বৃহস্পতিবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২১

ছাপা বইয়ের আবেদন ফুরাবার নয়

রাব্বি হোসেন

আমার কৈশোরকাল কেটেছে বইয়ের সাথে। মফস্বলে জন্ম বলে তেমন একটা বই পড়ার সুযোগ তখন আমার হয়নি। তবে আর দশটা বন্ধুর চেয়ে আমার বই, পত্রিকা পড়ার প্রতি ঝোঁক ছিল প্রবল। গ্রামে তেমন করে তখনও পত্রিকা যেতো না। সেলুনের দোকানে দুই একটা পত্রিকা আসত। স্কুল ফাঁকি দিয়ে সেলুনে বসে পত্রিকা পড়তাম। আত্মীয়-স্বজনের কারো বাসায় বই দেখলে লুকিয়ে পড়তাম। মা যখন নতুন লুঙ্গি বা শাড়ি কিনে নিয়ে আসতো তখন নতুন লুঙ্গির ভেতরে ভাজ করে রাখা পত্রিকার পাতায় চোখ রাখতাম। মেলার সময় বন্ধুরা ঘড়ি, চশমা কিনতো আর আমি কিনতাম উপন্যাস, গল্প, কবিতার বই। দুপুরে, বিকেলে ঘরের শোফায় সুয়ে সুয়ে পড়তাম, বাগানে চেয়ার পেতে হেলান দিয়ে পড়তাম, মা বাহিরে রোদে কাঁথা শুকাতে দিতো, সেই কাঁথার উপর সুয়ে সুয়ে পড়তাম। নতুন বই নাকে চেপে ধরে রেখে গন্ধ নিতাম। মা সামনে এসে বকা দিতো, এখন গল্পের বই পড়ার সময়? আগে স্কুলের পড়া পড়। আর একটু একটু বলে আমি ছাপা বইয়ের পাতায় লেখা গল্পে আবার মনোযোগ দিতাম।

আমাদের অনেকেরই সেই কৈশোরকালের দিনগুলো শেষ হয়েছে বহুআগে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে প্রযুক্তির দৌরাত্ম্য। প্রযুক্তির অগ্রগতিতে থেমে নেই আমাদের পড়ার অভ্যাসও। চিরচেনা মোটা মোটা বইয়ের জায়গা দখল করছে মোবাইল নামের ছোট্ট ডিভাইস। হাজার হাজার বই সংরক্ষণ করা যাচ্ছে মাত্র কয়েক গিগাবাইটের মেমোরি কার্ডে। প্রয়োজন নেই আর সেই বড় বড় তাক কিংবা স্টাডি রুমের। হাজারখানেক বই হলে একজন সংগ্রাহক যেখানে হিমশিম খেতেন, এখন সেটা নিশ্চিন্তে পকেটে করে ঘোরা যায়। এটা কি কাগজের বইয়ের মৃত্যু নাকি পুনর্জন্ম? এই প্রশ্নের খেলা থেকেই যায়। তবে কোনটা ভালো কাগজের বই নাকি ই-বই? কেউ কেউ বলেন কাগজের বই আবার কেউ বা বলেন ই-বই। তবে কোনটা ভালো? আমার মতে, সময়ভেদে দুটোই ভালো। তবে আমি মনে করি বই মানেই কাগজে ছাপানো বই, বই মানেই নতুন ছাপার ঘ্রাণ, বই মানেই সুয়ে সুয়ে পড়া আর বুকের উপর বই রেখে ঘুমিয়ে পড়া। একটা ছাপা বই বের করার পেছনে থাকে অজস্র পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ের ফসল। লেখক তার মেধা, মনন দিয়ে ফুটিয়ে তুলেন গল্প, কবিতা, উপন্যাস। লেখক থেকে প্রকাশনী, প্রকাশনী থেকে প্রেস, প্রেস  থেকে আবার প্রকাশনী, প্রকাশনী থেকে লেখক, লেখক থেকে অবশেষ সকল কর্মযজ্ঞ ছাপিয়ে বই উঠে যায় পাঠকের হাতে। বইয়ের সবশেষ আশ্রয় হলো পাঠক। আমার মতে একটা বইয়ের প্রধান ও শেষ আশ্রয়স্থল হলো পাঠক, লেখক নয়। 

কিন্তু ই-বুক তার পুরোটাই ভিন্ন। লেখক তার মেধা, মনন দিয়ে যে বইটা লিখে তা চাইলেই পিডিএফ আকারে পাঠকের কাছে সহজে পৌঁছে দেয়া যায়। পাঠক সামান্য মেগাবাইট দিয়েই বইটি পড়তে পারেন। ই-বুক থেকে বই পড়তে আর যেতে হয় না প্রকাশনীর কাছে, বইয়ের দোকানের কাছে কিংবা কাঙ্খিত বই মেলায়। ই-বুকের বর্তমানে জনপ্রিয়তা বাড়ছে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু টাকা বাঁচাতে, বই কিনতে খানিকটা সময় ব্যয় না করার মানসিকতা তৈরি করে ফেলার মধ্যে বইয়ের আসল স্বাদটুকু হারিয়ে ফেলছি না তো?

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, ডিজিটাল ডিভাইস অনিয়মিত ঘুমের জন্য অনেকাংশে দায়ী এবং শারীরিক বিভিন্ন সমস্যাও তৈরি হয়। তবে এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই, আমাদের দেশে ই-বুকের জনপ্রিয়তা কোনো অংশেই কম নয়। এর একটা কারণ হয়তো আমাদের দেশে বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হয় মূলত ছাত্র অবস্থা থেকেই। প্রায় শিক্ষার্থীই ৩০০-৪০০ টাকা দিয়ে একটা বই কেনার সামর্থ্য  রাখে না। যার ফলে কিছু মেগাবাইট খরচ করে ডাউনলোড করে নেওয়া অনেক বেশি সাশ্রয়ী হয়ে উঠে। তবে এতকিছুর পরও ছাপা বইয়ের আবেদন কোনো অংশেই কম নয়। পাতা উল্টানোর শব্দ, নতুন বইয়ের ঘ্রাণ, ছাপার অক্ষর ছুঁয়ে অনুভব কিংবা বাইরে ঝুম বৃষ্টি এক মগ কফি পাশে প্রিয় কোনো বইয়ে হারিয়ে যাওয়া সবকিছুর মাঝেই অন্যরকম এক আনন্দ লুকিয়ে আছে যা ই-বুকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

তবে ই-বুকের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো বহন করা সহজ। ছোট্ট একটা মোবাইলেই রাখা যায় কয়েক হাজার বই। তবে আমি মনে করি ই-বুক তখনই পড়া উচিত যখন ছাপা বই বহন করার মতো সুযোগ বা সুবিধা না থাকে। ধরুন আপনি দূরে কোথাও ভ্রমণে যাচ্ছেন ৪-৫টা বই বহন করা আপনার পক্ষে সম্ভব না তখন যদি আপনার হাতে স্মার্টফোন থাকে তখন পছন্দের ই-বুক ডাউনলোড করে নিয়ে যেতে পারেন। আবার ধরুন বাসের মধ্যে জ্যামে বসে আছেন। বিরক্তকর সময় কাটাতে তখন ই-বুক পড়তে পারেন। কিন্তু আপনি নিজের বাসায় অবস্থান করছেন অবসরকালিন সময়ে, তখন না হয় ছাপা বইগুলো পড়লেন! ছাপা বইয়ের স্বাদ নিলেন! ই-বুক’কে বিকল্প পন্থা হিসেবে গ্রহণ করতেই পারেন। তবে বই মানেই যে কাগজে ছাপা বই, ছাপা বইয়ের গন্ধ। ছাপা বইয়ের প্রতি পাঠকদের আরও আগ্রহ বাড়াতে হবে। ছাপা বইয়ের পেছনের পরিশ্রম আর সফলতার গল্পগুলো তুলে ধরতে হবে।

লেখা: রাব্বি হোসেন, লেখক ও সংবাদকর্মী।


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত