বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২০

দি ডিরেক্টর : অগোছালো চলচ্চিত্রের আরেক নাম!

আব্দুল্লাহ আল মামুন

কবি কামরুজ্জামান কামু’র ‘দি ডিরেক্টর’ মুভি দেখলাম।বুঝতে পারার পর থেকে অদ্যাবধি পর্যন্ত এমন অস্বস্তি নিয়ে কোন মুভি দেখা শুরু করিনি।’দি ডিরেক্টর’ মুভি দেখার আগে এ মুভি সম্পর্কে নানা ফিডব্যাক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পেয়েছি। কেউ কেউ বলেছেন,’আমার এমবি জলে ভেসে গেলো’,’ দু’ঘন্টা সময় অপচয় হলো’। আবার অনেকেই বলেছেন, ‘এমন ফাতরামি মুভি জীবনে দেখিনি’।নানা গালমন্দ, কুরুচিপূর্ণ ফিডব্যাক মাথায় রেখে মুভিটা দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।

বলা বাহুল্য, মুভিটা দেখার সময় খুঁজে পাচ্ছিলাম না। বিশেষ করে চেয়েছিলাম নিরিবিলি সময়। যে সময়টুকু শুধু একান্তই আমার। কারণ এমন মুভি দেখার জন্য সুনসান সময়ের’ই প্রয়োজন। যাই হোক অবশেষে সে মাহেন্দ্রক্ষণ আসল। আজ সকালে ঘুম থেকে জেগে ফ্রেশ হয়ে মুভিটা দেখা শুরু করলাম। মুভি শুরু হওয়ার পর থেকে শেষ হওয়া পর্যন্ত মস্তিস্ককে সম্পূর্ণ নিউট্রাল রাখলাম এবং মুভির ভিতরে যতদূর সম্ভব প্রবেশের চেষ্টা করলাম। মুভিটা কি সম্পর্কে এবং কামরুজ্জামান কামু’র মতো একজন কবি কেন হুট করে এমন মুভি বানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন প্রায় এক যুগ আগে তা বিলক্ষণ বোঝার চেষ্টা করলাম।

অবশেষে যা বুঝলাম তা হলো,’দি ডিরেক্টর ‘মুভিটা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাঁচের মুভি। একইসাথে থ্রিলার, রোমাঞ্চ, সাইকো ও অ্যাকশন ঘরানোর। বাংলাদেশে এমন ছবি নাই বললেই চলে। বাংলাদেশের মুভি নির্মিত হয় মূলত অ্যাকশন নির্ভর, নয় রোমাঞ্চকর নতুবা থ্রিলার টাইপের। একইসাথে এ তিনটিকে সমন্বিত করে মুভি পরিচালনা করা খুব দুরূহ। কবি কামরুজ্জামান কামু সেটি করে দেখিয়েছেন।

সবচেয়ে যেটি আকর্ষিত তা হলো, বাংলাদেশের সিনেমার ঘটনা মূলত দর্শকের মনকে রিড করে তৈরি করা হয়। যতটা না শিক্ষণের জন্য, তারচেয়ে বেশি মুনাফা লাভের জন্য। এক কথায় পরিচালক ও তাঁর সাথে সংশ্লিষ্ট সকলেই চায় একটা ব্যাবসাসফল ছবি। আর এজন্য এদেশে লুতুপুতু প্রেম, অ্যাকশন নির্ভর মুভি বা হালকা থ্রিলার গোছের মুভি দিনের পর দিন তৈরি হচ্ছে। এসকল মুভির চিত্রনাট্যের মান সম্পূর্ণ তলানিতে। নেহায়ত নামকরা নায়ক-নায়িকাদের দেখে দর্শকরা প্রেক্ষাগৃহে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হতাশ হয়।

বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সামাজিক নৈরাজ্যমূলক ঘটনাকে কেন্দ্র করে খুব কম মুভি তৈরি হয়। কারণ এ সকল মুভি তৈরিতে বাণিজ্যিক ঘাটতির সম্ভাবনা ব্যাপক। পরিচালক ও প্রযোজকরা ঝুঁকি নিতে চান না। বাংলাদেশের বাণিজ্যিক মুভিগুলো বহুলাংশে নকলে ভরা। স্বকীয়তা বলতে তেমন কিছু নেই। সম্প্রতি সাকিব খান পরিচালিত ‘পাসওয়ার্ড’ মুভির ক্ষেত্রে নকলের অভিযোগ আনা হয়েছে। বলা হচ্ছে,কোরিয়ান মুভি ‘টার্গেট’ থেকে নকল করা।

কবি কামরুজ্জামান কামু ও তাঁর পরিচালিত ‘দি ডিরেক্টর’ মুভি ছিলো এ ধারার সম্পূর্ণ বিপরীত।

আমরা কমবেশি সকলেই জানি, কবি-সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা এ দেশের সবচেয়ে অগ্রসর জনগোষ্ঠী। তাঁরা দেশ ও দশের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন। সমাজের নানা অসঙ্গতি,হঠকারিতা এমনকি শুভাশুভ বিষয় তুলির ছোঁয়া দিয়ে পরম মমতায় তুলে আনেন জনসমক্ষে।

কবি কামরুজ্জামান কামুও এটিও করেছেন ‘দি ডিরেক্টর ‘মুভির মাধ্যমে। সমসাময়িক বিশ্বে মোটামুটি ডিরেক্টরদের চরিত্র নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে! কখনো ধোঁয়াশা থেকে হালকা অগ্নি স্ফুলিঙ্গ বের হয়েছে। তখন আমরা তাঁদের চরিত্র সম্পর্কে সম্যক ধারণা পেয়েছি।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের উঠতি যুবতীদের মাঝে নায়িকা হওয়ার তীব্র বাসনা বিদ্যমান। সবাই চাই নিজেকে জনসম্মুখে পরিচিত করাতে। আর এ লক্ষ্যে যা যা করা দরকার তা করে থাকে। কখনো পরিচালকের রেডিমেড প্রেমিকা হয়ে অভিনয় করে, কখনো বিছানার সঙ্গী কখনো বা নিছক বিনোদন বা উপভোগ্যের উপকরণ। কামরুজ্জামান কামু পুরোপুরি না হলেও কতকটা অংশে ডিরেক্টরদের চরিত্র ও নায়িকাদের সাথে তাদের সম্পর্ককে চিত্রিত করেছেন তাঁর মুভিতে। যদিও অগোছালো গল্পে কখনও তা ম্লান মনে হয়েছে!

এবার সরাসরি মুভি সম্পর্কে আলোকপাত করা যাক। ‘দি ডিরেক্টর’ মুভিকে কখনো আমার মনে হয়েছে, কবিতার আলোকে সম্পূর্ণ বয়ান। যেন মুভি নয়; কবিতার আখ্যান। কবি কামরুজ্জামান কামু এক স্বতন্ত্র কাব্যিক চরিত্র। না প্রেমিক, না ডিরেক্টর, না সফল ক্রিমিনাল। কতকটা সিনেম্যাটিক টাইপের! সবকিছু মিলিয়ে তাঁর নিজের গল্প বলেছেন নিজস্ব ঢং-এ। যা শুধু একান্ত নিজেরই।যার অধিকর্তা তিনি নিজেই।

মুভির গানগুলো ছিলো বেশ আকর্ষণীয়। মুভির সঙ্গেও যথেষ্ট মানানসই। যেমন-আইটেম গান ‘আমি তোমার ডিরেক্টর তুমি হিরোইন আমার সাথে অ্যাক্টিং তুমি কইরো চিরদিন’। এটা যুব সমাজকে বেশ আকর্ষিত করবে। কারণ যুবসমাজ ইতোমধ্যে এগুলোতে বেশ অভ্যস্ত। তাছাড়া মারজুক-পপির জুটিও ছিলো বেশ রোমাঞ্চকর! আর লোকেশন বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও দারুণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন পরিচালক।

এছাড়া সিনেমাটিতে এমন মুহূর্তেরও রোমান্থন করা হয়েছে যা মানুশকে সহজে আবেগতাড়িত করে। স্মৃতি মানসপটে উজ্জ্বল হয়ে ধরা দেয়। যখন আমরা দেখি কেন্দ্রীয় চরিত্র কামরুজ্জামান কামু গাছের গায়ে চাবির রিং-এর চাকু দিয়ে লিখে ‘কামু+পূর্ণি’ তখন প্রেমের স্মৃতি মনে পড়ে যায়। অতীত কেন বর্তমানেও হাতে কলম বা কাঠি থাকলে মাটিতে বা খাতায় কত শতবার মনের অজান্তেই প্রেমিকার নাম লিখে ফেলি।

সিনেমাটিকে কখনো আবার ছেলেমানুষি বলে মনে হয়েছে! মনে হয়েছে কামরুজ্জামান কামু নিছক দর্শকদের সাথে ছেলেমানুষি করার জন্য অভিনয় করেছেন। যখন তিনি আবেগ তাড়িত হয়ে বলেন,’আমি তোমাকে বিয়ে করবো পূর্ণিমা’। কখনো আবার রোমান্টিক অথচ হাবাগোবা প্রেমিকের মতন চিরচেনা হাসি দিয়ে কচুরিপানা কুড়িয়ে প্রেমিকার আচলে জড়ো করেন।

আবার কখনো বিয়োগ বেদনায় হৃদয়ও ছুৃঁয়ে গেছে। যখন কবির কণ্ঠে শুনি, হাতের উপর হাতের পরশ রবে না। আমার বন্ধু আমার হবে না। হবে না…..!

সর্বোপরী ছবিটিকে অতুলনীয় মনে হয়েছে। গড়পড়তা মানের ছবির সাথে এ ছবির যোগসাজশ নেই। গন্ডিবদ্ধ কোটর থেকে কবি সিনেমাকে বের করতে মূলত এ ছবিটি নির্মাণ করেছেন। ছবিটিকে সাধারণ দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। কারণ তাঁরা তাদের গন্ডির বাহিরে এসে তেমন কিছু ভাবতে পারেন না। বিশেষত আমাদের ব্লাড ব্যাঙ্কে দু’নম্বর মিশে গেছে। স্বভাবতই ভালো কিছু গ্রহণ করতে পারি না।

তার মানে এই নয় যে, কবি কামরুজ্জামান কামু অতি নিখুঁতভাবে ছবি তৈরি করেছেন। অবশ্যই না। ছবি পরিচালনায় থাকতে হয় আবেগের সাথে পেশাদারিত্ব। কবির যথেষ্ট আবেগ থাকলেও পেশাদারিত্বের অভাব ছিলো। এটার ছাপ ছবির সর্বত্রে। তারপরেও তিনি যে নতুনত্ব আনতে চেয়েছেন চলচ্চিত্রে এটিকে স্বাগত জানাই। আশা করি পরবর্তীতে তিনি ছবি তৈরি করলে আপাদমস্তক চিন্তা ভাবনা করে ছবি তৈরি করবেন। আর কেন্দ্রীয় চরিত্রের ক্ষেত্রে প্রফেশনাল কাউকে নির্বাচন করবেন।

সবশেষে আপাতত সিনেমার পোকাদের বলবো যারা সিনেমায় নতুনত্ব খুঁজেন তাঁরা ছবিটি দেখতে পারেন। হতাশ হবেন না। আপনারা জীবনে তো অনেক অনেক সময় নষ্ট করেছেন। কবি’র জন্য যাক না আরো দু’ঘন্টা সময়!

মিরপুর-১২, ২০ জুন ২০১৯


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত