মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর ২০২১

‘চেহেল সেতুন’ উপন্যাসের পাঠ প্রতিক্রিয়া

চেহেল  সেতুন। একজন ক্রীতদাসের নবাব হয়ে ওঠার গল্প। হাসান হামিদের লেখা প্রথম উপন্যাস।

প্রকাশক – ঐতিহ্য। প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী ধ্রুব এষ।

কাহিনি সংক্ষেপ : প্রাসাদের নাম চেহেল সেতুন। ১৭০৪ সালে রাজস্ব বিভাগের রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদ সরিয়ে আনার পর নবাব মুর্শিদকুলী খান এটি নির্মাণ করেছিলেন। এই প্রাসাদকে ঘিরে যার গল্প, সেই গল্প বিক্রি হয়ে যাওয়া একজন ক্রীতদাসের; স্রোতের  বিপরীতে হেঁটে চলা একজন নবাবের। রাজা-বাদশাদের কথা বললে অনিবার্যভাবেই চলে আসে বিলাসিতা, যুদ্ধবিগ্রহ, জৌলুশ, মদের বুদবুদ আর নারী মাংসের গন্ধ। তবে এসবের পাশ কাটিয়ে পাঠক এখানে পাবেন অর্জন, আত্মবিশ্বাস আর দুর্দান্ত জীবনবোধের অন্য এক গল্প।

চেহেল সেতুন পড়ে অসংখ্য পাঠক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। সেখান থেকে কয়েকটি এখানে তুলে ধরা হলো-

সুমাইয়া আনাম রিতু, শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

চেহেল সেতুন উপন্যাস ইতিহাসভিত্তিক লেখা। মুঘল শাসনামলে বাংলায় রাজত্ব করা এক নবাবের গল্প। নবাব মুর্শিদকুলী খান। হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারের ছেলেটি ক্রীতদাস হয়ে চলে যায় সুদূর পারস্যে। বিদ্যাশিক্ষা, জ্ঞানে পারদর্শী হয়ে ফিরে আসে ভারবর্ষে। নাম বদলে নিযুক্ত হন বাংলার দেওয়ান হিসেবে৷ তারপর আস্তে আস্তে বাংলার বিশৃঙ্খল শাসনব্যবস্থা গুছিয়ে আনা, কঠিন আইন প্রণয়ন আর অতি বুদ্ধিমত্তার সহিত রাজ্য পরিচালনা, সেই সাথে মুঘলদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার কাজ করে যান তিনি। তার ব্যক্তিগত যোগ্যতার কারনে অর্জনও কম ছিল না৷ তারপর দিনশেষে ডুবন্ত সূর্যের মতো মৃত্যুতে শেষ হয়ে যায় তার আলো।

বাংলার ইতিহাস অনেকটাই অজানা ছিল। পড়ে মনে হলো বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজুদ্দৌলা হলেও শেষ যোগ্য নবাব ছিলেন মুর্শিদকুলী খান। বাকি প্রত্যেকেই কমবেশি নিজের ভোগ বিলাসে মত্ত হয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে। 

বইটা পড়ে তৃষ্ণা মিটেছে। একটানা পড়ে শেষ করেছি। কাহিনীভিত্তিক উপন্যাস আমার ভালো লাগে। তার ওপর খুবই সহজ ভাষায় ইতিহাস লেখা। লেখকের কল্পনার মিশ্রনে কিছু ঘটনা চমৎকারভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। বিশেষ করে শুরুটা ছিল আকর্ষনীয়। একটা লাইন মনে গেঁথে গেছে-

“অল্প কিছু উদাহরণ ছাড়া মধ্যাহ্নের হাসি সায়াহ্নে কান্নার রূপ নেয়, এটাই নিয়তি।”

তবে আমার মনে হয়েছে বইটা আরেকটু বড় হতে পারতো। কিছু ঘটনা যেন দ্রুতই ঘটে গেল! আরেকটু বিবরন দিলে বেশ লাগতো! গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোতে সেই ঘটনার সময় উল্লেখ করে দিলে ভালো হতো। তাছাড়া পুরো উপন্যাসে নবাব মুর্শিদকুলী খানকে প্রধানভাবে উপস্থাপন করা হলেও তার মৃত্যুর অংশটা ভালোভাবে লেখা হয়নি, এই জায়গায় আমি একটু কষ্টই পেয়েছি!

সর্বোপরি ভালো লেগেছে৷ ইতিহাসের অন্ধকার কিছু জায়গা আলেকিত হয়েছে৷ বইটার দাম কম। কিনে নিতে পারেন৷ আশা করি ভালো লাগবে।

আদৃতা মেহজাবিন, লেখক

একটি সাম্রাজ্য বা একটি ইতিহাসের মৃত্যু হয় কিভাবে? শুধু কি তার জন্য সম্রাট নিজে দায়ী থাকেন? আশেপাশের সবার কি কোন দায়বদ্ধতা থাকে না? রাজা বাদশাহ, সম্রাট এদের গল্প বলতে গেলেই যে কথাগুলো প্রথমে উঠে আসে তা হচ্ছে ‘ যুদ্ধ, মদ, নারী, বিলাসিতা, প্রাসাদ ষড়যন্ত্র। খুব কম নবাব বা সম্রাট আত্মবিশ্বাস ও স্বেচ্ছাচারিতা ব্যতিত মসনদ পরিচালনা করতে পেরেছেন।

যখন কেউ মসনদে বসে তার শত্রুর যেমন অভাব থাকে না। ঠিক তেমনি মোসাহেবেরও অভাব থাকে না। এর ফলে দিনে দিনে সেইসব নবাবদের মনের মাঝে গেঁথে যায়, তিনি নিজে যা করছেন এটাই সঠিক। কিন্তু ইতিহাস সব সময় তা বলে না।

চেহেল সেতুন এক প্রাসাদের নাম। ১৭০৪ সালে ঢাকা রাজধানী সরিয়ে এনে মুর্শিদাবাদকে নতুন রাজধানী ঘোষনা করা হয়। এখানকার এক নবাব আলিবর্দী  খান। নবাব হতে গিয়ে হাঁটতে হয়েছে বহু বন্ধুর পথ। মসনদে বসেই দরবার সহকারীদের বাছাই করা শুরু করলেন তিনি। তার পরামর্শদাতা দুজন।

হাজি আহমেদ ও জগৎশেঠ। ইংরেজদের দাপট দিন দিন বাড়ছে । এদের একটু লাই দিলেই মসনদের দিকে হাত বাড়াবে। চতুর নবাব ঠিকই সব টের পেলেন। অনেককে আনলেন হাতের মুঠোয় বাকিদের সম্পত্তি নিজের হাওলায় রেখে তাদের পাঠিয়ে দিলেন ঢাকায়। আলিবর্দী খানের রাজত্বকাল খুব শান্তিপূর্ণ ছিল না। উনি ছিলেন বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ। রাজনীতিতে কৌশল হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাধারণ মানুষের সুখ সুবিধা নিশ্চিত করতেও অনেক সময় অনিচ্ছাকৃত ভাবেও অনেক কাজ করতে হয়। মারাঠা সেনাপতি ভাস্কর হত্যাও তেমন একটি কৌশল।

নবাবের আদরের নাতি ‘সিরাজ’ উদ্ধত, বেপরোয়া, ও মদপ্য। স্নেহান্ধ বৃদ্ধ নবাব সব সময় তার সব আবদার পূরণ করেন। নবাবের দুই মেয়ে দুঃশ্চরিত্রা ও দ্বিচারিণী। সব কানে আসে নবাবের। প্রাসাদে মোটেও শান্তিতে নেই তিনি। 

নিজের পরবারের কলঙ্ক দূর করতে ‘হোসেন আলীকে’ প্রকাশ্যে হত্যা করার হুকুম দেন নবাব। কাজটি অন্যায়। তবুও অভিজাতদের সম্মান একজন গরিবের প্রাণের চেয়ে অধিক মূল্যবান মনে করা হয় রাজনীতিতে। সিরাজকে অত্যধিক স্নেহ করেন বলে তাকেই উত্তারাধিকার মনোনীত করেন।

তার মৃত্যুর পরে মসনদে বসেন ‘অল্প বয়সী উদ্ধত এক নবাব। যার পুরো নাম ‘নবাব সিরাজদ্দৌলা’

শুরু হয় আর এক করুণ ইতিহাস। যার সৃষ্টি প্রাসাদ থেকেই।

ডাঃ মৌলী আখন্দ, চিকিৎসক ও লেখক

“চেহেল সেতুন” ঐতিহাসিক একটি উপন্যাস যাতে বিধৃত হয়েছে আওরঙ্গজেবের সময়কাল থেকে বাংলার শেষ নবাবের মসনদি আসনে অবরোহণের ইতিহাসের এক মর্মস্পর্শী গল্প।

বইটি পড়তে পড়তে ঘুরে এসেছি যেন আমাদের অতীত ইতিহাসে। মনে নতুন করে অনুভব করেছি প্রাচীন বাংলার ইতিহাসের উত্থান ও পতন, আর আমাদের মতন সাধারণের ভাগ্যের নতুন নতুন মোড়। ইতিহাস

লেখেন যুদ্ধের বিজয়ীরা, বা শাসকের অত্যাচার থেকে মুক্তির পরে স্বাধীন মানুষেরা। লেখক কার ভাষায় ইতিহাসকে তার লেখায় বয়ান করতে যাচ্ছেন, পড়তে শুরু করার সময় সেই কৌতূহল ছিল প্রবল।

পড়তে পড়তে মনে হল, লেখক তো শুধু লিখেই গিয়েছেন তার মনের চোখে দেখা সত্যকে, আর দেখিয়েছেন সাধারণের জন্য আগত একের পর এক ভাগ্যের বদল এবং বাংলার মসনদে আসা যাওয়া ও টিকে থাকার পথচলায় অধিপতিদের অসহায় সময় অথচ দৃঢ় মনঃ শক্তি।  

দিল্লির অধিপতি বাদশাহ আওরঙ্গজেব গল্পের পটভূমির প্রথম নায়ক। পরাক্রমশালী সম্রাট আওরঙ্গজেবের দুঃসময়ে মুহাম্মদ হাদি যে ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম নিয়েছিল সে হলো বাংলার রাজস্ব আদায়ের জন্য সম্রাটের নিয়োগকৃত দেওয়ান, উপাধি হল তার করতলব খান। তার সাথে বিরোধিতা শুরু হয়ে গেল সুবাদার শাহজাদা আজিমুদ্দীনের। উপন্যাসের কাহিনীর শুরু এখান থেকেই।

এই উপন্যাস পড়তে পড়তে ইতিহাসের বাঁকবদলে টানটান উত্তেজনার জগতে দেখে এলাম তাঁর ও আরও কত ইতিহাসের পাতায় পাতায় রয়ে যাওয়া চরিত্রের জীবন্ত ছবিতে আঁকা যুদ্ধ ও প্রেম, বিশ্বাস ও বিশ্বাস ঘাতকতা, স্বেচ্ছাচারিতা ও বিচক্ষণতা, লোভ লালসা ও ব্যভিচারের বয়ানের বয়ে চলা।  এই চমৎকার উপন্যাসটিকে সেরা পাণ্ডুলিপি  নির্বাচিত করার জন্য বইপ্রেমি পাঠকদের হয়ে ঐতিহ্য-রোদ্দুরকে অনেক ধন্যবাদ জানাই।

শাসক আওরঙ্গজেব, মুর্শিদকুলী খান, সুজাউদ্দিন, সরফরাজ খান, আলিবর্দী খান, সিরাজ উদ দৌলা- প্রতিটি চরিত্রের শক্তিশালী বাস্তব সেই ধারাবর্ণনায় লেখক তাঁদের বুদ্ধি আর চারিত্রিক দৃঢ়তা দিয়ে আমার মনকে  আন্দোলিত করেছেন। আবার, অল্প কিছু লোকের অমানবিক অবস্থানে পুরো ভবিষ্যতের জন্য আসন্ন বিপর্যয় গড়ে ওঠার বিপন্ন প্রাক ইতিহাস  আমাকে ভাবিয়েছে, ক্ষুব্ধ করেছে। কোন বিরতি ছাড়াই একটানে বইটি পড়া শেষ করেও অতৃপ্তি থেকেই গেল।

লেখকের কাছে দাবি, আমাদের ইতিহাসপ্রিয় পাঠকের জন্য আরও লিখুন। বইয়ের ভ্রমণে ইতিহাসের এই যাত্রায় ছেদ পড়েছে ঠিকই, তবে যা পড়েছি তার রেশ সহজে কাটার নয় ।

আনু আশরেফা, কবি

চেহেল সেতুন খুব আগ্রহ নিয়ে পড়ে শেষ করলাম। চেহেল সেতুন পড়তে গিয়ে প্রথমেই যেটা মনে হয়েছে গল্পের ছলে ইতিহাস জানছি নিখুত ভাবে। চেহেলসেতুন  প্রাসাদের নাম। বাংলার নবাব মুর্শিদকুলী খান এটি নির্মাণ করেন। এ-ই প্রাসাদ ঘিরে এবং এর নির্মাতা নবাব কে নিয়েই এ-র গল্প। নবাব মুর্শিদ কুলী খা যিনি  কিনা একজন ধর্মত্যাগী ব্রাহ্মণ এবং বিক্রি হয়ে যাওয়া ক্রীতদাস ছিলেন।

একজন ক্রীতদাস  থেকে কিভাবে  বাংলার  দক্ষ নবাব হয়ে উঠেছিলেন এটি তারই গল্প। গল্প বলার  ফাঁকে ফাঁকে লেখক অত্যন্ত সুনিপুণ ভাবে জীবনঘনিষ্ঠ  কিছু বাক্য বলেছেন যা  পড়তে  গিয়ে আমি জীবন  সম্পর্কে  নতুন ধারনা পেয়েছি। চেহেলসেতুন  পড়তে গিয়ে যে কথাগুলো অনন্য জীবনবোধের পরিচয় দিয়েছে,

“নির্ভরতা একসময় মানুষকে বড় বেশি আশ্রয়হীন করে দেয়,তখন খুঁজে ফিরতে হয় দিন যাপনের যাবতীয় প্রয়োজন। ফেলে দেয়া একপাটি জুতো  কিংবা আধপুরোনো একটা খয়েরি মাফলার ও জীবনের কোন পর্যায়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে।  কিংবা দিল্লির অধিপতি বাদশাহ আওরঙজেবের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন,” ভরা গাঙে ভাসতে থাকা সাঁতার না জানা বালকের মতোই নিজেকে অসহায় লাগছে বাদশাহের।

চেহেল সেতুন  পড়তে গিয়ে যে লাইন গুলো মনে দাগ কেটেছে,

” অতিরিক্ত আয়েশ যেমন রোগের সৃষ্টি করে তেমনি অত্যাধিক চিন্তা মানুষকে অসস্তি তে ফেলে,নতুন ব্যথার জন্ম দেয়।অসস্তির চেয়ে ভারী আর কোন বেদনা নেই।”

” মধ্যাহ্নের হাসি সায়াহ্নে কান্নার রূপ নেয়।”

” সহজে কিছুই পূরণ হয় না মানুষের, না স্বপ্ন, না শখ,না প্রয়োজন।হাঁটার জন্য মন প্রস্তুত হলেই রাস্তায় খানাখন্দ বেড়ে যায়,নিয়তি এমনই। “

” অভ্যাস খুব শক্তিশালী,এটি জীবনকে  হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় এমন এক রাস্তায় যেখানে জীবন সেই পথ ছাড়া অন্য কিছু আর খুঁজে পায় না।”

ভারতবর্ষে জন্ম নেয়া একজন ধর্মত্যাগী হিন্দু ব্রাহ্মণ ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি হয়ে মুহাম্মদ হাদী নাম নিয়ে সম্রাট আওরঙজেব কতৃক করতলব খান উপাধি নিয়ে বাংলার দেওয়ান থেকে নবাব মুর্শিদ কুলী খা হয়ে উঠেন এটি তারই গল্প। মুর্শিদ কুলী খা  এ-র উপর তার বেগম নাসিরা বানুর অনেক প্রভাব ছিল,তিনি অত্যন্ত বিচক্ষন আর বুদ্ধিমতি ছিলেন। এ প্রসংগে লেখক বলেছেন,” অল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া  জগতের সব স্বামীর ওপরই   স্ত্রীদের কর্তৃত্ব থাকে।”

নবাব মুর্শিদ কুলী খা থেকে নবার সিরাজুদ্দৌলার উথান পযন্ত চেহেল সেতুনের কাহিনী বিস্তৃত।  দক্ষতা, বুদ্ধিমত্তা না থাকলে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত  সিংহাসন কিভাবে অন্যের দখলে চলে যায় সেটির বর্ণনা পাওয়া যায়। চেহেল সেতুন  প্রকৃতপক্ষে  ইতিহাস নির্ভর গল্প।

ফাইজা হাবিব নেবুলা, সদস্য, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র

It was the best of times

It was the worst of times….

চার্লস ডিকেন্স এর টেল অফ টু সিটিস এর চমৎকার এ লাইন দুটি যেন চেহেলসেতুন গল্পে আক্ষরিক অর্থেই মিলে যায়।

চেহেলসেতুন একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে লেখা উপন্যাস।চেহেলসেতুন একটি মহলের নাম,এই মহল,মহলটাকে আবর্তিত করে একজন ক্রিতদাসের নবাব হয়ে উঠার কাহিনী। একবার উইকিপিডিয়ায় ঐতিহাসিক উপন্যাস এর সংজ্ঞা দেখেছিলাম, ঐতিহাসিক কাহিনির একটি অপরিহার্য উপাদান হলো,এটি অতীতে সংঘটিত হবে এবং সেকালের রীতিনীতি এবং সংস্কৃতির খুটিনাটি ফুটিয়ে তুলবে।আমার মনে হয় তা অনেকাংশেই লেখক চেহেলসেতুন উপন্যাস এ ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।

এ গল্প সম্পর্কে বলার আগে প্রাককথন হিসেবে বলা যায়, একদা হিন্দুস্তান থেকে সহস্র ক্রোশ দূর থেকে সম্রাট বাবুর এসেছিল রাজ্য স্থাপনের নিয়তে,ইব্রাহিম লোদী পরবর্তীতে রাজপুতদের সাথে যুদ্ধে বিজয় এর মাধ্যমে উপনিবেশ এ নিজের শাসন কায়েম করেছিল,তারই উত্তরাধিকার সম্রাট আওরঙ্গজেব যার শাসন আমলের শেষদিকের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই এ উপন্যাস।

পরাক্রমশালী সম্রাট আজ চিন্তায় অস্থির, দক্ষিনাত্যের সাথে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে আজ সে সর্বশান্ত।রাজকোষ অর্থের অভাব,দীর্ঘ মেয়াদী যুদ্ধে দেশের শাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।তাই বাংলার রাজস্ব আদায়ের জন্য বিশ্বাসী লোক দরকার।আর এ থেকেই ঘটনার শুরু।

আওরঙ্গজেবের এ দুঃসময়ে মুহাম্মদ হাদি তার শেষ ভরসাস্থল। মুহাম্মদ হাদি একদা যে ব্রাহ্মণ ছিলো সে হলো বাংলার রাজস্ব আদায়ের জন্য সম্রাটের নিয়োগকৃত সুবেদার।এভাবেই পরিবর্তিত হলো বাংলার মানুষের ভাগ্যের।বাংলার অনাবাদী জমিকে কি করে আর ও ফলন উপযোগী করা যায়,রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা করা,কৃষককে কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করেছিলেন করতলব খান(মুহাম্মদ হাদির উপাধি)। বাংলার সুবেদার থেকে মুর্শিদাবাদ এর সফর যে সহজ ছিলো না তা তো বুঝাই যায়।মসনদে বসার সময় তার নতুন নাম হয় মুর্শিদকুলী খান। মীরজাফর,জগৎশেঠ,রায়বল্লভ প্রমুখের বিশ্বাস ঘাতকতার কথা আমাদের অবিদিত থাকলেও সিরাজউদ্দৌলার পূর্ব পুরুষ যে ছলনার সাথে মসনদ দখল করেছিল তা আড়ালেই থেকে গেছে জন সাধারণের।

তবে এ বইয়ের শেষ অংশে পাঠকের যে অতৃপ্তি,জানার আগ্রহ,কৌতুহল বৃদ্ধি করে নাটুকে শেষ তাতেই লেখকের লেখনীর মুন্সিয়ানা।

লেখকের প্রতি একটাই অনুরোধ এর পর উপন্যাসের ব্যাপ্তি আরেকটু বৃহৎ  আকারে চাই। এ উপন্যাস নিঃসন্দেহে ঐতিহ্য -রোদ্দুর সেরা পান্ডুলিপি পাবারযোগ্য।

আতহার বাবরুল, কবি, শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

বিজ্ঞান আমাদের যতদূরেই নিয়ে যাক,ইতিহাস আমাদের টেনে আনে শেকড়ে।আজকের কাজই আগামীকালের ইতিহাস। ইতিহাসের প্রতি মানুষে উৎসাহ,উদ্দীপনা আজন্মকালের। একবিংশ শতাব্দীর মানুষের কাছে রাজা,রাজত্ব,সম্রাট, সাম্রাজ্য শব্দগুলো কৌতূহলের। ইশ! আর সেটা যদি হয় রাজারাজড়ার উত্থান পতনের গল্প তবে তো কথাই নেই।

হাসান হামিদ তার “চেহেল সেতুন” উপন্যাসে তেমনই এক উদ্দীপনার বীজ বপন করেছেন। সে গল্প হতদরিদ্র ছেলের মুর্শেদকুলী খা হয়ে উঠার গল্প।সেখানে শেষ হয়নি গল্পটা।টেনে নিয়ে এসেছে নবাব সিরাজ উদ্দৌলার দার প্রান্তে।

আমি অল্প কথায় কিছু বলতে বা বুঝাতে পারি না। সবিস্তারে অন্য একদিন বলবো,চেহেল সেতুনের কথা।

আদিল মাহমুদ, সাংবাদিক 

ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস ‘চেহেল সেতুন’। স্রোতের বিপরীতে হেঁটে চলা একজন ক্রীতদাসের নবাব হয়ে ওঠার গল্প বলা হয়েছে এখানে। রাজা-বাদশার নাম শুনলে অনিবার্যভাবেই চলে আসা বিলাসিতা, যুদ্ধবিগ্রহ, জৌলুশ, মদের বুদবুদ ও নারী মাংসের গন্ধ ইত্যাদি না পেয়ে অর্জন, আত্মবিশ্বাস ও দুর্দান্ত জীবনবোধের এক গল্প পেয়েছি ‘চেহেল সেতুন’ এ।


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত