সোমবার, ১৫ আগস্ট ২০২২

পদ্মা সেতুর আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক তাৎপর্য

ইশফাক ইলাহী চৌধুরী

গত ২৫ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদ্মা সেতুর উদ্বোধন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক মাইলফলক হয়ে থাকবে। বস্তুত অনেকে এটিকে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। পদ্মা সেতু, যা বাংলাদেশের অবহেলিত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে রাজধানী ঢাকা এবং দেশের পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে প্রাথমিকভাবে সড়ক ও পরবর্তীকালে রেলপথের মাধ্যমে যুক্ত করবে, তা আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৩০,০০০ কোটি টাকা, যা মার্কিন ডলারে প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়নের সমান, যার সম্পূর্ণটাই বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পটির আরও উল্লেখযোগ্য দিক হলো, প্রকল্পটি একদিকে যেমন ব্যয়বহুল, সেই সঙ্গে প্রকৌশলগত দিক থেকে ছিল ভীষণ চ্যালেঞ্জিং।

বাংলাদেশের জন্য এটি আত্মসম্মানের ব্যাপার ছিল এ জন্য; ২০১২ সালে যখন প্রকল্পটির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত হয়ে আসছিল, তখন দুর্নীতির এক কাল্পনিক অভিযোগ এনে বিশ্বব্যাংক ও পরে এডিবি, জাইকাসহ বিভিন্ন অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান এ প্রকল্প থেকে তাদের সমর্থন তুলে নেয়। প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ যখন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত, ঠিক তখনই প্রধানমন্ত্রী এককভাবে সিদ্ধান্ত নেন- পদ্মা সেতু প্রয়োজনে বাংলাদেশ তার নিজস্ব অর্থায়নে সম্পন্ন করবে। সে সময় দেশ-বিদেশে অনেকেই এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন এবং এর বাস্তবায়নের ব্যাপারেও ছিলেন সন্দিহান। ২০১৪ সালে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার ৮ বছরের মাথায় চার লেনের সড়ক অংশটুকু চালু হয়ে গেল। একই সঙ্গে উচ্চ গতিসম্পন্ন ব্রডগেজ রেল যোগাযোগের কাজটিও দ্রুত সমাপ্তির পথে। প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জগুলোর সমাধানে আমাদের নিজস্ব প্রকৌশলী প্যানেলের তত্ত্বাবধানে বিশ্বসেরা প্রকৌশলী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সহায়তা নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন কারিগরি দিক থেকে এই সেতুটি সমগ্র বিশ্বে এক অনন্য স্থাপনা হয়ে থাকবে।

ইতোমধ্যে ঢাকা থেকে বরিশাল, পটুয়াখালী, যশোর বা খুলনার যাতায়াতের সময় অর্ধেকে নেমে এসেছে। সেই সঙ্গে সড়কপথে ঢাকা থেকে কলকাতা যাতায়াতে সময় লাগবে ৭ ঘণ্টা। আগামী কয়েক মাসে মধুমতীর ওপর নির্মাণাধীন কালনা সেতুটি চালু হলে এবং সেই সঙ্গে যে দু-একটি বাইপাস সড়ক নির্মাণের পথে, সেগুলো চালু হয়ে গেলে মাত্র ৫ ঘণ্টায় ঢাকা থেকে কলকাতা যাওয়া সম্ভব হবে। ২০২৪ সালের দিকে নতুন রেললাইন চালু হলে ট্রেনে মাত্র ৪ ঘণ্টায় কলকাতা পৌঁছা যাবে। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা বাইপাস, ঢাকা-সিলেট চার লেন মহাসড়ক চালু হয়ে গেলে পূর্ব ভারত থেকে উত্তর-পূর্ব ভারতের সংযোগের ক্ষেত্রে এক নবযুগের সূচনা হতে পারে। তখন আগরতলা থেকে কলকাতা ট্রেন বা বাসে দিনে দিনে পৌঁছানো যাবে, যা বর্তমানে অকল্পনীয়। কলকাতা-ঢাকা-সিলেট-শিলং হাইওয়েটি প্রস্তাবিত এশিয়ান হাইওয়ের অঙ্গীভূত। অর্থাৎ উত্তর-পূর্ব ভারত হয়ে এই সড়কপথ মিয়ানমার হয়ে চীন, মালয়েশিয়া হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে যাবে। সেই সঙ্গে যখন আখাউড়া-আগরতলা এবং কুলাউড়া-মহিশ্মশান রেল সংযোগ চালু হবে তখন সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য আর কলকাতানির্ভর না হয়ে চট্টগ্রাম, পায়রা বা মোংলা সমুদ্রবন্দর দিয়ে হতে পারবে। আগামীতে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হয়ে গেলে শুধু ভারতের নয়; নেপাল, ভুটান এমনকি পূর্ব-মিয়ানমারের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে হতে পারে। আগামীতে পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ স্থাপিত হয়ে গেলে তা প্রস্তাবিত ট্রান্স-এশিয়ান রেল নেটওয়ার্কের অঙ্গীভূত হবে। এর ফলে বাংলাদেশসহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী উল্লম্ম্ফন ঘটবে।

পদ্মা সেতুর উদ্বোধন ইতোমধ্যে বাংলাদেশের বাইরে যথেষ্ট আগ্রহের জন্ম দিয়েছে। ১৯৭১ সালে ডক্টর হেনরি কিসিঞ্জার যে বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ আখ্যা দিয়েছিলেন; সেই বাংলাদেশ আজকে নিজস্ব অর্থায়নে ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প বাস্তবায়ন করল, বিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন সমগ্র বিশ্ব করোনা অতিমারি ও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ফলে অর্থনৈতিক মন্দায় আক্রান্ত। স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বসমাজ এখন বাংলাদেশকে অধিক সল্ফ্ভ্রমের দৃষ্টিতে দেখছে।

২০২৬ সালে বাংলাদেশ অনুন্নত দেশের তালিকা থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উত্তীর্ণ হবে। একইভাবে ২০৩০ সালের নধ্যে জাতিসংঘ নির্ধারিত টেকসই উন্নয়নের বিভিন্ন সূচককে বাংলাদেশ অতিক্রম করে যাবে সহজেই। যে বিশ্বব্যাংক ২০১২ সালে পদ্মা সেতু প্রকল্পের অর্থায়ন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিল, সেই ব্যাংকই এখন আগামী ৫ বছরে বাংলাদেশকে ১৮ বিলিয়ন ডলারের সহজ শর্তে ঋণ দিতে প্রস্তুত।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ কোনো একক জোটে না জড়িয়ে নিজেদের স্বার্থের জন্য যা প্রয়োজন তাই-ই করছে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ প্রকল্প ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প’ রাশিয়ার অর্থায়নে হচ্ছে; কর্ণফুলী টানেল প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে চীনের অর্থায়নে; ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প, ঢাকা বিমানবন্দরে তৃতীয় টার্মিনাল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ইত্যাদি প্রকল্প জাপানের অর্থায়নে হচ্ছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের অনেক প্রকল্পে ভারতীয় অর্থায়ন ও প্রকল্প সহায়তা রয়েছে। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও পশ্চিম ইউরোপ আমাদের রপ্তানির প্রধান গন্তব্যস্থল, অপরদিকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো আমাদের জনশক্তি রপ্তানির প্রধান বাজার। আমাদের বৈদেশিক নীতিমালা ও কর্মকাণ্ড পরিচালনায় তাই বহুমাত্রিকতা ও ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে এবং বাংলাদেশ অত্যন্ত সুন্দরভাবে তা করে যাচ্ছে।

পদ্মা সেতুর উদ্বোধন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক কর্মকাণ্ডে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে। সড়ক ও রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়; সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও দূরপ্রাচ্যের যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই সেতু বিশেষ ভূমিকা রাখবে।

ইশফাক ইলাহী চৌধুরী :অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমডোর, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বিশ্নেষক


© 2022 - Deshbarta Magazine. All Rights Reserved.