শনিবার, ৩০ মে ২০২০

ধস নেমে এসেছে দেশের পাইকারি কাপড়ের ব্যবসায়

করোনাভাইরাস দীর্ঘায়িত হলে তা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক হতে পারে মন্তব্য করে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, আমাদের বড় দুশ্চিন্তা তৈরী পোশাক শিল্প নিয়ে। তবে এ মুহূর্তে কিছু বলা ঠিক হবে না কারণ, তথ্যের অনেক ঘাটতি রয়েছে। আরো কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে। কী করব তা সময় বলে দেবে।

এদিকে আজ থেকে বিভিন্ন মার্কেট খুললেও ক্রেতা নেই। প্রায় দেড় মাস ধরে বেচাকেনা না থাকায় ধস নেমে এসেছে দেশের পাইকারি কাপড়ের মোকামগুলোতে। তাছাড়া গত তিন-চার বছর ধরেই তুলনামূলক কম ব্যবসা হচ্ছিল এই খাতে। এবার তা হুমকির মুখে।

করোনার কারণে প্রায় ছয় সপ্তাহ ধরে পাইকারি ক্রেতারা আসতে না পারায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বর্তমানে হাটের সাপ্তাহিক লেনদেন কমেছে ৯৫ শতাংশের মতো।

আজ কয়েকটি মার্কেটে গিয়ে অল্পসংখ্যক মানুষের চলাচল আর দুই-একজন ক্রেতার উপস্থিতি দেখা গেছে। যানজট, পণ্য ওঠানো-নামানো, ক্রেতার ভিড়, বিক্রেতার ব্যস্ততা এসব মিলে বাজারের চিরচেনা যে রূপ তার ছিটেফোঁটাও যেন নেই। বিক্রেতাদের কেউ ঘুমাচ্ছেন, কেউ সংবাদপত্র পড়ছেন, আবার কেউ আড্ডা দিয়ে সময় কাটাচ্ছেন।

পাইকারি বাজারে কাপড়ের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় কারখানার মালিকেরা উৎপাদিত শাড়ি, লুঙ্গি ও গ্রে কাপড় বিক্রি করতে পারছেন না। উৎপাদিত কাপড় জমতে জমতে মালিকদের গুদাম ভর্তি হয়ে গেছে। পাইকারি ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ছোট কারখানা মালিকের গুদাম কাপড়ের মজুদ উপচে পড়ার মতো। পাইকারি ক্রেতারা কাপড় ক্রয় করতে হাটে আসছেন না। শত শত পাওয়ারলুম কারখানা মালিক উৎপাদিত কোটি কোটি টাকার মজুদ কাপড় নিয়ে বিপাকে পড়েছেন।

গত প্রায় দেড় মাস তাঁত প্রধান এলাকা সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, পাইকারি বাজারে কাপড়ের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় কারখানার মালিকেরা উৎপাদিত শাড়ি, লুঙ্গি ও গ্রে কাপড় বিক্রি করতে পারছেন না। উৎপাদিত কাপড় জমতে জমতে মালিকদের গুদাম ভর্তি হয়ে গেছে। পাইকারি ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ছোট কারখানা মালিকের গুদাম কাপড়ের মজুদ উপচে পড়ার মতো। পাইকারি ক্রেতারা কাপড় ক্রয় করতে হাটে আসছেন না। শত শত পাওয়ারলুম কারখানা মালিক উৎপাদিত কোটি কোটি টাকার মজুদ কাপড় নিয়ে বিপাকে পড়েছেন।

কারখানা মালিকেরা জানান, দেশের বাজারে কাপড় বিক্রি একেবারেই কমে গেছে। পাবনার আতাইকুলা, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, এনায়েতপুর, টাঙ্গাইলের করোটিয়া ও নরসিংদীর বাবুরহাটে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১০০০ কোটি টাকার কাপড় বেচাকেনা হতো। যা বর্তমানে নেই। এ ছাড়া প্রতি সপ্তাহে ভারতে প্রায় ৫০ কোটি টাকার শাড়ি, লুঙ্গি ও গ্রে কাপড় রফতানি হতো। ভারতের বাজারে চাহিদা কয়েক বছর ধরে কমে যাওয়ায় কাপড়ের রফতানি ও দাম কমে গেছে।

সবচেয়ে বেশি কমেছে গ্রে কাপড়ের দাম। এই কাপড়ের দাম উৎপাদন খরচের নিচে নেমে গেছে। এক গজ গ্রে কাপড় উৎপাদন ব্যয় হয় ২২ টাকা। বর্তমানে এক গজ কাপড় বিক্রি হচ্ছে ২১ টাকা কিংবা তার চেয়ে কম দামে। দুই হাত বহরের ৪০ পপলিন গ্রে কাপড়ের পূর্ববর্তী মূল্য ছিল প্রতি গজ ৩০ টাকা। বর্তমানে তা ২৬ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আড়াই হাত বহরের ভয়েল কাপড় প্রতি গজ বিক্রি হয়েছে ২৪ টাকা দরে। বর্তমানে তা কমে বিক্রি হচ্ছে ২১ টাকা দরে। টিসি কাপড় প্রতি গজের মূল্য ছিল ৩৪ টাকা। এখন তা কমে বিক্রি হচ্ছে ২৯ টাকা দরে। টিসির নি¤œমানের প্রতি গজ কাপড় বিক্রি হচ্ছে ২৬ টাকা করে। অথচ আগে বিক্রি হতো ৩০ টাকা দরে। ১০০ সানার ৪৪ টাকার টিসি কাপড় বিক্রি হচ্ছে ৩৭ টাকা। ৬৮ সানার টিসি কাপড় বিক্রি হতো ২৭ টাকা এখন বিক্রি হচ্ছে ২৩ টাকা। একই অবস্থায় পড়েছেন লুঙ্গি ও শাড়ি উৎপাদকেরা। প্রতি থান লুঙ্গি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা এবং শাড়ি প্রতি পিসে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা কম দামে বিক্রি হচ্ছে বলে কারখানা মালিকেরা জানিয়েছেন।

টিসি কাপড় উৎপাদক মালিকেরা জানিয়েছেন, টিসি কাপড়ের মূল ক্রেতা ইসলামপুরের পাইকারি ব্যবসায়ীরা। এসব পাইকারি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কাপড় কিনে নেয় বিভিন্ন গার্মেন্ট ও বায়িং হাউজের মালিক। বর্তমানে ইসলামপুরের পাইকারি ব্যবসায়ীদের গুদামে কোটি কোটি গজ কাপড় মজুদ হয়ে পড়ে রয়েছে। গার্মেন্ট ও বায়িং হাউজের মালিকেরা কাপড় নিচ্ছেন না।

আমদানিকারকেরা জানিয়েছেন, রানা প্লাজায় ধসের পর থেকে গার্মেন্ট কাপড়ের বৈদেশিক বাজার সঙ্কুচিত হয়ে পড়ায় গার্মেন্ট সেক্টরে সৃষ্ট মন্দার প্রভাব পড়েছে।

তারা জানিয়েছেন, গত তিন-চার মাসে উৎপাদিত কাপড় বিক্রি করতে না পেরে কারখানা মালিকেরা ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছেন। ব্যাংক থেকে ঋণ তুলে শ্রমিকদের বেতন দিতে হচ্ছে। আবার সঠিক সময়ে ব্যাংকের সুদের টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। ছোট কারখানার স্বল্প পুঁজির মালিকদের ঋণ রি-সাইকিং প্রক্রিয়ায় বাধার সৃষ্টি হওয়ায় অনেক মালিক বাজার ব্যবস্থা থেকে ছিটকে পড়েছেন। এ অবস্থায় ছোট ছোট কারখানার মালিকেরা মহা বিপদে পড়েছেন। ইতোমধ্যে অনেকেই কারখানায় উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছেন। বেকার হয়ে পড়েছে কয়েক হাজার শ্রমিক।

কারখানার মালিক ও শ্রমিকেরা জানিয়েছেন, বর্তমান মন্দাভাব অব্যাহত থাকলে এই সেক্টরে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে। হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বে। এতে অর্থনৈতিকসহ সামাজিক সমস্যাও সৃষ্টি হতে পারে।


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত