সোমবার, ২৯ নভেম্বর ২০২১

চেঙ্গিস খানের সমাধি : যা খুঁজে পায়নি কেউ

পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্য জয়ী এক অমর জেনারেলের নাম চেঙ্গিস খান (Genghis Khan)। চেঙ্গিস খানের নাম শোনেননি এমন লোকের সংখ্যা কম। অনেকে অবশ্য তাকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় লুটেরা বলেও অভিহিত করেন। পুরো পৃথিবীর কাছে তিনি একজন নিষ্ঠুর মানব। তার জন্মস্থান মঙ্গোলিয়ায়। চেঙ্গিস খানের জীবন যেমন কালে কালে মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে, তেমনই তার মৃত্যুর ঘটনা ইতিহাসকে করেছে বিস্মিত।

চেঙ্গিস খান প্রায় ২১ বছরে রাজত্ব করেন। তিনি জয় করেন পারস্য চীন, ভারত, ইউরোপ, ভারত ও এশিয়ার প্রায় ১ কোটি বর্গ কিলোমিটার এলাকা এবং জীবনভর তিনি অপরাজিতই থেকেছেন।

চেঙ্গিস খান ১২২৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট কোন তথ্য আজও মেলেনি। কারো কারো মতে, তিনি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। আবার কারো মতে, এক রাজকন্যার দ্বারা খোজা-করণ হওয়ায় তার মৃত্যু হয়। তবে সর্বাপেক্ষা গ্রহণযোগ্য সূত্র অনুসারে বলা যায়, পশ্চিম জিয়া সাম্রাজ্যে আক্রমণ চালানোর সময় ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে তার মৃত্যু হয়েছিল। আর মৃত্যুর পর তাকে মঙ্গোলিয়ায় ফিরিয়ে আনা হয় এবং সেখানেই কোন এক অজ্ঞাত স্থানে তাকে সমাধিস্থ করা হয়।

তার জীবনের ইতিহাস এখানে শেষ হলেও শেষ হল না রহস্য। যুগ যুগ ধরে মানুষ এই মঙ্গোলীয় সম্রাটের সমাধিক্ষেত্র খুঁজে বেড়িয়েছে। কেউ কেউ নিজের সমগ্র জীবন অতিবাহিত করেছে এই সমাধি খোঁজার পিছনে। আর কেউবা এখনো খুঁজে চলেছে ইতিহাসের পাতায়। কিন্তু ইতিহাস কি আর এই রহস্যের সমাধান দিতে পারে!

বলা হয়, চেঙ্গিস খান তার মৃত্যুর পূর্বে বলে গিয়েছিলেন, তার কবর যেন কোন গুপ্ত স্থানে দেয়া হয়। আর সেই ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করার জন্যই যারা তার কবর খনন করেছিল, তাদের হত্যা করা হয় এবং বাকিরা আত্মহত্যা করে। এছাড়া মনে করা হয়, চেঙ্গিস খানের সাথে অর্ধেক পৃথিবীর ধন-সম্পদ ও তার জয় করা ৭৮ জন রাজার মুকুটও সমাধিস্থ করা হয়েছিল। সেই সাথে কিছু সুন্দরী নারীকেও হত্যা করে সমাধিস্থ করা হয়, যাতে তারা পরের জন্মে চেঙ্গিস খানকে সঙ্গ দিতে পারে।

ইতিহাস আরও বলে, মৃত্যুর পূর্বে চেঙ্গিস খান তার নিজের সমাধিস্থলও নির্বাচন করে রেখেছিলেন। তার সমাধির সঠিক স্থান নিয়ে প্রভূত মতামত রয়েছে। কারো কারো মতে, মঙ্গোলিয়ার খেন্তি পর্বতমালার ‘বুরখান খালদুন’ নামক পর্বতের পাদদেশে কোন একটা বড় গাছের নিচে তার সমাধিক্ষেত্র ঠিক করা হয়েছিল।

অনেক ইতিহাসবিদের মতে ,তার সমাধিক্ষেত্র কোন এক নদীর আশেপাশে কিংবা নদীর কোন এক অগভীর অংশে অবস্থিত। আবার কেউ কেউ বলেন , তাকে সমাধিস্থ করার পর সমাধির উপর দিয় শত শত ঘোড়া দৌড়িয়ে নেওয়া হয়, যাতে তার কবরের উঁচু অংশ চিহ্নিত করা না যায়। আর সেখানে গাছপালা লাগিয়ে দেওয়া হয়।

চেঙ্গিস খানের বিরাট সাম্রাজ্যের অগণিত স্থানকে তার সমাধিক্ষেত্র হিসেবে সন্দেহ করা হয়। কিছু কিছু ইতিহাসবিদ বেশ জোরেশোরেই বলেন, চেঙ্গিস খান এর সমাধি মঙ্গোলিয়ায় কোন এক দুর্গম পাহাড়ের কাছে রয়েছে। আবার কারো কারো দাবী, চেঙ্গিস খানকে চীনে সমাধিস্থ করা হয়, যেখানে তার মৃত্যু হয়েছিলো। অবশ্য চীনের ধারণাটি বেশি একটা গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।

১৯৯৩ থেকে ১৯৯৬ সালের মাঝে চেঙ্গিস খানের সমাধি খোঁজার উদ্দেশ্যে একটি জাপানিজ টীম স্যাটেলাইট ও ম্যাগ্নেটোমিটার ব্যবহার করে অভিযান চালায়, যদিও তা ছিল ফলশুন্য। এরপর ২০০০ সালে আবারো ‘মরি ক্রাভিটস’ এর নেতৃত্বে আমেরিকান ও মঙ্গোলীয় একটি যৌথ দল ব্যাপক অভিযান চালায়।

২০০১ সালে একটি চমকপ্রদ আবিষ্কার করে ক্রাভিটস এর দল। তারা ‘খেরেম’ নামক একটি স্থান বের করতে সক্ষম হয়, যাকে চেঙ্গিসের দেয়াল বলা হয়। তাদের মতে, এখানেই সমাধি থাকার অনেক সম্ভাবনা ছিল। তবে ২০০১ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত দলটি ছিল পুরোপুরি নিশ্চুপ। তারপর আর খেরেম সম্পর্কে কোন তথ্য দেয়া হয়নি। ২০০৬ সালে আবারো শুরু হয় খননকার্য। খুঁজে পাওয়া যায় ৩৯ টি সাধারণ কবরের উপস্থিতি যা সম্রাটের সমাধির সম্ভাবনাকে অনেকটাই ম্লান করে দেয়।

এছাড়া ১৫ শতকের এক ফরাসী পাদ্রী বেশ দৃঢ়ভাবেই বলেছিলেন, “বুরখান খালদুন” পর্বতের কাছের দুটি নদী ‘খেরলেন’ এবং ‘ব্রুচি’ এর সংযোগস্থল সবচেয়ে সম্ভাবনাময় একটি জায়গা। কারণ, এখানেই চেঙ্গিস খানের শৈশব কেটেছে। ‘এই জায়গাটি চিরকালই আমার প্রিয় রবে’ কোন একটা যুদ্ধে জয় লাভ করার পর চেঙ্গিস খান এভাবেই তার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন বলে দাবী করেন পাদ্রী।

‘খেরলেন’ নদী খুঁজে পাওয়া যায়, কিন্তু ‘ব্রুচই’ এর কোন চিহ্নও এখন আর নেই। তাই চেঙ্গিস খানের সমাধিক্ষেত্র অনাবিষ্কৃতই রয়ে গেছে, সেই সাথে অধরা হয়ে আছে মধ্য যুগের সবচেয়ে বড় গুপ্ত-ধনের ভাণ্ডারও।

তথ্য সূত্র ও ছবি: ইন্টারনেট


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত