শুক্রবার, ২৯ অক্টোবর ২০২১

নিজেকে বড় আর বিশেষ মনে করা একটা মানসিক রোগ

অনেকেই হয়তো জানেন না, নিজেকে বড় আর বিশেষ মনে করা একটা মানসিক রোগ। ইংরেজিতে এই রোগকে Narcissistic Personality Disorder আর বাংলায় আত্মমুগ্ধতাসূচক ব্যক্তিত্ব ব্যাধি বলা হয়ে থাকে। সংক্ষেপে এটাকে NPD বলে। যিনি এ রোগে আক্রান্ত হন, তিনি তা বুঝতে পারেন না। কিন্তু তিনি যাদের সাথে নিজেকে বিশেষ বলার আচরণ করতে থাকে, তারা আস্তে আস্তে তা বুঝতে পারে। শুরুর দিকে কম থাকলেও ধীরে ধীরে এটি বাড়তে থাকে। এক সময় আশেপাশের অনেকেই বিরক্ত হয়। আপনার পরিবারের কেউ এ রোগে আক্রান্ত হলে শুরুর দিকে তাকে মনোরোগ ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান।

NPD এর লক্ষণ সমূহ:

১। আক্রান্ত ব্যাক্তি নিজেকে অন্যদের চেয়ে অনেক বড় মনে করে। নিজের মধ্যে এতটাই আত্মবিশ্বাস জন্মে যায় যে কারো কোন পরামর্শ বা বুদ্ধি তার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয় না। এখানে নিজেকে তিনি সেরা মনে করে। পরিবারের, আশেপাশের মানুষ এবং আত্নীয়দের মধ্যে নিজেকে সেরা প্রমাণ করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে।

২। অন্যদের কাছ থেকে সম্মান ও আনুগত্য পাবার ঝোঁক বাড়তে থাকে। সবসময় সবার থেকে আলাদা একটা সম্মান বা আনুগত্য পাবার একটা প্রবল ইচ্ছে থাকে সব সময়। আক্রান্ত ব্যাক্তি নিজেকে সবার থেকে আলাদা এবং শ্রেষ্ট মনে করে। অন্যদের তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে।

৩। নিজের অর্জন এবং প্রতিভাকে অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করে।

৪। বিশাল সাফল্য, শক্তি, প্রতিভা, সৌন্দর্য বা প্রেমের কল্পনায় আচ্ছন্ন থাকে।

৫। নিজেকে ‘বিশেষ’ ও অনন্য ভাবে এবং শুধু অন্য ‘বিশেষ’ মানুষরা তাকে বুঝতে পারে অথবা তাদের সাথেই তার মেশা উচিত বলে বিশ্বাস করে।

৬। আক্রান্ত ব্যাক্তি অন্যের কোন কথার গুরুত্ব দিতে চায় না। অন্যের অনুভুতিও কখনও বুঝতে চায় না। এছাড়া সমালোচনা একদমই সহ্য করতে পারে না। নিজেকে সকল বিষয় সঠিক ভাবার একটা স্বার্থপর মনোভাব এদের মাঝে দীর্ঘদিন থেকে যায়। কারো কারো আজীবন। এদেরকে ভাল কিছু বুঝাতে গেলে বা তাদের ভুলের সমালোচনা করতে গেলে এরা সবসময় সেই খোড়া যুক্তি অনুসরন করবে।

৭। অত্যধিক প্রশংসা পাওয়ার তীব্র বাসনা জাগে এ রোগীর মনে। সব রকম কাজে সে অন্যদের প্রশংসা প্রত্যাশা করে। লক্ষ্য এবং উদ্দ্যেশ্যই থাকে অন্যের প্রশংসা কুড়ানো। অথচ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন সুস্থ মানুষরা প্রশংসা পাওয়ার কাজ করলেও তা নিজে থেকে অন্যদের প্রবলভাবে বলে বেড়ায় না।

৮। NPD আক্রান্ত রোগীরা মানসিক ভাবে অবাধ্য হয়। এই সমস্যাটা তাদের মধ্যে তীব্র আকারে দেখা যায়। আপনি যদি দেখেন যে আক্রান্ত ব্যাক্তি যা করছে তা ভুল করছে বা তা ক্ষতির কারণ হচ্ছে আপনি তার চিন্তার বিপরীতে কোন কিছুই বঝাতে পারবেন না। আপনি যুক্তি দেখিয়ে বুঝাতে বুঝাতে হাপিয়ে উঠবেন তাও এরা নিজের কথায় অটল থাকবে।

NPD এর চিকিৎসা: NPD তে আক্রান্ত ব্যাক্তিরা কোনভাবেই এই ধরনের সমস্যাকে রোগ বলতে নারাজ। তারা এতটাই আত্মবিশ্বাসি থাকে যে তাদের ভুল হতে পারে সেটা অসম্ভব। এ কারনে তাদের চিকিৎসা নেয়ার সম্ভাবনা কম। এই রোগে আক্রান্ত ব্যাক্তিরা চিকিৎসা নিতে চায়না। যেহেতু আক্রান্ত ব্যক্তির মাঝে নিজের বিশ্বাসের প্রতি প্রচন্ড রকমের অহংবোধ কাজ করে এবং যেহেতু তাদের মাঝে ঘুরে ফিরে নিজেদের সঠিক মনে করার প্রবণতাটাই কাজ করে, সেক্ষেত্রে একা কোনো থেরাপিস্ট এর পক্ষে এদেরকে সহজে নিজেদের ধারণার বাইরে কিছু বুঝানো অনেক কষ্টদায়ক। তাই এক্ষেত্রে গ্রুপ থেরাপি কার্যকর হবার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। এক্ষেত্রে অনেকেই Mentalization based therapy, transference-focused psychotherapy ও schema-focused psychotherapy পদ্ধতিগুলোর প্রয়োগ সমর্থন করে থাকেন।

আরও পড়ুন

জেনে নিন কোন টিকা করোনা থেকে আজীবন সুরক্ষা দেবে

করোনা সংক্রমণ এড়াতে কী খাবেন, কী খাবেন না

আমাদের করনীয়: নারকিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত রোগীর আচরণ যদি বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যায় তাহলে প্রথম কাজ হবে রোগীকে বুঝিয়ে শুনিয়ে বা ভুলিয়ে ভালিয়ে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া। এছাড়াও ব্যক্তিটির পরিবার, স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও কাছের মানুষদের সম্মিলিত সমর্থন, মানবিক সাহায্য একান্ত প্রয়োজন রোগীর জন্য। সঠিকভাবে সুদীর্ঘ থেরাপির মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সুস্থ করে বের করে আনা সম্ভব এই জঘণ্য আচরণ থেকে।

ডাঃআমিরুল ইসলাম, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও গবেষক


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত