বৃহস্পতিবার, ২৪ জুন ২০২১

চোখবেড়াল । তীর্থঙ্কর ভট্টাচার্য

পাশের গলির ফ্ল্যাটের দোতলায় ভোর না হতেই হুড়োহুড়ি কাণ্ড। চিৎকার, ধোঁয়া, লোকজন। বাড়ির বুড়োটা গায়ে আগুন দিয়ে পুড়ে মরে গেছে। দমকল এসেছে। পুলিশও চলে এল। আত্মহত্যার কেস শোনা যাচ্ছে। মই দিয়ে উঠে ফ্ল্যাটের পিছনদিকে দেয়ালের বড় জানালাটা ভেঙে ফেলেছে দমকলের লোকেরা। ঘরে ঢুকে পাইপ দিয়ে নেভাচ্ছে আগুনটা। এখন শুধু ধোঁয়া বেরোচ্ছে। আরও ভোরে নাকি বুড়োটা চিৎকার করে উঠেছিল পুড়ে যাওয়ার যন্ত্রণায়। নেতাইদের বস্তিতে আশেপাশের লোকেরা ছুটে গিয়েছিল বাঁচাতে। বুড়োর ছেলে আর গিন্নী নাকি বাধা দিয়েছে। দরজা খুলছিল না। ওরা বাধা দিয়ে বলছিল ‘এখন আগুন লেগে গেছে, ওদিকে যাওয়া যাবে না’।

নেতাই অবশ্য এত সব টের পায় নি। কাল রাতে নেশাটা বেশিই হয়ে গিয়েছিল। দুটো মুরগি ছাপের প্যাকেট কিনে এনে একটার অর্ধেক রাত্তিরে বেশ তরিবৎ করে গলায় দিয়েছে। মাথাটা যেন অনেক হালকা লাগছিল। এই লকডাউনের বাজারে উপায়-রোজগার বন্ধ; বৌ এর ডাক্তার দেখানো, ভাড়াটের ভাড়া আদায়-যে সব চিন্তাগুলো মাছির মত ভন ভন করে সেগুলো কোথায় লুকিয়ে পড়ল। কর্পোরেশনের গাড়ি মাছি তাড়াবার ওষুধ দিলে মাছিগুলো যেমন কোথায় কেটে পড়ে, ঠিক সেরকম। নেশাটাও আস্তে আস্তে জমে গেল। এখনো পুরো কাটে নি।

জানালা দিয়ে ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে দেখতে লাগল। ধোঁয়া এখনো বেরোচ্ছে। দমকলের উর্দি পরা লোকগুলো এক এক করে বেরিয়ে আসছে। আরও লোকজন জড় হচ্ছে। বুড়োর গিন্নীটা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ফোনে কার সাথে যেন কথা বলছে হাউ হাউ করে হাত নেড়ে নেড়ে। এরপর পুলিশ আশেপাশের লোকগুলোকে আর জড় হওয়া লোকগুলোকে জিজ্ঞাসা করল। লাশটা ধরাধরি করে বের করে এনে প্যাকেটে ভরে নিল। বুড়োর ছেলেকে ধরে জিজ্ঞাসা করতে লাগল।

আদ্ধেক খালি হওয়া মুরগি ছাপ প্যাকেটটার দিকে নেতাই একবার তাকাল। এই মুরগি ছাপের দিন ত কম গেল না। ছোটবেলা থেকে দেখে আসছে। ওর বাবা মুরগি ছাপ খেত। তখন মুরগি ছাপের সাঙ্ঘাতিক কাটতি ছিল। বস্তিশুদ্ধ সকলে এটাই খেত। থানার পুলিশরা অবধি এসে নিয়ে যেত রাতে। জিনিসটার মধ্যে কিছু ছিল। সাউধ গুণিন বলেছিল ওটার নাকি আলাদা গুণ আছে। আত্মাটাকে বাইরে বের করে এনে দিতে পারে। সেই আত্মাটা নাকি তখন বেরিয়ে অনেক দামী কথা বলে দেয়। তখন নেতাই খুব ছোট। সাউধ গুণিন নামকরা গুণিন ছিল। কবে মরে গেছে। লোকটার হাতযশ ছিল। গলায় কাঁটা আটকালে মন্ত্র পড়ে বের করে দিতে পারত। নেতাই এর বোনকে একবার দিয়েছিল। অসুখ বিসুখ করলে ওষুধ-পাঁচন দিত। শ্রাদ্ধে কীর্তন গাইত। কালীপুজোয় ঢাক বাজাত। বস্তির লোকেদের তাবিজ-মাদুলি দিত। কারো বাচ্চার অসুখ সারছে না, কারও বাচ্চা হচ্ছে না, কারও ঘরে কোঁদল- সবার ভরসা ছিল সাউধ গুণিন। একবার সুন্দরবন থেকে একটা বুড়ি এসেছিল। তার বেটা মধু আনতে গিয়ে আর ফিরছিল না- হারিয়ে গিয়েছিল। সাউধ গুণিনের কাছে গোণাতে এসেছিল। নেতাইয়ের নিজের চোখে দেখা।

এমনিই পুলিশের গাড়ি করে চোঙা নিয়ে বাইরে বেরোতে নিষেধ করে গেছে। এখন কাজকর্মও তেমন নেই। নেতাই সারাদিন আর বেরোয় নি। সারাদিন দুয়োরধারে বসে বসে বিড়ি খেয়ে কাটিয়ে দিল। পাশের ঘরে বৌ রান্না করে খাওয়া গুছিয়ে দিয়েছিল। এখন আর তেমন গালমন্দ করে না। চুপচাপ কাজ করে যায়। বয়সে আর রোগে শরীরটা তেমন নেই যে তেজ দেখাবে। গা ছেড়ে দিয়েছে।

সন্ধ্যা হলে পরে গেঞ্জিটা গলিয়ে একবার শম্ভুর সেলুনের দিকে পা বাড়াল নেতাই। সেলুনের জটলায় সেদিন জোর গুজব। সকালে যে বুড়োটা মরল সেটা কী খুন না আত্মহত্যা। পুলিশ নাকি গিন্নীকে আর ছেলেটাকে তুলে নিয়ে গেছে। বুড়োটা নাকি লোক খুব ভাল ছিল। ডেকে ডেকে কথা বলত অনেকের সাথে। ওর ঘরের দরজা নাকি বাইরে থেকে বন্ধ ছিল আগুন ধরার সময়ে। এমনিধারা কত কি। দাড়ি কামানো হয়ে গেলে নেতাই বেরিয়ে এল। পথে একবার বাড়িটার দিকে তাকাল। ফ্ল্যাটের পিছন দিকে ঘরটা। দোতলায়। পিছন দিকটা একটা ফাঁকা জমি। সেখানে বড় বড় গাছ আর খাগড়ার ঝোপ। পাঁচিল ঘেরা। এইখানে দিয়েই দমকলের পাইপ নিয়ে এসেছিল বাবুরা। জানালার গ্রিল কাটা, দেয়াল ভাঙা। ভিতরটা অন্ধকার হয়ে আছে। এদিকটা অত আলো নেই। নেতাই ফিরে এল। রাতটা একটু চিন্তা করতে হবে।

অনেক বছর আগে জোয়ান বয়সে চিন্তা করতে আর ছক কষতে দারুণ উত্তেজনা ছিল। ওরা ছিল দলে তিনজন। এখন সেই দল আর নেই। পুরনো হাতযশটা একবার চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করাই যায়। একটা কিছু হয়েই যাবে। রুজি রোজগারের অবস্থা যখন এমনিই খারাপ- গলাটা অল্প ভিজিয়ে নিয়ে শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগল নেতাই। একটা বেড়াল সন্ধ্যা থেকে একটানা একই সুরে বেশ জোরে কেঁদে চলেছে। রূপার মা বলছিল বুড়ো টার আত্মা বুঝি বেড়ালটায় ওপর চলে এসেছে। আরও অনেকে সায় দিয়েছিল। কে জানে বাবা।

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙল দেরিতে। রাতে বেশি খায়নি নেতাই, ঐ গলাটাই যা ভিজিয়েছিল। অনেক বিষয়কর্মের চিন্তা ছিল। বৌ যখন ডেকে ডেকে শেষে গাল দিতে থাকল, তখন নেতাই উঠেছিল রাতের খাবার খেতে। খেয়ে ঘুমোতে ঘুমোতে দেরি হল। বেড়ালের কান্নায় আরও অসুবিধা হয়েছিল। ঘর থেকে বেরিয়ে দেখল নেতাই। সামনের আস্তাকুঁড়ের পাশেই

বেড়ালটা। থেকে থেকে ডেকে উঠছে। ওর দুঃখটা কিসের? সাদার ওপর পাটকিলে ছোপ। এরকম বিড়াল অনেক আছে। একবার যেন এদিকে তাকাল না বেড়ালটা? কিছু বোঝা গেল? ধুত্তেরি। মুখ ঘুরিয়ে কয়েক পা সরে এসে একটা বিড়ি ধরাল নেতাই।

বর্ষা এখনো পড়ে নি। মেঘ করে থাকে কিন্তু বৃষ্টি হয় না। বৃষ্টি পড়েছিল গত সপ্তাহে। নেশাটা জমেছিল ভালো। রাস্তায় এখনো জল জমে আছে। সামনের জুয়ার আড্ডাটা বন্ধ। বৃষ্টি হলে ওটা বন্ধ থাকে কদিন। সন্ধ্যা হলে বসে। এখন কয়েকটা ছেঁড়া তাস পড়ে আছে। ফিরে এল ঘরে নেতাই। আজ রাতেই সারতে হবে কাজটা।

রাত্রি বেলা কাউকে কিছু না জানিয়ে খুট করে চুপি চুপি বেরিয়ে পড়ল নেতাই। চারপাশটা দেখে নিল একবার। বেড়ালটা চুপ মেরে গেছে। লাইটপোস্টের আলোগুলো জ্বলছে। রাস্তায় লোকজন কেউই নেই। ফ্ল্যাটগুলোতে আলো জ্বলছে কোনো কোনোটাতে এখনো। আস্তে আস্তে এগোতে লাগল সে। শুয়ে থাকা কুকুরটা একবার জেগে উঠেই তাকাল ওর দিকে একবার। তারপর ফের ঘুমিয়ে পড়ল। নেতাই এগিয়ে গেল সেই ফ্ল্যাটটার দিকে। পুরোটা ঘুরে একবার চক্কর দিয়ে দেখে নিল। সব ঠিক আছে। পিছন দিকের ফাঁকা জমির পাঁচিলটাতে দুই হাতে ভর দিয়ে উঠে পড়ল। ঝোলাটা কাঁধে ভাঁজ করা। পাঁচিলের ওপর দাঁড়িয়ে নিয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল। একদম পৌঁছে গেল গ্রিল খোলা জানালাটার তলায়। গাছটাকে হাতে ধরে একটা ডালে পা দিয়ে উঠে পড়ল গাছটাতে। পরের উঁচু ডালটাতে উঠে পড়ে তারপর কার্নিশটা নাগালে পেয়ে গেল। ঝোলাটা কার্নিশে রেখে কার্নিশে উঠে পড়ল নেতাই। তারপরে হাঁচোড় পাঁচোড় করে চলে এল জানালাটায়। একটু আওয়াজ হয়েছিল, কিন্তু ও কিছু না। নেতাই ওস্তাদ লোক। তারপরে আস্তে লাফিয়ে নেমে পড়ল ঘরের মধ্যে। ঝোলা থেকে সরু টর্চবাতি বের করে জ্বালাল। ঘরে আলো পড়ছে বাইরে থেকে, কিন্তু খোঁজাখুঁজির ব্যাপার আছে। নেতাই ভাল করে চারিদিকে চোখ বুলিয়ে ঘরটা দেখতে লাগল। আলমারি আর আলমারির চাবি পেতে হবে। ঘড়ি ল্যাপটপ বা মোবাইল হাতিয়ে ঝোলায় ভরতে হবে।

হঠাৎ তার চোখ চলে গেল সামনের দেওয়ালটায়। এ কি, এই চোখদুটো কার? এক সেকেন্ড আগেও ত এখানে ছিল না। নেতাই ওদিকে টর্চটা মারল। টর্চের আলো ওখানে পড়ল না-যেমন কে তেমন। দেখতে দেখতে চোখ দুটো বড় হয়ে উঠল। নেতাই হাঁ করে তাকিয়ে রইল সে দিকে। হাত পা পুরো শক্ত কাঠ হয়ে গেল। পুরো মুখটা ফুটে উঠল দেওয়ালে। অল্প আলোয় স্পষ্ট দেখতে পেল নেতাই। সেই বেড়ালটার মুখ। হুবহু যেমন সকালে আজ ওর দিকে তাকিয়েছিল। ভয়ে চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল ওর। পরিষ্কার টের পেল হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। টর্চবাতিটা  ঠক করে নিচে পড়ে গেল।

বেড়ালটা এবার বলে উঠল ‘ কি রে, আবার সেই কাজে নেমেছিস? বুড়ো বয়সেও শিক্ষা হয় নি? সেই যে বাঘাযতীনে মার খেয়েছিলি মনে নেই?’

বেড়াল মানুষের গলায় কথা কইছে। নেতাই বেদম তাজ্জব হয়ে গেল। বলেছে ঠিকই। বাঘাযতীনে পিটুনি খেয়ে থানার লক আপে দুই রাত কাটাবার পর থেকে এ লাইনে আর সে নামে নি। নাক কান মুলে ছেড়ে দিয়েছিল। কোনমতে হাত জোড় করে বলল ‘ হ্যাঁ হুজুর, ভুল হয়ে গেছে’। বেড়ালের চোখ দুটো রেগে গেল। বলে উঠল ‘এত বয়স হল এখনো হাতটান দিতে মন হাঁকুপাঁকু করছে, তাই না? এইবারে তোর কর্ম্ম সারা।‘ গলাটা চেনা লাগল। ভীষণ চেনা। কিন্তু মনে পড়ল না কার। হাত দুটো ঠেলেঠুলে কোনমতে আবার জোড়া করে বলল ‘ হুজুর এবারের মতন মাপ করে দিন আজ্ঞে। কিছু সরাব না এখান থেকে, একটা জিনিসও ছোঁব না।‘ গলাটা কার কিছুতেই চিনতে পারল না, খটকা লেগে রইল। গলাটা বলে চলল ‘খবরদার এ কাজে আর হাত দিবি নে। কাজ পারিস, গায়ে গতরে আছিস, দু পয়সাও হয়েছে, এখন আবার এত কিসের রে?’ ‘ আজ্ঞে, আজ্ঞে’ বলে হাত দুটো কপালে ঠেকাল নেতাই। ‘তবে কিনা এখন রুজি রোজগার বন্ধ আর তার ওপরে হাতে পয়সাকড়ি নেই ত, তাই ভুলচরিত্র হয়ে গেছে। যদি মাপ করে দেন।‘ বেড়াল বলে উঠল ‘তাই বলে চুরি করবি? চুরি করা ভাল? ধরা পড়লে এই বয়সে পুলিশের তাড়া খেতে পারবি? আর কেউ তোকে কোনো কাজে লাগাবে যদি জানতে পারে?’ কিছুক্ষণ চুপচাপ। তারপরে হেঁট মাথায় মনে সাহস এনে নেতাই বলল ‘আজ্ঞে তবে আজ আসি? অনুমতি করেন।‘ – ‘ঠিক আছে, সোজা বাড়ি যাবি। আর নেশাভাঙ কমিয়ে দিবি। বুঝলি?’ – ‘আজ্ঞে আজ্ঞে‘ বলে নেতাই কোনমতে ঘামতে ঘামতে হামাগুড়ি দিয়ে জানালার সামনে এসে পড়ল।

নিজের জিনিসগুলো ঝোলায় ভরে সেটা কাঁধে নিয়ে তাড়াহুড়ো করে লাফিয়ে নামতে গেল দোতলা থেকে। কার্নিশ থেকে নামার সময়ে হাতে পায়ে ছড়ে গেল আর পাঁচিলে কোমরের পিছনদিকটা দড়াম করে বেদম লাগল। কোন রকমে গড়াগড়ি খেয়ে উঠে পড়ে পিছন দিকের ফাঁকা জমিতে নেমেই দে দৌড়। রাস্তায় লাইটপোস্টের নীচটায় দাঁড়িয়ে সাহস ফিরল। হ্যাঁ হ্যাঁ করে হাঁফাতে লাগল নেতাই নীচু হয়ে। টর্চবাতিটা একবার জ্বালিয়ে দেখল। ঠিকই আছে। একবার ওদিকটা তাকিয়ে দেখে নিল। যে কে সেই। একদম আগের মতই।

আজ সন্ধ্যায় আবার খানিকটা মুরগি ছাপ খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। সাউধ গুণিনের কথাটাই বুঝি সত্যি করে খেটে গেল। আত্মাটা বেরিয়ে এসে অনেক দরকারি কথা শুনিয়ে দিয়েছে-চোখ খুলে দিয়েছে আরেকবার। চুরিটা ভাল কাজ নয় মোটেই। গলাটা কার ছিল এতক্ষণে মনে পড়েছে নেতাইয়ের। গলাটা ত ওর নিজেরই।


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত