ্বের ১৯৩ দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে প্রাণঘাতী নভেল করোনাভাইরাস। আড়াই মাসের বেশি সময় ধরে দেশ থেকে দেশে ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্বজুড়ে বিপর্যয়কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পুরো বিশ্ব একযোগে করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেও সংক্রমণ ঠেকানো যাচ্ছে না। গতকাল সোমবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রধান টেড্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘ক্রমেই বাড়ছে করোনা সংক্রমণ। তবে এই সংক্রমণ চক্রে পরিবর্তন আনা এখনও সম্ভব।’ বিশ্বজুড়ে সংক্রমণ হু-হু করে বেড়ে যাওয়ার চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রথম পর্যায়ে সংক্রমণ এক লাখে পৌঁছতে ৬৭ দিন লেগেছিল। পরের এক লাখে পৌঁছায় ১১ দিনে। তবে তৃতীয় লাখে পৌঁছেছে মাত্র চার দিনে। এরপর তিনি বলেন, তবে আমরা হতাশ সাক্ষীগোপাল নই। মহামারির এই চক্রে আমরা পরিবর্তন আনতে পারি।
এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকার বড় বড় দেশে সংক্রমণ ঠেকাতে জনজীবন লকডাউন করার মতো নজিরবিহীন ব্যবস্থা নেওয়ার পরও দ্রুত বেড়ে চলা সংক্রমণের লাগাম হঠাৎই টেনে ধরা খুব কঠিন। চীনের দেখানো পথে দেশে দেশে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, বিমান চলাচল বন্ধ, শহর অবরুদ্ধ, সামাজিক অনুষ্ঠান বাতিল করায় সংক্রমণের গতিতে কিছুটা ভাটা পড়বে বলে আশা করছে ডব্লিউএইচও। তবে লকডাউন একমাত্র সমাধান নয় বলেও সতর্ক করেছে সংস্থাটি। লকডাউনের সঙ্গে আক্রান্ত শনাক্ত, তাদের চিকিৎসা, সন্দেহভাজন আক্রান্তদের কোয়ারেন্টাইনে রাখার কঠিন চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
সোমবার রাত ১২টা পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান সংস্থা ওয়ার্ল্ডওমিটারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে মোট আক্রান্ত বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৬৮ হাজার ৯৪৮। আর মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ৩১২। মোট আক্রান্তের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠেছেন এক লাখ এক হাজার ৬৯ জন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছেন ১১ হাজার ৮৫৬ জন। সারাবিশ্বে গতকাল মারা গেছেন এক হাজার ৬৭২ জন ও নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৪ হাজার ৭১৭ জন। চীনে নতুন ৯ জনসহ মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ২৭০।
ইউরোপের ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রে গতকাল পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এদিনও সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে ইতালিতে, ৬০১ জন। এ নিয়ে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয় হাজার ৭৭ জনে। আর নতুন চার হাজার ৭৮৯ জনসহ দেশটিতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৩ হাজার ৯২৭ জনে। স্পেনে নতুন ৪৩৫ জনসহ মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ২০৭ জনে এবং নতুন দুই হাজার ২০৬ জনসহ মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৮৯ জনে। জার্মানিতে নতুন ২৪ জনসহ মৃত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৮ জনে এবং দেশটিতে মোট আক্রান্ত ২৮ হাজার ৮৬৫ জন। ফ্রান্সে নতুন ১৮৬ জনের মৃত্যুসহ মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৬০। আর তিন হাজার ৮৩৮ জন নতুন আক্রান্তসহ মোট আক্রান্ত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৮৬০। নেদারল্যান্ডসে নতুন মৃত্যু ৩৪ ও সুইজারল্যান্ডে ২০।
বর্তমানে প্রাণহানির দিক থেকে ইউরোপের দেশগুলো মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে রয়েছে। গতকাল বেলজিয়ামে ১৩, অস্ট্রিয়ায় পাঁচ, পর্তুগালে ৯, সুইডেনে চার, ডেনমার্কে ১১, আয়ারল্যান্ডে চার ও নরওয়েতে দু’জন মারা গেছেন। যুক্তরাজ্যে নতুন ৫৪ জনসহ মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩৫ জনে। এ ছাড়া গতকাল মালয়েশিয়ায় চার, ইন্দোনেশিয়ায় এক, ফিলিপাইনে আট, দক্ষিণ কোরিয়ায় সাত, ভারতে দুই, ইরাকে তিনজনসহ বিভিন্ন দেশে আরও অনেকে মারা গেছেন।
সংক্রমণ রোধে পুরো ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্রের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা, সৌদি আরব, ভারতের বড় বড় শহর, চীন ও হংকং, ইরাক, ইরান, বলিভিয়াসহ প্রায় ৪০টি দেশ অবরুদ্ধ করা হয়েছে। সব বিমান সংস্থার আন্তর্জাতিক যাত্রীবাহী ফ্লাইট প্রায় বন্ধ। এই কড়াকড়িতে কিছু সুফল আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে নতুন ৮৫ জনসহ মোট প্রাণহানি দাঁড়িয়েছে ৫০৪। দেশটিতে নতুন আট হাজার ২৩ জনসহ মোট আক্রান্তে সংখ্যা ৪১ হাজার ৫৬৯। দেশটির সবচেয়ে বেশি সংক্রমিত নিউইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া ও ওয়াশিংটনে চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করাসহ চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপনে সহায়তায় সেনা মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দেশটিতে সংক্রমিতদের ২০ শতাংশের বয়স ২০ থেকে ৪৪ বছর। করোনাভাইরাস বিস্তারের নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠেছে নিউ ইয়র্ক। এদিকে করোনা আতঙ্কে কলম্বিয়ায় জেল ভেঙে পালাতে গিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন ২৩ বন্দি।
ইরানে সোমবার মারা গেছেন ১২৭ জন এবং মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৮১২ জনে। সৌদি আরবে নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার পর সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা কারফিউ জারি করেছেন বাদশাহ সালমান। সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সারাদেশে কারফিউ বলবত থাকবে। সোমবার থেকে শুরু হয়ে আগামী ২১ দিন এ আদেশ কার্যকর হবে। চিকিৎসাসহ জরুরি সেবা এই বিধিনিষেধের বাইরে থাকবে। এর আগে পুরো সৌদি আরবের সব মসজিদে নামাজ আদায় বন্ধ করা হয়েছে। সামাজিক সব অনুষ্ঠানও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস বদলে দিয়েছে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জীবন। বিভিন্ন দেশে বেকার হয়ে পড়েছে বহু খেটেখাওয়া মানুষ। সরকারি সাহায্য পেতে বেকারদের দীর্ঘ লাইন শুরু হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন এর আগে সতর্ক করে বলেছিলেন, করোনাভাইরাস মহামারিতে দেশে অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করবে।
চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হংকংয়ে হঠাৎ বেড়েছে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ। মূলত ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা থেকে যারা আসছেন, তাদের মাধ্যমেই সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। এমন অবস্থায় হংকংয়ের বাসিন্দাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ। পরিস্থিতি সামাল দিতে হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী ক্যারি লাম আজ থেকে তাদের অঞ্চলে বিদেশি ঢোকা পুরোপুরি বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছেন।


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত