সোমবার, ২৩ মে ২০২২

খাবার তেলের সঙ্কট : উত্তরণের পথ কী

অ আ আবীর আকাশ

বাজারে খাবার তেল বা ভোজ্যতেল সয়াবিনের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, কৃত্রিম সংকট, নানা কারসাজি সৃষ্টিতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের মাঝে তৈরি হয়েছে চরম হতাশা। সয়াবিন তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি। তাতে করে দেশের সাধারণ ও গরিব মানুষের দৈনন্দিন জীবনমান হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। এতে করে ক্ষমতাসীন সরকারের ব্যর্থতা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং ভোজ্যতেলের কারসাজির সাথে এমপি-মন্ত্রীদের সম্পৃক্ত থাকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

জনসাধারণ ক্রেতারা তো আর আন্তর্জাতিক বাজার বুঝে না, তারা কি দামে, কত টাকায় পণ্য পেলো তা দেখার বিষয়। সাধারণ জনগণের কথা চিন্তা করে সরকারের উচিত যত দ্রুত সম্ভব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্রয়মূল্য ও ভোজ্যতেলের লাগামহীন দামে লাগাম টেনে ধরা। যেখানে গত বছরও ভোজ্যতেলের দাম প্রতি লিটার ষাট টাকা ছিল, সেখানে আজ দুইশত টাকা ছাড়িয়েছে প্রতি লিটার। এই নিয়ে কতো বেকায়দায় রয়েছে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষেরা।

গত দু’বছর করোনায় বহু মানুষ এতোটাই আর্থিক দীনতার শিকার হয়েছে যে, দুইশ টাকা দিয়ে এক লিটার সয়াবিন তেল কেনার সাহস দেখাতে পারে না। ফলে সংসারের সৃষ্টি হচ্ছে বাড়তি ঝামেলা। তেলকে কেন্দ্র করে অনেক পরিবারের সৃষ্ট ঝামেলায় সংসার ভাঙ্গার উপক্রম হয়ে দাঁড়িছে। এই ভোজ্যতেলের দাম সাধারন মানুষকে চরম বিপাকে ফেলেছে। প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম ধাপে ধাপে দুইশ টাকার ঘর ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এর সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্রের দাম।

বিশ্ব বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে। ইন্দোনেশিয়া পামওয়েল তেল সরবরাহের নিষেধাজ্ঞা দেয়ায় দেশীয় আমদানিকারক পাইকারি ব্যবসায়ীদের মধ্যে সিন্ডিকেট তৈরি করে তেলের দাম বাড়িয়েছে। যদিও পরে ইন্দোনেশিয়া সে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। কিন্তু চলমান তেল সংকটের লাগাম কিভাবে টেনে ধরা হবে! তবে হুট করে ভোজ্যতেলের দাম ২০০ টাকা প্রতি লিটার হওয়াটা মোটেও ঠিক হয়নি। এটা ব্যবসায়ীরা কি ধরনের মন মানসিকতা পোষণ করলে ৬০ টাকার তেল ২০০ টাকা, ৪০ টাকার পামওয়েল তেল ১৭০টাকা থেকে ১৮০ টাকা দামে বিক্রি করতে পারে!

এর প্রভাব ও চাপ সাধারণ মানুষের জীবন যাপনে কঠোরভাবে আঘাত হয়ে পড়বে। সরকার জনসাধারণের কথা চিন্তা করে যদি এর কোন উত্তম বিহিত ব্যবস্থা গ্রহণ না করে তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য দেশের মানুষের মরার উপর খাড়ার ঘা হয়ে উঠবে। একসময় দেশের পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকবে অনুমান করা যায় না। জনসাধারণের জীবন মান দূর্বিষহ হয়ে উঠবে।

সরকার যাচ্ছেতাইভাবে দেশ পরিচালনা করার যে সাহস দেখিয়ে যাচ্ছে তাতে করে জনগণের ভাগ্যে কি লেখা আছে আল্লাহ জানে। সরকার যদিও বলছে দেশে তেলের কোনো ঘাটতি নেই। তাহলে এ সংকট কোথা থেকে, কেনো, কিভাবে তৈরি হলো? সরকার ইচ্ছে করলে কি তা সমাধান করতে পারে না? কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ঈদের আগে ও পরে ভোজ্যতেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের চরম কৃত্রিম সঙ্কট দেখা যাচ্ছে। প্রশাসনের লোকেরা দেশের বিভিন্ন স্থানে হাটে-বাজারে দোকানপাটে তেল মজুদ রাখার বিষয়টি উদঘাটন ও জরিমানা করছেন। তেলের দাম কী আরো বাড়বে? নইলে কেনো অন্ধপ্রকৌষ্টে তেল মজুদ করবে? কেনো তেল নাটকের সূচনা হবে!

তেল খাওয়া পূর্বের তুলনায় অধিক হারে বাড়াতে দিনকে দিন তেল নিয়ে ব্যবসায়ীদের কারসাজি বেড়ে চলছে। বর্তমান বাজারে ভোজ্যতেলের ৯৫ ভাগ আমদানি করা হয়। এই সুযোগে আমদানিকারকরা দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ইন্দোনেশিয়ার সরকার পামওয়েল তেল রফতানি নিষেধাজ্ঞায় সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে। অবশ্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে। এই সুযোগে বিশ্ববাজারে গুজবও কম নয়। গুজবের কারণে বাজার আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। দফায় দফায় দাম বৃদ্ধি ভোক্তাদের নাজেহাল করে তোলে।

প্রতিমাসে গড়ে ৬৫ হাজার টন অপরিশোধিত আকারের সয়াবিন তেল আমদানি করা হয়। সয়াবিন বীজ মাড়াই করে সয়াবিন তেল উৎপাদন করে তিনটি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান মাসে গড়ে ২৮ হাজার টন সয়াবিন তেল উৎপাদন করে। সবমিলিয়ে মাসে দেশে এক লাখের বেশি তেলের চাহিদা রয়েছে। বিশ্ব বাজারে অস্থিরতা থাকায় কিছুদিন ধরে আমদানিকারকরা সয়াবিন তেল আমদানি কমিয়ে দিয়েছে। তাতে করে সয়াবিন তেলের কেজিপ্রতি দাম দুইশ’র বেশী টাকা থেকেও হুহু করে বেড়ে চলছে।

বাংলাদেশ সরকার কি কোন পদক্ষেপ নিয়েছে যে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম যদি অস্থির হয়ে পড়ে তাহলে দেশের ভোজ্য তেলের চাহিদা কিভাবে পূরণ করবে? এ পর্যন্ত সরকারের এরকম কোনো পদক্ষেপ নিতে শোনা যায়নি। তবে শীঘ্রই দেশের বাজার চাহিদা অনুযায়ী ভোজ্য তেলের উৎপাদন বাড়াতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আমাদের মাটি ও আবহাওয়া উপযোগী নতুন নতুন তেলের বীজ উদ্ভাবন করতে হবে ও তা চরাঞ্চলে ব্যাপকহারে উৎপাদন বাড়াতে হবে। মোটকথা সরকার ও ভোজ্যতেলের আমদানিকারকদের ভোজ্যতেল আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দিয়ে দেশে তেল উৎপাদনে নজর দিতে হবে। আমরা দেখেছি দেশে একসময় ভোজ্যতেল হিসেবে সরিষার তেল ব্যবহার হতো। সরিষার তেলের পুষ্টি সমৃদ্ধ খৈল পশু খাদ্য ও মৎস্য খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বহুবিধ ব্যবহার করা যায় সে রকম তেল বীজ আমদানি করতে হবে।

আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশেই তেল উৎপাদন বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা একদিকে যেমন সরকারকে নিতে হবে অন্যদিকে ব্যবসায়ীদেরকেও নিতে হবে। সরিষা, চিনাবাদাম, তিল, তিসি, সয়াবিন, কুসুম ফুল ও সূর্যমুখি ফুল থেকে তেল উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশের মধ্যে লক্ষ্মীপুর জেলায় মোট আবাদী জমির মধ্যে মাত্র ৪ শতাংশ জমিতে সয়াবিন উৎপাদন করা হয়। এর ব্যাপকতা সারাদেশেই বাড়াতে হবে।

উন্নত জাতের বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, কৃষকদের প্রশিক্ষণ, তেলবীজ চাষে উদ্বুদ্ধকরণ ও সহজ শর্তে ঋণ প্রদানসহ যাবতীয় উপকরণ সরবরাহ করা এবং অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের দেশের মাটি সমুদ্র থেকে ভেসে আসা উর্বর পলি দ্বারা গড়ে উঠেছে। তাই এই ব-দ্বীপের মাটি খুবই উৎকৃষ্ট উর্বর। এমন সম্পদ পৃথিবীর খুব কম দেশেই আছে। তাই এদেশের মাটি ও মানুষকে সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে তেল উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে আগামীতে ভোজ্যতেল আমদানি করার বিপরীতে রপ্তানি করার দিকে অগ্রসর হওয়ার লক্ষ্যে সরকার ও ব্যবসায়ীদের দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠবে।


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত