শনিবার, ১৭ আগস্ট ২০১৯

নার্গিসের সাথে নজরুলের বিয়ে কি হয়েছিল?

নার্গিস খানম। ১৯২১ সালে তাঁর সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের বিবাহ ধার্য হয় কুমিল্লায়। কোনও কোনও ঐতিহাসিক বলেন, বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল; আবার কারোর মতে, হয়নি। বিয়ের পরে শ্বশুরবাড়ি থাকার প্রস্তাব  শুনে ক্ষুব্ধ হন ব্যক্তিত্ববান নজরুল এবং কুমিল্লা ছেড়ে চলে যান। ফিরে আসেন কলকাতায়। এরপর দীর্ঘ ষোলো বছর নজরুলের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না নার্গিসের। ১৯৩৭/৩৮ সালে, নজরুল নার্গিসের একটি চিঠির জবাবে লেখেন বিখ্যাত সেই গান – ‘যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পারো নাই’

বাংলা ১৩২৭ সালের ২৩ চৈত্র হতে ১৩২৮ সালের ৪ আষাঢ় পর্যন্ত কবি নজরুল ইসলাম দৌলতপুরে আলী আকবর খানের বাড়িতে অবস্থান করেন। বর্তমানে দৌলতপুরে আলী আকবর খানের বাড়িতে সে আলিশান অট্টালিকা দেখা যায় তখন এই আলিশান অট্টালিকা ছিল না। কয়েকটি ঘর ছিল মাত্র। নজরুলকে পুকুরের ধার ঘেঁষে একটি ঘরে থাকতে দেয়া হয়েছিল। এখন সেখানে একটি রান্নাঘর আছে। নজরুল দিনের বেশ কিছু সময়ই বাড়ির ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের সঙ্গে হৈ চৈ করে কাটাতেন। বেশ কিছু সময় ব্যয় করতেন পুকুরে সাঁতার কেটে ও বাঁশি বাজিয়ে। আলী আকবর খানের ভাতিজা ওয়াজেদ আলী খান ছিলেন সমবায়ের জেলা হিসাব নিরীক্ষক। তিনি প্রাবন্ধিক ও নজরুল গবেষক তিতাশ চৌধুরীকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন।

তার সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, ‘নজরুল যে দিন আমাদের বাড়িতে আসেন, এর পরদিন তাকে নিয়ে আমার চাচা মুনশি বাড়িতে যান। ঐ বাড়িতে আমার চাচার এক বোনকে বিয়ে দিয়েছিলেন। সে সুবাদে তিনি বোনকে দেখতে গিয়েছিলেন। কাজী নজরুল ইসলামকেও সঙ্গে নিয়ে যায়। সেখানেই নার্গিসের সঙ্গে নজরুলের প্রথম দেখা হয়। অবশ্য নার্গিসের পূর্বনাম সৈয়দা খাতুন। মা আসমাতুন্নেসা এবং বাবা মুনশী আবদুল জববার। আমরা সবাই ছবি বলে ডাকতাম। ‘নার্গিস’ নজরুল প্রদত্ত নাম। এর দিন দু’ এক পরই নার্গিস আমার এক ভাইয়ের বিয়ে উপলক্ষে আমাদের বাড়িতে আসে। এখানে অনেকদিন থাকে।

নজরুল-নার্গিসের প্রথম সাক্ষাৎকার সম্পর্কে আলী আকবর খান বলেন, ‘১৩২৮-এর ২২ বৈশাখ আমার বড় ভাই নেজাবত আলী খানের একমাত্র সন্তান আম্বিয়ার বিয়ে হয়েছিল আমাদের ভাগনে আবদুল জববারের সঙ্গে। সেই বিবাহ অনুষ্ঠানেই আমাদের ভাগ্নি সৈয়দাও এসেছিল। নজরুল প্রথম দর্শনেই ওকে ভালবেসে ফেলে, সৈয়দাও। ঐ বিয়ে অনুষ্ঠানে সৈয়দা গান গেয়েছিলেন। তিনি অসামান্য সুন্দরী ও সুকণ্ঠের অধিকারী ছিলেন।

প্রথম দর্শনেই নজরুল নার্গিসের প্রেমে পড়ে যান। এই প্রসঙ্গে বন্ধু পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের নিকট নজরুলের লেখা চিঠি থেকে জানা যায়, ‘এক অচেনা পল্লী বালিকার কাছে এত বিব্রত আর অসাবধান হয়ে পড়েছি, যা কোন নারীর কাছে কখনও হয়নি। কবি হাফিজের প্রিয় ফুল নার্গিসের নামে তিনি সৈয়দার নতুন নামকরণ করেন ‘নার্গিস’। নজরুল নার্গিসের প্রেম কাহিনী সুদূর কলকাতার নজরুল বন্ধুদের কানেও পৌঁছে যায়। এ প্রসঙ্গে নজরুলকে লেখা সাহিত্যিক মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর একটি চিঠির অংশ ‘নিভৃত পল্লীর যে কুটির বাসিনীর (দৌলতপুরের দৌলতখানার শাহজাদী বলাই বোধহয় ঠিক না?) সাথে আপনার মনের মিল ও জীবনের যোগ হয়ে গেছে, তাকে আমার শ্রদ্ধা ও প্রীতিপূর্ণ আদাব জানাবেন।’

নার্গিস বিষয়টি এভাবে উল্লেখ করেন : ‘প্রথম দেখার পর থেকে কখন যে কিভাবে দু’জন দু’জনকে ভালবাসে ফেলেছিলাম। নজরুলতো আমাকে নিয়ে দৌলতপুরেই অনেকগুলো গান ও কবিতা লিখেছিল। আমাকে এক নজর না দেখলেও মনমরা হয়ে যেত।’ (দৈনিক সংগ্রাম-৩০ মে, ১৯৮২) এ সম্পর্কে কমরেড মুজফফর আহমদের কথায় খুব একটা তফাৎ নেই।’

ছবি – শেষ বয়সে নার্গিস

প্রথম পরিচয়ের পরে এই মেয়েটির সঙ্গে নজরুলের ঘনিষ্ঠতা বেড়ে যায়। নজরুল তাকে নিশ্চয়ই ভালবেসেছিল।’ নজরুল সুহৃদ সুলতান মাহমুদ মজুমদারের লেখনিতেও একই সুর বেজে উঠেছে। ‘নার্গিসকে নজরুলতো প্রায় দু’ মাসের মতো সময় নিজের মনের মাধুরী দিয়ে রচনা করেছিলেন….. নজরুল নার্গিসকে আবিস্কার করেছেন তিল তিল করে। সৃষ্টি করেছেন পলে পলে নিকটতম সান্নিধ্যের দ্বারা। নার্গিস তাকে বরণ করে নিয়েছিলেন পুণ্য প্রেমের অভিষেকে।’ কবিও নার্গিসের প্রতি এত অনুরক্ত ছিলেন যা তার লেখনিতে বার বার ফুটে উঠেছে। ‘দোলন চাঁপা’ কাব্যের ‘সমর্পণ’ কবিতায় কবি প্রিয়তমার নিকট নিজেকে এভাবে সমর্পণ করেছিলেন : প্রিয়! ‘এবার আমায় সঁপে দিলাম তোমার চরণ-তলে। তুমি শুধু মুখ তুলে চাও, বলুক যে যা বলে।’ সৈয়দার (নার্গিস) পিতা পূর্বেই ইন্তেকাল করেছিলেন। পিতৃহীন এই মেয়েটিকে মামা অতি আদর-যত্নে গড়ে তুলেন। নজরুলের সাথে ভাগ্নিকে বিয়ে দিতে তারা প্রথমে রাজি ছিলেন না। পরবর্তীতে নজরুলের জেদ এবং যে কোন মূল্যে সৈয়দাকে পাওয়ার আগ্রহের কারণে নজরুলের সাথে সৈয়দাকে বিয়ে দিতে তারা বাধ্য হন। ১৩২৮ সালের ৩ আষাড় শুক্রবার ১৭ জুন ১৯২১ নজরুল ও নার্গিসের বিয়ের দিন ধার্য করা হয়। সপ্তাহখানিক পূর্বে আলী আকবর খান কুমিল্লায় অবস্থানরত সেন পরিবারকে বিয়ের দাওয়াত কার্ড পৌঁছে দেন।

মুজাফফর আহমদ লিখেছেন, বিয়ের দেনমোহর ধার্য করা হয় ২৫ হাজার টাকা। বিয়ে প্রসঙ্গে নজরুলের বিয়ের সাক্ষী ওয়াজেদ আলী বলেন : আমার চাচাতো বোন নার্গিসকে দেখে নজরুল মুগ্ধ হয়ে যান। খুব ধুমধাম করে তাদের বিয়ে দেয়া হয়। বিয়েতে রামচন্দ্রপুরের তুফানী বাদ্যদল এলো। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে এলো শাহাবুদ্দিনের দল। কুমিল্লা থেকে এলো প্রমীলা আর বিরজা সুন্দরীরা। বিয়ের পর কলকাতা গিয়ে সংসার করার মতো আর্থিক সঙ্গতি নেই বলে কবিকে কুমিল্লা রাখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু প্রমীলার মা গিরিবালা দেবী এবং চাচী বিরজা সুন্দরী দেবী কবিকে এই বলে বোঝাতে থাকেন যে তাঁকে তারা ঘরজামাই করে রাখবে এবং তাদের ইচ্ছায় তাকে চলতে হবে। সেন পরিবারের পরামর্শে কবি বিয়ের পরদিন সকালে সকলের অনুরোধ উপেক্ষা করে চিরদিনের জন্য দৌলতপুর থেকে চলে যান।

নজরুল জীবন ও সাহিত্যের অন্যতম গ্রন্থকার ড. রফিকুল ইসলাম তাঁর নজরুল-জীবনী গ্রন্থে লিখেছেন, ‘কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে যে সৈয়দা খাতুন ওরফে নার্গিস বেগমের বিয়ে হয়নি এই সম্বন্ধে আমি স্থির নিশ্চিত হয়েছি। ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের বাসা হতে যে ক’জন নিমন্ত্রিত দৌলতপুরে গিয়েছিলেন তাঁদের ভিতরে সন্তোষকুমার সেন নামক পনেরো ষোলো বছর বয়স্ক একজন কিশোর ছিল। তার কথার্বাতা বোঝার ও মনে রাখার বয়স হয়েছিল। ঘটনা মিলিয়ে নেয়ার জন্য আমি তাকে গত ক’বছর খুঁজছিলাম। অবশেষে সন্তোষের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। সে ভারত গভর্নমেন্টের একজন গেজেটেড অফিসার ছিল। এখন অবসর গ্রহণ করেছে। তার দেওয়া তথ্য হতে বোঝা যাচ্ছে যে আলী আকবর খানও বিয়ে ভেঙ্গে দিতে চেয়েছিলেন। তাঁর মুসাবিদা করা কাবিননামায় একটি শর্ত এই ছিল যে কাজী নজরুল ইসলাম দৌলতপুর গ্রামে এসে নার্গিস বেগমের সঙ্গে বাস করতে পারবে, কিন্তু নার্গিস বেগমকে অন্য কোথাও সে নিয়ে যেতে পারবে না। এই শর্ত নজরুল ইসলামের পৌরুষে বেধেছিল। তাই সে বিয়ে না করে বিয়ের মজলিস হতে উঠে রাত্রেই হেঁটে সে কুমিল্লা চলে গেল।’ (পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত সংস্কারণ, একুশে গ্রন্থমেলা, ২০১৫. নজরুল ইনস্টিটিউট, পৃষ্ঠা সংখ্যা-১৩৩)


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

error: Content is protected !!