শনিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২১

থাইরয়েড সমস্যা যখন শিশুর

থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে হরমোনের নিঃসরণ স্বাভাবিক না হওয়ায় শারীরিক বা মানসিক বৃদ্ধি— পিছিয়ে থাকে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই রোগের নাম কনজেনিটাল হাইপোথাইরয়েডিজম বা সি এইচ।

শিশু-কিশোররা সাধারণত দু’রকম হাইপোথায়রয়েডিজমে ভোগে-

* জন্মগত হাইপোথায়রয়েডিজম

* পরবর্তী সময়ে সংঘটিত হাইপোথায়রয়েডিজম

এ ধরনের হাইপোথায়রয়েডিজম সাধারণত বয়োসন্ধিকালের আগে বা বয়োসন্ধিকালের কাছাকাছি কোনো সময়ে শুরু হয়।

শারীরিক বহুবিধ প্রয়োজনে থায়রয়েড হরমোন জরুরি। যেমন- শিশুর দৈহিক বৃদ্ধি, শিশুর হাড়ের গঠন তৈরি এবং বিপাকীয় কার্যক্রম।প্রায় সব দেশেই শিশু-কিশোররা অটোইমিউন হাইপোথায়রয়েডিজমে ভোগে। এ ক্ষেত্রে দেহের রোগ প্রতিরোধী কার্যক্রম (ইমিউনসিস্টেম) থায়রয়েড গ্রন্থির কোষগুলোকে আক্রমণ করে যাতে প্রদাহ তৈরি হয় এবং থায়রয়েড গ্রন্থির ক্ষমতা হ্রাস করে থাকে। অল্প কিছু ক্ষেত্রে পিটুইটারির কার্যক্রম কমে যাওয়ার কারণে বা কোনো কোনো ওষুধের কারণে হাইপোথায়রয়েডিজম হতে পারে। ডাউন সিনড্রোমের মতো কিছু জন্মগত রোগেও শিশুদের হাইপোথাইরয়েডিজমে ভুগতে দেখা যায়।

লক্ষণ

* দৈহিক বৃদ্ধি কম বা দৈহিক স্থূলতা

* লেখাপড়ায় খারাপ হওয়া, অমনযোগী বা মনোসংযোগে ব্যর্থ হওয়া

* বুদ্ধিমত্তায় ঘাটতি প্রদর্শিত হওয়া

* দৈহিক দুর্বলতা

* মুখ ফোলা ফোলা লাগা

* ঘুমের সমস্যা

* বেশি ঠাণ্ডা লাগা বা জ্বরজ্বর বোধ করা

* চুল ভঙুর হওয়া

* গলগণ্ড বা ঘ্যাগ

* মাংস বা অস্থি সন্ধিতে ব্যথা

* যৌবন প্রাপ্তিতে বিলম্ব

উপরিউক্ত লক্ষণ থাকলে শিশুকে অতি দ্রুত একজন হরমোন বিশেষজ্ঞ (এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট)কে দেখান। তিনি শিশুটির রক্তের নমুনা নিয়ে থায়রয়েড ও হরমোন পরিমাপের ব্যবস্থা করবেন। অনেক ক্ষেত্রেই গলার আল্ট্রসনোগ্রাম দরকার হয়। কিছু ক্ষেত্রে ক্রমজোমাল, জেনেটিক বা আপটেক টেস্ট করতে হতে পারে।

প্রধান চিকিৎসা পদ্ধতি হল- থায়রক্সিন ট্যাবলেট দেয়া। এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট শিশুটির হরমোনের ঘাটতির মাত্রা, হাইপোথায়রয়েডিজমের কারণ, শিশুর বর্তমান অবস্থা সবই বিবেচনা করবেন। যত আগে চিকিৎসা শুরু করা যাবে শিশুটির স্থায়ী ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা তত কম হবে।

হাইপোথাইরয়েডিজমে আক্রান্ত শিশুদের কোষ্ঠকাঠিন্য, ত্বকের সমস্যা দেখা যায়, পেট ফুলে যায়, এমনকি চেহারায় অস্বাভাবিকতা দেখা যায়। এই ধরনের লক্ষণ চেহারায় ফুটে ওঠা মানে মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি হয়ে গেছে। আর একটু বড় শিশুদের হাইপোথাইরয়েডিজমের সমস্যা হলে বৃদ্ধি ঠিকমতো হয় না, বয়ঃসন্ধি আসতে দেরি হয়।

শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি সম্পন্ন হওয়ার পরে থাইরয়েড সমস্যা হলে চিকিৎসা করার পর সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী কোনো ক্ষতি হয় না।  হাইপারথাইরয়েডিজমের ক্ষেত্রে উল্টোটা ঘটে। তখন থাইরয়েড গ্রন্থিটির কার্যকারিতা বা হরমোনের পরিমাণ বৃদ্ধির কারণে বিভিন্ন রকম শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে থাকে। হাইপারথাইরয়েডিজম অসুখটি সাধারণত বড়দের বেশি হয়। হাইপারথাইরয়েডিজমে আক্রান্ত বাচ্চারা ভীষণ অস্থিরতায় ভোগে। অর্থাৎ সব সময় ছটফট করতে থাকে, কারও কারও ঘন ঘন পায়খানা হয়, অতিরিক্ত ঘাম হয়। একটু বেশি বয়সী শিশু হলে বুক ধড়ফড়ানির কথা বলবে এবং এরা গরম সহ্য করতে পারে না। এই ক্ষেত্রে এন্টিথাইরয়েড ট্যাবলেট দিয়ে চিকিৎসা করা হয়।

হাইপো বা হাইপারথাইরয়েডিজমে আক্রান্ত শিশুদের সঠিক চিকিৎসা করা হলে অন্য সবার মতোই শারীরিক-মানসিক বৃদ্ধি অর্জন ও পরিপূর্ণ-সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব। তবে সমস্যা শুরু হওয়ার পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চিকিৎসা শুরু করে দেওয়া জরুরি। স্থায়ী ক্ষতি হওয়ার আগেই চিকিৎসা শুরু করতে হবে।

ডা. শাহজাদা সেলিম : হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ, সহযোগী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত