মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১

ছদ্মবেশ || মনদীপ ঘরাই

গত এক ঘন্টা ধরে সেজেই চলেছে তন্দ্রা। ওদিকে বেজেই চলেছে ফোনটা। আকাশ একের পর এক ফোন করেই যাচ্ছে। মহাবিরক্ত হচ্ছে তন্দ্রা। তিন মাসের সম্পর্কে আকাশকে এই ছোট্ট জ্ঞানটা দিতে পারেনি সে। মানুষ একবার ফোন না ধরলে বারবার বিরক্ত করতে হয় না। কে শোনে কার কথা! ফোন করেই যাচ্ছে আকাশ। এখন তন্দ্রার এটা অভ্যাসেই পরিণত হয়ে গেছে।
সাজগোজ শেষ করে পাক্কা দেড় ঘন্টা পরে ফোনটা হাতে নিল তন্দ্রা।
৫৪ মিসড্ কল!
রাগে গজগজ করতে করতে কল দিল আকাশকে:
– তোমার সমস্যাটা কি বলো তো!
– কোন সমস্যা তো নেই!
– তাহলে ৫৪ বার কল কোন সুস্থ্য মানুষ দেয়?
– আমি ভাবলাম তোমার কোন বিপদ হলো কিনা!
– হয়েছে বিপদ।তো? কি কাজে ফোনটা দিলে তাড়াতাড়ি বলো। একটা বিয়ের প্রোগ্রামে যাচ্ছি। সাজছিলাম এতক্ষণ।
– যেও না।
– ফাইজলামি করো? যেও না মানে?
– চলো না কোথাও বসে কফি খাই…
– আর ইউ কিডিং মি? আমার পলি আপুর বিয়ে!
– আচ্ছা যাও। ফিরে এসে ফোন দিও।
– দেব রে বাবা, দেব।

আকাশের এই পাগলামি মনে মনে খুব পছন্দ করে তন্দ্রা।এখন ওর নিজেরই মন চাচ্ছে বিয়ে টিয়ের অনুষ্ঠান বাদ দিয়ে কফি খায় আকাশের সাথে। পরক্ষণেই সামলে নেয় নিজেকে। আকাশ পাগল হতে পারে।সে তো আর পাগল না! দুজন পাগল হলে সংসার পাততে হবে সো…জা পাবনায়।

বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে ফিরে ফোন দিতে ভুলে যায় তন্দ্রা। আকাশও আর সে রাতে একবারও ফোন দেয় না। সকালে উঠে মোবাইলে কোন মিসড কল না দেখে অজানা আতঙ্ক ভর করে তন্দ্রার মনে। কোন বিপদ হলো না তো?
ঘুম জড়ানো কন্ঠে রাগ মিশিয়ে শুরু করে তন্দ্রা:
– অ্যাই ছেলে, তুমি কাল রাত থেকে একটা ফোনও দিলে না যে!
– সরি তনু। আমার মনটা ভালো ছিলো না।তুমি যেভাবে নিষেধ করলে ফোন দিতে!
– নিষেধ করলাম মানে? নিষেধ করলেই শুনতে হবে! যাও নিষেধ করলাম ভালোবাসতে,পারবে?
– সেটা সম্ভব না।
– তাহলে? ফোনই দিতাম না। ভাবলাম তোমার কোন বিপদ হলো কিনা!
– আমিও তো সেটা ভেবেই কলগুলো দিতাম। আর দেব না বারবার কল।
– দেবে না মানে! নতুন জুটিয়েছ নাকি দু একটা।

ফোনের লাইনটা কেটে দেয় তন্দ্রা।আকাশ মনে মনে হেসে বলে,
“পাগলী একটা”
এই পাগলীর আরেকটা ব্যাপার বড় অদ্ভুত। সম্পর্কের তিন মাসে হাতটা পর্যন্ত ধরতে দেয় নি। খেলা চলছে একটা। স্পর্শবিহীন ভালোবাসার খেলা।কে জানে কতদিন চলবে? আকাশের তাতে কিছুই আসে যায় না। তবে মাঝে মাঝে তনুর হাতটা ধরতে বড় মন চায় তার।দেখা হয়। কথা হয়। ভাব বিনিময় হয়; এই তো যথেষ্ট। আর কি? তনু যে তাকে ভালোবাসে এটাই তো অনেক।

দিন কেটে যায়। আবেগ বাড়ে। তবে স্পর্শের ব্যাপরটা আগের মতোই। তনুকে ছুঁয়ে দেখা হয় নি আকাশের।
সম্পর্কে স্পর্শের প্রয়োজন আছে। অবশ্যই আছে।
আকাশের আজ মনে হয়, হাতে হাত রাখলে নিশ্চয়ই আয়ন বিনিময় করতে পারতো তনুর সাথে। তড়িৎবিজ্ঞানের মতো শোনালেও, এটাই তো সত্যি। হাত থেকে হাতে, ছোঁয়া থেকে ছোঁয়ায় বিদ্যুতের স্রোত কি বয়ে যায় না?

ভোর ছয়টা। হঠাৎ তনুর ফোন।
– আকাশ, আমার প্রচন্ড মাথা ব্যথা করছে। কি করি বলো তো!
– তোমার ব্যথাগুলো আমাকে দাও। আমি তোমার নীল ব্যথা পান করে নীলকন্ঠ হয়ে যাই।
– ঢং! এই উছিলায় ছুঁতে চাও আমায়,তাই না।
আকাশ থেকে পড়ে আকাশ। এভাবে তো ভেবে বলে নি সে! সামলে নিয়ে বলে:
– না না। তা হবে কেন? তোমার যন্ত্রণার ভাগ নিতে চাইছিলাম।
– তাই? তাহলে এমন কোন উপায় বলো যাতে স্পর্শবিহীন উপশম হবে।পারবে খুঁজে আনতে?
– অবশ্যই।তুমি আমাকে আধাটা ঘন্টা সময় দাও আমি তোমাকে ভোরের শিশির এনে দিচ্ছি। কপালে বুলিয়ে দেখো। ঠিকই দৌঁড়ে পালাবে ব্যথা।
– ওরে আমার কবি রে। একদম কবিদের রাজা কবিরাজ। কাব্য দিয়ে রোগ সারাবে আমার!
খিলখিল করে হাসি দিয়ে ফোনটা রেখে দিল তন্দ্রা। আকাশের মনটা তোলপাড়। আকাশ-পাতাল এক করে আনতে হবে শিশির। কোনদিন কিছু চায় না তনু। আজ অনেক বড় সুযোগ…

তনুদের বাসার ওদিকটা ইট-কংক্রিটের জঙ্গল। আর যাই হোক, শিশির মিলবে না।
স্কুলের বড় মাঠটাতে গিয়ে ঘাসে জমে থাকা শিশির করতলে তুললো আকাশ। চার পাঁচ ফোঁটা হবে। অতি সাবধানে হেঁটে চললো তনুর বাসার দিকে।
কতটা সময় গেছে কে জানে? সূর্যের উঁকি দেয়া দেখে বুঝলো আকাশ, ঘন্টাখানেক তো হেঁটেছেই।

তনুর বাড়ির সামনে এসে এক হাত দিয়ে মোবাইলটা বের করে অনেক কষ্টে কল দেয় আকাশ
– তনু, তোমার জন্য শিশির এনেছি। তোমার স্পর্শবিহীন উপশম। নেবে না?
– নেব না মানে? এক্ষণি নামছি।
বরাবরের মতো ফোনটা আজ তনু কাটে না। আকাশই কেটে দেয়। লাল বাটনটাতে চাপ দিতে গিয়ে খেয়াল হয়, শিশিরগুলো গড়িয়ে পড়েছে হাত থেকে। সোজা কংক্রিটের রাস্তায়। সূর্যের আলোতে চকচক করছে বদমাশ বিন্দুগুলো।
কষ্টে,ব্যর্থতায় মনটা ভরে ওঠে। এখন কি করবে আকাশ! জীবনে প্রথম কোনকিছু চেয়েছিল তনু।
আকাশের মনটা বড় নরম। চোখের জল ধরে রাখতে পারবে না, এটা সে নিজেও জানতো।করতল আগের মতো করেই রাখে। যদি থেকে যায় দু-এক ফোঁটা!
এক বিন্দুও মেলে না। উল্টো দু ফোঁটা চোখের জল গড়িয়ে জমা হয় আকাশের লজ্জ্বিত হাতের তালুতে।
হুট করে নেমে আসে তনু। এসেই বলে,
– এনেছ শিশির? আমি সত্যিই তোমাকে খুব ভালোবাসি আকাশ। তুমি আমার কবিরাজ।
বলেই হাত থেকে দু-ফোঁটা অশ্রু নিয়ে কপালে বুলিয়ে নেয় তনু। ওদিকে আকাশ জুতো দিয়ে ঢাকে মাটিতে গড়ানো শিশির বিন্দুগুলো। তনু হেসে বলে,
-এই তো, শিশিরের ছোঁয়ায় মাথার ব্যথা অনেক কম লাগছে। অ্যাই কোবরেজ মশাই, আমি গেলাম।
বলেই বাসার দিকে ছুট দেয় তন্দ্রা।

দাঁড়িয়ে আছে আকাশ। বিজয়ীর বেশে। তনুর স্পর্শবিহীন সম্পর্কের খেলা আজ ফুরোলো। শিশিরের ছদ্মবেশে তনুর কপাল ছুঁয়েছে আকাশের অশ্রু।
আকাশের অশ্রুর মাঝেই তো মিশে আছে…..একবিন্দু পূর্ণ আকাশ।


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত