মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১

তালেবান নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ

সাইফুল ইসলাম হাফিজ

আফগান সরকারের নিরাপত্তা ব্যূহ ধ্বংস করে হেলমান্দ, কান্দাহার, মাজার-ই শরিফ এবং অবশেষে কাবুল দখলের মাধ্যমে আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে তালেবান। আশরাফ গনির দেশত্যাগের মাধ্যমে বিনা রক্তপাতে প্রেসিডেন্ট প্যালেসে প্রবেশ করে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা করে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর চেয়েছে তারা। সাড়ে তিন মাসের মধ্যে তারা আফগান ভূমিকে কব্জায় নিয়েছে। কী ছিল তাদের রণকৌশল?

যুক্তরাষ্ট্রের প্রশিক্ষিত তিন লাখ সরকারি সেনা আফগানিস্তানকে কেন রক্ষা করতে পারল না? দুই দশকের যুদ্ধে দুই লাখ ২৬ হাজার কোটি ডলার ব্যয় করে যুক্তরাষ্ট্রের অর্জনই বা কী? এমন প্রশ্নের চেয়ে আরও দুটি প্রশ্ন বেশি ভাবাচ্ছেÑএক. কেমন হবে তালেবানের অধীনে আফগানদের জীবন? দুই. প্রতিবেশী দেশগুলোয় সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে পড়বে কি? বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয়। এই বিষয়টি নিয়েও উদ্বিগ্ন রাষ্ট্রগুলোর নেতারা। দেশের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে তালেবানÑএই খবরে আতঙ্কিত হয়ে হাজারো মানুষ দেশ ত্যাগ করছেন। তালেবান যদিও সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছে, কিন্তু তাতে তারা আস্থা রাখতে পারছেন না। তারা অতীতের বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা ভুলতে পারছেন না।

১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে তারা বেশ রক্ষণশীল নীতিতেই দেশ শাসন করেছিলেন। তবে তা অনেকের কাছেই ছিল শোষণ। সেই ১৯৯৬ সালের তালেবান আর ২০২১ সালের তালেবান কি এক রকম? বস্তুত এখনকার তালেবানকে তুলনামূলকভাবে উদার মনে করছেন বিশ্লেষকরা। গোষ্ঠীটি বর্তমানে তাদের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরার লক্ষ্যে কাজ করছে; মার্কিন জোটের সঙ্গে চুক্তি করে সমাধানে এসেছে। বেইজিং, মস্কো ও দোহায় বৈঠকে মিলিত হয়েছে কয়েকবার। রাজধানী কাবুল নিয়ন্ত্রণের পরেও অস্ত্র নয়, আলোচনার মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর চেয়েছে।

তারা বলেছে, শরিয়াহ্ আইন মেনে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে শিক্ষার অধিকার ফিরিয়ে দেবে, যা উদার পন্থারই লক্ষণ। তারা যদি আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে চায়, তবে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কট্টরপন্থি মনোভাব থেকে সরে আসতে হবে। তাদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন আফগানিস্তানে ইসলামি ইমারত প্রতিষ্ঠা করা। সেই প্রশাসন আফগানদের কাছে শ্বাসরুদ্ধকর হয়, নাকি স্বস্তির হয়, তা সময় বলে দেবে। কিন্তু তারা যদি সেই দোররা ও পাথর নিক্ষেপের যুগে ফিরে যায়, তবে আন্তর্জাতিক সমর্থন লাভ করতে পারবে না; বরং উন্নত দেশগুলোর পক্ষ থেকে মিয়ানমারের মতো অবরোধের মুখে পড়বে।

দ্বিতীয়ত, আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় থাকলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা হুমকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে ঢের। তালেবান যদি আফগান ভূমিকে সন্ত্রাসবাদের আখড়া বানায়, তবে আশেপাশের দেশগুলোয় তার শাখাপ্রশাখা ছড়িয়ে পড়বে। পাকিস্তানে তেহরিক-ই তালেবান এখনও জঙ্গি তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। অতীতে তারাও তা করেছিল। বিশেষ করে সার্কভুক্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশেও তার নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে বর্তমান সমীকরণ বলছে, আগের অবস্থায় তালেবানের ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তালেবানের ক্ষমতা দখলের কারণে বিশ্বরাজনীতিতে একটা পরিবর্তন আসবে, যে পরিবর্তনের ছোঁয়া দক্ষিণ এশিয়াকে বেশি প্রভাবিত করবে। তালেবান গোষ্ঠীকে এতদিন সবাই জঙ্গি বলেছে। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর বেশিরভাগ দেশ ও আন্তর্জাতিক মিডিয়া আর জঙ্গি বলছে না।

চীন ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তিগুলো তাদের স্বীকৃতি দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে; পাকিস্তান, ইরান, তুরস্ক ও সৌদি আরব তো শীর্ষ পর্যায়ে। যুক্তরাষ্ট্র অচিরেই তালেবান-নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তানকে আপন করে নিতে চাইবে। চীনের তৎপরতা রুখতে কোয়াডের কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বাড়াতেই হবে। কিন্তু তালেবান তাদের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করবে কি না, সেটা মুখ্য বিষয়। কারণ তালেবানের এই পুনরুত্থানকে ইরানের ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের

সঙ্গে তুলনা করা যায়। বিপ্লব-পরবর্তী দেশগুলো সাধারণত পশ্চিমাবিরোধী হয়ে থাকে; ইরান, কিউবা তারই উদাহরণ। তালেবান-নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তানও ইরানের মতো ইসলামি রাষ্ট্র হতে পারে। অপরদিকে ইউরোপের দুই বৃহৎ শক্তি ফ্রান্স ও জার্মানি সুর নরম করেছে। তাই বলা যায়, আন্তর্জাতিক রাজনীতির বৃহত্তর শক্তিগুলো তালেবানের সঙ্গে দহরম-মহরমপূর্ণ সম্পর্ক রাখবে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে তালেবানের বেশি সময় লাগবে না। ’৯৬-তে ক্ষমতায় এসে পাঁচ বছরে তারা মাত্র তিনটি দেশের সমর্থন লাভ করেছিল। কিন্তু রক্ষণশীল মনোভাব থেকে সরে এলে অতীতের মতো তাদের একঘরে হয়ে থাকতে হবে না।

তালেবান সরকার গঠন করলে সার্কের অন্যতম সদস্য পাকিস্তান স্বীকৃতি দেবে। কারণ পাকিস্তানের সমর্থনপুষ্ট তালেবান ক্ষমতায় থাকলে তাদের শক্তি বৃদ্ধি পাবে; ভারতকে কোণঠাসা করা সহজ হবে। ফলে কাশ্মীর ভারতের হাতছাড়া হতে পারে। সার্কের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে নিজ অবস্থান থেকেই সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত হবে। এক-তৃতীয়াংশ দেশ স্বীকৃতি দিলে বাংলাদেশেরও কূটনৈতিক সম্পর্ক উষ্ণ করার দিকে নজর দিতে হবে। 


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত