রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১

দুনিয়া কাঁপানো ফরাসি বিপ্লব

মানব সভ্যতার পরতে পরতে যুদ্ধ আর বিপ্লবের আগুন ছড়িয়ে আছে। উত্থান আর পতনের গল্প কখনো রোমাঞ্চময় হয়েছে, কখনো হয়েছে বিষাদময়। ফরাসি বিপ্লব শুধু ফ্রান্স নয়, গোটা ইউরোপের চিত্র বদলে দিয়েছিল। মানুষের চিন্তার জগৎ আলোড়িত হয়েছিল। রাজতন্ত্রের পতন হয়েছিল। ফরাসি বিপ্লব গোটা মানব সভ্যতাকে নতুনভাবে লিখতে ভুমিকা রেখেছে। ফরাসি বিপ্লবের মূলমন্ত্র ছিল সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা। উনিশ শতকে ফ্রান্স ছাড়িয়ে সারা ইউরোপে নতুন ভাবধারার সূচনা করেছিল এই বিপ্লব। ইতিহাসের দিকে তাকালে ফিরে যেতে হবে ১৪ জুলাই ১৭৮৯ সালে। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস সেদিন উত্তপ্ত শ্রমিক, কারিগর, গ্রাম ও শহরের গরিব মানুষের খাদ্যের দাবিতে। এ শুধু নিছকই দাঙ্গা-হাঙ্গামা নয়। প্যারিসের সর্বত্র চলছিল বিক্ষোভ মিছিল। জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য রাজার নির্দেশে মিছিলের ওপর অশ্বারোহী বাহিনী চালিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু প্যারিসের সামরিক অধিনায়ক সসৈন্যে সরে দাঁড়ালে রাজধানীর নিয়ন্ত্রণ জনতার হাতে চলে যায়। রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড দেওয়া হয়। লুট করা হয় আগ্নেয়াস্ত্রের দোকান। উত্তেজিত জনতা আরও বেশি আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহের উদ্দেশে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের প্রতীক বাস্তিল কারাদুর্গে আক্রমণ করে। উন্মত্ত জনতা কারাগারের বন্দীদের মুক্ত করে এবং কারাগারের অধিকর্তা দ্যলুনেকে হত্যা করে। ফ্রান্সের রাজা ষোড়শ লুই এ খবর পেয়ে এক সহচরের কাছে এমন অভিমত প্রকাশ করেন, দ্যাট ইজ এ রিভোল্ট।’ সহচরটি প্রত্যুত্তরে বলেন, স্যার, ইট ইজ নট এ রিভোল্ট, ইট ইজ এ রেভল্যুশন। প্রশ্ন জাগতে পারে, কেন আপামর খেটেখাওয়া মানুষগুলো রাজার বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছিল। ফরাসি রাজতন্ত্র ছিল নিরঙ্কুশ স্বৈরাচারী। রাজার ক্ষমতাবেশি স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে এবং তা দিন দিন বাড়তে থাকে। রাজা নিজেকে ঈশ্বর প্রদত্ত ডিভাইন রাইট অব মনারকির প্রতিভু বলে মনে করতেন। রাজা ষোড়শ লুই বলতেন, সার্বভৌম ক্ষমতা আমার ওপর ন্যস্ত, সব আইন প্রণয়নের ক্ষমতাও আমার। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান রাজার সমালোচনা করলে তাকে গোপন পরোয়ানার আইনে গ্রেফতার করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো। তবে রাজা চতুর্দশলুই-এর শাসনামলের শেষ ভাগে রাজতন্ত্রের স্বেচ্ছাচারিতা চরমে পৌঁছে গিয়েছিল। এরপর রাজা পঞ্চদশ লুই রাজকার্য পরিচালনার পরিবর্তে বিলাস-ব্যসনেই ব্যস্ত ছিলেন। পঞ্চদশ লুই-এর পরে রাজা  ষোড়শ লুই সিংহাসনে বসে প্রশাসনকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আদৌ তিনি পূর্বসূরিদের পদাঙ্ক ছাড়তে পারেননি। একসময় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সমানুপতিক হারে আয় বৃদ্ধি না হওয়ায় তাদের আর্থিক সংকট প্রবল আকার ধারণ করে। ফলে কৃষক ও শ্রমিকরা ক্রমেই বিপ্লবমুখী হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচণ্ড বৈষম্য ছিল। এই বৈষম্যের কারণে শ্রেণিগত বিদ্বেষের সূচনা। ত্রুটিপূর্ণকরনীতি ছাড়াও মুদ্রাস্ফীতির পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। স্বেচ্ছাচারিতা আকাশ ছুঁয়েছিল। ফরাসি রাজতন্ত্র জনমানুষের জীবনকে দুরূহ করে তুলেছিল। বেঁচে থাকাই ছিল তাদের সংগ্রাম। পেটে ক্ষুধার জ্বালা নিয়ে সামান্য আয়ে যখন মিলছিল না খাবার তখন রাজপথে নেমে এসেছিল তারা। উল্টো দৃশ্য তখন রাজপ্রাসাদে। রাজপরিবার যেন ছিল গোটা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন। সাধারণ মানুষের হাহাকার আর ক্ষুধার যন্ত্রণা তাদের স্পর্শও করতে পারেনি। ভার্সাই রাজপ্রাসাদ তখন যেন ঐশ্বর্যের ইন্দ্রপুরী। ১৮ হাজার কর্মচারী রাজপরিবারের সেবায় সর্বদা নিযুক্ত থাকত। সভাসদদের মধ্যে কোটি কোটি মুদ্রা পুরস্কার হিসেবে বিতরণ করা হতো। কয়েকটি হিসাব পাওয়া যায় যেখানে দাবি করা হয়, ১৭৮৯ সালে ভার্সাই রাজপ্রাসাদে বিলাসী কর্মকাণ্ডে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছিল। রাজা, রানী ও তাদের সন্তান-সন্ততি এবং অগণিত আত্মীয়স্বজন সবার জন্য পৃথক পৃথক সুরম্য অট্টালিকা ছিল। এক হিসাবে বলা হয়, রানী মেরি অ্যান্টয়নেটের নিজস্ব সহচরীর সংখ্যা ছিল ৫০০। রাজা, রানী, রাজকুমার ও রাজকুমারীদের প্রমোদভ্রমণের জন্য রাজদরবারে প্রায় দুই হাজার ঘোড়া ও ২০০ অশ্বশকট সব সময়ের জন্য প্রস্তুত থাকত। এসব বিষয় ফরাসি জনগণের মধ্যে দারুণ ক্ষোভের সঞ্চার করেছিল। অবস্থা এমন হয়েছিল যে, ৫ অক্টোবর প্যারিস থেকে মহিলাদের ভুখামিছিল বা হাঙ্গার মার্চ অব দ্য ওমেন ভার্সাই রাজপ্রাসাদের কাছে পৌঁছে রুটির দাম কমানোর দাবি জানায়। তখন রানী মেরি অ্যান্টয়নেট অবাক হয়ে মিছিলের দিকে তাকিয়ে জানতে চান, এরা কী চায়? তার সহচরী উত্তর দেন, এরা রুটির দাম কমাতে বলছে, রুটি চায়। রানী অবাক হয়ে বললেন, রুটি কেন? এরা কেক খেতে পারে না! প্রকৃতপক্ষে রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরে বিলাস ব্যসনে জীবনযাপন করে রানী অ্যান্টয়নেট নিজ দেশের সাধারণ মানুষের জীবন সম্পর্কে কিছুই জানতে পারেননি। ১৭৮৯ সালের হিসাবে ফ্রান্সের ৮৫ শতাংশ মানুষ গ্রামাঞ্চলে থাকত। তার মধ্যে প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ ছিল কৃষক। অথচ চাষযোগ্য জমির অধিকাংশ ছিল গির্জা ও সামন্তপ্রভুদের হাতে- প্রায় ৩০ শতাংশ। যদিও তারা ছিল জনসংখ্যার মাত্র ২ ভাগ। এ ছাড়া বিপ্লবের সময়টাতে ফ্রান্সে প্রায় ১০ লাখের মতো ভুমিদাস ছিল। মাঝেই মাঝেই দেখা দিত অজন্মা। একজন ইতিহাসবিদ লিখেছিলেন, ফ্রান্সে ৯ দশমাংশ লোক অনাহারে মারা যায়, আর এক দশমাংশ মরে অতি ভোজনের ফলে। এ ছাড়া ছিল কর বা খাজনার জন্য নির্যাতন। সাধারণ মানুষকে রাজার আরোপ করা কর, গির্জা কর্তৃক আরোপ করা কর, ভুস্বামী বা জমিদারদের আরোপ করা কর দিতে হতো। আইনও ছিল গরিবের বিপক্ষে। তাদের বিচার করার সময় সাক্ষ্য-প্রমাণ নিয়ে ততটা মাথা ঘামানো হতো না। সব মিলিয়ে জ্বলে ওঠে বিপ্লবের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। ফরাসি বিপ্লবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ভার্সালিসে নারী সম্মেলন। ১৭৮৯ সালের ১ থেকে ৫ অক্টোবরের মধ্যবর্তী সময়ে প্রায় ৭ হাজার নারী ভার্সালিসে বিভিন্ন দাবিতে সম্মেলন করেন। এ সম্মেলনের মাধ্যমে তারা বিদ্রোহীদের আন্দোলনের সঙ্গে ঐকমত্য প্রকাশ করেন। এতে বিপ্লবের গতি অনেক বেগবান হয়। ষোড়শ লুই ও তার স্ত্রী মারি অ্যান্তনে। ফরাসি বিপ্লবের ট্র্যাজেডি তাদের ঘিরেই। রাজা ও রানীর স্বৈরাচারিতা, বিলাসিতা ও রাষ্ট্র পরিচালনায় দুর্নীতি পুরো রাজপরিবারকে সাধারণ জনগণের প্রতিপক্ষ করে তোলে। আন্দোলন দানা বাঁধে। বিদ্রোহীদের কাছে শেষ পর্যন্ত বন্দী অবস্থায় উপনীত হন রাজা ষোড়শ লুই। ক্ষমতা হারানোর সুবাস পেতে শুরু করেন। আন্দোলনকারীদের কাছে কার্যত বন্দী রাজা ষোড়শ লুইয়ের বিচার শুরু হয়। ১৭৯৩ সালের ২১ জানুয়ারি শতসহস্র জনতার সম্মুখে রাজা ষোড়শ লুইসকে গিলোটিনে শিরোচ্ছেদ করা হয়। তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সময় আয়োজিত ভোটে ৩৬১ জন মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে এবং ২৮৮ জন বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। অন্যদিকে তার স্ত্রীকেও বিচারের মুখোমুখি হতে হয়। ফ্রান্সের কুইন মারি অ্যান্তনের বিলাসিতার জন্য অনেকেই অপছন্দ করতেন। এ ছাড়া দুর্নীতির কলকাঠি আড়ালে থেকে তিনিই নাড়তেন বলে জনগণের অভিযোগ ছিল। বিচারের পর ১৬ অক্টোবর রানীর ক্ষেত্রেও একই শাস্তি কার্যকর করা হয়।


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত