রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১

পান্তাভাতের গপ্প

রিমি দত্ত

‘পান্তাভাতে টাটকা বেগুন পোড়া’- গরম পড়লেই বাংলার মাঠে-ঘাটে-ঘরে এই গানটির গুনগুন প্রায়ই শোনা যায়। এককথায়, গরমের ঠান্ডা হওয়ার আদি প্রথা। রাতের গরম ভাতে পানি ঢেলে মাটির হাঁড়িতে রাখা হয়। পানিতে ভাত ভেজানো হয় বলে হয়ত এর নাম ‘পান্তাভাত’ হয়েছে। একে আবার ভাত সংরক্ষণের প্রাচীন পন্থাও বলা যেতে পারে। গ্রামবাংলার খেটে খাওয়া মানুষদের কাছে এই ভাত গরমে যেমন তাদের শরীর ঠান্ডা রাখে, পাশাপাশি শক্তিও যোগায়। দিনের প্রধান খাবার হিসাবে তারা পান্তা খেয়ে থাকে।

পান্তাভাতের সঙ্গে থাকে কাঁচালঙ্কা বা শুকনো লঙ্কা পোড়া, কাঁচা পেয়াজ, সরষের তেল ও নুন। আর সঙ্গে থাকে ডালের বড়া অথবা মাছ ভাজা বা তরকারি। এই পান্তাভাতের জল থেকে তৈরি করা হয় আমানি। এই আমানি একধরনের দেশি ঠান্ডা পানীয়। তবে এটি বেশি গেঁজিয়ে একধরনের সুরাও তৈরি করা হয়। গ্রামেগঞ্জে এর প্রচলন দেখা যায়।

গ্রীষ্মের রাতে টিমটিম করা লণ্ঠনের আলোয় মাটির দেওয়ায় বসে মাঝখানে মাটির হাঁড়িতে পান্তাভাত গ্রীষ্মকালে গ্রামবাংলার একটি পরিচিত দৃশ্য। কিছুটা এলিয়ে পড়া পান্তাভাত ও আমানি বাংলার এক নিজস্ব খাবারও বলা যেতে পারে। তবে নিছক রসনা তৃপ্তিই নয়। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় প্রমাণিত, গরম ভাতের তুলনায় পান্তার উপকারিতা বেশি। অনেক পুষ্টিবিদদের দাবি, পান্তা ভাতের পুষ্টিগুণ অনেক বেশি। দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকে এবং গরমে শরীর ঠান্ডা রাখে।

বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় দেখা গেছে, ১০০ গ্রাম পান্তা ভাতে ১২ ঘণ্টার পর ৭৩.১১ মিলিগ্রাম আয়রন থাকে। এছাড়া ১০০ গ্রাম পান্তাভাতে ৩০৩ মিলিগ্রাম সোডিয়াম, ৮৩১ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম এবং ৮৫০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম থাকে। গরমে শরীরে জলের অভাব দূর করে তাপমাত্রার ভারসাম্য বজায় রাখে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে। দীর্ঘক্ষণ ভাত ভিজিয়ে রাখার ফলে সহজপাচ্য হয় এর ফলে পেটের রোগ, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।

বাঙালির প্রিয় এই পান্তাভাতের সঙ্গে কী থাকবে, তা নিয়ে অঞ্চলভেদে পার্থক্য দেখা যায়। মাটির হাঁড়িতে রাখা পান্তাভাত পরিবেশন করা সময় জল ছেঁকে নেওয়া হয়। দরিদ্র মানুষের কাছে এর সঙ্গের উপাদানে বাহারি আইটেম সাধারণত দেখা যায় না। কাঁচালঙ্কা অথবা শুকনো লঙ্কা পোড়া, কাঁচা পেঁয়াজ, নুন আর সরষের তেল। কখনও শাকভাজা অথবা তেঁতুল।

পান্তাভাত সাধারণত খেটে খাওয়া মানুষের খাবার বলে পরিচিত হলেও হিন্দুশাস্ত্র ভগবানের ভোগ হিসাবে এই উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। চণ্ডীমঙ্গলে পান্তাভাতের উল্লেখ আছে। পান্তা ভাতের আরেক নাম কাঞ্জী। বৈষ্ণবরা রাধাকৃষ্ণকে পান্তা ভোগ দেনে জ্যৈষ্ঠ মাসে। এর নাম পাকাল ভোগ। এতে থাকে পান্তাভাত, দই, চিনি, কলমি শাক ভাজা এবং দুই একরকমের নিরামিষ তরকারি। মা দুর্গাকেও দশমীতে পান্তা ভোগ দেওয়া হয়।

কথিত আছে গ্রামের মেয়ে উমা অনেক দূর পেরিয়ে শ্বশুর বাড়ি যাবেন। তাই সহজপাচ্য ও শরীর ঠান্ডা করার জন্য এই ভোগ দেওয়া হয়। শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে যাতে ছেলেপুলেরা শ্মশানবাসী বাপের কাছে ঐতিহ্যপূর্ণ খাবারের গল্প না করতে পারে, তার জন্য দেওয়া হয় পান্তাভোগ। আবার অনেকের মতে, মেয়ে চলে যাচ্ছে। এই দুঃখে মা-বাবা আগের দিনের রান্না করা খাবার খায়। অনেক বনেদি বাড়িতে এখনও এই রীতি মানা হয়। একই ভোগে থাকে পান্তাভাত, ইলিশ মাছ, কচুরলতি বাসি তেঁতুল অথবা আমসির চাটনি এবং মাছের মাথা দিয়ে অম্বল।


© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত