সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০২২

ডিজিটাল বিপ্লব কাগজে ছাপা বইয়ের চূড়ান্ত মৃত্যু ঘটাবে?

আন্দালিব রাশদী

২০২১ সালে এডিনবরা আন্তর্জাতিক বইমেলায় লেখক ইভান মরিসন ঘোষণা দেন, আর মাত্র পঁচিশ বছর, এর মধ্যেই ডিজিটাল বিপ্লব কাগজে ছাপা বইয়ের চূড়ান্ত মৃত্যু ঘটাবে। বই দেখতে হলে জাদুঘরে যেতে হবে। আর বইয়ের চূড়ান্ত মৃত্যুতে লেখকেরও মৃত্যু ঘটবে।

পঁচিশ বছরের মধ্যে দশ বছর চলে গেছে, সামনে আছে আর পনের বছরের ক্রান্তিকাল, এর মধ্যে আমার স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটার সম্ভাবনা বেশি, অন্তত এটুকু প্রার্থনা তো করতেই পারি, ছাপা বইয়ের চূড়ান্ত মৃত্যুর আগে আমার মৃত্যু হোক। সন্তানের মৃত্যুর মতো আমি কাগুজে বইয়ের মৃত্যুও দেখতে চাই না।

মিলেনিয়াল-শাবক কিংবা Y জেনারেশনের সদস্যরা আমার রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি ও পশ্চাৎপদতার নিন্দা করবেন ধরেই নিয়েছি, প্রজন্মের ব্যবধান তো আর মিথ্যে নয়।

গুটেনবার্গের মতোই একটানা লেগে থেকে যিনি এ কাজটি করলেন তার নাম জেফ বেজোস (Jeff Bezos)। তিনিই আমাজন ডট কম-এর প্রতিষ্ঠাতা। জেফ বেজোস আমেরিকান এক যুবক, তার জন্ম ১২ জানুয়ারি ১৯৬৪।

১৯৯৭ সালে, মাত্র দু’বছরের মাথায় আমাজন দাবি করে বসলো যে এটা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বইয়ের দোকান। খান্দানি বইয়ের দোকানগুলো চটে গেল। বার্নস অ্যান্ড নোবেল মিথ্যাচারের অভিযোগ এনে আমাজনের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিলো ১৯৯৭-র মে মাসে। তাদের দাবি এটা আদৌ কোনো বইয়ের দোকান নয়, বরং জেফকে বলা যায় বইয়ের দালাল।

১৯৯৮-তে ওয়ালমার্ট মামলা করলো- আমাজন তাদের ব্যবসায়ের গোপন সূত্র চুরি করেছে। জেফ বেজোসের তখন এমনিতে ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা। মামলার কারণে নয়, ক্ষতি সামলে উঠতে পারছেন না বলে। এরই মধ্যে টাইম ম্যাগাজিন আর্থিক দৈন্যদশায় ডুবে থাকা মানুষটিকে ১৯৯৯ সালে ‘পার্সন অব দ্য ইয়ার’ ঘোষণা করলো।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বইয়ের দোকানের মালিকরা স্থানীয় ট্যাক্স অফিসের স্বীকৃতিটুকু কেবল পেয়েছেন আর টাইম ম্যাগাজিন আমাজনের মালিক হিসেবে তাকে ‘বছরের সেরা ব্যক্তি’ নির্বাচন করেছে।

৩ এপ্রিল ১৯৯৫ সালে ডগলাস হফস্টাডারের ফ্লুইড কনসেপ্ট ক্রিয়েটিভ অ্যানালিসিস ‘Fluid Concepts of Creative Analogies : Computer Models of the Fundamental Mechanisms of thoughts’ বইটি যখন অ্যামাজনের বাণিজ্য যাত্রায় প্রথম বই হিসেবে অনলাইনে বিক্রি হলো স্টেশন বুক শপ কিংবা হাইস্ট্রিট বুকশপ তখনও ভাবেনি বইয়ের ব্যবসাটা তাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। এই লেখক বিখ্যাত অধ্যাপক এবং নন-ফিকশনে ১৯৭৯ সালের পুলিৎজার পুরস্কার বিজয়ী। গুটেনবার্গ প্রযুক্তি বাস্তব হুমকির মুখে পড়লো।

১৯৩০ সালে রবাট ব্রাউন একটি সাধারণ ‘রিডিং মেশিন’ আবিষ্কার করতে চেয়েছেন যেখানে তিনি হাজার হাজার পৃষ্ঠার বই পড়তে পারবেন, পাঠক তার সুবিধে মতো টাইপের সাইজ সমন্বয় করে নিতে পারবেন, কাগজ কাটাকাটির কোনো দরকার হবে না।

রবার্ট ব্রাউনের স্বপ্নটি সত্য হতে পুরো চল্লিশ বছর লেগে যায়। মাইকেল এস হার্ট যখন প্রজেক্ট গুটেনবার্গ চালু করলেন, ১৯৭৯-এ পৃথিবীর প্রথম ই-বুক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল দ্য ইউ এস ডিক্লারেশন অব ইন্ডিপেন্ডেস। স্মরণ রাখা যেতে ১৯৭১ সালেই একটি মেইনফ্রেম কম্পিউটার থেকে অপর একটি মেইনফ্রেম কম্পিউটারে ই-মেইল পাঠানো হয়েছিল। এটিই পৃথিবীর প্রথম ই-মেইল। ১৯৮৫তে ভয়েজার কোম্পানি সিডি রম-এ তুলে এনেছিল মাইকেল ক্রিকটনের জুরাসিক পার্কসহ অন্যান্য বই। ১৯৯৩ সালে ডিজিটাল বুক ইনকর্পোরেটেড একটি ফ্লপি ডিস্কে ৫০টি বই বাজারজাত করেছিল। বইকে কাগজ থেকে তুলে আনার অর্থাৎ সনাতন বই থেকে বের করে সুলভে অন্য কোনো ভাবে উপস্থাপন করার প্রক্রিয়াটির বয়স অর্ধ শতাব্দীর।

১৯৯৮ সালের চারটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যা সনাতন বইয়ের জগতে বজ্রাঘাত বলে বিবেচিত হতে পারে :
১. প্রথম ডেডিকেটেড ইবুক রিডার-রকেট ই-বুক এবং সফট বুক বাজারে আসে।
২. ইবুকের জন্য ISBN(ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড বুক নাম্বার) নম্বর ইস্যু করা শুরু হয়।
৩. যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি তাদের ওয়েবসাইটে জনগণের জন্য বিনে পয়সায় ইবুক সরবরাহ করতে শুরু করে।
৪. ল্যারি পেইজ ও সার্গেই ব্রিন সার্চ ইঞ্জিন গুগল প্রতিষ্ঠা করেন।

মাইকেল হার্ট চেয়েছিলেন তার প্রজেক্ট গুটেনবার্গের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ১০,০০০ বই শতাব্দী শেষ হবার আগেই বিনে পয়সায় পাঠকের সামনে উপস্থাপন করবেন। ২০২০-এর মে নাগাদ এই প্রজেক্টের বিনে পয়সার ইবুকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬২১০৮টি।

কাগজে ছাপা বইয়ের অস্তিত্বের উপর ডিজিটাল হুমকি এসেছে পঞ্চাশ বছর আগে আর এই হুমকি প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে আরো জোরদার হয়েছে! সে কারণেই ইভান মরিসন দিনক্ষণ বেধে দিয়েছেন, বইয়ের মৃত্যুর সাথে লেখকের মৃত্যু ঘটবে।

কিন্তু লেখকের কোনো মৃত্যু ঘটবে? কাগজে বইয়ের বদলে যদি ইবুকই আরাধ্য হয়ে উঠে, সেই বইয়ের কি লেখক দরকার হবে না? নাকি বিশেষ বিশেষ ধরনের বইয়ের সফটওয়ার ডাউনলোড করে একটি থিম এবং কিছু চরিত্রের নাম লিখে এন্টার টিপলেই বইটি বেরিয়ে আসবে?

সাহিত্যিক ও উপস্থাপক আলী ইমামের সঞ্চালনায় ইবুক নিয়ে একটি আলোচনায় আরো দু’জন লেখকের সাথে আমিও অংশ গ্রহণ করেছিলাম। ছাপা বইয়ের চেয়ে ইবুকের চাহিদা কেন বেশি হবে আমি এই ব্যাখ্যা দেবার সময় একজন লেখক ইবুকের উপর এতোটাই চটে গিয়েছিলেন যে বলে বসলেন, ওসব বাজে কথা, ইবই লিখে কেউ কখনো নোবেল পুরস্কার পেয়েছে? তার মানে স্পষ্ট ই-বইয়ের সাথে তার পরিচয় ঘটেনি। ইবই যে আলাদাভাবে লিখতে হবে এমন নয়, কাগুজে বইয়েরই যে কাগজহীন একটি সংস্করণ এটা, এই ধারনাটি তার বিবেচনায় আসেনি। কেনো ইবই কাগুজে বইয়ের চেয়ে ভালো তার অর্ধশত কারণ দেখানো যাবে।

আমার এই নিবন্ধটি আমার মতো প্রাক-ইপ্রযুক্তি পাঠকের জন্য যতটা না তার চেয়ে বেশি Y বা ওয়াই প্রজন্মের নাগরিক বা মিলেনিয়ালদের নিয়ে। ছাপানো বই হোক কি ইবই, ওয়াই প্রজন্মের পাঠক আদৌ পড়বে কিনা কিংবা পড়ছে কিনা সেটা জানা আবশ্যক।

২০৪৯ সালের কথা ধরা যাক। এখন থেকে আরো ২৮ বছর পর ইভান মরিসন যে ডেটলাইন দিয়েছেন তারও ১৩ বছর পর। ধরা যাক ফারেনহাইট ৪৫১ নামের ডিস্টোপিয়ান উপন্যাসে রে ব্র্যাডবারি যা লিখেছেন তাই সত্য হতে যাচ্ছে। ডিস্টোপিয়া হচ্ছে প্রিয় কল্পলোক বা ইউটোপিয়ার ঠিক উল্টোটা। ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত এই বইটিতে রে ব্র্যাডবারি ১৯৪৯ সালের আমেরিকান সমাজের একটি বর্ণনা দিয়েছেন যেখানে বইপত্র নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যেখানেই বই পাওয়া যাচ্ছে দমকল বিভাগের লোকজন তা ছিনিয়ে নিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। তাপমাত্রা যখন ৪৫১ ডিগ্রি ফারেনহাইট স্পর্শ করছে তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাগজে আগুন ধরে যাচ্ছে এবং পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছ্, এই তাপমাত্রা বজায় রাখতে পারলে পৃথিবীকে বইশূণ্য করার কাজটা সহজ হয়ে যায়। ৪৫১ ডিগ্রি ফারেনহাইট হচ্ছে ‘অটোইগনিশন টেম্পারেচার’।

বইয়ের সাথে রাষ্ট্রের বৈরিতা, সেন্সরশিপ, লাইব্রেরিতে আগুন এ ধরনের অনেক সংস্কৃতিনাশা কর্মকান্ড লেখককে ক্ষুব্ধ করেছিল। তিনি আগামীদিনের অনেকদৃশ্য সঠিক আঁকলেও বইয়ের জন্য যে কাগজের প্রয়োজন হবে না এটা কল্পনায় আনতে পারেননি, পারলে সম্ভবত উপন্যাসটি ভিন্নভাবে লেখা হতো।

২০৪৯-এর তিন দশক আগেই আমরা যেখানে পৌঁছেছি যেখানে বইয়ের জন্য ভারী প্রিন্টিং মেশিন, কাগজ এসবের কোনো প্রয়োজন নেই। বই সবার জন্যই থাকলো, কারো ধরা ও ছোঁয়ার মধ্যে নেই। বইয়ের অবস্থান ভার্চুয়াল জগতে। তবুও সংকট কিছুটা রয়ে যায়। আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরিসহ বহু সভ্যতার ফসল আগুনে ভস্মীভূত হবার পরও যে সব বাস্তব ও স্পর্শযোগ্য বইপত্র রয়ে গেছে, ডিজিটাল ত্রিমাত্রিক সেই সব বইপত্র ও দলিল ভার্চুয়াল জগতে কেমন করে স্থানান্তর করবে এবং ভার্চুয়াল গুদামে সঞ্চিত রাখবে তা এখনো স্থিরীকৃত হয়নি।

মিলেনিয়ালস বা ওয়াই জেনারেশন কি বই পড়ে?

গবেষক ও গণমাধ্যম ১৯৮০ দশকের শুরু থেকে ১৯৯০ দশকের মাঝামাঝি সময়টাতে, আরো সুনির্দিষ্ট করতে চাইলে ১৯৮১ থেকে ১৯৯৬ এই সময়ে যারা জন্মগ্রহণ করেছে তাদেরই মিলেনিয়ালস (এখন যথেষ্ট পরিচিত এ নামে) বা ওয়াই জেনারেশন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন; তারা হয়ে উঠবে আলফা জেনারেশনের সন্তানের জনক-জননী।

এই প্রজন্মের বড় বৈশিষ্ট্য তারা ইন্টারনেট, মোবাইল ডিভাইস এবং সোশাল মিডিয়ার সাথে পরিচিত এবং গভীর সম্পৃক্ততা, কখনো তাদের ডিজিটাল নেটিভও বলা হয়ে থাকে। ১৯৭৪ থেকে ১৯৮০ পর্যন্ত সময়ে যারা জন্মগ্রহণ করেছেন তারা X প্রজন্ম।

অভিযোগটা ছিল মিলেনিয়ালদের বিরুদ্ধে, তারা বই পড়েন না। কিন্তু সমীক্ষা ও পরিসংখ্যান তা ভুল প্রমাণ করেছে। তাদের হাতে কাগুজে বই কম দেখার কারণেই সম্ভবত অভিযোগটা দানা বেধেছিল।

বয়স দিয়ে সনাক্ত করে (৫ থেকে ২৫ Z জেনারেশন, ২৬-৪০ মিলেনিয়ালস, ৪১ থেকে ৫৫ X জেনারেশন, ৫৬-৭৫ বেবি বুমার্স এবং ৭৬ থেকে ৯৫ সাইলেন্ট জেনারেশন), চালানো সমীক্ষায় দেখা গেছে মিলেনিয়ালরা অন্য যে কোনো প্রজন্মের চেয়ে বেশি বই পড়েছে এবং তাদের বয়সে তাদের জ্যেষ্ঠ প্রজন্ম যে পরিমাণ বই পড়েছে তাদের পাঠ তার চেয়ে লক্ষণীয় রকম বেশি। এই গবেষণাটি ২০১৬ সালের। বই পড়ে না বলে যারা তাদের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করছেন ডিজিটাল প্রজন্ম যে তাদের চেয়ে বেশি বই পড়েছে তা সমীক্ষায় প্রমাণিত। কাজেই বইয়ের চাহিদা এতোটুকুও কমেনি, ফলে বই এবং লেখকের মৃত্যুর আশঙ্কার কারণ নেই।

পাঁচ প্রজন্মের পাঠাভ্যাসের সারমর্ম:

সাইলেন্ট জেনারেশন প্রতিদিনই কমবেশি পড়ে।
বেবি বুমার্সরা বেস্টসেলার্স লিস্ট থেকে বই খুঁজে নেয়।
এক্স জেনারেশন অন্যদের চেয়ে বেশি অনলাইন সংবাদ পড়ে।
মিলেনিয়ালসরা যে কোনো প্রজন্মের চেয়ে বেশি বই পড়ে।
এক্স জেনারেশন অন্যদের চেয়ে ফ্যান্টাসি বেশি পছন্দ করে।

প্রযুক্তি এখন হাতে তুলে দিয়েছে অত্যন্ত সস্তা এবং এমনকি বিনে পয়সার বিনোদন। ইন্টারনেটের মাধ্যমে শত উৎসে যাওয়া এবং তা নিয়ে মজে থাকা সম্ভব। এর মধ্যেও মিলেনিয়ালদের বই পড়ার উচ্চ হার প্রকাশনা জগতের জন্য আশাব্যঞ্জক।

সমীক্ষকরা বলছেন ‘সারপ্রাইজিং রিডিং হ্যাবিট অব দ্য মিলেনিয়ালস’, তারাই বইয়ের দোকান এখনও টিকিয়ে রেখেছেন। ২০১৮ সালের প্রকাশনা শিল্পের বাজার ছিল ১১১ বিলিয়ন ডলারের আগের পাঁচ বছর ধরে শতকরা এক ভাগ করে বাড়তে বাড়তে এখানে এসেছে। কাজেই প্রকাশনা ডুবে যাচ্ছে বলে যারা মনে করছেন, তাদের অনুমান সঠিক নয়।

তাহলে অনেক বইয়ের দোকান যে বন্ধ হয়ে গেল, বার্নস অ্যান্ড নোবলস-এর অনেক শাটার নেমে এল-এর ব্যাখ্যা কি? এর জবাব দেবে অ্যামাজন এবং অন্যান্য অনলাইন বই বিক্রেতা। অ্যামাজন বহু ক্ষুদ্র বই ব্যবসায়ীকে গলধকরণ করেছে। করোনাকাল আরো সুযোগ সৃষ্টি করেছে অ্যামাজনের। লকডাউন আর শাটডাউনে যখন অন্যান্য বইয়ের দোকান বন্ধ অনলাইন জায়ান্ট অ্যামাজন ঠিক সময়মত গ্রাহকের বইটির চালান পৌঁছে দিয়ে এসেছে। ২০২০-এর মে মাসে অ্যামাজন জানিয়েছে তারা যে পরিমাণ ফরমায়েশ পাচ্ছে, বিতরণ করে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। তাদের গুদামের আলমারির তাক খালি হয়ে গেছে। লকডাউন চলাকালে প্রথম তিন মাসে আমাজনে বই বিক্রি বেড়েছে ২৬ শতাংশ। কিন্তু সাধারণ বইয়ের দোকান বন্ধ থাকায় মনে হয়েছে বইশূন্য পৃথিবী। পত্রিকার সম্পাদকীয় শিরোনাম হয়েছে। ‘ডিস্টোপিয়ান ফিউচার উইদাউট বুকস্টোরস’।

করোনাকালের বই সংবাদ শিরোনাম

বিশ্বব্যাধি আতঙ্ক বইয়ের বাজারকে লন্ডভন্ড করে ফেলেছে। গত বছরের কয়েকটি বইপত্র বিষয়ক সংবাদের শিরোনাম তুলে ধরছি :
১. ইতালির বই দোকান কর্মচারীরা দোকান খুলতে অস্বীকার করেছে, শত শত দোকান বন্ধ।
২. অস্ট্রেলিয়াতে ‘লাভ ইয়োর বুকশপ’ প্রচারনা শুরু করেছে জাতীয় বই বিক্রেতা সমিতি।
৩. চীনা ভাষার বইয়ের দোকান (যুক্তরাষ্ট্রে) টিকে থাকার লড়াই করে যাচ্ছে।
৪. বার্নস অ্যান্ড নোবল ইভানস্টোন বইয়ের দোকান স্থায়ীভাবে বন্ধ করেছে।
৫. কিনোজুনিয়া (জাপানি চেইন স্টোর) আবুধাবিতে বইয়ের দোকান খুলেছে।
৬. ফ্ল্যাঙ্কফুর্ট বইমেলা অনিশ্চিত।
৭. ব্রিটিশ বুকসেলার্স অ্যাসোসিয়েশন সোশাল ডিসট্যান্সিং-এর গাইডলাইন জারি করেছে।
৮. বইপত্রের অনলাইন বিক্রেতা বাড়াতে ভ্যাট বাতিল, বইয়ের দাম কমছে।
৯. ভ্যাঙ্কুভারের পুরোনো বইয়ের দোকান পিপলস কোঅপারেটিভ বুক স্টোর বন্ধ হওয়া ঠেকাতে স্থানীয়রা ৭৫০০০ ডলার চাঁদা উঠিয়েছে।
১০. ফ্রান্সে মুদ্রিত বইয়ের বিক্রিতে ৯৪ শতাংশ ধস।
১১. ই-কমার্স ২০০০ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে।
১২. কোভিডে বই বিক্রেতার মৃত্যু।
১৩. ওয়ার্ল্ড বুক ডে-তে অনুদান প্রদানের জন্য জনগণকে অনুরোধ করা হয়েছে।
১৪. করোনা আতঙ্কে ৩০০ অ্যামাজন কর্মী কাজ চালিয়ে যেতে অস্বীকার করেছে।
১৫. সাংহাই-এর ৩০টি বইয়ের দোকান আলীবাবার সাথে যোগ দিয়েছে।
১৬. অ্যামাজনে প্রথম কোভিডে মৃত্যু (১৬ এপ্রিল), মৃত ব্যাক্তি গুদাম রক্ষক।
১৭. লন্ডন বইমেলার জন্য দেওয়া বুকিং মানি ফেরত দেওয়া হবে, মেলা স্থগিত।
১৮. পেন রাইটার্স ইমার্জেন্সি ফান্ড গঠন।

আশঙ্কা:
কাগুজে বই নেই, আছে কেবল ইবুক। পান্ডুলিপি তৈরি করে আপলোড করে দিলেই হলো। তাহলে ইবুক চলে যাবে ফার্স্ট টাইমারদের দখলে। বেস্ট সেলিং লেখকদের অ্যামাজানের মতো বড় প্রতিষ্ঠান কিনে নেবে। বেস্ট সেলিং এবং ফাস্ট টাইমারের মাঝামাঝি সব লেখকের মৃত্যু হবে। বিপুল সংখ্যক লেখকের লিখে কিছু সম্মানী পাওয়া এবং লিখে জীবন ধারণ করার দিন শেষ।

আশঙ্কানাশ:
যখন প্রকাশনার মাধ্যম ছিল বিশাল পাথরের স্ল্যাব, প্যাপিরাস আবিষ্কারের পর লেখকরা বলেছিলেন তাদের দিন শেষ। কাগজ আবিষ্কারের পর প্যাপিরাসের লেখকরা বলেছিলেন তাদের দিন শেষ। ১৪৫৫তে গুটেনবার্গের মুদ্রণযন্ত্র চালু হবার আগে পুরোনো প্রযুক্তির ছাপা লেখার ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। লেখকরা বললেন তাদের দিন শেষ। তারপর লেখকের জন্য সাধারণ টাইপরাইটার, ইলেক্ট্রিক টাইপ রাইটার, ওয়ার্ড প্রসেসর, পার্সোনাল কম্পিউটার, ট্যাব, ল্যাপটপ অনেক কিছু এল। এখনও বিশ্বজুড়ে লেখকদের বড় অংশ কাগজে কলমেই লিখেন। কম্পিউটার ছাপাখানার তেমন সর্বনাশ করতে পারেনি। স্ল্যাবের বই, প্যাপিরাসের বই তারপর কাগজের বই: যখন ১৯৩০ দশকে পেপারবুক বাজারে এলো লেখক প্রকাশক ও সুধিজন সকলে আঁতকে উঠলেন– বইয়ের বারোটা বেজে গেছে। ২০২০ সালে ইবুকের বিশ্ববাজার ১৬১০০ মিলিয়ন ডলারের; প্রতিবছর গড়ে ১৫.৭% বেড়ে ২০২৬ এই বাজারের আকার দাঁড়াবে ৩৮৫৬০ মিলিয়ন ডলার। কেবল ফার্স্ট টাইমারের বই দিয়ে বাজারের সম্প্রসারণ সম্ভব নয়। কেবল বেস্ট সেলিং রাইটার দিয়েও নয়। সুতরাং লিখতে থাকুন, প্রকাশক আসবেই।

বই তো লেখককেই লিখতে হবে। সুতরাং লেখকের মৃত্যুর সম্ভাবনা একেবারেই নেই।

ইবুক সামগ্রীর প্রধান বিক্রেতাদের চিনে রাখুন: অ্যামাজন, অ্যাপল, ম্যাকগ্র হিল, সাইব্রেক্স, বিকন প্রেস, এডবি প্রেস, জন উইলি অ্যান্ড সন্স, পেঙ্গুইন গ্রুপ, ব্ল্যাকওয়েল সায়েন্স, র‌্যানডম হাউস, স্প্রিঙ্গার বার্টেলসম্যান, মনি, আইরিডার টেকনোলজি।

কাগজে ছাপা বইয়ের বৃহত্তম ২০টি বাজার (আকারের অধঃক্রম অনুসারে) যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জার্মানি, জাপান, ফ্রান্স, ভারত, কোরিয়া, স্পেন, ইতালি, তুরস্ক, কানাডা, ব্রাজিল অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, রাশিয়া, তাইওয়ান, পোল্যান্ড, মেক্সিকো এবং অস্ট্রিয়া।

২০২৫ সালে এই বাজারের আকার ১২৪.২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। তবে এটা সত্য ইবুকের বাজার সম্প্রসারণের হার ছাপা বইয়ের সম্প্রসারনের হারের চেয়ে বেশি।

ডিজিটাল ইন্ডাস্ট্রিতে অধোগতি

হোমভিডিও: মূল উদ্যোক্তা ও লগ্নিকারকরা পাইরেসির কাছে মার খেয়ে গেছেন। আমেরিকান মোশন পিকচার অ্যাসোসিয়েশন ২০০৫ সালেই বলেছে পাইরেটেড মুভির কারণে তাদের ক্ষতি ৬.১ বিলিয়ন ডলার।

মিউজিক: এখানেও পাইরেটেড হতে সময় লাগে না, আয় কমেছে ৭৫ ভাগ।
পর্ণছবি: বহু চ্যানেল বিনে পয়সায় নীল ছবি দেখায়, ফলে পে চ্যানেলের চাহিদা নেই। পর্ণছবি নায়িকাদের চাহিদা কমেছে এবং আয় ২০১০ এর তুলনায় এক তৃতীয়াংশ কমে গেছে।
কম্পিউটার গেমস: পাইরেসির কারণে পাঁচ বছরে কম্পিউটার গেমস ইন্ডাস্ট্রির ক্ষতি হয়েছে ৪১ বিলিয়ন ডলার।
সংবাদপত্র: প্রচার সংখ্যা নেমে এসেছে ১৭ ভাগ।
ফটোগ্রাফি: শিল্প হাতছাড়া হয়ে চলে গেছে মোবাইল ফোন ক্যামেরার কাছে।
টেলিকমিউনিকেশন: স্মার্ট ফোন টেলিকমিউনিকেশনের সনাতন শিল্প ও বাণিজ্য ধ্বংস করে দিয়েছে।
ইন্টারনেট: প্রায় ফ্রি’ গুগল, ইয়াহু, ইউটিউবসহ প্রায় সব সামাজিক মাধ্যম ফ্রি। পৃথিবীজুড়ে চলছে একটি ফ্রি রেভ্যুলেশন। তুলনামূলকভাবে এখনো বইয়ের বাজার অনেক ভালো। পাইরেসি থাকলেও তা ব্যাপক নয়। পুঁজি লগ্নি করে ভরসা করার মতো বই ছাড়া আর কিছু হাতে নেই– সুতরাং বই থেকেই যাবে। ইবুক বাড়বে। লেখক প্রকাশক পাঠক সবাই এটাই মেনে নেবেন। যে দুর্যোগের কথা এতোদিন শোনা গিয়েছে সে রকম কিছু ঘটেনি বইয়ের জগতে।

বই বাড়ছে : কাগজে ছাপা বই যেমন বাড়ছে তার চেয়ে বেশি হারে বাড়ছে ইবুক। বই বিক্রি বাড়ছে, যতটা না দোকানে তার চেয়ে বেশি অনলাইনে। যত বৃক্ষ সংহার হোক না কেন কাগজহীন পৃথিবী এখনো অনেকদূর। মৃত ঘোষনার পরও বই টিকে থাকবে। লেখক দীর্ঘজীবী হবেন।

বইতথ্য
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের হুটন লাইব্রেরিতে ১৮৮০-র দশকে প্রকাশিত একটি ফরাসি বই যার নামের মানে ‘আত্মার নিয়তি’ মানুষের চামড়া দিয়ে বাঁধাই করা। একজন নারী মানসিক রোগীর মৃত্যুর পর কেউ তার মৃতদেহ দাবি করেনি, তার পিঠের চামড়া দিয়ে বইটি বাঁধাই করা হয়। হার্ভার্ডের কিউরেটর জানান পঞ্চদশ শতক থেকে মৃত মানুষের চামড়া দিয়ে বই বাধাই করার রেওয়াজ ছিল। এই বইটি আত্মা সম্পর্কৃত মানুষের চামড়া দিয়ে বাধাই করা যুক্তিযুক্ত হয়েছে। লাইব্রেরির আরো দুটো বই মানুষের চামড়ায় বাধাই করা বলে মনে করা হয়।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বইটি ১৬.৪০ ফুট x ২৮.৪৫ ফুট মাপের এবং বইটির ওজন দেড় টন (১৫০০ কিলোগ্রাম) পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪২৯। মাশাহেদ ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১২ বইটি উন্মোচিত করে। বইয়ের নাম দিস ইজ দ্য প্রোফেট মোহাম্মদ, তার জীবনের গল্প দিয়ে বইটি রচিত। বইটির প্রস্তুতিতে ৫০ জন অংশগ্রহণ করেছেন।

মুদ্রিত প্রকাশিত সবচেয়ে বড় বইটির নাম ‘দ্য লিটল প্রিন্সেস’। এটি দৈর্ঘ্য ১০.১ ফুট এবং প্রস্থ ৬.৬ ফুট; পৃষ্ঠা সংখ্যা ১২৮। প্রকাশক ব্রাজিলের এডিওরো পাবলিকেশন্স। ১৩ সেপ্টেম্বর ২০০৭ রাজধানী রিও দ্য জেনারিওর দ্বিবার্ষিক গ্রন্থমেলায় বইটি প্রথম প্রদর্শিত হয়।

পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ নামের বইটি ৩৭৭৭ শব্দের। প্রথম অংশটুকু দ্য হিস্ট্রিক্যাল ডেভলাপমেন্ট অব হার্ট, ২০ মার্চ ২০১৯ কিরগিজস্তানের বিশকেকে শহরে একজন ভারতীয়ের হস্তগত হয়। গড়পরতা ১৭.৩ মিলিয়ন পাঠক প্রতিবছর নিউ ইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরিতে যান। শীর্ষস্থানে এটাই, দ্বিতীয় শীর্ষ ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব চায়না, ৫ মিলিয়ন পাঠক এখানে আসেন আর তৃতীয় স্থানে ব্রিটিশ লাইব্রেরি, বছরে ১.৫ মিলিয়ন পাঠকের আগমন ঘটে। ৮৬৮ সালে মুদ্রিত ডায়মন্ড সূত্র ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে আসে সম্ভবত: এটিই পৃথিবীর টিকে থাকা প্রাচীনতম বই।

সবচেয়ে ওভারডিউ বই

লাইব্রেরি থেকে আনা বই কোনো কারণে শতবর্ষ পরেও ফেরত দেওয়া হয়নি এরকম বই থাকতেই পারে। কিন্তু ফেরত ও জরিমানা দেওয়া বইটির নাম ডেজ অ্যান্ড ডিডস। এমিলি ক্যানেলস সিমস ১৯৫৫ সালের এপ্রিলে ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের কেওয়ানি পাবলিক লাইব্রেরি থেকে বইটি আনেন। ১৯ এপ্রিল ১৯৫৫ এর মধ্যে ফেরত দেবার কথা। কিন্তু বইটি ফেরত দেওয়া হয়নি। লাইব্রেরির সেই সদস্য মারাও যান। ৪৭ বছর পর তারই মেয়ে এমিলি তার বাসায় পুরোনো জিনিসপত্র খুঁজতে গিয়ে বইটি পান। ওভারডিউ বইয়ের বেলায় প্রতিদিনের জন্য জরিমানা ২ সেন্ট। এমিলি ৩৪৫.১৪ ডলার ফাইনসহ বইটি লাইব্রেরিতে ফেরত দেন। বই ফেরত এবং বেশি টাকা জরিমানা দেবার ক্ষেত্রে এটি একটি বিশ্বরেকর্ড।

উপন্যাসিক মার্শেল প্রুস্ত

উপন্যাসের নাম রিমেমব্র্যান্স অব থিঙ্গস পাস্ট অর ইন সার্চ অব লস্ট টাইম, ১৩ খন্ডের উপন্যাস; প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯১২ সালে। পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪২১৫; উৎসাহী পাঠক যদি প্রতি মিনিটে ৩০০ শব্দ পড়তে পারেন তাহলে উপন্যাসটি শেষ করতে কমপক্ষে ৭০ ঘন্টা সময় লাগবে।

হরাইজন্টাল রাইটার

ট্রুমান ক্যাপোট নিজেকে সম্পূর্ণ আনুভূমিক লেখক মনে করতেন। বিছানায়, কাউচে না শুয়ে তিনি লিখতে পারতেন না। তিনি মনে করতেন এ অবস্থায়ই তার সৃজনশীলতা সবচেয়ে বেশি বিকশিত হয়। এই টেকনিক আগে যারা অনুসরণ করেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন মার্ক টোয়েইন এবং জর্জ অরওয়েল। ভার্টিকাল বা উলম্ব অবস্থায় লিখতেন চার্লস ডিকেন্স, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। ভার্জিনিয়া ওলফও দাঁড়িয়ে লিখতেন।

ভিক্টর হুগো, ড্যান ব্রাউন, জন স্টাইনবেক

বিখ্যাত ফরাসি ঔপন্যাসিক ভিক্টর হুগোর নির্দেশে তার খানসামা তার পরনের পোশাক লুকিয়ে রাখতেন। তিনি নগ্ন অবস্থায় লিখতেন। শীতের সময় একটি কম্বল জড়িয়ে নিতেন। পোশাকবিহীন থাকার ভালো দিক হচ্ছে কারো আহ্বানে কিংবা নিজেরই ইচ্ছেতে ঘুরোঘুরি করতে বাইরে যেতে পারতেন না। ফিলিপ রথ প্রতি পৃষ্ঠা লেখা শেষ হলে আধ মাইল হেঁটে আসতেন। দ্য ভিঞ্চি কোড এর ড্যান ব্রাউন নিজস্ব প্রেসক্রিপশন আর্ট ইনভার্সন থেরাপি, মাথা নিচে দিয়ে ঝুলে থাকা তার অভিনিবেশ বাড়ায় এবং রাইটার্স ব্লক কাটিয়ে দেয়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার সঙ্গ অফারিংস পান্ডুলিপি বিলেতের ট্রেনে ফেলে নেমে গিয়েছিলেন। পরে লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ডে যোগাযোগ করে পেয়েছেন। একালের সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে কম্পিউটার ক্রাশ। জন স্টাইনবেক তার বিখ্যাত উপন্যাস অফ মাইস অ্যান্ড ম্যান পান্ডুলিপির প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিলেন, তার প্রিয় কুকুর টবি পান্ডুলিপির অর্ধেকটা খেয়ে ফেলেছিল। স্টাইনবেক লিখলেন, একটা মাইনর ট্রাজেডি ঘটল, আমার কুকুরছানা পুরো এক রাতে আমার পান্ডুলিপির অর্ধেকটা খেয়ে ফেলল– আবার দু’মাস আমাকে খাটাখাটনি করতে হবে। সাদামাটা চাপড় দিয়ে শাস্তি দিলাম।

কুকুর খেয়ে ফেলেছে লেখকের পান্ডুলিপি এটা খুব ভালো অজুহাত নয় জেনেও স্টাইনবেক প্রকাশকের কাছে আরো দু’মাস সময় প্রার্থনা করলেন।

বাগদাদের বইয়ের দোকান

ইরাকের বই ব্যবসায়ীরা বইয়ের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত নন। তারা রাতের বেলা বই রাস্তায়ই ফেলে রাখেন। কারণ তারা এটা জানেন, যারা পড়তে জানেন তারা চুরি করেন না, আর চোর বই চুরি করবে না কারণ চোর পড়তে জানে না।

২০০৯-২০১০ অর্থ বছরে আমেরিকার বেস্ট সেলার ফিকশন লেখক জেমস প্যাটারসন তখনকার ডলার-টাকা বিনিময় হার অনুযায়ী কামিয়েছেন ৫০১ কোটি ৯০ লক্ষ টাকা। দিনের কামাই ১ কোটি ৩৭ লক্ষ ৫১ হাজার টাকা।

১৬ কোটি মানুষের এই বাংলাদেশের সকল ফিকশন লেখক মিলে এক বছরে জেমস প্যাটারসনের এক দিনের ধারে কাছেও পৌঁছতে পারেননি- এটা বেশ জোর দিয়েই বলা যায়।

হ্যারি পটার সিরিজের জন্য এক বছরে জে কে রাউলিং কামিয়েছেন ৫০০ মিলিয়ন ডলার। চোরাবাজারের ডলারের দর অনুযায়ী প্রতিদিন ৬ কোটি ৫৭ লক্ষ টাকা; জেমস প্যাটারসনের পাঁচগুণ। তিন বছরে এক মুদ্রণের ৫০০ বই বেচতে আমাদের শ্রেষ্ঠ প্রকাশকরাও হিমশিম খেয়ে যান। এমন ঘটনা ইউরোপেও ঘটে। ১৭১৬ সালে কপটিক থেকে ল্যাটিনে ভাষান্তরিত নিউ টেস্টামেন্টের ৫০০ কপির মুদ্রণের শেষ বইটি বিক্রি হয়েছে ১৯০৭ সালে। ১৯১ বছরে ৫০০ কপি বইয়ের সদগতি হওয়া একটি বিশ্বরেকর্ড। এটি পড়তে পড়তে মনে হয়েছে ওদের বইয়ের গুদামে উঁই নেই?

বই ও লেখক দীর্ঘজীবী হবে আশ্বস্ত থাকতে চাই।


© 2022 - Deshbarta Magazine. All Rights Reserved.