বুধবার, ১২ মে ২০২১

পাণ্ডুলিপির রহস্য উন্মোচনে বাংলাদেশি গবেষকের সাফল্য

কয়েক হাজার বছরের পুরোনো এক প্রাচীন ধর্মীয় পাণ্ডুলিপি, যা ‘ডেড সী স্ক্রল’ নামে বিখ্যাত, তা কিভাবে লেখা হয়েছিল, সেই রহস্য উন্মোচন করে সাড়া ফেলে দিয়েছেন একদল গবেষক। 

তাদের দলে রয়েছেন একজন বাংলাদেশি। তার নাম মারুফ ঢালি।  তিনি এখন গবেষণা করছেন গ্রুনিনগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার গবেষণার ক্ষেত্র হচ্ছে মূলত কম্পিউটার বেজড ইমেজ প্রসেসিং এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স।

এ নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি বাংলা।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, যে পার্চমেন্ট বা চামড়ার কাগজের ওপর এই পাণ্ডুলিপি লেখা হয়েছে, তা প্রায় সাত মিটার দীর্ঘ। প্রায় ৭০ বছর আগে জেরুজালেমের কাছে এক গুহায় এক আরব বেদুইন এই পার্চমেন্ট খুঁজে পান একটি বয়ামের ভেতর। এতদিন পর্যন্ত ধারণা করা হচ্ছিল এই পাণ্ডুলিপির পুরোটাই একজনের হাতে লেখা। কিন্তু নেদারল্যান্ডসের গ্রুনিনগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই পাণ্ডুলিপির লেখা বিশ্লেষণ করে দেখতে পান, একজন নয়, আসলে দুজন মিলে এই পাণ্ডুলিপিটি লিখেছেন।

গবেষণাটি চালান এই বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন গবেষক ম্লাদেন পপোভিচ, মারুফ ঢালি এবং ল্যাম্বার্ট শমেকার।

মারুফ ঢালির বরাত দিয়ে বিবিসি বাংলা জানায়, বিশ্বে প্রাচীন কোন পাণ্ডুলিপির বিশ্লেষণে এই প্রথম সফলভাবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করা হয়েছে। প্রাচীন টেক্সট বিশ্লেষণে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির এই ব্যবহার এখন এ ধরণের গবেষণার ক্ষেত্রে এক নতুন মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিল বলে মনে করা হচ্ছে।

ডেড সী স্ক্রলে কী আছে?

১৯৪০ এবং ১৯৫০ এর দশকে বেশ কিছু প্রাচীন পাণ্ডুলিপি খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরে ডেড সীর আশেপাশে। এগুলো মূলত পার্চমেন্ট বা গোটানো চামড়ার ওপর লেখা পাণ্ডুলিপি।

হিব্রু হরফে লেখা এই পার্চমেন্ট মূলত প্রাচীন বাইবেল সম্পর্কিত কিছু ধর্মীয় টেক্সট। কিছু টেক্সট আরামেইক এবং গ্রিক ভাষাতেও লেখা। এগুলো খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের বলে মনে করা হয়।

মারুফ ঢালি জানান, এরকম স্ক্রল বা পাণ্ডুলিপির হাজার হাজার ছিন্নভিন্ন অংশ সেখানে পাওয়া গেছে। তবে এরমধ্যে সবচেয়ে বড় স্ক্রলটি ছিল সাত মিটার দীর্ঘ। একজন বেদুইন জেরুজালেমের কাছে এক গুহায় একটি বয়ামের ভেতর এটি পেয়েছিলেন।

এটি ‘ইসাইয়াহ স্ক্রল’ নামেও পরিচিত। ইসাইয়াহ ইহুদীদের একজন নবী।

ডেড সী স্ক্রলের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছে এই ‘ইসাইয়াহ স্ক্রল।’ এটিতে ৫৪টি কলামের লেখা দুটি ভাগে বিভক্ত, কিন্তু এই দুই ভাগের লেখা প্রায় হুবহু একই রকম।

এই পাণ্ডুলিপিকে ঘিরে অনেক রহস্যের এখনো মীমাংসা হয়নি। বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টের সবচেয়ে প্রাচীনতম সংস্করণ এতে লিপিবদ্ধ আছে বলে মনে করা হয়।

মারুফ ঢালি বলেন, “এতদিন পর্যন্ত ধারণা করা হচ্ছিল যে দ্য গ্রেট ইসাইয়াহ স্ক্রল আসলে একজনের হাতেই লেখা। গত ৭০ বছর ধরে বিশেষজ্ঞরা সেটাই মনে করতেন। কিন্তু আমাদের গবেষণায় আমরা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি, এটি একজনের নয়, আসলে দুজনের হাতে লেখা। “
জেরুজালেমের কাছে এক গুহায় পা্ওয়া গিয়েছিল এই প্রাচীন পাণ্ডুলিপি

তিনি বলেন, “আমাদের গবেষণায় আমরা দেখেছি, প্রথম ২৭টি কলাম একজনের লেখা, পরের ২৭টি কলাম আরেকজনের লেখা। তবে যেটা বোঝা যায়, একজন আরেকজনের লেখার স্টাইল হুবহু কপি করার চেষ্টা করেছে। কাজেই প্রথম ২৭টি কলামের সঙ্গে পরের ২৭ টি কলামের হুবহু মিল।”

“এটি খালি চোখে ধরা কঠিন। কিন্তু আপনি যখন খুব ম্যাক্রো লেভেলে, খুব জিওমেট্রিক স্ট্রাকচারে, ম্যাথম্যাটিক্যাল এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স রিলেটেড মডেলিং দিয়ে পরীক্ষা করবেন, তখন দেখবেন, এখানে আসলে একটা ক্লিয়ার সেপারেশন আছে। এটা আসলে দুজনের লেখা, একজনের না।”
যে প্রযুক্তি দিয়ে গবেষণাটি চালানো হয়

নেদারল্যান্ডসের গ্রুনিনগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা মূলত এমন এক অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে এই গবেষণায় ব্যবহার করেন, যেটি দিয়ে প্যাটার্ন চিহ্নিত করা যায়।

তারা ডেড সী স্ক্রলের একটি হিব্রু হরফ ‘আলেফ’ বিশ্লেষণ করেন, যে হরফটি ঐ স্ক্রলে পাঁচ হাজার বারের বেশি ব্যবহৃত হয়েছে।

গবেষকরা বলেছেন, ঐ টেক্সট যে কালি দিয়ে লেখা হয়েছে, তার অবশেষ তারা ডিজিটাল ইমেজে চিহ্নিত করতে পেরেছেন।

কাজটি কিভাবে করা হয়েছে তা ব্যাখ্যা করলেন মারুফ ঢালি।

“আমরা পুরো পার্চমেন্টের লেখা কম্পিউটারে প্রসেস করলাম। এগুলো আসলে আরমেইক ভাষায় লেখা, তবে হিব্রু অক্ষরে। ভাষা আরমেইক, অক্ষর হিব্রু। বর্তমান পৃথিবীতে আসলে খুব বেশি মানুষ আরমেইক বলে না। কিন্তু প্রচুর মানুষ আছেন, যারা আরমেইক বলতে পারেন এবং পড়তে পারেন।”

তিনি বলেন, ডকুমেন্টগুলো যেহেতু অনেক পুরোনো, তাই অনেক লেখা নষ্ট হয়ে গেছে। এই ডকুমেন্ট থেকে মেইন ক্যারেক্টার বের করাটা তাদের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ ছিল। তারা কিছু পড়তে পারছিলেন, কিছু পারছিলেন না।

“আমরা যদি হিব্রু নাও জানি, বুঝতে পারি কোথায় লেখা, আর কোথায় ডকুমেন্টের ব্যাকগ্রাউণ্ড। কাজেই আমরা একটা কম্পিউটার প্রোগ্রাম ডেভেলপ করি, এই প্রোগ্রামকে আমরা শেখাই ,কিভাবে লেখা পড়তে হয়। কম্পিউটার আসলে লেখার অর্থ জানে না, কিন্তু সে জানে কিভাবে পড়তে হয়। এভাবেই আমরা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে কাজে লাগিয়েছি।”
কিন্তু আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কিভাবে ধরতে পারলো যে এই ডেড সী স্ক্রল দুজনের হাতে লেখা?

মারুফ ঢালি বলেন, “আমরা যখন লিখি, তখন আমাদের লেখা হাতের ফ্লেক্সিবিলিটি এবং কব্জির মুভমেন্ট দ্বারা নির্ধারিত হয়। আপনার কব্জির মটর মুভমেন্ট অনেক কিছু নির্ধারণ করে। এই জিনিসটাকেই আমরা একটা কম্পিউটারের ম্যাথম্যাটিকাল মডেলে নিয়ে এসেছি। “

“আমরা প্রতিটি ক্যারেক্টারের অ্যাঙ্গেল ডিস্ট্রিবিউশন পরিমাপ করেছি। এরপর আমরা আবার প্রতিটি ক্যারেক্টারকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে একটিকে আরেকটির ওপর বসিয়েও তুলনা করেছি, একটির সঙ্গে আরেকটির কতটা পার্থক্য। এভাবেই আমরা বুঝতে পারি, প্রথম ২৭টি কলামের সঙ্গে পরের ২৭টি কলামের পার্থক্য আছে। এটি আসলে দুজনের লেখা।”
 
তিনি বলেন, ব্যাংকের চেকে গ্রাহকের সই যেভাবে যাচাই করা হয়, এটা অনেকটা সেরকম।

তবে দুজনের হাতের লেখা হলেও তাদের লেখায় অদ্ভুত সাদৃশ্য আছে, যেটা দেখে তারা মনে করছেন, এরা দুজন হয়তো ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। হয়তো তারা পিতা-পুত্র, বা শিক্ষক-ছাত্র, এরকম কোন সম্পর্ক।

মারুফ ঢালি বলেন, “ওই সময় আসলে তো বেশি মানুষ লিখতে পারতো না। আমরা আসলে দুই হাজার তিনশো বা দুই হাজার চারশো বছর আগের কথা বলছি। তখন আসলে খুব অল্প কিছু মানুষ লিখতো। অল্প কিছু মানুষ একজন আরেকজনকে লিখতে শেখাতো। কাজেই একজনের লেখার স্টাইলের প্রতিফলন আরেকজনের লেখায় আছে।”

যে প্রযুক্তি এই গবেষকরা তৈরি করলেন, সেটা এখন কি কাজে লাগবে?

মারুফ ঢালি বলেন, “আমরা আসলে এমন একটা টুল ডেভেলপ করতে চাই, যেটা পক্ষপাতহীন, আনবায়াসড। গত ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে মানুষ বলে যাচ্ছে, ডেড সী স্ক্রল একই মানুষের লেখা। কেন এটা বলা হচ্ছে? কেউ না কেউ অবশ্যই এই লেখার মধ্যে কিছু পার্থক্য দেখেছে।”

“কিন্তু কেন কেউ এই পার্থক্যের কথা বলেনি? কারণ তাদের মধ্যে হয়তো কোন রিলিজিয়াস বা সোশ্যাল বায়াস ছিল। একজন মানুষ হয়তো এই ডিসিশনটা নিতে পারছে না। বা তার হয়তো এই অ্যানালিটিকাল ক্ষমতা নেই। আমরা চাইছিলাম এমন একটা টুল যেটা শুধুমাত্র ঐ এনালিসিসের ভিত্তিতেই রেজাল্ট দেবে। আমরা চাইছি এই টুলটা যেন যে কোন প্রাচীন ডকুমেন্টের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায়।”

তিনি আশা করছেন এটা যে কোন প্রাচীন পাণ্ডুলিপি গবেষণায় ব্যবহার করা যাবে।

বত্রিশ বছর বয়সী মারুফ ঢালির জন্ম ঢাকায়, পড়াশোনা করেছেন কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজ এবং ঢাকার ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে। মাস্টার্স করেছেন এডিনবারা ইউনিভার্সিটি থেকে। এরপর গ্রুনিনগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে গিয়ে এই গবেষণায় যুক্ত হন।

তিনি বলেন, প্রাচীন পাণ্ডুলিপির প্রতি তার আগ্রহ ছিল ছোটবেলা থেকেই।

আমার বাবা ছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। তিনি ইরাকে কাজ করতেন। সেখান থেকে প্রাচীন অনেক পাণ্ডুলিপির রেপ্লিকা আমাদের জন্য আনতেন। তখন তিনি আমাদের সঙ্গে এ নিয়ে গল্প বলতেন। সেখান থেকে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।”


©  দেশবার্তা কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত