বৃহস্পতিবার, ০৬ অক্টোবর ২০২২

গল্প : জাদুর বাক্স

রুজহানা সিফাত

এক।

: আসেন আসেন জাদু দেখলে আসেন। টিকেট পঞ্চাশ টাকা, পঞ্চাশ টাকা, পঞ্চাশ টাকা। পঞ্চাশ টাকায় রাজ্যের বিস্ময়! ভালো না লাগলে পয়সা ফেরত। পঞ্চাশ টাকা, পঞ্চাশ টাকা, পঞ্চাশ টাকা।

মোকলেস অনেকক্ষণ ধরেই লোক ডাকছে। আজকে মেলায় জন সমাগম প্রচুর। মোকলেস কাজ করে ইদ্রিস আলীর জাদুর দলে। এই দল বিভিন্ন মেলায় ঘুরে ঘুরে জাদু দেখায়। দলে শরিফা নামে একজন আছে; সে অনেক বছর ধরে এদের সাথে কাজ করে।

শরিফার বয়স এবার সতেরো বছর হলো। শরিফা যেই জাদুটায় অংশ নেয় সেই জাদুটা তার একটুও ভালো লাগে না। শরিফাকে একটা বাক্সের গোপন কুঠরীতে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। মানুষের সামনে বাক্সের ভিতর একটা কবুতর ঢুকানো হয়। তারপর মোকলেস মন্ত্র পড়ে তালি দেয়। আর শরিফা গোপন কুঠরী থেকে বেরিয়ে আসে। এই জাদুটায় শরিফাকে অন্ধকারে ঘুপটি মেরে বসে থাকতে হয় অন্তত বিশ সেকেন্ড। এই বিশ সেকেন্ড সময় শরিফার বিশ বছরের মতো লাগে। অন্ধকারে শরিফার খুব ভয় লাগে। মনে হয় একজোড়া চোখ শরিফাকে অনুসরণ করছে। শরিফা মনে মনে চোখ বন্ধ করে গুনতে শুরু করে এক, দুই, তিন, চার…এভাবে উনিশ পর্যন্ত গুনলেই মোকলেস তাকে বের করে আনে।

শরিফার জীবনটা এমন হবার কথা ছিল না। শরিফার বাবা ছিল ইলেক্ট্রিশিয়ান। মা-বাবা দুজনই শরিফাকে খুব ভালবাসতো। শরিফার বয়স তখন ছয়। শরিফা বাড়ির পাশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তো। শিশু শ্রেণীতে। তারপর একদিন বাবার সাথে বৈশাখী মেলায় এলো। ভীড়ের মধ্যে বাবা বারবার বলেছিল,

: শক্ত করে হাত ধরে রাখ। আর নয় হারিয়ে যাবি।

কিন্তু জাদুর খেলা দেখার জন্য হঠাৎ হাত ছেড়ে জাদুর দলে খেলা দেখতে শুরু করেছিল শরিফা। তারপর ওস্তাদ ইদ্রিস আলী শরিফাকে ডাকলো। বলল,

: জাদুর বাক্সের মইধ্যে ঢুকবা নাকি খুকি?

শরিফা কিছু না বুঝেই মাথা উপর-নিচ নাড়িয়ে হ্যাঁ বলল। এরপর ভয় না পেয়ে ঢুকে গেলো জাদুর বাক্সে। ওরা কবুতর বের করলো। শরিফা ঘুপটি মেরে বসে রইলো অন্ধকার কুঠুরিতে। হঠাৎ মনে হলো জাদুর বাক্সে সে ছাড়া আরো কেউ আছে। তাকে দেখছে। ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল শরিফা। তারপরই তালির শব্দ শুনলো। ওস্তাদ তাকে বের করে আনলো।

তারপর শরিফার খেয়াল হলো সে তার বাবার হাত ছেড়ে জাদু দেখতে এসেছে। ভীড়ের মধ্যে বাবাকে অনেক খুঁজলো, অনেক কান্নাকাটি করল, চিৎকার করে ডাকল। কিন্তু খুঁজে পেলো না কাউকে।

শরিফার ছোট্ট বুকটা ধুক ধুক করে কাঁপছে। জাদুর বাক্সের পাশে বসে বসে কাঁদতে থাকে শরিফা। তারপর ইদ্রিস ওকে সাথে করে নিয়ে আসে জাদুর দলে। ইদ্রিস লোকটাকে যতটা ভালো মনে হয়েছিল শরিফার পরে বুঝলো লোকটা আসলে খুব খারাপ। কি বিশ্রীভাবে শরিফার গায়ে হাত বুলায়। শরিফার খুব অস্বস্তি হয়। শরিফাকে লোকটা খুব কষ্ট দেয়।

শরিফা যখন প্রথম লোকটার হাতে ধর্ষিত হয় সে বুঝতেই পারেনি এটাই ধর্ষণ । জাদু দলের মোমেনা খালাকে যখন সে প্রথম এই অভিজ্ঞতার কথা বলেছিল। সে শরিফার মুখ চেপে ধরে বলেছিল,

: চুপ বেডি, চুপ কর, এসব কথা কাউরে কয় নাহি?

শরিফা সব বুঝতে না পারলেও এটুকু বুঝেছিল এখানে থাকলে তার জীবনটা এভাবেই কাটবে। শরিফার বয়স যখন দশ বছর হলো তখন সে জাদুর দল ছেড়ে পালিয়ে যায় একদিন। ছুটতে ছুটতে হাঁপিয়ে গেল একসময়। তারপর দাঁড়িয়ে কাঁদতে শুরু করলো।

খলিল ছিল ঐ এলাকার ভিক্ষুক। ভিক্ষুক মহলে সে ল্যাংড়া খলিল্লা নামে পরিচিত। খলিল শরিফা যেখানে কান্না করছিল তার পাশেই বসে ভিক্ষা করছিল। খলিল জিজ্ঞেস করল,

: এই খুকি কান্দ ক্যান? কোত্থেকে আইস? আম্মা কই তোমার?

শরিফা শুধু কাঁদতেই থাকে। খলিল শরিফাকে জিজ্ঞেস করে,

: আমার লগে যাইবা?

শরিফা হ্যা সূচক মাথা নাড়ে। খলিল তখন মহাখুশি। এই বাচ্চা মেয়েটাকে কাছের পতিতালয়ে শোভা মাসির কাছে বেচতে পারলে ভালো দাম পাওয়া যাবে।

দুই।

প্রথমে খলিল শরিফাকে হোটেলে নিয়ে গিয়ে ভাত খাওয়াল। তারপর নিয়ে গেল শোভা মাসির কাছে।

শরিফাকে দেখে শোভা মাসি নাক সিটকে বললো,

: এতো বাচ্চা মেয়ে! বাচ্চা মেয়ে কামে লাগাই আর পুলিশে আইসা কেইস খাওয়াইব তা হইতো না। যা যেহানতোন আনসস রাইখা আয়।

হোটেলে ভাত তরকারি বাবদ পঞ্চাশ টাকা খরচ হয়েছে খলিলের এতো সহজে সে হাল ছাড়ার পাত্র না।

: মাসি বাচ্চা মাইয়াই তো খদ্দেররা পসন্দ করে। দেহো পুলিশ আইলে লুকাই রাখবা, পয়সা দিয়া দিবা, কাম শেষ। আর এই মাইয়া বাবদ বেশি পয়সা রাখবা।

শোভা রাণী আঁচলে বাঁধা টাকা থেকে দুইশ টাকা ছুড়ে দিল খলিলকে। খলিল অনুনয় বিনয় করে আরো একশ টাকা নিয়ে চলে গেলো। শোভা রাণী চোখ কুচকে শরিফাকে দেখতে শুরু করল। শরিফার হাড় জিরজিরে শরীর দেখে মুখ বাকিয়ে বলল,

: যা এক খান স্বাস্থ্য! অই তোর নাম কিরে?

শরিফা কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে,

: শরিফা।

: কোথথেইকা পলাইসস? কার বাড়িত কাম করতি?

শরিফা কেঁদে কেঁদে বলে,

: পলাইনাই; হারাই গেসি।

: অহন যা গোসল কইরা ল। জুলেখা নতুন মাইয়াডারে কাপড় দে।

বিকাল নাগাদ শোভারাণী বুঝে গেল শরিফা কোথা থেকে পালিয়েছে। ইদ্রিস শোভাকে ফোন করলো বিকালে।

: আমার দলের একটা মাইয়া নাকি তোর কাছে আসে?

: কি, আমার কাছে কুনো মাইয়া নাই।

: খলিল্যা তোরে একটা মাইয়া দিসে নাকি না।

: হেই মাইয়া আমার। হ্যারে কিন্যা লইসি।

: কত দিয়া কিনছস? ভালয় ভালয় মাইয়াডা ফেরত দিয়া দে।

: হ, তোমার মাইয়া তুমি নিয়া যাও। কিন্তু আমারে কি দিবা। হ্যারে আমি টেকা দিয়া কিনসি। নগদ পাঁচ হাজার টেহা দিসি।

: আবার মিসা কথা কস!

: তুমি আমারে ছয় হাজার টেকা দাও। মাইয়া তুমি ফেরত পাইবা আর নয় পাইবা না। অন্যখানে চালান দিমু।

ইদ্রিস জানে শোভার সাথে ঝামেলায় গেলে তার লস। শোভার অনেক প্রভাব প্রতিপত্তি। এই এলাকায় অনেক বড় বড় বোয়ালমাছ তার খদ্দের। ইদ্রিস এবার গলার স্বর একটু নরম করেই বলল,

: শোভা, মাইয়াডা খুব কামের। দারুণ জাদু দেহায়। তুই আমারে দুই হাজার টেকায় হ্যারে ছাইড়া দে।

: এইতো এতক্ষণে লাইনে আসছো ইদ্রিস। আইচ্ছা যাও তোমার লাইগা পাঁচশ টেহা কমামু।

ইদ্রিস আবার অনুনয় করে বলে,

: শোভা, আমার কাছে অহন টেহা নাই। যা তরে আড়াই হাজার টেকা দিমু, মাইয়াডারে দিয়া দে।”

শোভা ধানাইপানাই করে। অবশেষে তিন হাজার টাকায় শরিফাকে আবার ইদ্রিস নিয়ে যায়। এবার অত্যাচারের মাত্রা আরো বেড়ে গেল। শরিফাকে এবার সে পয়সা দিয়ে কিনেছে। অধিকার অনেক বেশি। শরিফার জীবনটা অন্ধকারেই আচ্ছন্ন হয়ে গেল। কাঁদতে কাঁদতে শরিফা একসময় কান্না ভুলে যায়।

তিন।

আজকে মেলায় অনেক লোক সমাগম। দলের পুরোনো সদস্য মোকলেস অনেকক্ষণ ধরেই লোক ডাকছে। প্রথমেই শরিফার খেলা। শরিফা বক্সে ঘুপটি মেরে বসে আছে। তার বরাবরের অন্ধকারে অস্বস্তি লাগছে। মনে হচ্ছে কেউ একজন তাকে দেখছে। অসংখ্য চোখ আছে বক্সে। শরিফা গুনতে থাকলো এক, দুই, তিন, চার… বিশ, একুশ, বাইশ।

শরিফা কুল কুল করে ঘামছে। আজ কি হলো ওস্তাদের! বিশ পেরিয়ে গেছে তবু কেউ তাকে বের করছে না কেন?

শরিফা গুনতে গুনতে একশ পেরুলো। তারপর ধীরে ধীরে চোখ খুলল। নীলচে একটা আভা দেখল। তারপর নিজেকে আবিষ্কার করলো বিশাল একটা হলঘরে। সে শুয়ে আছে একটা হাসপাতালের বেডের মতো বেডে। আশেপাশে কেউ নেই। পুরো এলাকাটা নিস্তব্ধ। শরিফা ভয় পেয়ে গেলো। আর তখনি একটা অপরিচিত পুরুষ কণ্ঠস্বর শুনতে পেলো।

: তোমাকে আমাদের গ্রহ টিটিনে স্বাগতম। শুনতে পাচ্ছ তুমি? আমার কথা বুঝতে পারছ?

শরিফা ভয়ে কুকড়ে গেল। আবার শব্দ হলো।

: ভয় পেয়ো না খুকি। তুমি আমাদের দেখতে পাবে না। তোমাদের দৃষ্টিশক্তি যে ত্রিমাত্রিক প্রতিবিম্ব তৈরি করে তা দিয়ে আমাদের দেখা সম্ভব না। আমাদের ভাষা বিশেষ ট্রান্সলেটর দিয়ে তোমাদের ভাষায় রুপান্তরিত করা হয়েছে। তোমাকে দীর্ঘদিন ধরে ঐ বক্সে আমরা পর্যবেক্ষণ করছিলাম। বাক্স থেকে তোমাকে এখানে আনা হয় এবং তোমাদের হিসাব অনুযায়ী ৩.৩ মাইক্রোসেকেন্ডের মধ্যে পাঠিয়ে দেই। আজকে সামান্য যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়েছে। তাই তোমাকে ধৈর্য ধরে একটু অপেক্ষা করতে হবে।

এবার শরিফা একটু ভয়ে ভয়ে বলে,

: আমি ঐ জাদুর বাক্সে ফিরতে চাই না, আমি দুনিয়ায় যাইতে চাই না।

: কিন্তু খুকি আমাদের জগৎটা তোমাদের জন্য না। তোমার জন্য একটা ত্রিমাত্রিক ছবি তৈরী করা হয়েছে মাত্র। তুমি আসেপাশে যা দেখছ সব কৃত্রিম। তোমার দৃষ্টিসীমার সামর্থ অনুযায়ী তৈরি। এই জগৎটার সব কিছু ভিন্ন রকম। ভিন্ন মাত্রার। বুঝতে পেরেছ?

: জি না।

: তুমি বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন অক্সিজেন এবং পানির। তোমাদের জীবনটা পানি নির্ভর। এখানে অক্সিজেন এবং পানির পরিমান খুব সামান্য তুমি বড়জোর দু’ঘন্টা বাঁচবে।

: হেই ভালা। মইরা যাওন ভালা।

: খুকি তোমার কথায় আমরা খুব কষ্ট পাচ্ছি।

তারপর একটু থেমে আবার কন্ঠস্বর বলতে শুরু করল।

: আমাদের এই সৌর জগৎ স্থির। সব কিছুই স্থির। আমাদের সময় তোমাদের গ্রহের মতো প্রবাহিত হয় না। স্থির থাকে। তাই তুমি যদি চাও তাহলে তোমাকে সেই দিনে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারব যেদিন তুমি তোমার বাবার সাথে মেলায় গিয়েছিলে।

শরিফার মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেলো। শরিফা সাথে সাথে উত্তেজিত হয়ে বলল,

: পারবেন? আমার আম্মার কাছে ফিরাইয়া দিতে?

: পারব। তুমি চুপচাপ চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকো। যেমন ছিলে তেমন অবস্থায় থাকো।

শরিফা চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়লো। মনে মনে গুনতে শুরু করলো এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ….উনিশ…

হঠাৎ শরিফার মনে হলো কেউ একজন ওর চুল আঁচড়ে দিচ্ছে।

: শরিফা, চোখ বন্ধ কইরা বইসা আছস ক্যান? তাড়াতাড়ি কাপড় পিন্দা ল। তর বাপজান তরে মেলাত লইয়া যাইব।

শরিফা চোখ খুলে দেখলো, সে সেই দিনটিতে পৌছে গেছে যেদিন তার বাবা তাকে মেলায় নিয়ে গিয়েছিল। শরিফা চিৎকার করে মাকে জড়িয়ে ধরে বলল,

: আমি কোনহানে যামু না মা। আমারে শক্ত কইরা ধইরা রাহো।

শরিফার মা তাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। সে কিছুই বুঝতে পারছে না। যে একটু আগেও মেলায় যাবার জন্য লাফিয়েছে সে এখন কোথাও যেতে চাইছে না কেন।


© 2022 - Deshbarta Magazine. All Rights Reserved.